উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য, কঠিন বাস্তবতা

উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য, কঠিন বাস্তবতা
কলামবাংলাদেশ

উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য, কঠিন বাস্তবতা

১২ জুলাই, ২০২৬

মুহম্মদ মাহবুব আলী [সূত্র : কালবেলা, ১২ জুন ২০২৬]

২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের একটি কৌশলগত কাঠামো রয়েছে, যার অন্তর্ভুক্ত রয়েছে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করা ও অগ্রাধিকারগুলো পুনর্বিন্যাস করা।

শাসনের মানদণ্ড: ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত ৯.৩৮ লাখ কোটি টাকার বাজেট পরিকল্পনাটি নতুন সরকারের জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।

অর্থনৈতিক অগ্রাধিকারের পরিবর্তন: এই পরীক্ষাটি অতিমাত্রায় উচ্চাকাঙ্ক্ষী প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা থেকে সরে এসে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, আর্থিক খাত পুনর্বিন্যাস এবং তীব্র মুদ্রাস্ফীতিজনিত চাপ হ্রাসের দিকে জোরালো পরিবর্তন প্রয়োজন।

 
 

মানবসম্পদ সুরক্ষা: ফলস্বরূপ, এই বিস্তারিত পরিকল্পনাটি নির্দিষ্ট সংস্কারের এমন একটি কাঠামোর সঙ্গে পুরোপুরি সংগতিপূর্ণ, যেখানে ব্যবসায় টিকে থাকা এবং মানবসম্পদ সুরক্ষার জন্য আর্থিক ভারসাম্যকে ন্যূনতম ভিত্তি হিসেবে গণ্য করা হয়।

 
 

২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য সংশোধিত হিসাব অনুযায়ী, মোট আয়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫.৯৩ লাখ কোটি থেকে ৭.০১ লাখ কোটি টাকার মধ্যে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে অনুদানসহ আয়ে প্রায় ১৮ শতাংশ বৃদ্ধির পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। কিন্তু ২০২৫-২৬ অর্থবছরের আয়ের অনুমান সম্ভবত অতি উচ্চাভিলাষী ছিল—কারণ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রকৃত রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক কম ছিল। তাই কর ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের সংস্কার ছাড়া এই লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব নয়।

 

 

বাস্তবায়ন ব্যবধান: মূলধনি ব্যয় ৪৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ২.১৫ লাখ কোটি টাকা (সংশোধিত ২০২৫-২৬) থেকে দাঁড়িয়েছে ৩.১৬ লাখ কোটি টাকায়। কিন্তু ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য প্রাথমিক উন্নয়ন বাজেট এরই মধ্যে প্রত্যাশিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১৩ শতাংশ কম ছিল, যা বাস্তবায়নের দুর্বলতা নির্দেশ করে। এত বড় বৃদ্ধি প্রকৃত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নাও বোঝাতে পারে।

 

ঋণ পরিশোধের বোঝা: দেশীয় উৎস থেকে ঋণ গ্রহণের ব্যয় এখনও ১.২৮ লাখ কোটি টাকা, যা বেসরকারি বিনিয়োগকে নিরুৎসাহিত করে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ১.২৭ লাখ কোটি টাকার সুদ পরিশোধ এখন প্রত্যাশিত আয়ের প্রায় ১৮ শতাংশ গ্রাস করে। এই পরিমাণ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে পরিশোধিত সুদের চেয়ে (১.৩৯ লাখ কোটি টাকা) কম, যা ইঙ্গিত দেয় যে, বাজেটে ঋণ পরিশোধের জন্য পর্যাপ্ত বরাদ্দ রাখা হয়নি।

 

প্রকৃত আর্থিক সংহতি নেই: কর আদায় ও ব্যয় পরিকল্পনায় দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার না করলে সরকার সম্ভবত তার ঘাটতির লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাবে, যা ঊর্ধ্বমুখী সুদের হার ও ঋণগ্রহীতার ধারাবাহিকতা বজায় রাখবে।

রাজস্ব অপ্টিমাইজেশন ও ফাঁস রোধ: কর আদায়ের ব্যবস্থা আধুনিকায়ন এবং বাণিজ্যে অবৈধ মূল্য বিকৃতি (অন্ডার-ইনভয়েসিং ও ওভার-ইনভয়েসিং উভয়ই) বন্ধ করার মাধ্যমে সরকার তার সীমিত আর্থিক স্থান রক্ষা করতে পারে।

 

 

সামাজিক নিরাপত্তা বলয় সুরক্ষা: এই আর্থিক স্থান রক্ষা করলে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও খাদ্য সহায়তার মতো প্রয়োজনীয় সামাজিক ব্যয়ের অর্থায়ন নিশ্চিত হয়, যা সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্যকে আরও প্রসারিত হওয়ার হাত থেকে রক্ষা করে।

বৈশ্বিক মূলধন উদ্দীপনা: একই সঙ্গে সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিবেশকে স্থিতিশীল করার মাধ্যমে এমন একটি সুসংহত পরিস্থিতি তৈরি হয়, যা দীর্ঘস্থায়ী পদ্ধতিগত প্রতিবন্ধকতাকে সম্ভাব্য প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগে (এফডিআই) রূপান্তর করতে সহায়তা করে। একটি শক্তিশালী বিনিয়োগ প্রণোদনা প্যাকেজের মাধ্যমে এই উদ্যোগ আরও জোরদার করা যেতে পারে।

 

 

আইনের শাসন জোরদারকরণ: এই কাঠামোকে মজবুত করতে কঠোর নিয়ন্ত্রণমূলক প্রয়োগ ব্যবস্থা জরুরি।

প্রশাসনিক ও আর্থিক অনিয়ম মোকাবিলা: কেবল কর ফাঁকিদাতাদেরই নয়, যারা শহরগুলোর বেসরকারি অ্যাপার্টমেন্ট মালিক সমিতির অবৈধ ‘প্রধান নেতা’ হিসেবে কাজ করছে—বিশেষ করে যারা সঠিক জয়েন্ট স্টক কোম্পানি (জেএসসি) নিবন্ধন বা স্বচ্ছ ব্যাংকিং লেনদেন ছাড়াই বাসিন্দাদের কাছ থেকে অবৈধ অর্থ আদায় করছে—তাদের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।

 

 

আর্থিক অসদাচরণ রোধ: একই সঙ্গে যারা ব্যাংক ঋণ খেলাপি, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া আবশ্যক। যারা ইচ্ছাকৃতভাবে সরকারি সম্পদ লুট করেছে, তাদের জন্য সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ডের বিষয়টিও বিবেচনায় আনা যেতে পারে।

স্থূল নীতি থেকে ক্ষুদ্র পর্যায়ে ত্রাণ: এই উচ্চ পর্যায়ের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা জনমূলের কাছে পৌঁছানোর জন্য মুদ্রাস্ফীতি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ এবং মাইক্রোব্যাংকিং মডেল (আলী, ২০২৫) বাস্তবায়নের সমন্বয় প্রয়োজন।

 

 

স্থিতিস্থাপক কাঠামো গঠন: এই মডেল বাস্তবায়নের মাধ্যমে প্রান্তিক ভোক্তা, কৃষিবাজার ও ক্ষুদ্র উদ্যোগগুলো তাৎক্ষণিক অর্থনৈতিক ত্রাণ এবং এই অস্থিতিশীল পুনরুদ্ধার পর্বে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক আর্থিক ব্যবস্থা লাভ করবে, তা নিশ্চিত করা যাবে।

রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা: অবস্থাকে আরও জটিল করে তুলেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) ৬ লাখ কোটি টাকার বেশি রাজস্ব সংগ্রহের বাধ্যবাধকতা—একটি উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য, যা বর্তমান অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে বাস্তবসম্মত বলে মনে হচ্ছে না।

 

 

নির্দিষ্ট পণ্যে শুল্ক হ্রাস: চাল, গম ও রান্নার তেলের মতো মৌলিক পণ্যের ওপর উৎস কর মাত্র ০.৫ শতাংশে নামিয়ে আনার সরকারের এটা অত্যন্ত প্রশংসনীয় পদক্ষেপ।

স্বাস্থ্যসেবা ভর্তুকি: একইভাবে, হার্টের স্টেন্ট ও ডায়ালাইসিস ফিল্টারের ওপর ভ্যাট বাতিলের মতো চিকিৎসা ক্ষেত্রে রেয়াত প্রশংসিত হয়েছে।

ভবিষ্যতের প্রণোদনা: এ ছাড়া, রাজস্ব নীতিতে নতুন প্রযুক্তি, স্টার্টআপ এবং সবুজ শিল্পের জন্য ক্রমোন্নতিশীল বিনিয়োগ প্রণোদনা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

 

 

ডিজিটাল অর্থনীতির সুবিধা: এই প্রণোদনাগুলো আরও জোরদার করা হয়েছে ফ্রিল্যান্স ডিজিটাল কর্মী এবং অনলাইন কনটেন্ট নির্মাতাদের পাঠানো প্রবাসী আয়ের ওপর কর ছাড়ের মাধ্যমে।

শ্রমবাজারের বৈষম্য: বেশ কয়েক বছর ধরে প্রকৃত মজুরি কমে এলেও প্রস্তাবিত নতুন বেতন কাঠামো বেসরকারি খাতের কর্মীদের জন্য আরও প্রতিকূল পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে।

 

দুর্বল আর্থিক খাত: ব্যাংকিং খাত এখনও গভীর সংকটের মধ্যে রয়েছে, যেখানে খেলাপি ঋণ (এনপিএল) ক্রমাগত বাড়ছে এবং জনগণের আস্থা সংকুচিত হচ্ছে।

লেখক: অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস অ্যান্ড টেকনোলজি (বিইউবিটি)

ট্যাগ:BCSকলামবাংলাদেশ