
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের রোডম্যাপ চাই
এম এ হালিম [সূত্র : যুগান্তর, ২৫ আগস্ট ২০২৬]
১৯৭৮ সালে মিয়ানমার (তৎকালীন বার্মা) থেকে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গারা দুবছরের মধ্যে প্রত্যাবাসিত হওয়ার পর ১৯৯১ সালের নভেম্বর-ডিসেম্বর আবারও তারা কক্সবাজারে আশ্রয় নিতে শুরু করে। ৯ মার্চ (১৯৯২) আমি রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির একজন কর্মকর্তা হিসাবে রোহিঙ্গা মানবিক সেবা কর্মসূচির টেকনাফের দমদমিয়া ক্যাম্পে যোগ দিই। ক্যাম্প তখনো পুরোদমে সেট হয়নি। তখনো দলে দলে রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশ চলছেই। এক অগোছালো পরিবেশে ক্যাম্প স্থাপন এবং সেখানে আশ্রয় নেওয়া শরণার্থীদের মধ্যে মানবিক সেবা পরিচালনায় নিরন্তর প্রচেষ্টার মাধ্যমেই শুরু হয়েছিল রোহিঙ্গাদের দুঃখ-কষ্ট জানা এবং তাদের জন্য আমার কাজের প্রথম অভিজ্ঞতা।
১৯৭৮ ও ১৯৯১-৯২, দুই পর্বেই রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে আসার প্রেক্ষাপট ছিল একই-রাখাইনে সামরিক ও আধা-সামরিক বাহিনীর নির্যাতন, নিপীড়ন ও হত্যা থেকে আত্মরক্ষা। ২০১৬-২০১৭ সালে সেই একই প্রেক্ষাপটে আবারও রোহিঙ্গারা কক্সবাজারে আশ্রয় নিতে শুরু করে এবং ২৫ আগস্ট (২০১৭) অনুপ্রবেশের ঢল ব্যাপক আকার ধারণ করে। সে সময়ে সাত লক্ষাধিক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করে। বর্তমানে উখিয়া ও টেকনাফে অবস্থিত ৩৩টি ক্যাম্পে এবং ভাসানচরে ১২ লাখ ৫০ হাজার ২০৯ জন রোহিঙ্গা (সূত্র : আইএসসিজি) আশ্রিত আছে। এর মধ্যে গত এক বছরে নতুন ১ লাখ ৭৮ হাজার রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ করেছে। একই সময়ে ৩৪ হাজার ৩০১ জন অর্থাৎ প্রতিদিন প্রায় ১০০ নতুন শিশু জন্ম নেয়। উল্লেখ্য, রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশ সরকার শরণার্থীর মর্যাদার পরিবর্তে ‘বলপূর্বক বাস্তুচ্যুত মিয়ানমার নাগরিক’ (এফডিএমএন) হিসাবে অভিহিত করেছে।
২০১৬ সালের সেপ্টেম্বরে মিয়ানমারে গণহত্যা এবং সেখান থেকে বিপুল জনগোষ্ঠী বিতাড়িত হতে থাকলে আন্তর্জাতিক সমালোচনার মুখে জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনানের নেতৃত্বে নয় সদস্যবিশিষ্ট Advisory Commission on Rakhine State গঠন করা হয়। কমিশনের কার্যক্রম চলাকালীনই মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের ওপর অত্যাচার-নিপীড়ন জোরদার করে, যা ২৫ আগস্ট ২০১৭ ভয়াবহ রূপ নেয়। কমিশন ২৩ আগস্ট রিপোর্ট দাখিল করে, যেখানে রোহিঙ্গারা বিভিন্ন নাগরিক সেবার অধিকার থেকে বঞ্চিত, তাদের মুক্ত ও স্বাধীনভাবে চলাচল প্রতিবন্ধকতা, ১৯৮২ সালের জটিল নাগরিকত্ব আইন ইত্যাদি উল্লেখ করে নাগরিকত্ব আইনের সংশোধনসহ কিছু সুপারিশ করা হয়।
২০১৭ সালে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের পর ২৩ নভেম্বর বাংলাদেশ ও মিয়ানমার সরকারের মধ্যে প্রত্যাবাসন বিষয়ে একটি সমঝোতো স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হয়। জানামতে, এ প্রক্রিয়ায় জাতিসংঘ অথবা তৃতীয় কোনো প্রভাবশালী পক্ষ (যেমন আসিয়ান) সম্পৃক্ত ছিল না। ফলে এমওইউ বাস্তবায়ন অথবা কোনো পূর্ণাঙ্গ চুক্তি হয়নি অথবা প্রত্যাবাসন বিষয়ে মিয়ানমারের পক্ষে কোনো কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের তাগিদও দেখা যায়নি। মাঝেমধ্যে কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করা হলেও তার আন্তরিকতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে পরীক্ষামূলকভাবে ১ হাজার ১৭৬ জন রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের পরিকল্পনা করা হয়।
প্রত্যাবাসন বিষয়ে রোহিঙ্গাদের আস্থা ও আগ্রহ বাড়াতে ২০২৩ সালের ৫ মে ২০ রোহিঙ্গাসহ ২৭ সদস্যের টিম রাখাইন রাজ্যের মংডু সফর করেন এবং মংডু শহরের বিভিন্ন গ্রাম ও ট্রানজিট সেন্টার ঘুরে দেখেন। কিন্তু সে বছরের নভেম্বরে মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর সঙ্গে আরাকান আর্মির সংঘর্ষের প্রেক্ষাপটে সে উদ্যোগ থেমে যায়। প্রত্যাবাসন বিষয়ে বড় সমস্যা হলো, মিয়ানমার সরকার কর্তৃক অধিকাংশ রোহিঙ্গাকে নাগরিক হিসাবে স্বীকৃতি দিতে অনীহা, যা সম্প্রতি সেদেশের সরকারের বিবৃতি থেকেই প্রমাণিত। দীর্ঘদিন প্রত্যাবাসন বিষয়ে এক ধরনের নীরবতার পর গত ৩০ জুলাই মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর বরাদ দিয়ে খবর প্রকাশিত হয়, মিয়ানমার ৩ লাখ রোহিঙ্গা ফেরত নেবে। আর সাম্প্রতিক খবর অনুসারে বাংলাদেশের পাঠানো ৮ লক্ষাধিক নামের বিপরীতে মিয়ানমার ৩ লাখ ৮ হাজার ৯৭৫ জনকে রাখাইন রাজ্যের বাসিন্দা হিসাবে স্বীকৃতি দিয়েছে। তবে ‘রাখাইনের নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি হলে’ প্রত্যাবাসন করা হবে বলে বিবৃতিতে বলা হয়। অবশিষ্টদের তারা ‘বাঙালি’ হিসাবে অভিহিত করেছে, অর্থাৎ মিয়ানমারের নাগরিক হিসাবে স্বীকৃতি দেয়নি। যদিও সরকারের তরফ থেকে এ বিবৃতির প্রতিবাদ করা হয়েছে।
উখিয়া ও টেকনাফের মূল জনসংখ্যার আড়াই গুণ রোহিঙ্গা দীর্ঘদিন প্রতিকূল ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে অবস্থান করায় একদিকে যেমন তারা তীব্র স্বাস্থ্যগত ঝুঁকির সম্মুখীন, অন্যদিকে তা স্থানীয় আর্থসামাজিক অবস্থা ও পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। ৩৪টি ক্যাম্প স্থাপনের জন্য ১০ হাজার হেক্টরেরও বেশি বনভূমি ধ্বংস করা হয়, যা ছিল প্রথমেই পরিবেশ ও বাস্তুতন্ত্রের ওপর এক বড় ধাক্কা। অনিশ্চিত প্রত্যাবাসন শেষে নতুন করে বনায়নের মাধ্যমে এ ক্ষতি কতদিনে পূরণ হবে, তার হিসাব মেলানো দায়। উপরন্তু, একটি পত্রিকা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে পাহাড় কেটে রোহিঙ্গাদের জন্য স্থায়ীয় ঘর নির্মাণ করার কথা।
এছাড়া, আড়াই লক্ষাধিক পরিবারের বর্জ্য, ব্যবহৃত দূষিত পানি আর প্রতিদিনকার পয়ঃ সেখানকার পরিবেশ অসহনীয় করে তুলেছে। এলাকার নর্দমা, খালি জায়গা, কৃষিজমি, খাল-বিল আজ ময়লা-আবর্জনা আর দূষিত পানির ভাগাড় হয়ে আছে। এসবের সঙ্গে পলিথিন ও প্লাস্টিকের সংযোগে কৃষিজমির উর্বরতা হুমকির মুখে। অগোচরে সবচেয়ে যে সমস্যাটি বিস্তৃত হচ্ছে তা হলো, ভূগর্ভস্থ পানির ওপর অতি নির্ভরতাহেতু অপরিকল্পিভাবে গভীর-অগভীর নলকূপ স্থাপন। ফলে পানির স্তর ইতোমধ্যে ৭০০-৭৫০ ফুট নেমে গেছে। এছাড়া রোহিঙ্গারা প্রায়ই অভ্যন্তরীণ (ক্যাম্পে) ও স্থানীয়দের মধ্যে হামলা-প্রতিহামলা করছে এবং হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনা ঘটাচ্ছে। রোহিঙ্গাদের অনেকেই স্থানীয় শ্রমবাজারে মিশে গিয়ে স্থানীয়দের জীবিকায়নেও ভাগ বসাচ্ছে, যা নিয়ে দ্বন্দ্ব এখন চরম।
অন্যদিকে স্থানীয়-রোহিঙ্গা মিলেমিশে চোরাকারবারিতে জড়ানোর ফলে দ্বন্দ্ব ও সামাজিক অস্থিরতা বাড়ছে নিত্যদিন। এসবের বাইরে ক্যাম্পগুলোতে প্রতিনিয়তই কোনো না কোনো সহযোগী দুর্যোগ (Secondary disaster) সংঘটিত হচ্ছে, যেমন-আকস্মিক বন্যা, ভূমিধস, ঘূর্ণিঝড়, অগ্নিকাণ্ড। এর মধ্যে ২০২১ সালে সংঘটিত ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১০ হাজারেরও অধিক ঘর ভস্মীভূত হয়। এ বছরের ৪ ও ৮ জুলাই ক্যাম্পে ভূমিধসে ১৪ রোহিঙ্গা নিহত হন। এসব সংকট মোকাবিলার জন্য সম্মিলিত উদ্যোগ এবং বাড়তি শ্রম ও সম্পদ নিশ্চিত করাও এক কঠিন কাজ।
এদিকে উন্নত সুবিধা প্রদানের লক্ষ্যে ভাসানচরে ১ লাখ রোহিঙ্গা থাকার জন্য ব্যারাক নির্মাণ করা হলেও ডিসেম্বর ২০২০ থেকে এখন পর্যন্ত মাত্র ৩৩ হাজার অর্থাৎ এক-তৃতীয়াংশ রোহিঙ্গাকে সেখানে স্থানান্তর করা সম্ভব হয়েছে। অন্যদিকে বিভিন্ন সময়ে সেখানে স্থানান্তরিত রোহিঙ্গারা পালিয়ে কক্সবাজার অথবা দেশের অন্যত্র বাংলাদেশিদের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে। শারীরিক গঠন ও ভাষাগতভাবে রোহিঙ্গাদের সঙ্গে কক্সবাজারের স্থানীয়, বিশেষত টেকনাফের মানুষের সাদৃশ্য থাকায় তাদের পার্থক্য করা অনেকটা কঠিন। এদিকে মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন, কক্সবাজার তথা মিয়ানমার সীমান্ত থেকে দূরত্ব, যোগাযোগ প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও এক বিচ্ছিন্ন দ্বীপে রোহিঙ্গাদের জন্য বিপুল অর্থ ব্যয়ে অবকাঠামো নির্মাণের যৌক্তিকতা নিয়ে বিভিন্ন মহলে কৌতূহল ও প্রশ্ন রয়েছে।
রোহিঙ্গা মানবিক কার্যক্রমের দায়িত্বে (১৯৯২-৯৩, ২০২০-২২) থেকে অনেক রোহিঙ্গার সঙ্গে আলাপকালে অনুভব করেছি, প্রতিকূল পরিবেশ, একঘেয়েমি ও মানবেতন জীবন এবং সন্তানদের অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কথা ভেবে তারা হাঁপিয়ে উঠেছে। কেউ বলেছেন, ‘অন্য দেশে কতদিন পড়ে থাকব? ওপারে আমাদের জমিজমা চাষবাস করে সেখানে আমরা সুখেই ছিলাম।’ বুঝতে পারি, সন্তানদের নিয়েও তারা উদ্বিগ্ন, কারণ তারা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছাড়াই বড় হচ্ছে এক অনিশ্চিত জীবনে।
বাস্তবে মানবিকতার দোহাই দিয়ে বাংলাদেশের পক্ষে কোনোভাবেই রোহিঙ্গাদের অনির্দিষ্টকাল আশ্রয় দেওয়ার সুযোগ নেই। ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক সংকট ও যুদ্ধ, বৈশ্বিক মানবিক তহবিল সংকুচিত হওয়া এবং একটি প্রলম্বিত সমস্যা বিবেচনায় রোহিঙ্গা সংকট ক্রমেই আন্তজার্তিক নজর হারাচ্ছে, যা সহজেই প্রতীয়মান।
২০২৬ সালে সাড়ে ১২ লাখ রোহিঙ্গা ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীসহ ১৫ লাখ মানুষের জন্য রোহিঙ্গাদের মধ্যে মানবিক সহায়তাবিষয়ক জয়েন্ট রেসপন্স প্ল্যানের (জেআরপি) আওতায় ৭১০ মিলিয়ন ডলারের তহবিল সংগ্রহের পরিকল্পনা করা হলেও তার কতটা প্রাপ্তি নিশ্চিত হবে, সে বিষয়ে সংশয় রয়েছে। কারণ, ২০২৫ সালে জেআরপির আওতায় ৯৩৪ মিলিয়ন ডলারের অ্যাপিলের বিপরীতে নিশ্চিত তহবিল পাওয়া যায় ৪০ শতাংশ। তহবিল সংকটের কারণে রোহিঙ্গাদের জন্য বরাদ্দ সর্বোচ্চ ১২ ডলারে গিয়ে ঠেকেছে, যা তাদের পুষ্টিচাহিদার জন্য বড় হুমকি। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, রোহিঙ্গা শিবিরে দাতা সংস্থাগুলোর অনুদান কমে যাওয়ায় শিশুশিক্ষা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অর্থ সংকটে গত বছর রোহিঙ্গা শিবিরে অনেক শিক্ষাকেন্দ্র বন্ধ করে দেয় ইউনিসেফ।
রোহিঙ্গা সংকটের সূচনা থেকেই বাংলাদেশ বিভিন্ন সময়ে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বিষয়টি উত্থাপন এবং বিভিন্ন প্রস্তাব পেশ করে। কিন্তু কোনো প্রস্তাবই সাধারণ পরিষদে সিদ্ধান্ত গ্রহণে ভূমিকা রাখার সুযোগ নেই, যতক্ষণ না তা অধিবেশনের এজেন্ডাভুক্ত হবে। তাই প্রকৃত আলোচনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের লক্ষ্যে বিষয়টি আসন্ন জাতিসংঘ সাধারণ সভার আনুষ্ঠানিক এজেন্ডাভুক্ত করার উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। এ বছর বাংলাদেশ সাধারণ পরিষদের সভাপতি।
তাই এ সুযোগকে কাজে লাগাতে হলে এখনই উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যসহ সমকালীন অনেক বৈশ্বিক যুদ্ধ ও সংকট উত্তরণ প্রচেষ্টার অভিজ্ঞতা অনুসরণে জাতিসংঘের বাইরেও বহুপক্ষীয় ও আঞ্চলিক উদ্যোগ অনস্বীকার্য। রোহিঙ্গা সংকট উত্তরণ তথা দ্রুত প্রত্যাবাসনের লক্ষ্যে আঞ্চলিক শক্তি হিসাবে আসিয়ান এবং আসিয়ানের প্রভাবশালী রাষ্ট্র মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলোচনা অব্যাহত রাখতে হবে।
বাংলাদেশ ও মিয়ানমার উভয় দেশের সুহৃদ হিসাবে চীনের সঙ্গেও কূটনৈতিক সংলাপ চলমান রাখতে হবে। প্রসঙ্গত, অন্তর্বর্তী সরকারের উদ্যোগে গত বছরের ২৫ আগস্ট কক্সবাজারে অনুষ্ঠিত অংশীজন সম্মেলন, ৩০ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সদর দপ্তরে উচ্চপর্যায়ের আন্তর্জাতিক সম্মেলন এবং ৬ ডিসেম্বর কাতার আন্তর্জাতিক সম্মেলনের ফলাফল এক বছর পরও অজানা। এছাড়া বিভিন্ন সময়ে জাতিসংঘ মহাসচিব, ইউএনএইচসিআর প্রধান, জাতিসংঘ মানবাধিকার সংস্থা প্রধানসহ আরও অনেক সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধান বাংলাদেশ সফর এবং রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করে গতানুগতিক আশ্বাস প্রদান করে গেছেন, কিন্তু কার্যত কোনো অগ্রগতি হয়নি। প্রত্যাবাসন বিষয়ে আলোচনায় শর্ত দেওয়া হয়, ‘প্রত্যাবাসন হতে হবে স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও নিরাপদ’, যেন এসব নিশ্চিত বিধানের দায়িত্ব বাংলাদেশেরই।
জাতিসংঘ বিভিন্ন সময়ে রোহিঙ্গাদের আত্তীকরণেরও প্রস্তাব দেয়। বাংলাদেশ তা প্রত্যাখ্যান করে এবং বাংলাদেশ এ ধরনের প্রস্তাব মানতেও বাধ্য নয়। কেননা, বাংলাদেশ জাতিসংঘ রিফিউজি কনভেনশনে (১৯৫১) স্বাক্ষর করেনি এবং রোহিঙ্গাদের রিফিউজি হিসাবে স্বীকৃতি দেয়নি। উল্লেখ্য, কনভেনশন অনুসারে রিফিউজিরা কিছু বিশেষ সুবিধার অধিকারী; যেমন-ক্যাম্পের বাইরে অবাধ চলাচল, স্থানীয় নাগরিকের মতো কাজ করার অধিকার ইত্যাদি, যার বাস্তবায়ন হবে বাংলাদেশের জন্য নিঃসন্দেহে আত্মঘাতী।
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন বিষয়টি অনিশ্চিত। একদিকে জাতিসংঘ অথবা বৈশ্বিক উদ্যোগের অভাব, অন্যদিকে মিয়ানমার সরকার কর্তৃক অধিকাংশ রোহিঙ্গাকে তাদের নাগরিক হিসাবে স্বীকৃতি প্রদানে অনীহা। সুতরাং প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু হলেও ১-২ লক্ষাধিক রোহিঙ্গার নাগরিকত্ব প্রমাণ করা নিঃসন্দেহে এক কঠিন চ্যালেঞ্জ। কারণ রোহিঙ্গারা এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছিল, যেখানে কোনো নাগরিকত্ব প্রমাণ-দলিল সঙ্গে আনার সুযোগই ছিল না। তাই বাংলাদেশকেই প্রত্যাবাসন বিষয়ে একটি সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ তৈরি ও তা বাস্তবায়নে জাতিসংঘসহ আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ফোরামে উত্থাপন এবং সংলাপ ও অ্যাডভোকেসি অব্যাহত রাখতে হবে। নয়তো ৯ বছর পেরিয়ে এক দশকে পড়া এ সংকটের সমাধান অনিশ্চিতই হয়ে থাকবে।
এম এ হালিম : রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির সাবেক পরিচালক, দুর্যোগ ও মানবিকবিষয়ক বিশ্লেষক



