
ফিলিস্তিন সংকট ও ইউরোপের নীতি
মাজেদ আল জীর [প্রকাশ : কালের কণ্ঠ, ২৬ জুলাই ২০২৬]
অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েলের অবৈধ বসতি স্থাপন ইউরোপের বিশ্বাসযোগ্যতার সবচেয়ে স্পষ্ট পরীক্ষা হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে এটি ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং এর সদস্য দেশগুলোর জন্যও একটি পরীক্ষা। ফিলিস্তিনে সংঘাতের অবসান এবং একটি স্থায়ী সমাধানে পৌঁছানোর ব্যাপারে তারা কতটা আন্তরিক, সেটিও এ পরীক্ষার মাধ্যমে স্পষ্ট হবে। ১৯৪৮ সালের নাকবার পর থেকে দখলদার শক্তির মানবাধিকার লঙ্ঘন অব্যাহত রয়েছে। গত তিন বছরে গাজায় তা গণহত্যামূলক যুদ্ধ ও জাতিগত নিধনের রূপ নিয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের নীতিনির্ধারকদের সামনে এখন প্রশ্ন হলো, তারা কি সত্যিই দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান রক্ষায় আন্তরিক? তারা বারবার এ সমাধানের পক্ষে কথা বলে আসছে। এর জন্য পুরো দখলদারত্ব এবং এর সঙ্গে যুক্ত সব ধরনের কর্মকাণ্ডের অবসান জরুরি। ২০২৬ সালের ১৭ জুলাই ইউরোপীয় ইউনিয়নের কার্যত পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় হিসেবে কাজ করা ইউরোপীয় এক্সটার্নাল অ্যাকশন সার্ভিস বা ইইএএস ২০২৫ সালের বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ করার পর এ পরীক্ষা আরও জরুরি হয়ে উঠেছে।
প্রতিবেদনটিতে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। এতে দেখা যায়, বসতি নির্মাণ শুধু জনসংখ্যা বাড়ানোর কোনো বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ নয়। এটি ইসরায়েলের একটি কেন্দ্রীয় ও সমন্বিত রাজনৈতিক প্রকল্পের অংশ। এ প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে বসতি নির্মাণ, অবৈধ বসতিগুলোকে বৈধতা দেওয়া, ভূমি দখল, বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা এবং শাসন ও প্রশাসনিক ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনা। এসব পদক্ষেপের ফলে কার্যত ইসরায়েলের দখলদারত্বকে স্থায়ীভাবে যুক্ত করার পথ আরও দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। একই সঙ্গে একটি কার্যকর ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনাও ক্রমেই ক্ষীণ হয়ে পড়ছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিজস্ব নীতির আলোকে দেখলে, এই অবৈধ প্রকল্প ঠেকাতে প্রতিবেদনটির সুপারিশে কঠোর প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপের বিষয়টি থাকার কথা।
প্রতিবেদনটিতে ইসরায়েলের এমন কিছু পদক্ষেপের কথা তুলে ধরা হয়েছে, যা নিরপেক্ষভাবে বিচার করলে ফিলিস্তিনিদের অধিকারের ওপর স্পষ্ট আগ্রাসন হিসেবে বিবেচিত হয়। এতে বলা হয়েছে, শুধু ২০২৫ সালেই ইসরায়েল সরকার অধিকৃত পশ্চিম তীরে (পূর্ব জেরুজালেম বাদে) ৫৪টি নতুন সরকারি বসতি অনুমোদন করেছে। এক বছরে এটি নজিরবিহীন সংখ্যা। একই সময়ে ৮৬টি নতুন বসতি স্থাপনের ঘাঁটি তৈরি করা হয়েছে। এর মধ্যে ৫৮টি কৃষি ও পশুপালনভিত্তিক ঘাঁটি।
এ ছাড়া ৬৩ হাজার ৩১১টি বসতিঘর নির্মাণের পরিকল্পনাও নথিভুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে পশ্চিম তীরে ২৭ হাজার ৯৪১টি এবং পূর্ব জেরুজালেমে ৫৬টি পরিকল্পনার আওতায় ৩৫ হাজার ৩৭০টি বসতিঘর রয়েছে। এ সংখ্যা ২০২৩ সালে তৈরি আগের রেকর্ডের দ্বিগুণেরও বেশি। ২০১৮ সালে যখন মাত্র ১১ হাজার ৫১৩টি বসতিঘর নির্মাণের পরিকল্পনা এগিয়ে নেওয়া হয়েছিল, তার তুলনায় এটি বিশাল বৃদ্ধি।
ইইএএসের মতে, এ প্রকল্পের স্বাভাবিক পরিণতি হবে পশ্চিম তীরকে খণ্ডিত করা। এর উত্তর ও দক্ষিণ অংশকে বিচ্ছিন্ন করা হবে। পূর্ব জেরুজালেমকে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের বাকি অংশ থেকে বিচ্ছিন্ন করা হবে। ফিলিস্তিনি জনগোষ্ঠীগুলো আলাদা আলাদা, চারদিক থেকে ঘেরা এবং অবরুদ্ধ এলাকায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়বে। এর ফলে একটি ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা অত্যন্ত ক্ষীণ হয়ে যাবে।
অথচ এ সম্ভাব্য ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রই সংঘাত সমাধানে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সরকারি কাঠামোর কেন্দ্রে রয়েছে। ১৯৬৭ সালের আরব ইসরায়েল যুদ্ধের পর ইউরোপীয় রাজনীতিকদের মুখে খুব কম কথাই ‘সংঘাতের অবসানের ভিত্তি হিসেবে দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান’ কথাটির মতো এতবার উচ্চারিত হয়েছে।
গণহত্যামূলক যুদ্ধের সময় ইসরায়েল ও তার নীতির বিরুদ্ধে ইউরোপে যে ব্যাপক জনমত তৈরি হয়েছে, ইউরোপীয় রাজনীতিকরাও তা কাজে লাগাতে পারেন। এই চাপ নিয়মিত বিক্ষোভ ও নানা কর্মসূচির মাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে। পশ্চিম ইউরোপের ২৫টিরও বেশি দেশে এবং প্রায় ৮০০টি শহরে ৫০ হাজারের বেশি বিক্ষোভ ও কর্মসূচি হয়েছে।
ইউরোপীয় নাগরিকদের উদ্যোগ বা ইউরোপিয়ান সিটিজেনস ইনিশিয়েটিভের ২০২৫/০০০০০৫ নম্বর উদ্যোগেও এ চাপ প্রকাশ পেয়েছে। এতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ইসরায়েলের অ্যাসোসিয়েশন চুক্তি পুরোপুরি স্থগিত করার আহ্বান জানানো হয়েছে। উদ্যোগটির আয়োজকরা ২০২৬ সালের ১৫ জুলাই স্বাক্ষর সংগ্রহের কার্যক্রম শেষ করেন। আনুষ্ঠানিক সময়সীমা শেষ হওয়ার প্রায় ছয় মাস আগেই তারা এ সিদ্ধান্ত নেন। ততদিনে ইউরোপীয় ইউনিয়নের নাগরিকদের কাছ থেকে প্রায় ১৩ লাখ স্বাক্ষর সংগ্রহ করা হয়েছিল।
আয়োজকদের দাবি অনুযায়ী, ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২৭টি সদস্য দেশের মধ্যে ১৪টিতে এ উদ্যোগ প্রয়োজনীয় জাতীয় সীমা পূরণ করেছে। ন্যূনতম সাতটি দেশে এই সীমা পূরণ করলেই নিয়ম অনুযায়ী তা যথেষ্ট। স্বাক্ষরকারীরা আরেকটি নিন্দা বিবৃতি বা অস্পষ্ট মানবিক অবস্থান দাবি করেননি। তারা এমন একটি বাস্তব রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পদক্ষেপ চেয়েছেন, যা ইসরায়েলের সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সম্পর্কের মূল কাঠামোকেই প্রভাবিত করবে।
ফিলিস্তিনিদের জন্য একটি সমান্তরাল দায়িত্ব:
ইউরোপের বিশ্বাসযোগ্যতার সংকট ফিলিস্তিনি রাজনৈতিক শক্তিগুলোর নিজস্ব দায়িত্ব থেকে তাদের মুক্তি দেয় না। ফিলিস্তিনিদের জাতীয় লক্ষ্য শুধু বসতি স্থাপন বন্ধ করা নয়। পুরো দখলদারত্বের অবসানও এর অংশ। তবে বসতি স্থাপন এমন একটি বাস্তব বিষয়, যেখানে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সরকারি অবস্থান ফিলিস্তিনিদের কার্যকর চাপ তৈরির সুযোগ দেয়। এর মাধ্যমে কিছু বাস্তব অর্জনও সম্ভব হতে পারে।
দখলদারত্ব ও বসতি সম্প্রসারণের এ পরিকল্পনার মোকাবিলায় ফিলিস্তিনিদের নিজেদের মধ্যেও গুরুতর সংস্কার প্রয়োজন। দরকার একটি জাতীয় কৌশল। সে কৌশলে প্রতিরোধের সঙ্গে রাজনৈতিক, আইনি ও কূটনৈতিক কার্যক্রমকে যুক্ত করা প্রয়োজন। ইউরোপের জনমতের পরিবর্তনকেও কাজে লাগানোর সক্ষমতা তৈরি করতে হবে।
বর্তমানে কোনো নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান না থাকলেও ইউরোপে ফিলিস্তিনিদের সম্মেলনের হিসাব অনুযায়ী, ইউরোপজুড়ে অন্তত ৮ লাখ ফিলিস্তিনি বসবাস করেন। তাদের জন্য যে স্বাধীনতা, যোগাযোগের সুযোগ, প্রয়োজনীয় সম্পদ এবং উন্মুক্ত সীমান্ত রয়েছে, তা কাজে লাগিয়ে এই বিশাল জনগোষ্ঠীর মধ্যে নির্বাচন আয়োজন করা সম্ভব। এর মাধ্যমে এমন একটি প্রতিনিধিত্বশীল সংগঠন গড়ে তোলা যেতে পারে, যা ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোর ওপর কার্যকর রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করতে সক্ষম হবে।
আমেরিকা মহাদেশ এবং এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে বসবাসরত ফিলিস্তিনি জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রেও একই উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব। এর মধ্যে অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডও রয়েছে। ইসরায়েলের একটি সমন্বিত প্রকল্পের মোকাবিলা খণ্ডিত ফিলিস্তিনি বাস্তবতা দিয়ে সম্ভব নয়। একইভাবে ইউরোপের একেকটি দেশের বিচ্ছিন্ন পদক্ষেপও সম্মিলিত ইউরোপীয় প্রতিক্রিয়ার বিকল্প হতে পারে না। এ কারণেই প্যালেস্টাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশন বা পিএলওকে পুনর্গঠন, ফিলিস্তিনি ন্যাশনাল কাউন্সিলের জন্য প্রকৃত নির্বাচন আয়োজন, রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের নতুন ম্যান্ডেট তৈরি এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা এককভাবে ধরে রাখার পরিবর্তে অংশীদারত্বের নীতি গ্রহণ করা শুধু অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়।
এগুলো সরাসরি ফিলিস্তিনিদের এমন একটি বৈধ ও প্রতিনিধিত্বশীল নেতৃত্ব গড়ে তোলার সক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত, যে নেতৃত্ব ফিলিস্তিন ও প্রবাসী জনগোষ্ঠীর মানুষের ভোটে নির্বাচিত হবে। ফিলিস্তিনিদের অভ্যন্তরীণ বিভাজন দখলদারত্বের কারণ নয়। এটি বসতি সম্প্রসারণেরও কোনো যুক্তি হতে পারে না। তবে এ বিভাজন ফিলিস্তিনিদের সক্ষমতা দুর্বল করে। ফলে ইউরোপীয় প্রতিবেদন, জনমতের পরিবর্তন এবং আইনি সুযোগগুলোকে বাস্তব রাজনৈতিক অর্জনে রূপ দেওয়া কঠিন হয়।
বিদ্যমান পরিস্থিতিতে ফিলিস্তিনি জনগণের এমন একটি জাতীয় নেতৃত্ব প্রয়োজন, যারা আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও জনমতের পরিবর্তন বুঝতে পারবে। সেই পরিবর্তনকে কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে পারবে। একই সঙ্গে ফিলিস্তিনিদের অধিকার, মুক্তি, প্রত্যাবর্তন এবং আত্মনিয়ন্ত্রণের সংগ্রামের পক্ষে তা কাজে লাগাতে পারবে।
লেখক: সাংবাদিক, প্রভাষক ও ফিলিস্তিনবিষয়ক কর্মী। ফিলিস্তিনি শরণার্থী সমস্যা এবং প্রত্যাবর্তনের অধিকার নিয়ে কাজ করেন। আলজাজিরায় প্রকাশিত নিবন্ধটি ভাষান্তর করেছেন আবিদ আজাদ



