
বদলে গেছে রাখাইন, বদলায়নি রোহিঙ্গাদের জীবন
রোহিঙ্গাদের যে রাখাইনে ফেরার কথা, সেই ভূখণ্ডের বড় অংশের নিয়ন্ত্রণ এখন আর মিয়ানমার সরকারের হাতে নেই। ফলে ৯ বছর পর প্রত্যাবাসনের পুরোনো সমীকরণও বদলে গেছে। লিখেছেন রাহীদ এজাজ রাহীদ এজাজ [প্রকাশ : প্রথম আলো, ২৫ আগস্ট ২০২৬]
মিয়ানমার সম্প্রতি বলেছে, বাংলাদেশে থাকা তিন লাখের বেশি রোহিঙ্গা রাখাইনের সাবেক বাসিন্দা। একই সঙ্গে তাদের ‘রোহিঙ্গা’ পরিচয় অস্বীকার করে আবারও ‘বাঙালি’ শব্দটি সামনে এনেছে নেপিদো। ফলে মিয়ানমারের এই পরস্পরবিরোধী বার্তা প্রশ্ন তুলছে—রোহিঙ্গাদের ফেরত নেওয়ার ক্ষেত্রে দেশটির মনোভাবে কি আদৌ পাল্টেছে, নাকি পুরো সংকটকে আরও জটিল করতে চাইছে?
মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ১৭ আগস্ট জানিয়েছে, বাংলাদেশ যে ৮ লাখ ২৮ হাজার ৮২৪ জনের তালিকা দিয়েছে, তার মধ্যে ৪ লাখ ২৬ হাজার ৫৪৫ জনের তথ্য যাচাই করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ৩ লাখ ৮ হাজার ৭৯৭ জনকে রাখাইনের সাবেক বাসিন্দা হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। কিন্তু প্রত্যাবাসনের কোনো সময়সীমা দেয়নি নেপিদো। বরং নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত প্রত্যাবাসন শুরু হবে না বলে জানিয়েছে।
এর মধ্যেই ‘বাঙালি’ বিতর্কটি সামনে এসেছে। রোহিঙ্গাদের এই নামে অভিহিত করা মিয়ানমারের পুরোনো অবস্থান। তবে প্রত্যাবাসন নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরুর সময় এই অবস্থানকে সামনে আনার রাজনৈতিক তাৎপর্য নিয়েই এখন প্রশ্ন উঠছে। একদিকে রোহিঙ্গাদের রাখাইনের সাবেক বাসিন্দা হিসেবে শনাক্ত করা হচ্ছে, অন্যদিকে তাদের নিজস্ব জাতিগত পরিচয় অস্বীকার করা হচ্ছে। ফলে প্রশ্নটি শুধু কতজনকে মিয়ানমার ফেরত নিতে প্রস্তুত, তা নয়; বরং যাদের ফিরিয়ে নেওয়ার কথা বলা হচ্ছে, তাদের পরিচয় ও অধিকার নিয়েই যদি মিয়ানমারের অবস্থান অনড় থাকে, তাহলে সেই প্রত্যাবাসন কতটা বাস্তব?
৯ বছর আগে ২৫ আগস্টের পর থেকে কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ৭ লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছিল। তখন প্রত্যাবাসনের সমীকরণ এখনকার মতো এতটা জটিল ছিল না। রাখাইনের পুরোটাই ছিল মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে। রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমার সেনাবাহিনীর ভয়াবহ নৃশংসতার পর আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ছিল। এমন একটা সময়ে অনেকটা তাড়াহুড়া করে চীনের চাপে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের প্রায় তিন মাসের মাথায় বাংলাদেশ প্রত্যাবাসনের চুক্তি সই করেছিল মিয়ানমারের সঙ্গে। আশা করা হয়েছিল, মিয়ানমার সরকারের সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমেই একদিন রোহিঙ্গাদের ফেরানো সম্ভব হবে।
২০২৬ সালের মিয়ানমারে সেই বাস্তবতা নেই। দেশটিতে ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর গৃহযুদ্ধ ছড়িয়ে পড়েছে। সামরিক বাহিনী বিভিন্ন এলাকায় নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে। রাখাইনেও ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে গেছে। আরাকান আর্মি এখন রাজ্যটির একটি প্রধান সামরিক ও রাজনৈতিক শক্তি। এই পরিবর্তনের মধ্যেই মিয়ানমার নতুন করে প্রত্যাবাসনের সংখ্যা সামনে আনছে।
বাংলাদেশ ও মিয়ানমার ২০১৮ সালের নভেম্বরে রোহিঙ্গাদের প্রথম দলকে প্রত্যাবাসনের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। প্রথম দফায় একজন রোহিঙ্গাকেও ফেরত পাঠানো যায়নি। দুই দেশ ব্যর্থ হওয়ার পর রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে যুক্ত হয় চীন। ২০১৯ সালে চীনের মধ্যস্থতায় প্রত্যাবাসনের দ্বিতীয় চেষ্টাও বিফলে যায়। নাগরিকত্ব ও নিরাপত্তার নিশ্চয়তার অভাবসহ রাখাইনে অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি না হওয়ায় রোহিঙ্গারা ফিরে যেতে রাজি হয়নি।
সংখ্যা নিয়ে মিয়ানমারের কৌশল
হঠাৎ করে তিন লাখের বেশি রোহিঙ্গা যাচাইয়ের বিষয়ে মিয়ানমারের ঘোষণায় অনেককে কৌতূহলী করে তুললেও দেশটির এমন প্রচার প্রথম নয়। ২০২৫ সালের এপ্রিলে ব্যাংককে ষষ্ঠ বিমসটেক শীর্ষ সম্মেলনের ফাঁকে মিয়ানমারের উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী থান শিউ বৈঠক করেছিলেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার তৎকালীন হাই রিপ্রেজেনটেটিভ খলিলুর রহমানের সঙ্গে। ওই বৈঠকে মিয়ানমার প্রাথমিকভাবে ১ লাখ ৮০ হাজার রোহিঙ্গাকে প্রত্যাবাসনের জন্য যাচাইকৃত ও উপযুক্ত বলে নিশ্চিত করে।
মিয়ানমারের এমন ঘোষণার বিষয়ে বাংলাদেশের তখনকার সরকারের মনোভাব ছিল এমন, সামরিক জান্তার কাছ থেকে সংখ্যার বিষয়ে একটি ঘোষণা আসুক। কিন্তু যেসব রোহিঙ্গাকে প্রত্যাবাসনের উপযুক্ত বলা হয়েছিল, তাদের কবে নেবে, সেটি তখন মিয়ানমার ঘোষণা করেনি। তখনো মিয়ানমার বলেছিল, নিরাপত্তা পরিস্থিতি ভালো হলে প্রত্যাবাসন শুরু হবে। রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা নেই। প্রতিবারই একটা জায়গায় এসে প্রক্রিয়া থেমে গেছে, যাচাই হয়েছে, কিন্তু প্রত্যাবাসন হয়নি। এবারের ছবিটা তার ব্যতিক্রম নয়। এখানে ‘ভেরিফিকেশন’ আর ‘রিপ্যাট্রিয়েশন’-এর পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ। কাউকে রাখাইনের সাবেক বাসিন্দা হিসেবে শনাক্ত করা মানেই তার নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের পরিবেশ তৈরি হয়েছে, এমন নয়।
পুরোনো ‘বাঙালি’ বয়ান, নতুন প্রশ্ন
রোহিঙ্গাদের ‘বাঙালি’ হিসেবে অভিহিত করাটা মিয়ানমারের জন্য নতুন কিছু নয়। দেশটি ১৩৫টি স্বীকৃত জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে রোহিঙ্গাদের স্বীকৃতি দেয় না। নাগরিকত্বের ক্ষেত্রেও তাদের অধিকার অস্বীকার করে এসেছে। তবে এখন প্রশ্ন উঠছে, এই পুরোনো বয়ানটি নতুন করে সামনে আনার সময়টি কেন? বাংলাদেশ যখন প্রত্যাবাসনের জন্য মিয়ানমারের সঙ্গে তালিকা যাচাই ও আলোচনার চেষ্টা করছে, তখন মিয়ানমার বলছে ‘রোহিঙ্গা’ নামে কোনো জাতিগোষ্ঠী নেই। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এর প্রতিবাদও করা হয়েছে। নির্বাসিত রোহিঙ্গারা মনে করে, এটি মিয়ানমারের পুরোনো অবস্থানেরই ধারাবাহিকতা। রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব ও পরিচয় স্বীকার না করার বিষয়টি এটা স্পষ্ট করে যে প্রত্যাবাসনের ব্যাপারে দেশটির সত্যিকারের সদিচ্ছা নেই।
তবে এই বক্তব্যগুলোর পাশাপাশি মিয়ানমারের সাম্প্রতিক পদক্ষেপের আরেকটি দিকও আছে। তারা যে ৩ লাখ ৮ হাজার ৭৯৭ জনকে রাখাইনের সাবেক বাসিন্দা হিসেবে শনাক্ত করেছে, সেটি অন্তত দেখায় যে পুরো বিষয়টি তারা আনুষ্ঠানিকভাবে অস্বীকার করছে না। তাই ‘বাঙালি’ বয়ানকে একেবারে নতুন নীতি না বলে পুরোনো পরিচয়-রাজনীতির পুনরাবৃত্তি হিসেবে দেখা বেশি যুক্তিযুক্ত। আসল প্রশ্ন হলো এই পরিচয়-রাজনীতি প্রত্যাবাসনের বাস্তব প্রক্রিয়াকে কতটা প্রভাবিত করছে।
রাখাইন এখন আরাকান আর্মির হাতে
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের পুরোনো কাঠামোর সবচেয়ে বড় পরিবর্তন ঘটেছে রাখাইনের ক্ষমতার সমীকরণে। ২০২৩ সালের শেষ দিকে আরাকান আর্মি রাখাইনে বড় ধরনের অভিযান শুরু করে। এরপর একের পর এক সামরিক ঘাঁটি ও গুরুত্বপূর্ণ এলাকা তাদের নিয়ন্ত্রণে আসে। ২০২৪ সালের শেষ দিকে বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী মংডুও আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে যাওয়ার দাবি ওঠে। ফলে উত্তর রাখাইনসহ রাজ্যের বিস্তীর্ণ অংশে মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়ে পড়ে। সিত্তের মতো কিছু গুরুত্বপূর্ণ এলাকা নেপিডোর নিয়ন্ত্রণে থাকলেও রাখাইনের সামগ্রিক বাস্তবতা বদলে গেছে। এখানেই প্রত্যাবাসনের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের ফেরত নেওয়ার কথা বলছে। কিন্তু যেসব এলাকায় তাদের ফেরার সম্ভাবনা বেশি, সেসব এলাকার বড় অংশে নেপিডোর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ নেই। তাহলে প্রত্যাবাসনের পর তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে কে? প্রশাসন চালাবে কে? চলাচলের অধিকার কে নিশ্চিত করবে? আর নাগরিকত্ব ও রাজনৈতিক অধিকারের প্রশ্নে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে কে? ৯ বছর আগে এসব প্রশ্নের উত্তর মোটামুটি পরিষ্কার ছিল, এখন আর তা নয়।


রোহিঙ্গাদের জন্য নতুন ঝুঁকি
রাখাইনে আরাকান আর্মির উত্থান রোহিঙ্গাদের জন্য নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। কিন্তু সেটি নিরাপত্তার নিশ্চয়তা নিয়ে আসেনি। আরাকান আর্মির বিরুদ্ধে রোহিঙ্গাদের ওপর নিপীড়ন, চলাচলে বিধিনিষেধ, বাস্তুচ্যুতি ও জোরপূর্বক নিয়োগের অভিযোগ রয়েছে। একই ধরনের জোরপূর্বক নিয়োগের অভিযোগ রয়েছে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধেও। ফলে রোহিঙ্গাদের সামনে সহজ কোনো পক্ষ নেই।
একদিকে নেপিডো তাদের জাতিগত পরিচয় ও নাগরিকত্বের প্রশ্নে পুরোনো অবস্থানে রয়েছে, অন্যদিকে, রাখাইনের বড় অংশের নিয়ন্ত্রণকারী আরাকান আর্মির সঙ্গেও রোহিঙ্গাদের সম্পর্ক জটিল। এই পরিস্থিতিতে প্রত্যাবাসন শুধু সীমান্ত পার হয়ে দেশে ফেরার বিষয় নয়। ফেরার পর কে তাদের নিরাপত্তা দেবে এবং কী অধিকার থাকবে, সেটিই হয়ে উঠছে মূল প্রশ্ন।
নতুন বাস্তবতার সামনে বাংলাদেশ
রাখাইনের পরিবর্তন বাংলাদেশের কূটনীতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। এত দিন ঢাকা মূলত মিয়ানমার সরকারের সঙ্গেই প্রত্যাবাসন নিয়ে আলোচনা করেছে। কিন্তু রাখাইনের ক্ষমতার কাঠামো বদলে যাওয়ায় সেই নীতিতে বাস্তবতার প্রতিফলন কতটা আছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। গত জুনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান সংসদে বলেছেন, রাখাইনে স্থিতিশীল পরিবেশ তৈরির জন্য মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ ও আরাকান আর্মির মধ্যে কার্যকর সংলাপ প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশ কাজ করছে।
এটি একটি তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত। কারণ, এর অর্থ আরাকান আর্মিকে স্বীকৃতি দেওয়া নয়; বরং বাস্তবতা হচ্ছে, রাখাইনের বড় অংশে যে পক্ষের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ রয়েছে, প্রত্যাবাসনের পরিবেশ তৈরিতে তাকে পুরোপুরি উপেক্ষা করা কঠিন। সীমান্তের কিছু ঘটনাতেও এই বাস্তবতা স্পষ্ট হয়েছে। আরাকান আর্মির হাতে আটক বাংলাদেশি জেলেদের ফেরাতে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হয়েছে। অর্থাৎ মাঠের বাস্তবতা ইতিমধ্যে একধরনের যোগাযোগ তৈরি করেছে।
প্রশ্ন হলো এই বাস্তবতাকে বাংলাদেশ কতটা কৌশলগতভাবে কাজে লাগাতে পারবে। একদিকে নেপিডোর সঙ্গে প্রত্যাবাসনের আলোচনা চালিয়ে যেতে হবে। অন্যদিকে রাখাইনে কার্যকর নিয়ন্ত্রণকারী শক্তির সঙ্গে প্রয়োজনীয় যোগাযোগও রাখতে হবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক চাপ ধরে রাখতে হবে, যাতে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব ও অধিকারের প্রশ্নটি প্রত্যাবাসনের আলোচনার বাইরে না যায়। দেশের স্বার্থ সুরক্ষা করে নানা স্তরে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পথ বের করাটা বাংলাদেশের জন্য বড় এক চ্যালেঞ্জ।

দীর্ঘ সংকটে চাপ বাড়বে বাংলাদেশের
প্রত্যাবাসন না হওয়ায় শুধু রোহিঙ্গারাই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে না, দীর্ঘ মেয়াদে বাংলাদেশের ওপরও চাপ বাড়ছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাতীয় সংসদে জানিয়েছেন, মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গার সংখ্যা প্রায় ১১ লাখ ৮৯ হাজার। প্রায় এক দশক ধরে তাদের বড় অংশ আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু বিশ্বজুড়ে নতুন নতুন সংঘাত তৈরি হওয়ায় মানবিক সহায়তার অর্থের ওপর চাপ বাড়ছে। রোহিঙ্গা সংকটে দাতাদের ‘ক্লান্তি’ও এখন বাস্তবতা। খাদ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন কর্মসূচিতে অর্থের সংকট দেখা দিচ্ছে। একই সঙ্গে রাখাইনে সংঘাত অব্যাহত থাকায় বাংলাদেশে নতুন করে রোহিঙ্গা প্রবেশের ঝুঁকিও পুরোপুরি কাটেনি। অর্থাৎ পুরোনো সংকটের সমাধান হয়নি, আবার নতুন সংকট তৈরির আশঙ্কাও রয়ে গেছে।
বিচার আছে, কিন্তু মাঠের সমাধান নেই
রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে ২০১৭ সালে নৃশংসতার দায়ে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে জবাবদিহির প্রশ্নে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে মামলা চলছে। ওআইসির পক্ষে গাম্বিয়া মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গণহত্যা সনদ লঙ্ঘনের অভিযোগে আইসিজেতে ওই মামলা করেছে। এই আইনি প্রক্রিয়া গুরুত্বপূর্ণ, তবে আইনি প্রক্রিয়া আর রাখাইনের রাজনৈতিক বাস্তবতা এক নয়। আদালত রাষ্ট্রীয় দায় নির্ধারণ করতে পারেন। কিন্তু রাখাইনে কোন পক্ষ কোন এলাকা নিয়ন্ত্রণ করবে, তা নির্ধারণ করতে পারেন না। একটি রায় আন্তর্জাতিক আইনে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। কিন্তু সেটি নিজে থেকে রোহিঙ্গাদের নিরাপদে ঘরে ফিরিয়ে দিতে পারে না। তাই জবাবদিহি নিশ্চিত আর প্রত্যাবাসন—দুটি পন্থা পাশাপাশি রেখেই এগোতে হবে।
প্রশ্ন বদলে গেছে ৯ বছর পর
রোহিঙ্গারা কবে রাখাইনে ফিরে যাবে? প্রত্যাবাসন চুক্তি সইয়ের পর ৯ বছর আগে এটাই ছিল প্রশ্ন। এখন প্রশ্নটি আরও জটিল। তারা কোথায় ফিরবেন? কার কাছে ফিরবে? কী অধিকার নিয়ে ফিরবেন? আর তাদের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা কে দেবে?
মিয়ানমার বদলে গেছে। রাখাইন বদলে গেছে। ক্ষমতার কাঠামো বদলে গেছে। নেপিডো আন্তর্জাতিক যোগাযোগ বাড়ানোর চেষ্টা করছে। একই সময়ে রাখাইনে আরাকান আর্মি শক্তিশালী বাস্তবতা হয়ে উঠেছে। আর মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের ‘বাঙালি’ বলার পুরোনো অবস্থানও নতুন করে সামনে এনেছে। এই দুই বাস্তবতার মাঝখানেই আটকে আছে প্রত্যাবাসন। তাই ২৫ আগস্ট রোহিঙ্গা-ঢলের ৯ বছর পূর্তিতে, শুধু কতজনকে যাচাই করা হয়েছে, সেদিকে তাকালে পুরো চিত্রটি ধরা পড়বে না।
বাংলাদেশের সামনে এখন একসঙ্গে কয়েকটি কাজ। মিয়ানমারের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ চালিয়ে যাওয়া। আন্তর্জাতিক চাপ ধরে রাখা। মানবিক সহায়তার অর্থ নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে রাখাইনের নতুন ক্ষমতার বাস্তবতাকে কূটনীতির হিসাবের মধ্যে আনা। কারণ, ২০১৭ সালের রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান ২০২৬ সালের মিয়ানমারের বাস্তবতায় খুঁজতে হলে শুধু নেপিডোর সঙ্গে আলোচনা যথেষ্ট নয়।
-
রাহীদ এজাজ প্রথম আলোর কূটনৈতিক প্রতিবেদক



