টেকসই কৃষির এক নতুন দিগন্ত

টেকসই কৃষির এক নতুন দিগন্ত
কলামবাংলাদেশ

টেকসই কৃষির এক নতুন দিগন্ত

১২ জুলাই, ২০২৬

ড. মো. আবদুছ ছালাম ও ড. যাকীয়াহ রহমান মনি [সূত্র : যুগান্তর, ২২ মে ২০২৬]

কৃষি বাংলাদেশে শুধু খাদ্য উৎপাদনের উৎস নয়, এটি দেশের অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, সামাজিক স্থিতিশীলতা ও সংস্কৃতির কেন্দ্রবিন্দু। অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০২৫ অনুযায়ী দেশের মোট শ্রমশক্তির প্রায় ৪৫ শতাংশ কৃষি খাতে নিয়োজিত এবং গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষ কোনো না কোনোভাবে কৃষির সঙ্গে জড়িত। কৃষি খাত জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে, তবে বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তন, মাটির উর্বরতা হ্রাস, বালাইনাশকের অতিরিক্ত ব্যবহার, নিরাপদ খাদ্যের অপ্রতুলতা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে মান নিয়ন্ত্রণের নানা চ্যালেঞ্জের মুখে। এ পরিস্থিতিতে উত্তম কৃষি চর্চা (গুড এগ্রিকালচারাল প্রাকটিসেস বা জিএপি) সময়োপযোগী পদক্ষেপ। এটি এমন একটি কৃষি ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি যা কৃষি উৎপাদনের প্রতিটি ধাপে স্বাস্থ্য, পরিবেশ, সামাজিক সুরক্ষা ও খাদ্য নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেয়।

 

জাতিসংঘ খাদ্য ও কৃষি সংস্থাকে (এফএও) কৃষিজ পণ্যের উৎপাদন, প্রক্রিয়াকরণ ও বিপণনের প্রতিটি ধাপে খাদ্যের নিরাপদতা, পরিবেশ সংরক্ষণ, কর্মীর স্বাস্থ্য ও কল্যাণ এবং পণ্যের গুণগত মান নিশ্চিত করার পদ্ধতি হিসাবে সংজ্ঞায়িত করেছে। সরকার নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন, পরিবেশ সংরক্ষণ, কৃষকের কল্যাণ ও আয় বৃদ্ধিকে লক্ষ্য করে ‘বাংলাদেশ উত্তম কৃষি চর্চা নীতিমালা’ প্রণয়ন করেছে। জিএপি ফসলের প্রাথমিক উৎপাদনের একটি স্ট্যান্ডার্ড। যা পৃথিবী বিভিন্ন দেশে নিজস্ব আইনবিধির মাধ্যমে প্রণয়ন করা হয়েছে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে আঞ্চলিক বা বিশ্বব্যাপীও প্রণীত হয়েছে। বাংলাদেশেও এ স্ট্যান্ডার্ড প্রণীত হয়েছে যা কৃষি খাতে একটি ইতিবাচক পরিবর্তন রাখতে সক্ষম।

 

 

বাংলাদেশে জিএপি-এর ধারণা নতুন হলেও এটি বাস্তবায়নের জন্য বাংলাদেশে একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তোলা হয়েছে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (বিএআরসি) বাংলাদেশ জিএপির স্কিমওনার হিসাবে দায়িত্ব পালন করছে এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই) বাংলাদেশে এগ্রিকালচারাল সার্টিফিকেশন বডি (বিএসিবি) হিসাবে দায়িত্ব পালন করছে। এ কাঠামোর আওতায় বাংলাদেশ জিএপি স্ট্যান্ডার্ড প্রণয়ন করা হয়েছে যা বিএসটিআই কর্তৃক জাতীয় মান (বিডিএস ২০২৫:২০২৩) হিসাবে অনুমোদিত হয়েছে। এ ছাড়া বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (বিএআরসি) বাংলাদেশ জিএপি-এর সার্টিফিকেশন মার্কস/লোগো প্রস্তুত করেছে, যা কৃষি মন্ত্রণালয় কর্তৃক অনুমোদিত হয়েছে এবং শিল্প মন্ত্রণালয় হতে ট্রেডমার্ক রেজিস্ট্রেশনের প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

 

 

বাংলাদেশে জিএপি বাস্তবায়নের অংশ হিসাবে বিশ্বব্যাংক অর্থায়িত Program on Agricultural and Rural Transformation for Nutrition, Entrepreneurship, and Resilience in Bangladesh (PARTNER) প্রোগ্রামের মাধ্যমে জিএপি বাস্তবায়নে মাঠপর্যায়ে কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এ প্রকল্পের আওতায় ১৫টি গুরুত্বপূর্ণ ফসলের জন্য ফসলভিত্তিক জিএপি প্রোটোকল তৈরি করা হয়েছে এবং কৃষকদের মাধ্যমে তা মাঠপর্যায়ে মূল্যায়ন করা হচ্ছে। জিএপি প্রোটোকল প্রণয়নে মাঠপর্যায়ে জিএপি মূল্যায়নের জন্য ফসল ও এলাকা নির্বাচনের ক্ষেত্রে মাঝারি থেকে অধিক উৎপাদিত হ্যাজার্ডমুক্ত এলাকা, রপ্তানির সুযোগ, বাজার সংযোগ, উদ্যোগী/প্রগতিশীল কৃষক এবং বছরব্যাপী উৎপাদন, সংরক্ষণকাল, দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা ইত্যাদি বিবেচনা করা হয়েছে।

 

 

 

মাঠপর্যায়ে মূল্যায়নের লক্ষ্যে নির্বাচিত ফসলগুলোর মধ্যে রয়েছে ৫টি ফল-আম, কাঁঠাল, পেয়ারা, আনারস, জারালেবু এবং ১০টি সবজি-বেগুন, বরবটি, লাউ, পটোল, কাঁচা পেঁপে, আলু, কচুরলতি, বাঁধাকপি, চিচিঙ্গা, করলা। এ ফসলগুলো দেশীয় চাহিদা ও রপ্তানি উভয় ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ। রাজশাহী, যশোর, খুলনা, গাজীপুর, নরসিংদী, কুমিল্লা, বগুড়া, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, টাঙ্গাইল ও সিলেটসহ বিভিন্ন জেলায় ফসলভিত্তিক উৎপাদন জিএপি মূল্যায়ন কার্যক্রম শুরু হয়েছে। কৃষকদের প্রশিক্ষণ, জিএপি রেকর্ডবুক সরবরাহ, প্রক্রিয়াকরণ ও বিপণন ব্যবস্থার উন্নয়নের কাজও চলমান রয়েছে।

 

 

 

জিএপি বাস্তবায়নকে সফল ও টেকসই করতে হলে কৃষক প্রশিক্ষণ ও সক্ষমতা বাড়ানো অত্যন্ত জরুরি। কৃষি সম্প্রসারণ কর্মসূচিতে জিএপি প্রশিক্ষণকে মূলধারায় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। একইসঙ্গে গণমাধ্যম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভোক্তা সচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন, যাতে নিরাপদ খাদ্যের চাহিদা বাড়ে এবং জিএপি বাস্তবায়নে কৃষকের আগ্রহ সৃষ্টি হবে। পাশাপাশি আঞ্চলিক পর্যায়ে পরীক্ষাগার, প্যাকহাউস ও কোল্ড চেইন অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে।

 

 

জিএপি পণ্যের জন্য আলাদা বাজার ও প্রিমিয়াম মূল্য নির্ধারণের মাধ্যমে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করা সম্ভব। আন্তর্জাতিক বাজারে জিএপি পণ্যের প্রচার ও রপ্তানি প্রমোশন বাড়ালে বাংলাদেশের কৃষিপণ্য বৈশ্বিক বাজারে শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারবে। এ ছাড়া নীতিগত সমন্বয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কৃষি সম্প্রসারণ, নিরাপদ খাদ্য, রপ্তানি প্রমোশন ও পরিবেশ সংরক্ষণের মধ্যে সমন্বিত নীতিমালা প্রণয়ন জরুরি। জিএপি বাস্তবায়নে ডিজিটাল ট্রেসেবিলিটি ব্যবস্থা চালু করলে উৎপাদন থেকে বাজার পর্যন্ত পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণ সহজ হবে; এতে ক্রেতার আস্থা বাড়বে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে।

 

 

জিএপি শুধু একটি উৎপাদন পদ্ধতি নয়, এটি জনস্বাস্থ্যের সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত। বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (বিএফএসএ) ও বিএসটিআই-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই-এপ্রিল সময়ে পরীক্ষিত ১ হাজার ৭৫৬টি নমুনার মধ্যে প্রায় ৩৩.৪ শতাংশে ভেজাল বা দূষণ পাওয়া গেছে। অনেক খাদ্যে নিষিদ্ধ রাসায়নিক, কীটনাশক, ভারী ধাতু (সিসা, আর্সেনিক, ক্রোমিয়াম) এবং অ্যান্টিবায়োটিকের উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে। বিআইডিএসের গবেষণায় দেখা যায়, একটি পরিবারের গড়ে প্রতি মাসে চিকিৎসা ব্যয় ৩ হাজার ৪৫৪ টাকা, যা পরিবারের মোট ব্যয়ের ১১ শতাংশ।

 

 

 

দরিদ্র পরিবারগুলোর মোট আয়ের প্রায় ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত চিকিৎসা ব্যয়ে চলে যাচ্ছে। ধনী পরিবারের ক্ষেত্রে এ হার মাত্র ৫ শতাংশ। শহরাঞ্চলের পরিবারগুলো গড়ে মাসে ৪ হাজার ১৯২ টাকা চিকিৎসায় ব্যয় করছে, যেখানে গ্রামে এ ব্যয় ৩ হাজার ১০৯ টাকা। ক্যানসার আক্রান্ত রোগীদের হাসপাতালে চিকিৎসায় গড়ে ব্যয় হয় প্রায় ২ লাখ ২৪ হাজার টাকা। হৃদরোগে গড়ে প্রায় ১ লাখ টাকা ও কিডনি রোগে প্রায় ৬৩ হাজার টাকা ব্যয় হয়। চিকিৎসক ও গবেষকদের মতে, ভেজাল খাদ্য শুধু স্বল্পমেয়াদি অসুস্থতা নয়, দীর্ঘমেয়াদে ক্যানসার, কিডনি রোগ, ডায়াবেটিস ও লিভার বিকল হওয়ার মতো মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভেজাল খাদ্যের কারণে দেশে প্রতিবছর লক্ষাধিক মানুষ বিভিন্ন জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছে।

 

 

রাসায়নিক ও বিষমুক্ত পণ্য মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়, খাদ্যজনিত রোগ কমায় এবং পুষ্টিকর খাদ্য সরবরাহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। একইসঙ্গে এটি পরিবেশের ওপর চাপ কমায় এবং কৃষিতে টেকসই উৎপাদনব্যবস্থা গড়ে তোলে। মানসম্মত ও নিরাপদ খাদ্য আমাদের সরবরাহের অন্যতম চ্যালেঞ্জ। এ প্রেক্ষাপটে জিএপি একটি কার্যকর, টেকসই ও রপ্তানিমুখী কৃষির কৌশল হিসাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। জিএপি সঠিক বাস্তবায়নের মাধ্যমে কৃষকের আয় বাড়বে, ভোক্তা নিরাপদ খাদ্য পাবে, পরিবেশ রক্ষা পাবে এবং বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক বাজারে একটি শক্তিশালী কৃষিপণ্য রপ্তানিকারক দেশে পরিণত হতে পারবে। নিরাপদ খাদ্য শুধু ভোক্তার দাবি নয়, এটি একটি জাতীয় দায়িত্ব। জিএপি বাস্তবায়নের মাধ্যমে একটি টেকসই, প্রতিযোগিতাক্ষম ও নিরাপদ নতুন কৃষি দিগন্তের সূচনা করা সম্ভব।

 

 

 

ড. মো. আবদুছ ছালাম : নির্বাহী চেয়ারম্যান ও আহ্বায়ক, জিএপি ইউনিট, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল

ড. যাকীয়াহ রহমান মনি : পরিচালক (পুষ্টি) ও সদস্য সচিব, জিএপি ইউনিট, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল

ট্যাগ:BCSকলামবাংলাদেশ