
সমসাময়িক বাংলাদেশ: অর্থনীতি ও রাষ্ট্র সংস্কার
[সূত্র : শেয়ার বিজ, ২৩ আগস্ট ২০২৬]
বাংলাদেশ এমন এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পাশাপাশি রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান, অর্থনীতি, প্রশাসন ও জবাবদিহিতার কাঠামোকে নতুন করে সাজানোর প্রশ্ন সামনে এসেছে। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্রব্যবস্থায় পরিবর্তনের যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তার কেন্দ্রে ছিল সুশাসন, জবাবদিহিতা, দুর্নীতি দমন, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করা। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সংবিধান, নির্বাচন, বিচারব্যবস্থা, জনপ্রশাসন, পুলিশ ও দুর্নীতি দমনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কার কমিশন গঠিত হয় এবং এসব কমিশন একাধিক সুপারিশ দেয়।
২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের মধ্য দিয়ে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর রাষ্ট্র সংস্কারের প্রশ্নটি নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা পেয়েছে। একই দিনে জুলাই জাতীয় সনদ ও সংশ্লিষ্ট সাংবিধানিক সংস্কার প্রস্তাব নিয়ে গণভোটও অনুষ্ঠিত হয়। ফলে সংস্কার এখন আর কেবল একটি অন্তর্বর্তী রাজনৈতিক পর্বের আলোচনার বিষয় নয়; নির্বাচিত সরকারের সামনেও এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব।
তবে সরকার পরিবর্তন আর রাষ্ট্র সংস্কার এক বিষয় নয়। সরকার নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসে এবং নির্দিষ্ট সময় পর পরিবর্তিত হতে পারে। কিন্তু রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে কার্যকর ও টেকসই করতে হলে এমন কাঠামো গড়ে তুলতে হয়, যা ব্যক্তি, দল কিংবা সরকারের পরিবর্তনের সঙ্গে মৌলিকভাবে বদলে যাবে না। বাংলাদেশের সামনে এখন মূল চ্যালেঞ্জ হলো—রাজনৈতিক পরিবর্তনকে কীভাবে প্রাতিষ্ঠানিক ও কাঠামোগত পরিবর্তনে রূপ দেওয়া যায়।
অর্থনীতির কিছু সূচকে সাম্প্রতিক সময়ে ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুলাইয়ে বছরওয়ারি সাধারণ মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৩২ শতাংশে নেমেছে, যেখানে জুনে তা ছিল ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ। খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ১৬ শতাংশ এবং খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ২৮ শতাংশে নেমেছে। মূল্যস্ফীতি কমায় স্বস্তির বার্তা মিললেও এর অর্থ বাজারে পণ্যের দাম কমে গেছে, এমন নয়। বরং এর অর্থ হলো, আগের তুলনায় পণ্যের দাম বাড়ার গতি কিছুটা কমেছে। দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতির ফলে যে উচ্চমূল্যের স্তর তৈরি হয়েছে, তার ওপর নতুন মূল্যবৃদ্ধি এখনো অব্যাহত রয়েছে। ফলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ে তাৎক্ষণিক বড় ধরনের স্বস্তি ফিরে আসেনি। জুলাইয়ে মজুরি হার সূচকও বছরে ৮ দশমিক ২২ শতাংশ বেড়েছে, যা একই সময়ে ৮ দশমিক ৩২ শতাংশ সাধারণ মূল্যস্ফীতির সামান্য নিচে। অর্থাৎ মূল্যস্ফীতি কমার সাম্প্রতিক প্রবণতা ইতিবাচক হলেও প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতার ওপর চাপ এখনো রয়ে গেছে।
মধ্যবিত্ত ও নির্দিষ্ট আয়ের ওপর নির্ভরশীল পরিবারগুলো এই পরিস্থিতিতে বিশেষ চাপের মুখে রয়েছে। খাদ্য, বাড়িভাড়া, শিক্ষা, চিকিৎসা ও পরিবহন ব্যয়ের সম্মিলিত চাপ সামলানো অনেক পরিবারের জন্য কঠিন হয়ে উঠেছে। তাই অর্থনৈতিক নীতির লক্ষ্য শুধু মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না; আয়, উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান ও প্রকৃত মজুরি বৃদ্ধিকেও গুরুত্ব দিতে হবে।
বৈদেশিক খাতেও কিছুটা স্বস্তি এসেছে। এ বছর জুলাই শেষে বাংলাদেশের মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল প্রায় ৩৬ দশমিক ৪২ বিলিয়ন ডলার। আইএমএফের বিপিএম৬ পদ্ধতিতে হিসাব করলে তা ছিল প্রায় ৩১ দশমিক ৬০ বিলিয়ন ডলার। ফলে রিজার্ভ পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে, তবে কোন পদ্ধতিতে হিসাব করা হচ্ছে, তা স্পষ্ট করে বলা জরুরি। প্রবাসী আয়ও শক্তিশালী রয়েছে। এ বছর জুলাইয়ে দেশে ২ দশমিক ৮৫৯ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে, যা আগের বছরের একই মাসের তুলনায় উল্লেখযোগ্য বেশি। বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহ এবং বহিঃখাতের স্থিতিশীলতায় রেমিট্যান্স গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তবে রিজার্ভ ও রেমিট্যান্সের উন্নতিকে অর্থনৈতিক সংকটের পূর্ণ সমাধান হিসেবে দেখা যাবে না। বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, রাজস্ব আহরণ, ব্যাংক খাত এবং জ্বালানি নিরাপত্তার মতো কাঠামোগত সমস্যাগুলো এখনো রয়ে গেছে। অর্থনীতিকে টেকসই পথে নিতে হলে সাময়িক স্বস্তির পাশাপাশি এসব দীর্ঘমেয়াদি দুর্বলতার সমাধান করতে হবে।
বাংলাদেশের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় দুর্বলতাগুলোর একটি ব্যাংক খাত। দীর্ঘদিনের অনিয়ম, দুর্বল ঋণ মূল্যায়ন, রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক প্রভাব, অপর্যাপ্ত তদারকি এবং ঋণ পুনরুদ্ধারের দুর্বলতার কারণে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় বিপুল পরিমাণ সমস্যাগ্রস্ত ঋণ জমেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের এ বছর মার্চ মাসের তথ্য অনুযায়ী, ৬১টি তফসিলি ব্যাংকের মোট ঋণের পরিমাণ ছিল প্রায় ১৮ লাখ ২৪ হাজার ৬৬৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে শ্রেণীকৃত ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশ। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে এই অনুপাত ছিল ৩০ দশমিক ৬০ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২৬ সালে খেলাপিদের জন্য ঋণ নিষ্পত্তির বিশেষ সুবিধার মতো পদক্ষেপ নিয়েছে। তবে এ ধরনের ব্যবস্থা কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে ঋণ পুনরুদ্ধার, সম্পদ মূল্যায়ন, ব্যাংকের মূলধন সক্ষমতা এবং পরিচালনা পর্ষদের জবাবদিহিতার ওপর।
ব্যাংকগুলোর প্রকৃত আর্থিক অবস্থা প্রকাশ করা, দুর্বল ব্যাংক পুনর্গঠন, প্রয়োজন হলে একীভূতকরণ, পরিচালনা পর্ষদের জবাবদিহিতা এবং ঋণ অনুমোদনে রাজনৈতিক ও স্বার্থগোষ্ঠীর প্রভাব কমানো এখন জরুরি। ব্যাংক খাতের সংস্কার যত দীর্ঘায়িত হবে, রাষ্ট্রের সম্ভাব্য আর্থিক ব্যয় ও আমানতকারীদের আস্থার ঝুঁকি তত বাড়তে পারে।
বাংলাদেশের অর্থনীতির আরেকটি বড় দুর্বলতা জ্বালানি খাত। ২০২৬ সালের জুলাই-আগস্টে এলএনজি সরবরাহে বিঘ্নের কারণে গ্যাস সংকট আরও তীব্র হয়েছে। একটি এলএনজি টার্মিনালে দুর্ঘটনার পর দৈনিক বিপুল পরিমাণ গ্যাস সরবরাহ সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়। পরে সরবরাহ আংশিকভাবে স্বাভাবিক হলেও সংকট পুরোপুরি কাটেনি। এই ঘাটতির প্রভাব পড়েছে বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানা, সার উৎপাদন এবং নগরজীবনে। টেক্সটাইল, সিরামিক, স্টিল, কাচ, সারসহ বিভিন্ন গ্যাসনির্ভর শিল্পে অনিয়মিত সরবরাহ উৎপাদন ব্যাহত করে, উৎপাদন ব্যয় বাড়ায় এবং বিনিয়োগের ঝুঁকি বৃদ্ধি করে।
জ্বালানি সরবরাহের এই অনিশ্চয়তা বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নীতির দুর্বলতাও সামনে এনেছে। দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা কিংবা সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে তার প্রভাব দ্রুত দেশের অর্থনীতিতে এসে পড়ে। তাই এলএনজি আমদানির উৎস বৈচিত্র্যপূর্ণ করার পাশাপাশি স্থল ও সমুদ্রভাগে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, গ্যাস সঞ্চালন অবকাঠামোর উন্নয়ন, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ এবং শিল্পে জ্বালানি দক্ষতা বাড়ানোর দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। জ্বালানি নিরাপত্তাকে শুধু বিদ্যুৎ বা গ্যাস মন্ত্রণালয়ের বিষয় হিসেবে না দেখে জাতীয় অর্থনৈতিক নিরাপত্তার অংশ হিসেবে বিবেচনা করা দরকার।
রাষ্ট্রের কার্যকারিতার অন্যতম প্রধান ভিত্তি হলো দক্ষ, পেশাদার ও নিরপেক্ষ প্রশাসন। বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে দলীয়করণ, পদায়নে রাজনৈতিক বিবেচনা, পদোন্নতিতে আনুগত্যের প্রভাব এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতা রয়েছে। প্রশাসনের পুনর্বিন্যাসের প্রয়োজন হলে এই পুনর্বিন্যাস যদি রাজনৈতিক আনুগত্যের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়, তাহলে পুরোনো সমস্যারই পুনরাবৃত্তি ঘটবে। রাষ্ট্রের প্রয়োজন এমন একটি প্রশাসন, যেখানে কর্মকর্তা সরকারের বৈধ নীতি বাস্তবায়ন করবেন; কিন্তু ব্যক্তিগত বা দলীয় আনুগত্যের পরিবর্তে সংবিধান, আইন ও পেশাগত দায়িত্বের প্রতি দায়বদ্ধ থাকবেন। পদায়ন ও পদোন্নতিতে যোগ্যতা, সততা ও কর্মদক্ষতাকে প্রধান মানদণ্ড করতে হবে। গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্বের নির্দিষ্ট মেয়াদ, কর্মসম্পাদন মূল্যায়ন এবং সম্পদের স্বচ্ছ হিসাবের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। একই সঙ্গে প্রতিটি মন্ত্রণালয় ও সরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রকল্প ও সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের অগ্রগতি পরিমাপের জন্য কার্যকর পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা দরকার।
বিচারব্যবস্থার সংকটও কম নয়। ২০২৬ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত দেশের আদালতগুলোয় মোট ৪৬ লাখ ৩৯ হাজার ৪৭৬টি মামলা বিচারাধীন ছিল। এর মধ্যে অধস্তন আদালতেই ছিল ৪০ লাখ ৭৮ হাজার ৪৩২টি মামলা। হাইকোর্ট বিভাগে ছিল ৫ লাখ ২২ হাজার ৩৩১টি এবং আপিল বিভাগে ৩৮ হাজার ৭১৩টি মামলা। এই বিপুল মামলাজট শুধু বিচার বিভাগের ওপর চাপ সৃষ্টি করে না; এটি নাগরিকের ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকারকেও দীর্ঘায়িত করে।
বিচার পেতে বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হলে আইনের শাসনের প্রতি মানুষের আস্থা কমে যায়। ব্যবসায়িক বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তি না হলে বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হয়, পারিবারিক মামলা দীর্ঘায়িত হলে সামাজিক সংকট বাড়ে এবং ফৌজদারি মামলার দীর্ঘসূত্রিতা ন্যায়বিচারের উদ্দেশ্যকে দুর্বল করে। মামলার জট কমাতে শুধু বিচারকের সংখ্যা বাড়ানো যথেষ্ট নয়। আদালত ব্যবস্থার পূর্ণাঙ্গ ডিজিটালাইজেশন, বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি, অপ্রয়োজনীয় তারিখ কমানো, দক্ষ প্রসিকিউশন ব্যবস্থা এবং তদন্ত সংস্থার সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। যেখানে সম্ভব, মামলা আদালতে যাওয়ার আগেই মধ্যস্থতার মাধ্যমে নিষ্পত্তির সুযোগ বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি বিচারিক প্রশাসনের দক্ষতাও বাড়াতে হবে।
দুর্নীতি শুধু সরকারি অর্থের অপচয় করে না; এটি প্রতিষ্ঠানের প্রতি মানুষের আস্থা নষ্ট করে, বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত করে এবং যোগ্যতার পরিবর্তে ব্যক্তিগত যোগাযোগকে সাফল্যের পথ করে তোলে। দীর্ঘ মেয়াদে এর ফলে রাষ্ট্রের সক্ষমতা দুর্বল হয়। দুর্নীতি দমনে শুধু অভিযান, গ্রেপ্তার বা মামলাই যথেষ্ট নয়। দুর্নীতির সুযোগ তৈরি করে এমন প্রশাসনিক কাঠামো পরিবর্তন করতে হবে। সরকারি ক্রয় থেকে নিয়োগ, প্রকল্প অনুমোদন থেকে কর আদায়—সব ক্ষেত্রে ডিজিটাল ব্যবস্থা, তথ্যের উন্মুক্ততা, স্বচ্ছতা ও স্বাধীন অডিট বাড়াতে হবে। দুর্নীতি দমনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকর স্বাধীনতাও জরুরি। তদন্তকারী প্রতিষ্ঠান যদি রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক প্রভাবমুক্তভাবে কাজ করতে না পারে, তাহলে দুর্নীতিবিরোধী অভিযান দীর্ঘ মেয়াদে টেকসই হবে না। তবে দুর্নীতি দমন কমিশন একা দুর্নীতি নির্মূল করতে পারবে না। সংসদ, প্রশাসন, বিচার বিভাগ, নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, রাজনৈতিক দল, ব্যবসায়ী সমাজ ও নাগরিক সমাজ—সব পক্ষের জবাবদিহিতার কাঠামো শক্তিশালী করতে হবে।
রাষ্ট্র সংস্কারের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা এখন সুপারিশের অভাব নয়; বাস্তবায়নের ঘাটতি। ২০২৪-২৫ সময়ে সংবিধান, নির্বাচন, বিচারব্যবস্থা, জনপ্রশাসন, পুলিশ ও দুর্নীতি দমনসহ বিভিন্ন বিষয়ে একাধিক সংস্কার কমিশন কাজ করেছে। এসব সুপারিশকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আলোচনা হয়েছে এবং জুলাই জাতীয় সনদ প্রণয়নের প্রক্রিয়া এগিয়েছে।
এ বছর নির্বাচন ও গণভোটের পর সংস্কারের প্রশ্নটি এখন নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। ফলে প্রয়োজন একটি সুস্পষ্ট জাতীয় সংস্কার রোডম্যাপ। কোন সংস্কার আগামী ছয় মাসে হবে, কোনটি এক বছরে এবং কোনটি দীর্ঘ মেয়াদে বাস্তবায়িত হবে, তা স্পষ্ট করা প্রয়োজন। প্রতিটি সংস্কারের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান, প্রয়োজনীয় আইন, অর্থায়ন, বাস্তবায়নের সময়সীমা এবং পরিমাপযোগ্য অগ্রগতি নির্ধারণ করতে হবে। সংস্কারের অগ্রগতি নিয়মিত জনগণের সামনে প্রকাশ করা উচিত। সংসদীয় কমিটিগুলোকে আরও কার্যকর করে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কাজের অগ্রগতি পর্যালোচনার সুযোগ দিতে হবে। একই সঙ্গে সরকারি প্রকল্প ও নীতির বাস্তবায়ন নিয়ে স্বাধীন মূল্যায়নের ব্যবস্থাও প্রয়োজন।
রাষ্ট্র সংস্কারের সবচেয়ে বড় ঝুঁকিগুলোর একটি হলো—এটিকে কোনো একটি রাজনৈতিক দলের প্রকল্পে পরিণত করা। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, দুর্নীতি দমন, প্রশাসনের নিরপেক্ষতা, ব্যাংক খাতের সুশাসন, নির্বাচন ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা কিংবা সরকারি অর্থের স্বচ্ছতা—এসব কোনো দলের একক সম্পদ নয়; এগুলো রাষ্ট্রের সম্পদ। নতুন সরকার যদি পূর্ববর্তী শাসনব্যবস্থার রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের জায়গায় নতুন রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে, তাহলে সরকার পরিবর্তন ঘটবে, কিন্তু রাষ্ট্রের চরিত্র মৌলিকভাবে বদলাবে না। অন্যদিকে যদি নিয়োগ, পদায়ন, তদন্ত, বিচার, সরকারি ক্রয় এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনায় নিয়ম ও প্রতিষ্ঠানকে ব্যক্তিগত বা দলীয় বিবেচনার ওপরে রাখা যায়, তাহলে রাজনৈতিক পরিবর্তন ধীরে ধীরে প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তনে রূপ নিতে পারে।
বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে পাঁচটি বিষয়কে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন।
প্রথমত, প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা ও জবাবদিহিতা। সাংবিধানিক ও নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানগুলোকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করার পাশাপাশি তাদের কর্মকাণ্ডের জন্য স্বচ্ছ জবাবদিহিতার ব্যবস্থা করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা ও ব্যাংকিং সংস্কার। সমস্যাগ্রস্ত ঋণ শনাক্তকরণ ও পুনরুদ্ধার, ব্যাংকের মূলধন সক্ষমতা, পরিচালনা পর্ষদের জবাবদিহিতা এবং আমানতকারীর আস্থা—সব বিষয়কে সমন্বিত সংস্কারের আওতায় আনতে হবে।
তৃতীয়ত, দক্ষ ও নিরপেক্ষ প্রশাসন। পদায়ন ও পদোন্নতিতে পেশাগত যোগ্যতা, কর্মদক্ষতা ও সততাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
চতুর্থত, দ্রুত ও কার্যকর বিচারব্যবস্থা। বিচারকের সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি মামলার ব্যবস্থাপনা, মধ্যস্থতা, ডিজিটাল আদালত এবং তদন্ত ও প্রসিকিউশনের সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
পঞ্চমত, সরকারি কর্মকাণ্ডে পূর্ণাঙ্গ জবাবদিহিতা। সরকারি অর্থ, প্রকল্প, ক্রয়, নিয়োগ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের তথ্য যতটা সম্ভব উন্মুক্ত করতে হবে এবং স্বাধীন অডিট ও সংসদীয় নজরদারি শক্তিশালী করতে হবে।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক সূচকে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন আশার কারণ। মূল্যস্ফীতি কমেছে, রেমিট্যান্স শক্তিশালী রয়েছে এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে উন্নতি হয়েছে। কিন্তু একই সময়ে ব্যাংক খাতে শ্রেণীকৃত ঋণ মোট ঋণের প্রায় এক-তৃতীয়াংশে পৌঁছেছে, জ্বালানি সংকট শিল্প ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থাকে চাপের মধ্যে রেখেছে এবং আদালতে ৪৬ লাখের বেশি মামলা বিচারাধীন। অতএব সাম্প্রতিক ইতিবাচক সূচককে সংকটের অবসান হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এগুলোকে একটি সম্ভাব্য স্থিতিশীলতার জানালা হিসেবে দেখা উচিত, যার সুযোগ কাজে লাগিয়ে কাঠামোগত সংস্কার এগিয়ে নিতে হবে।
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে শুধু রাজনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনে নয়, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের চরিত্র পরিবর্তনে। একজন সাধারণ নাগরিক কত দ্রুত বিচার পান, একজন উদ্যোক্তা কতটা নিরাপদে বিনিয়োগ করতে পারেন, একজন আমলা কতটা পেশাগত স্বাধীনতা নিয়ে কাজ করতে পারেন, একজন আমানতকারী তার অর্থকে কতটা নিরাপদ মনে করেন এবং রাষ্ট্রীয় অর্থ কতটা স্বচ্ছতার সঙ্গে ব্যয় হয়—এসব সূচকই হবে প্রকৃত অগ্রগতির মাপকাঠি।
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান, ২০২৫ সালের সংস্কার-আলোচনা এবং ২০২৬ সালের নির্বাচন ও গণভোট বাংলাদেশের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সুযোগ তৈরি করেছে। কিন্তু সুযোগ আর পরিবর্তন এক জিনিস নয়। পরিবর্তন তখনই স্থায়ী হবে, যখন রাজনৈতিক অঙ্গীকার প্রতিষ্ঠান, আইন ও প্রশাসনিক আচরণে রূপ নেবে।



