
মক্কা চুক্তি কি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি অনাস্থার প্রকাশ
ড. ফরিদুল আলম [প্রকাশ : কালের কণ্ঠ, ২৩ আগস্ট ২০২৬]
গত ৭ আগস্ট সৌদি আরবের মক্কায় সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের সমন্বয়ে নতুন একটি প্রতিরক্ষাবলয় তৈরির মধ্য দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে নতুন ভারসাম্য সৃষ্টি হলো কি না, এটি এখন একটি বড় প্রশ্ন হিসেবে দেখা দিয়েছে। কেন এই সময়ে এসে গুরুত্বপূর্ণ এই দেশগুলো এমন একটি চুক্তিতে স্বাক্ষর করল, এটি বিশ্লেষণ করতে গেলে প্রথমেই যে বিষয়টি সামনে চলে আসে, তা হচ্ছে নিজস্ব নিরাপত্তা প্রশ্নে সৌদি আরব এখন হয়তো আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওপর আস্থা রাখতে পারছে না।
মাত্র কয়েক দিন আগে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পারমাণবিক চুক্তি স্বাক্ষরের পর মার্কিন শর্তের বেড়াজালে সেটি ভণ্ডুল হয়ে যাওয়ার দিন কয়েকের মধ্যেই তাদের এমন সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রের ইসরায়েলি নীতিকে চ্যালেঞ্জ করল, সেটি বলার অপেক্ষা রাখে না। ইসরায়েল প্রশ্নে মধ্যপ্রাচ্যের অপরাপর দেশের স্বার্থ যুক্তরাষ্ট্রের কাছে মুখ্য নয়, এটির নতুন প্রমাণ পাওয়া গেল সৌদি আরবকে আব্রাহাম চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত হতে চাপ সৃষ্টি করা, যার অর্থ এত দিন ধরে গাজায় পরিচালিত গণহত্যাকে মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দেশ সৌদি আরবের মাধ্যমে বৈধতা দেওয়ার এটি একটি চেষ্টা; অন্যদিকে ১৯৬৯ সালে প্রতিষ্ঠিত ওআইসি প্রতিষ্ঠার মূল উদ্দেশ্যকে আড়াল করে ইসরায়েলের স্বার্থকেই সামনে নিয়ে আসার এক ঘৃণ্য প্রচেষ্টার বিপরীতে সৌদি আরবের উদ্যোগে এই চুক্তি নিঃসন্দেহে একটি বড় বার্তা।
মক্কা চুক্তি কি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি অনাস্থার প্রকাশশুধু সৌদি আরব কেন, পাকিস্তান ও তুরস্কের এই জোটে সামিল হওয়া এবং এই চুক্তির মাধ্যমে চুক্তিভুক্ত যেকোনো দেশের ওপর হামলাকে পুরো জোটের ওপর হামলা বলে বিবেচিত হওয়ার মতো সিদ্ধান্তকে বিশ্লেষকরা একে ‘ইসলামিক ন্যাটো’ বলে আখ্যায়িত করছেন। প্রশ্ন আসতে পারে, কেন এই তিন দেশের একত্র হওয়া? এর উত্তরে এই মুহূর্তে একটিই জবাব, আর তা হচ্ছে এর মধ্য দিয়ে দেশগুলোর মধ্যে অভিন্ন স্বার্থের অন্বেষণ করা।
কী সেই অভিন্ন স্বার্থ? এই মুহূর্তে এর বিশদ জবাব পাওয়া না গেলেও যদ্দুর ধারণা করা যায়, মধ্যপ্রাচ্যের বিষয়ে এখন ইসলামী দেশগুলো আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে নিজেদের জন্য রক্ষাকবচ হিসেবে দেখতে পারছে না। তবে তুরস্কের নিজস্ব স্বার্থ বলতে সিরিয়ার সরকার পতন-পরবর্তী সময়ে সিরিয়ার ভেতর ইসরায়েল রাষ্ট্রকে বর্ধিত করার লক্ষ্যে তাদের সেনা সমাবেশ, সিরিয়ার কুর্দিদের নিরাপত্তা সংকট এবং ভবিষ্যতে সিরীয় সংকটকে ঘনীভূত করে তুরস্কের জন্য নিরাপত্তা সংকট সৃষ্টির আশঙ্কা খুবই গুরুত্বপূর্ণ কারণ। এ ছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে লেবাননে এবং গাজা সংকটকে ঘনীভূত করার মূল কারণ মধ্যপ্রাচ্যে নিঃসন্দেহে ইসরায়েলকে শক্তিশালী করতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রয়াস, এই বিষয়টি এখন স্পষ্ট। গাজা নিয়ে চুক্তির পর হামাস নিরস্ত্র হতে রাজি হলেও ইসরায়েলের গাজা থেকে সেনা প্রত্যাহার না করার পেছনে আগে হামাসকে অকার্যকর করার শর্ত ইসরায়েলের দুরভিসন্ধির প্রমাণ।
সামপ্রতিক সময়ে পশ্চিম তীরেও ইসরায়েলের বসতি সম্প্রসারণের সিদ্ধান্ত মধ্যপ্রাচ্যের সংকটকে আরো দীর্ঘায়িত করার ইঙ্গিত দিচ্ছে। পাকিস্তানের দিক থেকে সবচেয়ে বড় স্বার্থ হচ্ছে, একটি মুসলিম দেশ হিসেবে তাদের সঙ্গে বরাবরই সৌদি আরবের সম্পর্ক উষ্ণ। এই সম্পর্কের মূল স্বার্থ হচ্ছে সৌদি আরব থেকে আর্থিক সাহায্য। এই তিন দেশের মধ্যে পাকিস্তানই একমাত্র পারমাণবিক শক্তির অধিকারী দেশ। তা ছাড়া সামরিক দিক দিয়েও তাদের রয়েছে অত্যাধুনিক সরঞ্জাম এবং দক্ষ বাহিনী।
এই মুহূর্তে পাকিস্তানের সামরিক শক্তি এই জোটের জন্য খুবই উপযোগী।
ন্যাটোভুক্ত একটি দেশ হিসেবে তুরস্কের এই জোটে যোগদানের আরো কিছু গুরুত্ব রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে ন্যাটো নিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতিবাচক মনোভাব, ন্যাটো থেকে বের হয়ে যেতে বারবার হুঁশিয়ারি ইত্যাদি বিষয় তুরস্কের আন্তর্জাতিক সম্পর্ককে নতুন করে বিবেচনার তাগিদ দিয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য পদ প্রাপ্তির ক্ষেত্রে এবং একই সঙ্গে ন্যাটোর ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তুরস্কের নিরাপত্তা ও ভবিষ্যতের জন্য নতুন ভাবনার তাগিদ দিয়েছে। সাম্প্রতিক সময়গুলোতে ইরান যুদ্ধকে কেন্দ্র করে ইসরায়েলের ওপর ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিভিন্ন ধরনের বিরক্তির প্রকাশ ঘটলেও রাষ্ট্র হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে মধ্যপ্রাচ্যে তাদের বৃহত্তর স্বার্থের প্রয়োজনে ইসরায়েলকে পরিত্যাগ করা সম্ভব নয়। ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর দীর্ঘ সময়ের ব্যক্তিগত সম্পর্ক এবং সম্প্রতি এতে কিছুটা চিড় ধরলেও ব্যক্তি নেতানিয়াহু বা ব্যক্তি ডোনাল্ড ট্রাম্প এখানে মুখ্য নন, বিষয়টি হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ ইসরায়েল, যা রিপাবলিকান বা ডেমোক্র্যাট কোনো প্রেসিডেন্টের পক্ষেই অগ্রাহ্য করা সম্ভব নয়।
তবে এখানে সবচেয়ে বড় যে ভুলটি ডোনাল্ড ট্রাম্প করে বসেছেন, সেটি হচ্ছে অতীতের প্রেসিডেন্টদের মতো ধীরে চলো নীতিকে পরিহার করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শক্তিকে এককভাবে জাহির করতে যাওয়া। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের শক্তির তুলনায় অনেক দুর্বল ইরানের কাছে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রতিনিয়ত নাজেহাল হতে হচ্ছে। ক্ষমতালোভী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ব্যক্তিগত রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষাকে ট্রাম্পের এই ক্ষমতার দম্ভের সঙ্গে তাই খুব সহজেই এক করে ফেলা সম্ভব হয়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ইরান যুদ্ধের বৈধতার পক্ষে এই মুহূর্তে কোনো ধরনের যুক্তি দেখানো যাচ্ছে না।
গত এক বছরের বেশি সময় ধরে ইরান নিয়ে উত্তেজনা এবং এক পর্যায়ে ইসরায়েলকে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার নেপথ্য কারণ হিসেবে ইরানকে পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ এবং সেখানকার শাসক পরিবর্তন বলা হলেও সাম্প্রতিক সময়ে এটি এসে ঠেকেছে হরমুজ প্রণালির অবরোধ প্রত্যাহার করা না করার বিষয়ে। বৈশ্বিক পরিসরে একক রাষ্ট্র হিসেবে ইসরায়েলের এতটা গুরুত্ব পাওয়া আন্তর্জাতিক সম্পর্কের শক্তির ভারসাম্যের প্রতি একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের এতদিনকার মিত্র ইউরোপের দেশগুলো, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা ও জাপানের মতো দেশগুলোও এখন নিজেদের নিরাপত্তার স্বার্থে বিকল্প খুঁজতে চাইছে। ব্রিকসে এবং সাংহাই কো-অপারেটিভ অর্গানাইজেশনের (এসসিও) নতুন তৎপরতা, সেই সঙ্গে ভারতের সঙ্গে চীনের দূরত্ব কমিয়ে আনতে দুই দেশের পক্ষ থেকেই আলোচনা, ইউরোপের সঙ্গে চীনের এবং চীনের সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের সম্পর্ককে ঝালাই করতে নতুন অনেক তৎপরতা লক্ষণীয় হচ্ছে।
এত কিছুর পরও মক্কা চুক্তি বাস্তবে কতটুকু তাদের আশার প্রতিফলন ঘটাবে, এটি নিয়েও সংশয় থেকে যায়। ডোনাল্ড ট্রাম্প এই মেয়াদে প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর সৌদি আরব ও আরব আমিরাতে তার দ্বিপক্ষীয় সফরে দুটি দেশের সঙ্গেই বিশাল অঙ্কের বাণিজ্যচুক্তি করেন। তবে এখানে উল্লেখ করা প্রাসঙ্গিক হবে যে সৌদি আরব ও আমিরাত—এই দুটি দেশ মধ্যপ্রাচ্যের মৌলিক ইস্যু ইসরায়েল নিয়ে পরস্পরবিরোধী অবস্থানে রয়েছে।
২০২০ সালে আব্রাহাম চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত হয়ে আমিরাত ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দিলেও এত দিন ধরে এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের চাপের কাছে নতি স্বীকার করেনি সৌদি আরব। অন্যদিকে অনেক বিতর্ক নিয়েও সৌদি আরবের রাজতন্ত্র টিকে থাকার পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনের বিষয়টিও কারো অজানা নয়। পাকিস্তানে ইমরান খান পতনের পর থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত সামরিক-বেসামরিক প্রশাসনের সমন্বয়ে শাসনব্যবস্থা পরিচালিত হওয়ার নেপথ্যে মূল সহায়ক শক্তি হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র।
ইরানের সঙ্গে সৌদি আরবের সমস্যার মূল কারণও হচ্ছে সেখানে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটি, যা ইরান-যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের যুদ্ধে ইরানের অন্যতম লক্ষ্যবস্তু। এ ক্ষেত্রে আমিরাত, বাহরাইন, কুয়েত ও কাতারের মতো দেশগুলোর অবস্থান ইরানের কাছে একই রকম। তবে বর্তমান বাস্তবতা উপলব্ধি করে যদি যুক্তরাষ্ট্র এই যুদ্ধের অবসান ঘটায়, তবে পরিস্থিতি একই রকম না-ও থাকতে পারে। মক্কা চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পর ইরানপন্থী ইয়েমেনের হুতিরা লোহিত সাগরের কাছে সৌদি আরবের তেল শোধনাগারে হামলা চালালেও এই চুক্তির শর্ত অনুযায়ী অপরাপর দেশ সৌদির সমর্থনে এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেয়নি, যা এই চুক্তির একটি দুর্বলতা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তবে মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে এই চুক্তিকে সবল বা দুর্বল হিসেবে চিহ্নিত করাকে খুব একটা সমীচীন মনে করা ঠিক হবে না। একটি জোটের সবেমাত্র যাত্রা শুরু হলো, যার পেছনে সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য এবং কর্মপরিকল্পনা রয়েছে। এখানে তাদের দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি ক্ষোভ থাকলেও এই দেশগুলোর কোনোটিই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের স্বার্থের কারণে চূড়ান্তভাবে সম্পর্কের অবনতি ঘটাতে চাইবে না। যুক্তরাষ্ট্রকে বরং এটি উপলব্ধি করাতে এটি একটি বার্তা যে তাদের নীতিকে সংশোধন করে তারা সঠিক পথ অবলম্বন করুক। চুক্তিভুক্ত দেশগুলো এবং এ রকম অনেক দেশের জন্যই ইসরায়েল এক বড় ধরনের ভীতি। সামনের দিনগুলোতে মিসর এই চুক্তির অংশ হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এমনও হতে পারে, ইরান যুদ্ধের অবসানের পর ইসরায়েলের বিরুদ্ধে জোটগত অবস্থানকে শক্তিশালী করতে ইরানকেও এর অংশ করা হতে পারে। আসলে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে কোনো কিছুই নির্দিষ্ট করে বলা যায় না। তবে এই মুহূর্তে বলা যায় যে মক্কা চুক্তিটি ভবিষ্যৎ রাজনীতির জন্য একটি বড় বার্তা।
লেখক : অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়



