
উন্নয়ন ও গণতন্ত্র সাংঘর্ষিক নয়, পরিপূরক
ড. আনোয়ারউল্লাহ চৌধুরী [প্রকাশ : যুগান্তর, ১২ মে ২০২৬]
গত ১ মে আমন্ত্রিত হয়ে বাংলা একাডেমিতে অনুষ্ঠিত দুটি বইয়ের প্রকাশনা উৎসবে গিয়েছিলাম। সময়-সুযোগ পেলে আমি এ ধরনের অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করি; যারা বই লিখেন এবং প্রকাশ করেন, তারা জ্ঞানালোকিত সমাজের অংশ। তাই তাদের সাহচর্য আমাকে আনন্দ দেয়। এসব অনুষ্ঠানে গেলে অনেক কিছু শেখা যায়। পরস্পর মতবিনিময় করে ব্যক্তিগতভাবে উপকৃত হওয়া যায়। প্রকাশনা অনুষ্ঠানে নতুন প্রকাশিত দুটি গ্রন্থের মোড়ক উন্মোচন করা হয়, যার একটি ইতিহাসভিত্তিক বই এবং অন্যটি গণতন্ত্র ও উন্নয়নবিষয়ক। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সাবেক তথ্য সচিব সৈয়দ মার্গুব মুর্শেদ। গণতন্ত্র ও উন্নয়নবিষয়ক বইটি আমি বেশ মনোযোগসহকারে পাঠ করি। বইটি পড়তে গিয়ে আমার বারবারই কেবল মনে হচ্ছিল, উন্নয়ন ও গণতন্ত্র আসলে কী। গণতন্ত্র ও উন্নয়ন কি পরস্পর সাংঘর্ষিক, নাকি সমার্থক ও একই পথের যাত্রী?
আমাদের দেশে অনেকের মধ্যেই উন্নয়ন বলতে কী বোঝায়, তা নিয়ে ভ্রান্ত ধারণা প্রচলিত আছে। মনে করা হয়, অর্থনৈতিক উন্নয়ন হলেই একটি দেশের কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন অর্জিত হয়। অর্থাৎ অর্থনৈতিক উন্নয়নকে তারা সামগ্রিক উন্নয়নের সমার্থক বলে মনে করেন। আসলে উন্নয়ন কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; উন্নয়ন বলতে আমরা একটি রাষ্ট্রের প্রতিটি অঙ্গের উন্নয়নকে বুঝি। অর্থনৈতিক উন্নয়ন, সামাজিক উন্নয়ন, রাজনৈতিক উন্নয়ন, কালচারাল উন্নয়ন, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা ক্ষেত্রে টেকসই ও সুষম উন্নয়ন হলেই তাকে প্রকৃত উন্নয়ন বলা যেতে পারে। এ ছাড়া উন্নয়ন হলো সমাজের সব স্তরের মানুষের সম-উন্নয়ন।
উন্নয়নের সুফল যদি দেশের মানুষ ন্যায্যতার ভিত্তিতে ভোগ করতে না পারে, তাহলে তাকে সত্যিকার উন্নয়ন বলা যায় না। দেহের সব রক্ত মুখে এসে জমা হলে তাকে সুস্বাস্থ্য বলা যায় না, সেটা অসুস্থতার লক্ষণ। তেমনি উন্নয়নের সুফল যদি মুষ্টিমেয় মানুষের করতলগত হয়, তাহলে তাকেও সুষম উন্নয়ন বলা যায় না। রাষ্ট্রীয় সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে সর্বোচ্চ উৎপাদন নিশ্চিত করা এবং এর সুফল সবার মধ্যে ন্যায্যতার ভিত্তিতে অর্থাৎ যার যেটুকু প্রাপ্য, সেই মোতাবেক বণ্টনের ব্যবস্থা করা গেলেই কেবল তাকে সুষম উন্নয়ন বলা যেতে পারে। আমাদের মনে রাখতে হবে, উন্নয়ন ও গণতন্ত্র কখনোই পরস্পরবিরোধী নয়। বরং পরস্পর পরিপূরক। গণতন্ত্র ছাড়া উন্নয়ন এবং উন্নয়ন ছাড়া গণতন্ত্র উভয়ই অর্থহীন। দেশে বিশুদ্ধ ও কার্যকর গণতন্ত্র না থাকলে স্বৈরাচারের জন্ম হয় এবং জনগণের ন্যায়সংগত অধিকার লঙ্ঘিত হয়। সুশাসন এবং ন্যায়ভিত্তিক উন্নয়নের স্বার্থেই দেশে গণতন্ত্র থাকা প্রয়োজন। গণতন্ত্র না থাকলে সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত হয় না। দুর্নীতি আর লুটপাট প্রাধান্য পায়। গণতন্ত্রহীন রাষ্ট্রে উৎপাদনশীল খাতের চেয়ে অবকাঠামোগত খাতে উন্নয়ন বেশি হয়। কারণ অবকাঠামোগত খাতে যে উন্নয়ন অর্জিত হয়, তা দৃশ্যমান এবং এতে অর্থ লুটপাটের সুযোগ বেশি থাকে।
উন্নয়নের গতিধারা বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, যেসব দেশে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা কার্যকর থাকে, সেখানে অবকাঠামোগত খাতের চেয়ে প্রোডাক্টিভ সেক্টরে উন্নয়নের জন্য বেশি জোর দেওয়া হয়। আমাদের মতো দেশগুলোতে যখন অগণতান্ত্রিক স্বেচ্ছাচারী সরকার ক্ষমতায় থাকে, তখন অবকাঠামোগত খাতে সবচেয়ে বেশি উন্নয়ন হয়। পাকিস্তান আমলে আমরা জেনারেল আইয়ুব খানের সময় অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রত্যক্ষ করেছি। স্বাধীন বাংলাদেশে সামরিক শাসক এরশাদ আমলে অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রত্যক্ষ করেছি। অবকাঠামোগত খাতে সবচেয়ে বেশি উন্নয়ন প্রত্যক্ষ করা গেছে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আমলে। শেখ হাসিনার আমলে অবকাঠামোগত খাতে যে উন্নয়ন হয়েছে, বাংলাদেশের ইতিহাসে আর কখনোই তা হয়নি। আর সেই আমলে উন্নয়নের নামে দুর্নীতির যে মহোৎসব চলেছে, অতীতের কোনো সরকারের আমলে তা হয়নি।
বিগত সরকারের উন্নয়ন দর্শন ছিল, ‘অতি উন্নয়ন অতি দুর্নীতি’। অন্তর্বর্তী সরকার আমলে গঠিত শ্বেতপত্র কমিটি তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, ২০০৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত সময়ে বাংলাদেশ থেকে ২৩ হাজার ৪০০ কোটি মার্কিন ডলার সমতুল্য ২৮ লাখ কোটি টাকা বিদেশে পাচার করা হয়েছে। পাচারকৃত অর্থের একটি বড় অংশই বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের নামে লোপাট করা অর্থ থেকে সংগৃহীত। অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, ‘ব্যাপক উন্নয়ন এবং শূন্য দুর্নীতি’ একটি দেশের উন্নয়ন কৌশলের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত অবস্থা। এমনকি তুলনামূলক কম উন্নয়ন এবং শূন্য দুর্নীতিও কাম্য হতে পারে; কিন্তু কোনোভাবেই উন্নয়নের নামে রাষ্ট্রীয় অর্থ লোপাট করা মেনে নেওয়া যায় না। কোনো দেশপ্রেমিক নাগরিক দেশের অর্থ বিদেশে পাচার করতে পারেন না।
বিগত সরকারের আমলে অবকাঠামোগত খাতে উন্নয়ন হয়েছে; কিন্তু সেজন্য জাতিকে কতটা মূল্য দিতে হয়েছে, সে বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে হবে। একটি উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। ভারতে প্রতি কিলোমিটার ফোর লেন সড়ক নির্মাণে ব্যয় হয় ১৪ লাখ মার্কিন ডলার। পাকিস্তানে ব্যয় হয় ২৯ লাখ ৫০ হাজার ডলার। ফিলিপাইনে ব্যয় হয় ১১ লাখ ৫০ হাজার ডলার। চীনে ব্যয় হয় ৩৯ লাখ ৫০ হাজার ডলার, আর বাংলাদেশে প্রতি কিলোমিটার ফোর লেন সড়ক নির্মাণে ব্যয় হয় ৬৩ লাখ ৫০ হাজার ডলার। এতে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের নামে কীভাবে অর্থ অপচয় করা হয়েছে, তা সহজেই বোধগম্য। বিগত সরকারের আমলে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিটি দপ্তর দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হয়েছিল।
সরকার প্রতিবছর রাজস্ব আদায়ের যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে দেয়, তা অর্জিত হয় না। এজন্য কাউকে জবাবদিহি করতে হয় না। ন্যাশনাল বোর্ড অব রেভিনিউ (এনবিআর) কোনো বছরই রাজস্ব আদায়ের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারে না। রাজস্ব আদায় করতে না পারলেও এনবিআরের একশ্রেণির কর্মকর্তা ‘আঙুল ফুলে কলাগাছ’ হচ্ছে। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের ট্যাক্স-জিডিপি রেশিও হওয়া উচিত অন্তত ১২ থেকে ১৫ শতাংশ। অথচ বাংলাদেশের ট্যাক্স-জিডিপি রেশিও ৭ শতাংশেরও কম। অভ্যন্তরীণ সূত্র থেকে পর্যাপ্ত পরিমাণ অর্থ সংগ্রহ করতে না পারার কারণে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের নামে উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে কঠিন শর্তে ঋণ গ্রহণ করতে হয়। অপরিকল্পিতভাবে ঋণ গ্রহণের ফলে বাংলাদেশ কার্যত ঋণগ্রস্ত দেশে পরিণত হতে চলেছে। ২০০৮ সালে বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ ছিল ২২ দশমিক ৭৯ বিলিয়ন ডলার। ২০২৫ সালে এসে তা ১১৩ দশমিক ৫১ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে। বিগত সরকারের আমলে স্থানীয়ভাবে তেল-গ্যাসের অনুসন্ধান ও উত্তোলনের পরিবর্তে বিদেশ থেকে উচ্চমূল্যে এলএনজি আমদানির প্রতি অতি আগ্রহ প্রত্যক্ষ করা গেছে।
বিগত সরকারের আমলে দেশের ব্যাংক খাতকে ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। সরকারসমর্থক ব্যবসায়ীগোষ্ঠী ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে তা ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করেছে। এমনকি বিদেশে পাচার করেছে। ব্যাংক খাত অর্থ পাচারের একটি নিরাপদ রুটে পরিণত হয়েছিল। ফলে প্রকল্প বাস্তবায়নের নামে যে ঋণ দেওয়া হতো, তা পরবর্তীকালে আর আদায় হয়নি। ফলে ব্যাংক খাত খেলাপি ঋণের ভারে জর্জরিত হয়ে পড়েছে। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করার সময় দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ২২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা, যা বর্তমানে ৫ লাখ ৪৫ হাজার কোটি টাকায় বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়েছে। এটি অবশ্য প্রদর্শিত খেলাপি ঋণের হিসাব। ঋণ হিসাব অবলোপন, ঋণ হিসাব পুনঃতফসিলিকরণ এবং মামলাধীন প্রকল্পের কাছে পাওনা অর্থ যোগ করলে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ১০ লাখ কোটি টাকা অতিক্রম করে যাবে বলে অনেকে মনে করেন।
বিগত সরকারের আমলে উন্নয়নের নামে রাষ্ট্রীয় অর্থ যেভাবে লুণ্ঠন করা হয়েছে, তা অমার্জনীয় অপরাধ। দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের মূল লক্ষ্য ছিল গণতান্ত্রিকভাবে রাষ্ট্র্র পরিচালনা করা এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য দূরীকরণের মাধ্যমে সমতাভিত্তিক সমাজ গড়ে তোলা। কিন্তু স্বাধীনতা অর্জনের পর কোনো সরকারই সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্য দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারেনি। আওয়ামী লীগ নিজেদের বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের একক কৃতিত্বের দাবিদার মনে করলেও তাদের আমলেই স্বাধীনতার মূল চেতনা সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলগুলোর সীমাহীন লুটপাটের কারণে অর্থনৈতিক বৈষম্য বেড়েছে অকল্পনীয়ভাবে। আগে পাকিস্তানের এক অঞ্চল অন্য অঞ্চলকে শোষণ করত, আর স্বাধীন বাংলাদেশে একশ্রেণি অন্য শ্রেণিকে শোষণ করছে। ১৯৭৩-৭৪ অর্থবছরে জাতীয় আয়ে সমাজের শীর্ষ ১০ শতাংশ মানুষের অংশ ছিল ২৮ শতাংশ। ২০২২-২৩ অর্থবছরে জাতীয় আয়ে এদের অংশ বেড়ে দাঁড়ায় ৪১ শতাংশে। অন্যদিকে ১৯৭৩-৭৪ অর্থবছরে জাতীয় আয়ে সমাজের সবচেয়ে দরিদ্র ১০ শতাংশ মানুষের অংশ ছিল ২ দশমিক ৮ শতাংশ, ২০২২-২৩ অর্থবছরে এসে তা কমে দাঁড়ায় ১ দশমিক ৩১ শতাংশে। এ থেকে সহজেই অনুধাবন করা যায় সমাজে আয়-বৈষম্য কীভাবে বাড়ছে।
বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে উন্নত হয়েছে ঠিকই; কিন্তু অন্যান্য সামাজিক সূচকে কি আমরা সেভাবে উন্নয়ন অর্জন করতে পেরেছি? স্বাস্থ্য, শিক্ষা, চিকিৎসা এবং অন্যান্য সামাজিক সূচকে আমরা এখনো অনেক পিছিয়ে আছি। শুধু অবকাঠামোগত খাতে উন্নয়নের মাধ্যমে দৃশ্যমান অর্থনৈতিক উন্নয়ন প্রদর্শন করলেই তাকে সঠিক উন্নয়ন বলা যায় না, যদি একইসঙ্গে সামাজিক অন্যান্য সূচকে উন্নতি অর্জিত না হয়। আর উন্নয়নের সুফল মুষ্টিমেয় সুবিধাভোগীর ভান্ডারে জমা হলে তাকে কোনোভাবেই সুষম উন্নয়ন বলা যায় না। তাই আমাদের উন্নয়নের ধারণাকে নতুন করে বিশ্লেষণ করতে হবে। একইসঙ্গে অর্জিত উন্নয়নের সুফল যাতে সবাই ন্যায্যতার ভিত্তিতে ভোগ করতে পারে, তার ব্যবস্থা করতে হবে। অন্যথায় উন্নয়ন কল্পকাহিনি হয়েই থাকবে, বাস্তবে ধরা দেবে না।
ড. আনোয়ারউল্লাহ চৌধুরী : প্রফেসর ইমেরিটাস; সাবেক উপাচার্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়; বাহরাইনে নিযুক্ত বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্র্রদূত



