
বৈশ্বিক কার্বন ট্রেডিং: জলবায়ু কূটনীতি, বাজার প্রক্রিয়া ও বিশ্বব্যবস্থার গতিধারা
সাদিয়া সুলতানা রিমি [সূত্র : শেয়ার বিজ, ২২ আগস্ট ২০২৬]
একবিংশ শতাব্দীতে জলবায়ু পরিবর্তন আর কেবল পরিবেশবিষয়ক সংকটে নয়; এটি অর্থনীতি, বাণিজ্য, কূটনীতি, নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক ক্ষমতার কাঠামোর সাথেও গভীরভাবে যুক্ত। পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধি, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা, চরম আবহাওয়া, খাদ্য ও পানির নিরাপত্তা এবং জলবায়ুজনিত বাস্তুচ্যুত—সবকিছু মিলিয়ে জলবায়ু পরিবর্তন এখন আন্তর্জাতিক রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। এই বাস্তবতায় কার্বন নিঃসরণ কমানোর জন্য অর্থনৈতিক ও বাজারভিত্তিক যে পদ্ধতিগুলো সামনে এসেছে, তার মধ্যে কার্বন ট্রেডিং বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
কার্বন ট্রেডিংকে অনেকে কেবল পরিবেশ রক্ষার একটি অর্থনৈতিক কৌশল হিসেবে দেখেন। কিন্তু এর প্রভাব অনেক বিস্তৃত। কোন দেশ কতটা নিঃসরণ করতে পারবে, কে কার্বন কমানোর প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণ করবে, কোন দেশ কার্বন ক্রেডিট বিক্রি করবে, কোন দেশ তা কিনবে এবং ভবিষ্যতের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে কার্বনের মূল্য কীভাবে নির্ধারিত হবে—সব প্রশ্নের সঙ্গে সরাসরি জড়িয়ে আছে বৈশ্বিক ক্ষমতার রাজনীতি। ফলে কার্বন বাজার এখন একই সঙ্গে পরিবেশনীতি, অর্থনীতি এবং কূটনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র।
কার্বন ট্রেডিং আসলে কী সহজভাবে বললে, কার্বন ট্রেডিং হলো এমন একটি বাজারভিত্তিক ব্যবস্থা যেখানে গ্রীনহাউস গ্যাস নিঃসরণ কমানোর অর্থনৈতিক মূল্য নির্ধারণ করা হয় এবং নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে সেই নিঃসরণ-অধিকার বা নিঃসরণ কমানোর প্রমাণপত্র কেনাবেচা করা যায়। এখানে অবশ্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সংশোধন প্রয়োজন। কার্বন ট্রেডিংকে সরাসরি অর্থনীতিবিদ রোনাল্ড কোসের ‘Polluter Pays Principle’-এর তত্ত্ব বলা পুরোপুরি নির্ভুল নয়। কোসের কাজ মূলত সম্পত্তির অধিকার ও বাজারভিত্তিক অর্থনৈতিক সমস্যার বাজারভিত্তিক সমাধানের আলোচনায় নিয়ে আসে; আর ‘polluter pays’ নীতিটি পরবর্তী সময়ে পরিবেশনীতি ও অর্থনৈতিক নীতি নির্ধারণে আলাদাভাবে বিকশিত হয়।
কার্বন বাজারের দুটি প্রধান ধারা হলো emissions trading বা cap-and-trade systems এবং carbon offsetting বা crediting। Cap-and-trade ব্যবস্থায় একটি নির্দিষ্ট খাত বা অর্থনীতির মোট নিঃসরণের জন্য সীমা নির্ধারণ করা হয়। সেই সীমার মধ্যে প্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্দিষ্ট পরিমাণ নিঃসরণ-অনুমতি দেওয়া হয় এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সেগুলো কেনাবেচা করতে পারে। ফলে যে প্রতিষ্ঠান কম খরচে নিঃসরণ কমাতে পারে, তার জন্য কমানো অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক হতে পারে।
অন্যদিকে carbon credit বা offsetting ব্যবস্থায় কোনো প্রকল্পের মাধ্যমে এক টন কার্বন ডাই-অক্সাইড বা সমপরিমাণ গ্রীনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ কমানো, এড়ানো বা অপসারণকে একটি ক্রেডিট হিসেবে গণনা করা হয়। তবে এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো প্রতিটি কার্বন ক্রেডিটের পরিবেশগত মান সমান নয়। কোনো প্রকল্প সত্যিই অতিরিক্তভাবে নিঃসরণ কমিয়েছে কি না, প্রকল্পটি না থাকলে ওই হ্রাস ঘটত কি না এবং দীর্ঘ মেয়াদে সেই কার্বন অপসারণ টিকে থাকবে কি না—এসব প্রশ্ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কিয়োটো থেকে প্যারিস: কার্বন বাজারের আন্তর্জাতিকীকরণ আন্তর্জাতিক কার্বন বাজারের ইতিহাসে ১৯৯৭ সালের Kyoto Protocol একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। কিয়োটো প্রোটোকলের অধীনে Clean Development Mechanism বা CDM প্রতিষ্ঠিত হয়, যার মাধ্যমে উন্নত দেশগুলো উন্নয়নশীল দেশে নির্দিষ্ট ধরনের নিঃসরণ কমানোর প্রকল্পে বিনিয়োগ করে নিঃসরণ হ্রাসের ক্রেডিট অর্জন করতে পারত। পরবর্তীতে ২০১৫ সালের Paris Agreement জলবায়ু কূটনীতিকে আরও বিস্তৃত কাঠামো দেয়। প্যারিস চুক্তির অনুচ্ছেদ ৬-এ আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে নিঃসরণ কমানোর বিভিন্ন পদ্ধতির আইনি ভিত্তি তৈরি করে। বিশেষ করে অনুচ্ছেদ ৬.২-এ আন্তর্জাতিকভাবে স্থানান্তরযোগ্য নিঃসরণ হ্রাসের হিসাব ও বাণিজ্যের সুযোগ দেয় এবং অনুচ্ছেদ ৬.৪-এ একটি জাতিসংঘ-তত্ত্বাবধানে নতুন কার্বন ক্রেডিটিং ব্যবস্থার কাঠামো তৈরি করে।
এর অর্থ হলো কার্বন এখন শুধু পরিবেশগত সূচক নয়; এটি আন্তর্জাতিক অর্থনীতির একটি ক্রমবর্ধমান সম্পদে পরিণত হচ্ছে। ফলে ভবিষ্যতে কার্বনের মূল্য, হিসাব ও বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা যার হাতে থাকবে, জলবায়ু অর্থনীতিতেও তার প্রভাব বাড়বে।
জলবায়ু কূটনীতিতে উত্তর-দক্ষিণ বিভাজন কার্বন বাজার নিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বিতর্কগুলোর একটি হলো Global North বনাম Global South। উন্নত দেশগুলোর যুক্তি হলো, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় বাজারভিত্তিক ব্যবস্থা ব্যবহার করলে তুলনামূলক কম খরচে নিঃসরণ কমানো সম্ভব। যেখানে কম খরচে কমানো যায়, সেখানে বিনিয়োগ করলে বৈশ্বিকভাবে একই অর্থে বেশি পরিবেশগত ফল পাওয়া সম্ভব।
কিন্তু উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রশ্ন ভিন্ন। তাদের যুক্তি হলো, শিল্পবিপ্লবের পর দীর্ঘ সময় ধরে উন্নত দেশগুলো বিপুল পরিমাণ গ্রীনহাউস গ্যাস নিঃসরণ করে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জন করেছে। এখন উন্নয়নশীল দেশগুলোকে একই মাত্রায় উন্নয়ন থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানানো হলে তা ন্যায্য হবে কি না, সেটিই বড় প্রশ্ন।
বাংলাদেশের মতো জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর অবস্থান আরও স্পষ্ট। বাংলাদেশের বৈশ্বিক নিঃসরণে অবদান তুলনামূলকভাবে খুব কম হলেও জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকির অনেক বেশি। তাই শুধু কার্বন বাজারের তার তৈরি করলেই জলবায়ু বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে না। ঐতিহাসিক দায়, সক্ষমতা, উন্নয়নের অধিকার এবং ক্ষমতার বাস্তবতাকে বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
কার্বন বাজারের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি: গ্রিনওয়াশিং কার্বন ট্রেডিংয়ের সবচেয়ে বিতর্কিত দিকগুলোর একটি হলো মধ্যস্বত্বভোগী। কোনো কোম্পানি বা প্রতিষ্ঠান বাস্তব নিঃসরণ কমানোর পরিবর্তে কার্বন ক্রেডিট কিনে নিজেদের ‘carbon neutral’ বা পরিবেশবান্ধব হিসেবে উপস্থাপন করতে পারে। কিন্তু সেই ক্রেডিট যদি প্রকৃত অতিরিক্ত নিঃসরণ হ্রাসের প্রতিনিধিত্ব না করে, তাহলে পরিবেশগত লাভ বিভ্রান্তিকর হয়ে যায়।
এখানেই কার্বন বাজারের বিশ্বাসযোগ্যতার প্রশ্ন আসে। একটি প্রকল্প বাস্তবে কত টন কার্বন কমিয়েছে তার সঠিক হিসাব না থাকলে বাজারের আকার বড় হলেও বাস্তবে জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় কার্যকর নাও হতে পারে।
তাই কার্বন ক্রেডিটের ক্ষেত্রে additionality, permanence, leakage, measurement, reporting and verification অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ প্রকল্প সত্যিই অতিরিক্ত নিঃসরণ কমিয়েছে কি না, কার্বন হ্রাস দীর্ঘস্থায়ী কি না, এক জায়গায় নিঃসরণ কমিয়ে অন্য জায়গায় বেড়ে যাচ্ছে কি না এবং পুরো প্রক্রিয়াটি স্বাধীনভাবে যাচাই করা হচ্ছে কি না এসব নিশ্চিত করতে হবে।
কার্বন এখন বাণিজ্যনীতিরও অংশ কার্বন বাজারের ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব সবচেয়ে স্পষ্ট হচ্ছে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের Carbon Border Adjustment Mechanism বা CBAM-এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। এর লক্ষ্য হলো কার্বন-নিবিড় পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত কার্বন ব্যয়ের প্রতিফলন ঘটানো এবং ইউরোপীয় শিল্পকে এমন প্রতিযোগিতা থেকে সুরক্ষা দেওয়া, যেখানে অন্য দেশে তুলনামূলক কম খরচে জলবায়ু নীতির তোয়াক্কা না করে উৎপাদন ব্যয় কম হতে পারে।
CBAM-এর মাধ্যমে কার্বন ধীরে ধীরে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের শর্তে অংশ হয়ে উঠছে। ফলে কোনো দেশের পরিবেশনীতি এখন শুধু সেই দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়; তার রপ্তানি প্রতিযোগিতা ও বৈদেশিক বাণিজ্যের সঙ্গেও যুক্ত।
বাংলাদেশের জন্য এই পরিবর্তন বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। দেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাক হলেও ইইউ-এর প্রাথমিক আওতায় পোশাক খাত নেই। তাই সরাসরি পোশাক রপ্তানিতে CBAM-জনিত শুল্ক এখনই আরোপ হচ্ছে এমন ধারণা সঠিক নয়। তবে ভবিষ্যতে কার্বন হিসাব, জ্বালানি দক্ষতা, নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ ব্যবহার এবং সরবরাহ শৃঙ্খলের পরিবেশগত মান ক্রমেই আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হয়ে উঠতে পারে। অর্থাৎ বাংলাদেশের জন্য ঝুঁকি শুধু সম্ভাব্য ‘কার্বন শুল্ক’ নয়; বরং বৈশ্বিক বাজারে কম-কার্বন উৎপাদন সক্ষমতা অর্জন করতে না পারলে রপ্তানি প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার সম্ভাবনা।
চীনের উত্থান ও কার্বন অর্থনীতি চীন বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ কার্বন নিঃসরণকারী দেশ হলেও একই সঙ্গে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, সৌর প্যানেল, ব্যাটারি ও বৈদ্যুতিক গাড়ির প্রযুক্তিতে বিশাল বিনিয়োগ করেছে। দেশটির জাতীয় emissions trading system বিশ্বের বৃহত্তম কার্বন বাজারের একটি।
চীনের অভিজ্ঞতা দেখায়, জলবায়ু নীতি এখন শিল্পনীতির সঙ্গে যুক্ত। যে দেশ ভবিষ্যতের সবুজ প্রযুক্তি, ব্যাটারি, সৌরশক্তি, বৈদ্যুতিক গাড়ি ও সংশ্লিষ্ট সরবরাহ শৃঙ্খল নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে, সে শুধু পরিবেশগত সুবিধাই পাবে না; বরং নতুন শিল্প ও বাণিজ্যিক ক্ষমতাও অর্জন করতে পারবে।
অর্থাৎ কার্বন অর্থনীতি আসলে নতুন শিল্প প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র। ভবিষ্যতের বিশ্বে কে কম-কার্বন প্রযুক্তি তৈরি করবে এবং কে তার বাজার নিয়ন্ত্রণ করবে এই প্রশ্নও ভূরাজনীতি অংশ হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশের সামনে সুযোগ কোথায়? কার্বন বাজার বাংলাদেশের জন্য শুধু ঝুঁকি নয়, সুযোগও তৈরি করতে পারে। সুন্দরবনের মতো ম্যানগ্রোভ বন, পুনর্বনায়ন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, জ্বালানি দক্ষতা এবং নির্দিষ্ট কৃষি প্রকল্প থেকে যাচাইযোগ্য নিঃসরণ হ্রাস তৈরি করা সম্ভব হলে আন্তর্জাতিক কার্বন অর্থায়নের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
কিন্তু এখানে সতর্কতা জরুরি। বাংলাদেশের বন, জমি বা প্রাকৃতিক সম্পদকে শুধু কার্বন ক্রেডিট তৈরি করার সম্পদ হিসেবে দেখলে চলবে না। স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অধিকার, জীবিকা, ভূমির মালিকানা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে কোনো কার্বন প্রকল্প গ্রহণ করলে তা নতুন ধরনের শোষণের জন্ম দিতে পারে।
কার্বন বাজারের সবচেয়ে বড় সমস্যা হতে পারে দরকষাকষির ক্ষমতার অসমতা। উন্নত দেশের বড় কোম্পানি বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান যদি উন্নয়নশীল দেশের প্রকল্প থেকে কম দামে ক্রেডিট কিনে নেয় এবং পরবর্তীতে উচ্চমূল্যে তা বিক্রি করে, তাহলে প্রকল্পের স্থানীয় জনগোষ্ঠী বা সংশ্লিষ্ট দেশ ন্যায্য সুবিধা থেকে বঞ্চিত হতে পারে।
তাই বাংলাদেশের প্রয়োজন শুধু কার্বন ক্রেডিট বিক্রি করা নয়; বরং কার্বনের অর্থনৈতিক মূল্য নির্ধারণ, প্রকল্পের মালিকানা, তথ্যের স্বচ্ছতা এবং আন্তর্জাতিক চুক্তির শর্তে নিজেদের সক্ষমতা বাড়ানো।
কার্বন বাজার কি জলবায়ু ন্যায়বিচারের বিকল্প? একথাও মূল নিবন্ধে। বাজারভিত্তিক ব্যবস্থা নিঃসরণ কমানোর একটি কার্যকর হাতিয়ার হতে পারে, কিন্তু এটি নিজে জলবায়ু ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে পারে না।
একটি কোম্পানি অর্থ দিয়ে কার্বন ক্রেডিট কিনে নিলেই তার উৎপাদন ব্যবস্থার প্রকৃত দূষণ অদৃশ্য হয়ে যায় না। একইভাবে কোনো উন্নত দেশ বিদেশে প্রকল্পে অর্থ বিনিয়োগ করলেই তার ঐতিহাসিক জলবায়ু দায় শেষ হয়ে যায় না।
কার্বন বাজারের পাশাপাশি প্রয়োজন সরাসরি নিঃসরণ কমানো, জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার হ্রাস, নবায়নযোগ্য প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ, প্রযুক্তি হস্তান্তর, অভিযোজন অর্থায়ন এবং জলবায়ুজনিত ক্ষয়ক্ষতির জন্য সহায়তা। অর্থাৎ কার্বন ক্রেডিট বাস্তব নিঃসরণ কমানোর বিকল্প নয়; বরং একটি সহায়ক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা হওয়া উচিত।
বদলে যাচ্ছে বিশ্বব্যবস্থার অর্থনীতি কার্বন ট্রেডিংয়ের সবচেয়ে গভীর তাৎপর্য সম্ভবত এখানেই। একসময় আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রধান প্রশ্ন ছিল শ্রম, মূলধন ও ভূমি। এখন তার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে কার্বন।
ভবিষ্যতে একটি পণ্য কোথায় তৈরি হয়েছে, কীভাবে তৈরি হয়েছে এবং উৎপাদনে কত কার্বন নিঃসৃত হয়েছে এসব প্রশ্ন আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে তার মূল্য ও গ্রহণযোগ্যতা নির্ধারণ করতে পারে। ফলে কার্বন ধীরে ধীরে বৈশ্বিক অর্থনীতির একটি নতুন ‘অদৃশ্য মুদ্রা’ হয়ে উঠছে।
যে দেশ দ্রুত সবুজ প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করবে, নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার বাড়াবে এবং নির্ভুলভাবে কার্বন হিসাব করতে পারবে, সে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে সুবিধা পেতে পারে। অন্যদিকে যেসব দেশ প্রযুক্তি ও অর্থায়নের ঘাটতির কারণে উচ্চ-কার্বন উৎপাদন ব্যবস্থায় আটকে থাকবে, তাদের পণ্য রপ্তানি বাজার আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
এই বাস্তবতায় জলবায়ু নীতি আর পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের একার দায়িত্ব নয়। এটি অর্থনীতি, শিল্প, বাণিজ্য, জ্বালানি, পররাষ্ট্রনীতি এবং প্রযুক্তি নীতির সঙ্গে একসঙ্গে ভাবতে হবে।
কার্বন ট্রেডিংকে একদিকে যেমন জলবায়ু সংকট মোকাবিলার বাজারভিত্তিক সমাধান হিসেবে দেখা যায়, অন্যদিকে এটি বৈশ্বিক ক্ষমতার নতুন ক্ষেত্র। কার্বনের মূল্য কে নির্ধারণ করবে, কোন ক্রেডিট গ্রহণযোগ্য হবে, কোন প্রযুক্তি বিশ্ববাজারে আধিপত্য করবে এবং উন্নয়নশীল দেশগুলো এই বাজার থেকে কতটা লাভ পাবে এসব প্রশ্ন আগামী দিনের আন্তর্জাতিক রাজনীতিকে প্রভাবিত করবে।
বাংলাদেশের জন্য তাই অবস্থানটি হওয়া উচিত ভারসাম্যপূর্ণ। কার্বন বাজারের সুযোগ গ্রহণ করতে হবে, কিন্তু অন্ধভাবে নয়। আন্তর্জাতিক কার্বন বাণিজ্যে প্রবেশের পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরীণ নিঃসরণ কমানো, নবায়নযোগ্য শক্তি বাড়ানো, শিল্পের জ্বালানি দক্ষতা উন্নত করা, কার্বন হিসাবের সক্ষমতা তৈরি করা এবং আন্তর্জাতিক জলবায়ু অর্থায়নের ন্যায্য দাবি করা জরুরি।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, কার্বন বাজার যেন দূষণের অধিকার কেনাবেচার বাজারে পরিণত না হয়। বাজারের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত দূষণ কমানোর জন্য অর্থনৈতিক প্রণোদনা তৈরি করা, দূষণকে বৈধতা দেওয়া নয়।
জলবায়ু পরিবর্তনের পৃথিবীতে অর্থনীতি ও পরিবেশকে আলাদা করে দেখার সুযোগ আর নেই। কার্বন এখন কেবল বায়ুমণ্ডলের একটি গ্যাস নয়; এটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, কূটনীতি, প্রযুক্তি এবং ক্ষমতার রাজনীতিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।
সুতরাং আগামী দিনের জলবায়ু কূটনীতির মূল প্রশ্ন শুধু হবে না ‘কে কত কার্বন নিঃসরণ করছে’—বরং প্রশ্ন হবে ‘কার্বনের মূল্যে কে নির্ধারণ করছে, সেই মূল্য থেকে কে লাভবান হচ্ছে এবং জলবায়ু পরিবর্তনের দায় ও ক্ষতির বোঝা কে বহন করছে?’
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দিয়েই নির্ধারিত হবে বৈশ্বিক কার্বন বাজার সত্যি জলবায়ু সমাধানের হাতিয়ার হবে, নাকি বৈশ্বিক বৈষম্যের আরেকটি নতুন অধ্যায়।
শিক্ষার্থী, গণিত বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।



