
প্রধানমন্ত্রীকে সৌদি সফরে আমন্ত্রণের তাৎপর্য
ওবায়দুল হক [প্রকাশ: সমকাল, ২২ আগস্ট ২০২৬]
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে একটি গভীর ও দৃশ্যমান গতিশীলতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিশেষ করে মালয়েশিয়া ও চীনে প্রধানমন্ত্রীর সফল রাষ্ট্রীয় সফরের পরপরই সৌদি আরবের পক্ষ থেকে একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দলের ঢাকা আগমন এবং বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে সৌদি যুবরাজের পক্ষ থেকে রাষ্ট্রীয় সফরের আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ জানানো আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে। বর্তমান বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক ভূরাজনীতির জটিল প্রেক্ষাপটে এটিকে শুধু একটি সাধারণ দ্বিপক্ষীয় কূটনৈতিক আমন্ত্রণ হিসেবে দেখার কোনো সুযোগ নেই; বরং এর পেছনে রয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের দ্রুত পরিবর্তনশীল ক্ষমতার ভারসাম্য, নিরাপত্তা কাঠামোর রূপান্তর এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের বহুমুখী একটি বড় ধরনের কৌশলগত সাফল্য।
ভূরাজনীতি মূলত একটি গতিশীল দাবার বোর্ডের মতো, যেখানে প্রতিটি চালের সঙ্গে সঙ্গে খেলোয়াড় এবং ঘুঁটির গুরুত্ব ও সমীকরণ দ্রুত বদলে যায়। মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতিও ঠিক তেমন এক রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের যে ‘সিকিউরিটি আমব্রেলা’ বা একচ্ছত্র নিরাপত্তাবলয় ছিল, তা সাম্প্রতিক সময়ের বিভিন্ন সংকটে অনেকটাই কার্যকারিতা হারিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের রাষ্ট্রগুলো–বিশেষ করে সৌদি আরব, কাতারের মতো আঞ্চলিক পরাশক্তিগুলো এখন বুঝতে পারছে যে, নিজেদের জাতীয় নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য একক কোনো পশ্চিমা পরাশক্তির ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল থাকা বুদ্ধিমানের কাজ নয়।
ফলে এই অঞ্চলের রাষ্ট্রগুলো এখন নিজেদের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অবস্থান ও মৈত্রী কাঠামোতে বড় ধরনের কৌশলগত পরিবর্তন আনছে।এর সবচেয়ে বড় এবং দৃশ্যমান উদাহরণ হলো, কিছুদিন আগে ইরানের সঙ্গে তীব্র সামরিক উত্তেজনা ও পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনার পরও, ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির জানাজায় সৌদি আরবের পক্ষ থেকে ডেপুটি ফরেন মিনিস্টারের নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল পাঠানো। যে দেশের তেল স্থাপনা ও কৌশলগত অঞ্চলে কিছুদিন আগেও ইরানের পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষ হামলার ঘটনা ঘটেছে, সেই দেশের সর্বোচ্চ নেতার শেষবিদায় অনুষ্ঠানে সৌদি আরবের এ ধরনের উচ্চপর্যায়ের অংশগ্রহণ এটাই ইঙ্গিত করে যে, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো এখন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। তারা দীর্ঘদিনের বৈরিতা ভুলে ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থাকে এক প্রকার রাজনৈতিকভাবে মেনে নিয়ে আঞ্চলিক উত্তেজনা প্রশমনের টেকসই পথ খুঁজছে।
বাংলাদেশের বর্তমান অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বাস্তবতায় সৌদি আরবের এই স্বতঃস্ফূর্ত আগ্রহ একটি অত্যন্ত পজিটিভ বা ইতিবাচক বার্তা বহন করে। বর্তমান সরকারের পররাষ্ট্রনীতি কোনো একক মেরু বা নির্দিষ্ট কোনো অক্ষের দিকে ঝুঁকে নেই, যা এই আমন্ত্রণের মাধ্যমে আবারও প্রমাণিত হলো। বাংলাদেশের এই বহুমাত্রিক কূটনীতির একটি স্পষ্ট ডিরেকশন বা দিকনির্দেশনা আমরা দেখতে পাচ্ছি। একদিকে চীন বা মালয়েশিয়ার দিকে মনোযোগ দেওয়া মানে শুধু নির্দিষ্ট ওই দুটি দেশের সঙ্গে বাণিজ্যিক লেনদেন নয়, বরং আসিয়ান এবং সামগ্রিক পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার উদীয়মান বাজারের সঙ্গে নিজেদের সংযোগ স্থাপন করা। অন্যদিকে, পশ্চিম এশিয়া তথা সামগ্রিক মুসলিম বিশ্বের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কেন্দ্রবিন্দু সৌদি আরবের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করা আমাদের এই কৌশলগত ভারসাম্যেরই একটি বাস্তবমুখী বহিঃপ্রকাশ।
প্রথমত, জ্বালানি নিরাপত্তার ক্ষেত্রে সৌদি আরব আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এই ভূমিকা শুধু আমাদের কাছে অপরিশোধিত তেল বা জ্বালানি রপ্তানি করার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের অবকাঠামোগত উন্নয়ন, যেমন নতুন আধুনিক তেল শোধনাগার নির্মাণ, এলএনজি টার্মিনাল স্থাপন এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের মাধ্যমে বড় ধরনের দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের ক্ষেত্র তৈরি হতে পারে।
দ্বিতীয়ত, আমাদের ঐতিহ্যবাহী সৌদি শ্রমবাজারের প্যাটার্ন বা সামগ্রিক ধরন বদলানোর এটাই উপযুক্ত সময়। বিগত কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশে থেকে সৌদি আরবে সস্তা এবং অদক্ষ বা স্বল্পদক্ষ জনশক্তি পাঠানোর যে ধারা চলে আসছে, তার অর্থনৈতিক রিটার্ন এখন তুলনামূলকভাবে কমে আসছে। দুই দেশের এই নতুন দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের স্তরে দাঁড়িয়ে আমাদের উচিত হবে দক্ষ, আধাদক্ষ এবং উচ্চশিক্ষিত পেশাদারদের (যেমন–প্রকৌশলী, তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ, চিকিৎসক ও নার্স) সৌদি আরবের আধুনিকায়ন প্রকল্প ‘ভিশন ২০৩০’-এর সঙ্গে যুক্ত করা।
তৃতীয়ত, জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক শান্তি রক্ষা মিশনের বাইরেও সৌদি আরবের সঙ্গে আমাদের বৃহত্তর সামরিক ও নিরাপত্তা সহযোগিতার এক বিশাল ও নতুন সম্ভাবনা উঁকি দিচ্ছে। অতীতে পাকিস্তান যেভাবে সৌদি আরবের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা, সামরিক প্রশিক্ষণ ও কৌশলগত জনবল মোতায়েনের ক্ষেত্রে দ্বিপক্ষীয় চুক্তি করেছে, বাংলাদেশও এখন তার পেশাদার ও বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত সামরিক বাহিনীকে ব্যবহার করে সেই ধরনের প্রতিরক্ষা সহযোগিতার কথা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে পারে। এটি দুই দেশের কৌশলগত আস্থাকে এক ভিন্ন উচ্চতায় নিয়ে যাবে।
আজ থেকে ৪০ বছর আগের রাজনৈতিক আমলগুলোতে সৌদি আরবের সঙ্গে সম্পর্কের যে ধারাবাহিকতা ছিল, বর্তমান আন্তর্জাতিক বাস্তবতায় তাকে ছাপিয়ে সম্পূর্ণ নতুন অর্থনৈতিক ও কৌশলগত প্রয়োজনের নিরিখে এই সুযোগকে কাজে লাগাতে হবে। সৌদি আরবের পক্ষ থেকে আসা এই আমন্ত্রণ আমাদের কূটনীতির জন্য যেমন একটি দূরদর্শিতার পরীক্ষা, ঠিক তেমনি আমাদের অর্থনীতির জন্য একটি বিশাল সম্ভাবনার জানালা। বহুমাত্রিক এই সহযোগিতার সম্ভাবনাকে সঠিক সময়ে ও সুনিপুণ কূটনৈতিক চালে ব্যবহার করতে পারলে তা কেবল আমাদের বর্তমান অর্থনৈতিক সংকট দূর করতেই সাহায্য করবে না, বরং আগামী দিনের বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক মানচিত্রে বাংলাদেশের কৌশলগত গুরুত্ব ও দরকষাকষির ক্ষমতাকে এক নতুন ও মর্যাদাপূর্ণ উচ্চতায় নিয়ে যাবে।
ওবায়দুল হক: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে সহযোগী অধ্যাপক এবং এফিলিয়েটেড জ্যেষ্ঠ ফেলো, ওসমানী সেন্টার ফর পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজ



