
ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতায় অর্থনৈতিক স্বাধীনতা
এম এম আকাশ [সূত্র : সমকাল, ১৭ আগস্ট ২০২৬]
বর্তমানে বাংলাদেশের অর্থনীতির ৫০ শতাংশই বিদেশনির্ভর; অবশিষ্ট ৫০ শতাংশ নির্ভর করে স্থানীয় অর্থনীতির ওপর। যেহেতু মুক্তবাজার অর্থনীতি অনুসৃত হচ্ছে, তাই দেশীয় অর্থনীতির গতি-প্রকৃতি অনেকটাই নির্ভরশীল আন্তর্জাতিক অর্থনীতির গতি-প্রকৃতির ওপর। এই বাস্তবতায় অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি ও বাইরের অর্থনীতির সামঞ্জস্য ছাড়া কোনো লক্ষ্যই বাস্তবায়িত হবে না।
এদিকে, বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারমতে, ২০৩৪ সালের মধ্যে দেশের জিডিপির আকার ১ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারে সম্প্রসারিত করা হবে। যদিও পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যমতে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জিডিপির আকার ছিল ৫০ দশমিক এক বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ বর্তমান জিডিপির আকার আগামী ৮ বছরে দ্বিগুণ করতে হবে। এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে প্রতিবছর গড়ে সাড়ে ৯ থেকে ১০ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হবে।
এখন, ২০৩৪ সালের মধ্যে অর্থনীতির আকার দ্বিগুণ করতে হলে রপ্তানি আয় দ্বিগুণ করতে হবে। একই সঙ্গে আমদানির পরিমাণ যতটা সম্ভব কমিয়ে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বিদ্যমান ঘাটতি কমিয়ে সহনীয় পর্যায়ে আনতে হবে। একই সঙ্গে দেখতে হবে, কোন ভূ-রাজনৈতিক ব্যবস্থার সঙ্গে আমাদের অর্থনীতি সামঞ্জস্যপূর্ণ। কোন পণ্যের বাজার বাইরে আছে, যেখানে আমাদের পণ্যের দাম তুলনামূলক কম কিন্তু গুণ ও মান অন্যদের তুলনায় কম হলেও বাজার হারায় না। দাম ও মান দুদিক থেকেই প্রতিযোগিতায় জেতার উৎপাদন কৌশল গ্রহণ করতে হবে।
প্রশ্ন হচ্ছে, বাংলাদেশের বৃহত্তম রপ্তানি গন্তব্য যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কাজ করলে আমরা কি জিডিপির আকার এক ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত করতে পারব? আমি মনে করি, তাহলে আমরা নিশ্চিতভাবেই ব্যর্থ হবো। কারণ, যুক্তরাষ্ট্র থেকে পণ্য আমদানি করা হলে সার্বিক আমদানি ব্যয় ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাবে। তা ছাড়া মার্কিন রক্ষণশীল বাণিজ্য কৌশল উচ্চ শুল্ক আরোপ করে আমাদের রপ্তানি পণ্যের দামও বাড়িয়ে দেবে। যেমন একই এলএনজি ভারত, চীন বা রাশিয়া থেকে আমদানির বদলে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা হলে দাম অনেক বেশি পড়বে। তাতে আমাদের রপ্তানি পণ্যের উৎপাদন খরচ ও দাম বেড়ে যেতে বাধ্য।
কেবল আমদানি-রপ্তানির ধ্রুপদি অর্থনীতি নয়; যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নানা গোপন-প্রকাশ্য চুক্তি ও চুক্তির সম্ভাবনার কথাও শোনা যাচ্ছে। এর ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব ও প্রতিক্রিয়া বিবেচনায় নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে যার সঙ্গেই হোক না কেন; জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে কোনো রকম সামরিক জোটে সম্পৃক্ততা থেকে বিরত থাকতে হবে। এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলার স্বীকৃত আন্তর্জাতিক পন্থা হচ্ছে নির্বাচিত জাতীয় সংসদে যে কোনো বৈদেশিক চুক্তি আলোচিত ও অনুমোদিত হতে হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের যে কোনো সম্পৃক্ততার ক্ষেত্রে চীনের প্রতিক্রিয়ার কথা ভাবতে হবে। এ সংক্রান্ত ভূ-রাজনৈতিক জটিলতায় চীনের মাধ্যমে বহির্বিশ্বে অবস্থান তৈরির চলমান চেষ্টা ব্যাহত হতে পারে। চীনের সহযোগিতায় ব্রিকস জোটে অংশগ্রহণের স্বপ্নও ব্যর্থ হবে। ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড কার্যক্রমে অন্তর্ভুক্তি বিঘ্নিত হবে। এমনকি চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ সড়ক সংযোগের যে পরিকল্পনার কথা শোনা যাচ্ছে, তাও পিছিয়ে যেতে পারে। মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশের উন্নয়ন সহযোগীদের মধ্যে চীন বর্তমানে শীর্ষস্থানে।
বিভিন্ন প্রকল্পে তারা অর্থায়ন করেছে এবং আরও অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র-চীন ভূ-রাজনৈতিক জটিলতায় বাংলাদেশ কোনো পক্ষে গেলে প্রতিশ্রুত অর্থ ঝুলে যেতে পারে। অর্থাৎ বাংলাদেশ এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে যেতে পারবে কিনা, তা নির্ভর করছে আগামীর ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর। এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র, চীন বা ভারতের প্রতি এককভাবে না ঝুঁকে পুরোনো ও পরীক্ষিত পররাষ্ট্রনীতি ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে শত্রুতা নয়’ অনুসরণ করা হলে এক ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের জিডিপি অর্জনের সম্ভাবনা রয়েছে।
ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা কেবল নয়; প্রশ্নটি দেশের অর্থনৈতিক স্বাধীনতারও। অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি এখন প্রায় স্থবির। আনুষ্ঠানিক খাতের পুরো অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বর্তমানে কয়েকটি গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে। এদের কেউ কেউ আবার ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে আর শোধ করেননি। বিপুল খেলাপি ও মন্দ ঋণের কারণে দেশের ব্যাংকিং খাতও বহুলাংশে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। এটা এক দিনে হয়নি। ঔপনিবেশিক বা নয়া ঔপনিবেশিক বিদেশনির্ভরতা আমাদের মজ্জাগত। যে কারণে এ দেশের বিত্তবান ও ক্ষমতাশালী শ্রেণির বিরাট অংশের ‘এক পা দেশে, এক পা বিদেশে।’ অনেকেই দেশে অবৈধভাবে অর্থ উপার্জন করে বিদেশে পাচার করেছেন। এই বহির্মুখী শ্রেণির ওপর নির্ভর করে ‘ওয়ান ট্রিলিয়ন’ ডলারের অর্থনীতি গড়ে তোলা সম্ভব? সম্প্রতি প্রয়াত অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক প্রায়ই আমাকে বলতেন, ‘জাতীয় উন্নতির পূর্বশর্ত হচ্ছে দ্বৈত নাগরিকত্ব বাতিল’। যারা জাতিকে রাজনৈতিক, প্রশাসনিক বা অর্থনৈতিকভাবে নেতৃত্ব দিতে চান, তাদের তা সর্বাগ্রে মানতে হবে।
অন্যদিকে, আমরা এই মুহূর্তে উন্নয়নের যে স্তরে রয়েছি, মূলত নির্ভর করতে হবে ‘সিএসএমই’ (কোলাজ, স্মল অ্যান্ড মিডিয়াম এন্টারপ্রাইজেস) খাত এবং আধুনিক ও গ্রন্থিত কৃষি খাতের ওপর। এই নিম্ন পর্যায় থেকে বাংলাদেশ যদি এক ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের অর্থনীতি গড়ে তুলতে চায় তাহলে তাকে প্রথম অবস্থায় পরিকল্পিত ও সুনিয়ন্ত্রিত মিশ্র অর্থনীতির ধারা অনুসরণ করতে হবে।
প্রাইভেট ও পাবলিক সেক্টরে বিনিয়োগ কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় বাড়ানো ছাড়া গত্যন্তর নেই। সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমানে জিডিপিতে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ হার ২২ দশমিক ০৩ শতাংশ। এটা বিগত ১১ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। বিদ্যমান বাস্তবতা বেসরকারি খাতের বিনিয়াগ আহরণের ক্ষেত্রে অনুকূলও নয়। চলতি বছরের জুন মাসে এসে বেসরকারি খাতে ব্যাংক ঋণে বার্ষিক প্রবৃদ্ধি মাত্র ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশ।
জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়নবিষয়ক সংস্থা আঙ্কটাডের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বাংলাদেশে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ এসেছে ১৭৭ কোটি মার্কিন ডলার। এটা দেশের মোট জিডিপির মাত্র শূন্য দশমিক ৪০ শতাংশ। এই বিদেশি বিনিয়োগের বড় অংশই এসেছে পুনর্বিনিয়োগ থেকে। অর্থাৎ আগে থেকেই বাংলাদেশে কার্যক্রম পরিচালনাকারী বিদেশি কোম্পানিগুলো অর্জিত মুনাফার সামান্য অংশ নিজ দেশে নিয়ে না গিয়ে এখানেই বিনিয়োগ করেছে। বাংলাদেশের মতো উদীয়মান অর্থনীতিতে ফরেন ইনভেস্টমেন্ট-জিডিপি রেশিও হওয়া উচিত অন্তত ৩ শতাংশ। শূন্য দশমিক ৪০ শতাংশ বিদেশি বিনিয়োগ নির্দেশ করে– এখনও বিদেশি উদ্যোক্তারা বাংলাদেশকে বিনিয়োগের উপযোগী মনে করছেন না।
আমরা যদি স্থানীয়ভাবে বিনিয়োগের উপযোগী পরিবেশ গড়ে তুলতে না পারি তাহলে বিদেশি বিনিয়োগও প্রত্যাশিত মাত্রায় আসবে না। কারণ বিদেশি বিনিয়োগকারিরা কোনো দেশে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে সেই দেশের বিনিয়োগকারীদের অবস্থা বিশেষভাবে পর্যালোচনা করে থাকেন। শিল্প স্থাপনের জন্য গ্যাস-বিদ্যুতের নিশ্চিত জোগান থাকতে হবে। বিদ্যুতের কাঁচামাল বিদেশ থেকে কম খরচে আমদানি করতে হচ্ছে। বিদ্যুতের কাঁচামালের মূল্য যদি বেশি হয় তাহলে শিল্পের উৎপাদন খরচ বেড়ে যাবে।
এতে শিল্প লাভজনক হবে না। অন্যান্য দেশে গ্যাস ও বিদ্যুতের যে মূল্য, তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের মূল্য নির্ধারণ করতে হবে। অর্থাৎ শিল্পের উৎপাদন ব্যয় যদি নিম্ন ও প্রতিযোগিতাক্ষম পর্যায়ে রাখা না যায় তাহলে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা আমাদের দেশে বিনিয়োগের জন্য আসবেন না। প্রয়োজনে শিল্প খাতের জন্য জ্বালানিতে বিশেষ বিশেষ শিল্পের জন্য ও নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বিশেষ শর্তসাপেক্ষে ভর্তুকি দিতে হবে। কিন্তু বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ এসব সৃজনশীল উদ্যোগ সমর্থন করবে না। এখানেই আসে দেশের সব অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে স্বাধীনতা থাকার প্রশ্নটি। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা কি আমাদের আছে?
ড. এম এম আকাশ: অর্থনীতিবিদ; অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়



