
ইরান সংকটের আসল পরীক্ষা শুরু
ড. ফরিদুল আলম [সূত্র : কালের কণ্ঠ, ২১ জুন ২০২৬]
ফ্রান্সের ভার্সাইয়ে যখন ইরানের সঙ্গে সমঝোতা স্মারকটি স্বাক্ষর করলেন, তখন ট্রাম্পের চোখে-মুখে যেন ছিল একজন পরাজিত রাষ্ট্রনায়কের প্রতিচ্ছবি। মুখে ছিল না তিল পরিমাণ হাসি কিংবা এত দিন ধরে দাবি করা বিজয়ের আনন্দ।
ইরান যুদ্ধে এ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের খরচ হয়েছে ২৫ বিলিয়ন ডলার। এই বিশাল অঙ্কের অর্থ খরচ করেও ট্রাম্পের পক্ষে তাঁর প্রাথমিক লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব হয়নি। ২৮ ফেব্রুয়ারি যখন ইসরায়েলের সঙ্গে একযোগে এই যুদ্ধ শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র, প্রথম দিনেই নিহত হন সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি এবং ইরানের বেশ কিছু শীর্ষস্থানীয় কমান্ডার।
গত ১৮ জুন দুই পক্ষের মধ্যে একটি স্থায়ী যুদ্ধ বন্ধে আলোচনা শুরু করার লক্ষ্যে যে সমঝোতা স্মারকটি স্বাক্ষরিত হয়েছে, এর দফাগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে যুক্তরাষ্ট্র যে লক্ষ্য নিয়ে এই যুদ্ধ শুরু করেছিল, এর কোনোটিই তারা অর্জন করতে পারেনি।
এই সবকিছুই নির্ভর করছে আগামী ৬০ দিন সময় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান তাদের আলোচনাপ্রক্রিয়াকে কতটুকু সফলভাবে পরিচালনা করতে পারবে তার ওপর। এখানে অবশ্য এক ধরনের শৈথিল্যের বিধানও রাখা হয়েছে। বিষয়টি এ রকম যে প্রয়োজনে দুই দেশের সম্মতিতে এই ৬০ দিন মেয়াদকে আরো বৃদ্ধি করা যেতে পারে। সমঝোতার অংশ হিসেবে ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের মিত্ররা একে অন্যের ওপর হামলা করবে না এবং ইসরায়েল লেবাননেও এই অন্তর্বর্তী সময় পর্যন্ত সব ধরনের হামলা বন্ধ করবে। সমস্যার মূল এখানেই। সমঝোতা স্মারকটি স্বাক্ষরিত হয়ে গেলেও ইসরায়েলের পক্ষ থেকে এর মান্যতা দেওয়া হয়নি এবং তারা লেবাননে তাদের হামলা পরিচালনা অব্যাহত রেখেছে। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ইসরায়েলের প্রতি ক্ষোভ প্রদর্শন করা হলেও পরিস্থিতি একই অবস্থায় রয়েছে। এমন অবস্থায় গত ১৯ জুন থেকে জেনেভায় শুরু হওয়ার কথা ছিল চূড়ান্ত শান্তি আলোচনা, কিন্তু তাতে যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল ইরান। এর প্রতিক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকেও আলোচনায় নেতৃত্ব দিতে যাওয়া ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স তাঁর সুইজারল্যান্ড সফর বাতিল করেছিলেন।
সমঝোতা স্মারকটি স্বাক্ষরের দুই দিনের মাথায় চূড়ান্ত শান্তি আলোচনা প্রক্রিয়াটি বাধাগ্রস্ত হওয়াকে কেন্দ্র করে সংগত কারণেই বিভ্রান্তি দেখা দিয়েছে এর কার্যকারিতা নিয়ে। মূল অগ্রগতি বলতে এরই মধ্যে ইরান হরমুজ প্রণালি খুলে দিয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্র তাদের নৌ অবরোধ প্রত্যাহার করেছে। তার পরও সেখান দিয়ে জাহাজ চলাচলের ক্ষেত্রে ঝুঁকির বিষয়টি থেকেই যায়। ধারণা করা হচ্ছে, হরমুজ প্রণালির জলপথে ইরান অসংখ্য সামুদ্রিক মাইন পেতে রেখেছে। সেগুলোকে অপসারণ করতে পরবর্তী ৬০ দিন সময় ধরে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে কাজ শুরু হওয়ার কথা।
এ ক্ষেত্রে ইরান যদি সহায়তা না করে এবং লেবাননে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হচ্ছে না এমন কারণে এই সমঝোতার বিষয়গুলো প্রতিপালন না করে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে এর পাল্টা যুক্তিতে আবারও ইরানে হামলা পরিচালনার বৈধতা অর্জন করা সম্ভব হবে না। ইরানের পক্ষ থেকেও তাদের জাতীয় স্বার্থ অর্জিত না হলে আবারও ইসরায়েলের ওপর হামলার হুমকি দেওয়া হয়েছে। লেবাননের পরিস্থিতি এখন যে অবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছে, এ ক্ষেত্রে ইরান যদি আবারও ইসরায়েলে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা পরিচালনা করে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ইসরায়েলের পক্ষ নেওয়ারও সুযোগ খুবই সীমিত। এমনিতেই নেতানিয়াহুর বর্তমান অবস্থান বেশ কিছুদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের দিক থেকে সমর্থিত হচ্ছে না।
সংগত কারণেই প্রশ্ন আসতে পারে, ইসরায়েলকে আগে থেকেই নিবৃত্ত না করে ইরানের সঙ্গে এই সমঝোতা স্মারকটি স্বাক্ষরের পেছনে কী যুক্তি থাকতে পারে? পরিস্থিতি বলছে এ ক্ষেত্রে একটিই যুক্তি, আর তা হচ্ছে কোনো ধরনের ফলাফলবিহীন, বরং যুক্তরাষ্ট্রের শক্তির দম্ভকে ধরে রাখতে না পারা এই যুদ্ধের লাগাম টানার এখনই প্রকৃত সময়। তাদের দিক থেকে একটিই যুক্তি দেখানো হচ্ছে, আর সেটি হচ্ছে তারা পরমাণু অস্ত্র ও সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম প্রশ্নে ইরানকে আলোচনার টেবিলে ফেরাতে পেরেছে। এই অজুহাতে এই আলোচনাপ্রক্রিয়াটিকে সামনের নভেম্বর মাস পর্যন্ত টেনে নিয়ে যেতে পারলে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনোত্তর পরিস্থিতিতে তারা এ নিয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নিতে পারবে। আপাতত ইরান ও ইসরায়েল ইস্যু নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বিভাজিত জনমতকে নিয়ে ট্রাম্প আর কোনো বড় ধরনের ঝুঁকি নিতে চাইছেন না। সে ক্ষেত্রে সমঝোতাটির এক জায়গায় উল্লেখ করা হয়েছে, ইরানের প্রতি প্রতিশ্রুত সহযোগিতার বিষয়টি নির্ভর করবে আলোচনাপ্রক্রিয়ায় তারা কতটা সহযোগিতা করছে তার ওপর। এই অজুহাতে ইরানের প্রতি আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং তাদের জব্দকৃত সম্পদ ও অর্থের অবমুক্তির বিষয়টিও ঝুলে যেতে পারে অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য।
সার্বিক মূল্যায়নে ইরানের পারমাণবিক ও ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধিকরণ ইস্যুটি এই সমঝোতা স্মারকে অন্তর্ভুক্ত না থাকায় কার্যত এটি চূড়ান্ত আলোচনাপ্রক্রিয়ার অংশ হয়েছে। এর ফলে এটিই দাঁড়াচ্ছে যে ইরান যুদ্ধ পূর্ব অবস্থায়ই আবার ফিরে গেল। যুক্তরাষ্ট্র আপাতত নিজের মান রক্ষায় এই যুদ্ধ থেকে সরে গেলেও দীর্ঘ মেয়াদে ইসরায়েলের সঙ্গে দূরত্ব রক্ষা করে চলা তাদের জন্য কঠিন হবে। মধ্যপ্রাচ্যের ১২টি দেশে যুক্তরাষ্ট্রের যে ১৯টি সামরিক ঘাঁটি রয়েছে, সেগুলোর ভবিষ্যতের জন্য হলেও তাদের ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা করতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের মতো ইসরায়েলেও আগামী অক্টোবর মাসে সাধারণ নির্বাচন। এই সময় পর্যন্ত নেতানিয়াহু তাঁর অবস্থান ধরে রাখতে লেবাননে হামলা অব্যাহত রাখা কিংবা ইরানের সঙ্গে যুদ্ধাবস্থা ধরে রাখতে চাইবেন। এই সময় পর্যন্ত ইরানের অভ্যন্তরে আবার নতুন করে নানা কৌশলে তাদের জনমতকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করা হবে। ইরানের অভ্যন্তরে ইসরায়েলের গোয়েন্দা নজরদারি কিংবা নতুন করে গোপন হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনা ঘটানোর বিষয়টিকেও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। মোটকথা, ইরান নিয়ে ষড়যন্ত্রের এক নতুন অধ্যায় শুরু হতে যাচ্ছে—এ কথা নিঃসন্দেহেই বলা যায়।
লেখক : অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়



