
ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির লক্ষ্য অর্জনে বাংলাদেশ-চীন করিডোর গুরুত্বপূর্ণ
কামরুল হাসান দর্পণ [সূত্র : Daily Inqilab, ৩১ জুলাই ২০২৬]
দেশের অর্থনীতিকে ২০৩৪ সালের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলারে পরিণত করার প্রতিশ্রুতি বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে রয়েছে। সাধারণ মানুষের কাছে অর্থনীতির এই হিসাব দুর্বোধ্য। সাধারণ মানুষ কেবল বোঝে নির্বাচনী ইশতেহারে তাদের জীবনমান উন্নয়নে কি প্রতিশ্রুতি দেয়া হচ্ছে। তারা নিশ্চিন্তে তিনবেলা খেতে পারবে কিনা, আয়-রোজগার বাড়বে কিনা, কর্মসংস্থান হবে কিনা, নিরাপদ পরিবেশে বসবাস করতে পারবে কিনা, শিক্ষা-স্বাস্থ্যের পর্যাপ্ত সুযোগ পাবে কিনা ইত্যাদি মৌলিক বিষয়গুলো যে দল নিশ্চিত করতে পারবে এবং এসব বাস্তবায়নে দলটির সক্ষমতা ও অভিজ্ঞতা কতটুকু, তা বিবেচনা করে ভোট দেয় এবং নির্বাচিত করে। সামষ্টিক অর্থনীতি, মাইক্রো অর্থনীতি, জিডিপি, অর্থনীতির এসব জটিল বিষয় তারা বোঝে না। এসব কঠিন হিসাবও তাদের জন্য নয়।
এগুলো দেশের অর্থনীতিবিদ, বিশেষজ্ঞদের বিষয়। এ নিয়ে তারা হিসাব-নিকাশ করেন। জিডিপি কত হবে, অর্থনীতির আকার কি হবে এবং তা কীভাবে অর্জিত হবে, এগুলোর তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ তারা দেবেন। সাধারণ মানুষ শুধু বোঝে তার আয়-রোজগার বাড়ছে কিনা এবং তা দিয়ে স্বচ্ছন্দে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনতে পারছে কিনা। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সম্প্রতি বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি উল্লেখ করে বলেছেন, ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে রূপান্তর করতে সরকার অঙ্গীকারবদ্ধ। এজন্য কি করতে হবে, তাও তুলে ধরেন।
তিনি বলেছেন, আইনি ও নিয়ন্ত্রক কাঠামোর আধুনিকায়ন, বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা জোরদার, দ্রুত বিরোধ নি®পত্তি, কর-ভ্যাট প্রশাসন সহজীকরণ ও মুনাফা দেশে ফেরত নেয়ার প্রক্রিয়া সহজ করতে সরকার কাজ করছে। পাশাপাশি পুঁজিবাজার শক্তিশালী করা, স্টার্টআপে উৎসাহ দেওয়া, সরকারি সেবার ডিজিটালাইজেশন এবং অবকাঠামো ও জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ১ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির লক্ষ্য অর্জনে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, ওষুধ, ইলেকট্রনিক্স, ডিজিটাল সেবা, কৃষি-প্রক্রিয়াজাতকরণ, উন্নত বস্ত্রশিল্প, স্বাস্থ্যসেবা ও লজিস্টিকস খাতে বিশেষ প্রণোদনা দেয়া হবে। প্রধানমন্ত্রীর কথা অনুযায়ী, ১ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি অর্জন করতে হলে, এসবই করতে হবে। এসব কাজ করতে অনেক অর্থের প্রয়োজন। এই অর্থ জোগাড় করতে হবে। অর্থপ্রবাহ বৃদ্ধি করে মানুষকে কর্মমুখী ও কর্মচঞ্চল করে তুলতে হবে। এজন্য প্রয়োজন, দেশি-বিদেশি ব্যাপক বিনিয়োগ এবং বিনিয়োগের উৎস ঠিক করে বিনিয়োগকারিদের আকৃষ্ট করা। বিনিয়োগকারিরা যাতে নিশ্চিন্তে বিনিয়োগ করতে পারে, এমন পরিবেশ এবং সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা।
দুই.
বিএনপি সরকার এমন এক সময়ে দায়িত্ব নিয়েছে, যখন দেশের অর্থনীতি বলতে কিছু নেই। বলা যায়, শূন্যের উপর দাঁড়িয়ে যাত্রা শুরু করেছে। বিগত ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকার লুটপাট ও অর্থপাচার করে দেশের অর্থনীতিকে অচলাবস্থার মধ্যে রেখে গিয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারও গভীর খাদে পড়ে যাওয়া অর্থনীতিকে টেনে তুলতে পারেনি। উল্টো তা আরও গভীরে নিয়ে গেছে। এমন এক পরিস্থিতিতে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বিএনপি ক্ষমতায় এসেছে। জনগণের বিপুল প্রত্যাশা এবং শূন্য অর্থনীতির অসীম চাপ নিয়েই বিএনপিকে যাত্রা শুরু করতে হয়েছে। তার যাত্রা এমন এক সময়ে হয়েছে, যখন দেশের অর্থনৈতিক মন্দার সাথে ইরানযুদ্ধে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দাও যুক্ত হয়েছে। বলা যায়, যুদ্ধে বিধ্বস্ত হওয়া একটি দেশের পুনর্গঠনের দায়িত্ব এসে পড়ে বিএনপি সরকারের উপর। অস্বীকার করার উপায় নেই, তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেয়ার পরপরই নিরলস পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে বহুমুখী প্রচেষ্টা শুরু করেছেন। বিরোধীদলের নানা সমালোচনা সত্ত্বেও নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী, ফ্যামিলিকার্ড, কৃষককার্ড, সুদসহ কৃষকের দশহাজার টাকা পর্যন্ত মওকুফ, ইমাম-মুয়াজ্জিন, পুরোহিতদের মাসিক ভাতা ইত্যাদি প্রদান করে মানুষের হাতে নগদ অর্থ পৌঁছানোর প্রক্রিয়া শুরু করেছেন। ক্ষমতায় আসার তিন মাসের মাথায় ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বাজেট (৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা) সরকার ঘোষণা করেছে। বলা হয়ে থাকে, বাজেটের আকার যাই হোক না কেন, তা যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করার মধ্যেই সার্থকতা থাকে।
ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায়, কোনো বাজেটই পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। হয়ত বিএনপি সরকার ঘোষিথ ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বাজেট পুরোপুরি বাস্তবায়ন হবে না। দেশের চলমান ভঙ্গুর অর্থনীতির কারণে বাজেটে ঘাটতি থেকে যাবে এবং সংশোধন করতে হবে। অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী স্পষ্ট করেই বলেছেন, দেশের এই নাজুক অর্থনীতি স্বাভাবিক হতে চার বছর লেগে যাবে। এর মধ্যে রয়েছে, ২০৩৪ সালের মধ্যে অর্থনীতিকে ট্রিলিয়ন ডলারে রূপান্তর করার চাপ। অর্থনীতিবিদরা বলেছেন, এই লক্ষ্য অত্যন্ত উচ্চাভিলাসী। তবে অর্জন করা খুব কঠিন নয়। বর্তমানে অর্থনীতির আকার প্রায় ৫০১ বিলিয়ন ডলার।
জিডিপির হার ৪.১৪ শতাংশ। ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত হতে হলে আগামী ৮ বছরে জিডিপির হার গড়ে ৯.১ শতাংশ হতে হবে। এই সময়ের মধ্যে অর্থনীতির আকার ৫০১ বিলিয়ন ডলারকে দ্বিগুণ করে ১ ট্রিলিয়ন ডলারে নিয়ে যেতে হবে। এ এক কঠিন পথ। তবে পরিকল্পনামতো এগুলো এবং অর্থনীতির খাতকে বহুমুখী করতে পারলে এ পথ পাড়ি দেয়া কঠিন হবে না। এজন্য রফতানিমুখী অর্থনীতির অন্যতম দুই খাত গার্মেন্ট ও জনশক্তি রফতানিকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি উৎপাদন খাত এবং নতুন নতুন রফতানিমুখী খাত তৈরি করতে হবে। আমাদের কৃষিখাতকে এখনো উল্লেখযোগ্যভাবে রফতানিমুখী করা যায়নি। প্রতিবছর কৃষক বিভিন্ন কৃষিপণ্য অতিরিক্ত উৎপাদন করে দাম না পেয়ে হতাশ হয়ে পড়ে। অথচ দেশের চাহিদা পূরণ করে অতিরিক্ত খাদ্যপণ্য রফতানির সুযোগ রয়েছে। এতে একাধিক রফতানি খাত সৃষ্টি হবে। বিশ্বে এখন প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতির অন্যতম বড় বাজারে পরিণত হয়েছে।
আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) এখন সবক্ষেত্রে রাজত্ব করছে। এর মধ্যে চিপ নির্ভর সেমিকন্ডাক্টর প্রযুক্তি যুক্ত হয়েছে। রোবটিক্স, ডেটাসেন্টার, নবায়নযোগ্য জ¦ালানি, চিকিৎসা সরঞ্জাম, মোবইল ফোন, মহাকাশের স্যাটেলাইট ইত্যাদির সুবিধা রয়েছে। এ বছরের মধ্যেই বিশ্বে এর বাজার ১ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারে পরিণত হবে। সম্প্রতি সেমিকন্ডাক্টর বিয়ার সামিটে বাংলাদেশের বিশেষজ্ঞরা বাংলাদেশে এর বিপুল সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেছেন। সেমিনারে প্রধানমনন্ত্রী তারেক রহমান প্রধান বলেছেন, তৈরি পোশাকের পরই সেমিকন্ডাক্টর শিল্প বাংলাদেশের জন্য নতুন অর্থনৈতিক খাত হতে পারে। দেশে উৎপাদিত ওষুধ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রফতানি হচ্ছে। এ খাতটিকে আরও বিস্তৃত করে রফতানির বাজার বাড়াতে পারলে, এটিও গার্মেন্ট ও জনশক্তি রফতানি খাতের সারিতে পৌঁছতে পারবে। বাংলাদেশের অর্থনীতিকে ১ ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত করতে বিভিন্ন উৎপাদনখাত ও রফতানি বাণিজ্য শক্তিশালী করার বিকল্প নেই।
তিন.
ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির লক্ষ্য অর্জন করতে হলে দেশের যেসব উৎপাদনশীল খাত রয়েছে সেগুলোকে শক্তিশালী করাসহ নতুন নতুন খাতে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী দেশগুলোর সাথে সুসম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। বিশেষ করে বিশ্বের দ্বিতীয় অর্থনৈতিক শক্তি চীনের সাথে সম্পর্ক জোরদার করতে হবে। চীনের বিনিয়োগে বিশ্বের অনেক দেশ দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। একমাত্র চীনই কোনো আধিপত্যবাদী মনোভাব না নিয়ে শুধু বাণিজ্যিকে প্রাধান্য দিয়ে প্রত্যেক দেশের সাথে সুসম্পর্ক গড়ে তুলছে। পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে উভয়পক্ষ লাভবান হওয়াই তার লক্ষ্য।
বিনিয়োগের ক্ষেত্রে তার এই উদার মনোভাবের কারণে ধনী-দরিদ্র দেশগুলো তার দিকে ঝুঁকেছে। এক্ষেত্রে আমাদের পিছিয়ে থাকার সুযোগ নেই। আমরা এই সুযোগ কাজে লাগাতে পারি, বাংলাদেশ-মায়ানমার-চীন করিডোর বাস্তবায়নের মাধ্যমে। এটা বাস্তবায়ন করা হলে, প্রধানমন্ত্রী যে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন, তা অর্জনের পথ সহজ হয়ে যাবে। এর মাধ্যমে শুধু চীনের বিনিয়োগ ও বাণিজ্যিক সম্পর্কই প্রতিষ্ঠিত হবে না, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সাথেও অর্থনৈতিক সম্পর্ক সুদৃঢ় হবে। এই করিডোরের মাধ্যমে প্রত্যেকটি দেশের সাথে যোগাযোগ সহজ হবে। বলার অপেক্ষা রাখে না, একের সাথে অপরের যোগাযোগ সম্পর্ককে যেমন সুদৃঢ় করে, তেমনি পারস্পরিক অর্থনৈতিক সম্পর্কও গড়ে উঠে। মানুষের সাথে মানুষের সম্পর্ক তৈরি হয়। বাংলাদেশ-মিয়ানমার-চীন করিডোর শুধু একটি যোগাযোগ ব্যবস্থাই নয়, এটি অর্থনৈতিক সম্পর্কের একটি লাইফ লাইনে পরিণত হবে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোকে একসুতোয় বাঁধা হবে। এতে চেইনশপের মতো ব্যবসা-বাণিজ্যকেন্দ্রে পরিণত হবে।
বিনিয়োগের অপার দুয়ার খুলে দেবে। আমরা যদি ইউরোপের দেশগুলোর দিকে তাকাই তাহলে দেখব, দেশগুলো একে অপরের সাথে সড়ক ও রেলপথে যুক্ত। তারা একে অপরের সাথে বিনিয়োগ-বাণিজ্য করে লাভবান হচ্ছে। এক ট্রেনে চড়ে এক দেশের মানুষ অনেক দেশে চলে যেতে পারছে। আমারা যেন ভারতঘেরা এক বদ্ধ ঘরে আটকে আছি। এই বদ্ধাবস্থা থেকে বের হতে হবে। আমাদের বের হওয়ার দুয়ার আমাদেরকেই খুলতে হবে। এই দুয়ার হবে বাংলাদেশ-মিয়ানমার-চীন করিডোর। দুয়ার খুলতে ভারত বাধা দেবে, এটা স্বাভাবিক। তবে আমাদের এখন নিজের উন্নয়নের স্বার্থে বিশালবপুর রুগ্ন ভারতকে তোয়াক্কা করার সময় নেই। আমাদের করিডোরের মাধ্যমে বের হতে হবে। বিশ্বের সাথে যোগাযোগ বাড়াতে হবে।
চার.
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি স্বপ্নের মতো মনে হলেও তা অর্জন অনেক সহজ করে দেবে বাংলাদেশ-মিয়ানমার-চীন করিডোর। শুধু দেশের সীমিত অর্থনৈতিক খাত নিয়ে ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির লক্ষ্য পূরণ করা সম্ভব হবে না। প্রধানমন্ত্রী দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানোর অনেক সুবিধার কথা বলেছেন। এসব সুবিধা দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে। তা নাহলে, বিনিয়োগকারীরা আস্থা পাবে না। বিনিয়োগের অন্যতম বাধা হয়ে আছে গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট। এই সংকট দ্রুত সমাধান করতে হবে। বিনিয়োগকারিদের বিনিয়োগের জায়গাটি প্রস্তুত করে দিতে হবে, যাতে বিনিয়োগ করে দ্রুত বাণিজ্য শুরু করতে পারে। শুধু ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির স্বপ্ন দেখলে হবে না, স্বপ্ন বাস্তবায়নে পরিকল্পনা ও তার দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে।



