স্বাধীনতার ঘোষক থেকে রাষ্ট্রনায়ক

স্বাধীনতার ঘোষক থেকে রাষ্ট্রনায়ক
কলামবাংলাদেশ

স্বাধীনতার ঘোষক থেকে রাষ্ট্রনায়ক

১২ জুলাই, ২০২৬

ফয়সাল আকবর [সূত্র : যুগান্তর, ০৮ জুন ২০২৬]

আধুনিক সময়ে বিশেষ করে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্তির সংগ্রাম, পাকিস্তান পর্বে অধিকারের আন্দোলন এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের পথে বেশ কয়েকজন সমসাময়িক রাজনৈতিক নেতৃত্ব অসামান্য অবদান রেখেছেন। তাদের মধ্যে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এক ব্যতিক্রমী ব্যক্তিত্ব। প্রকৃতপক্ষে তিনি ছিলেন দক্ষ ও অসীম সাহসের অধিকারী এক সামরিক কর্মকর্তা; কিন্তু ইতিহাসে তিনি শুধু একজন দক্ষ সেনানায়কই নয়। তার জীবনের পরতে পরতে রয়েছে অসাধারণ বীরত্ব, দেশপ্রেম এবং নেতৃত্বের ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত। এ অঞ্চলের তথা উপমহাদেশের দুটি গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধে বীরোচিত অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি দুবার অর্জন করেছেন দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সামরিক পদক।

 
 
 

শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের যুদ্ধের ময়দানের বীরত্ব, অসীম দেশপ্রেম, অনন্য নেতৃত্বগুণ এবং রাষ্ট্রনায়কোচিত প্রজ্ঞার অপূর্ব সমন্বয় আমরা তার চারটি স্বীকৃতি তথা সম্মাননায় খুঁজে পাই। শহীদ জিয়াউর রহমানকে জানতে সেই চারটি স্বীকৃতি বা সম্মাননার নেপথ্যের ইতিহাস, তাৎপর্য এবং অন্তর্নিহিত গুরুত্বের নির্মোহ বিশ্লেষণ আমাদের সবার জানা উচিত।

 

 

এক. হিলাল-ই-জুরাত : ডিফেন্ডার অব লাহোর

ব্রিটিশ শাসনোত্তর পাকিস্তান ও ভারতের বিবাদ-সংঘর্ষ-যুদ্ধ ছিল এক অনিবার্য বাস্তবতা। সিরিল র‌্যাডক্লিপের কূটচালে এ বাস্তবতা তৈরি হয়ে গিয়েছিল ১৯৪৭ সালেই। ফলে ঔপনিবেশিক শাসন অবসানের মাত্র দেড় যুগের মধ্যেই পাকিস্তান ও ভারত এক সর্বাত্মক যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। সেই যুদ্ধে শুরুর দিকে রণকৌশলগতভাবে ভারত বেশ এগিয়ে যায় এবং ভারতের তৎকালীন সেনাপ্রধান জয়ন্ত নাথ চৌধুরী অনেকটাই দম্ভ করে লাহোর দখলের ঘোষণা দেয়। ভারতীয় সেনাবাহিনীর সেই ঘোষণাকে দুঃস্বপ্নে পরিণত করার নেপথ্যে যে কয়েকজন সেনা কমান্ডো অসামান্য ভূমিকা রাখেন তার মধ্যে জিয়াউর রহমান অন্যতম। যুদ্ধে অংশ নিয়ে তিনি এবং তার ব্যাটালিয়ন ভারতীয় সেনাবাহিনীর অগ্রযাত্রায় সাহসী প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। মূলত ক্যাপ্টেন জিয়া ও তার ব্যাটালিয়ন লাহোরের খেমকারান ফ্রন্টে ভারতীয় আক্রমণের জবাবে পালটা আক্রমণ শুরু করে। ক্যাপ্টেন জিয়ার রণকৌশল, নেতৃত্ব এবং সাহসিকতার ফলে ভারতের বাহিনীর অগ্রযাত্রা থেমে যায় এবং এ যুদ্ধে ভারতীয় সেনাবাহিনী অসংখ্য ট্যাঙ্ক হারায়। যুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা ও অসীম সাহসিকতা প্রদর্শনের জন্য জিয়াউর রহমানকে পাকিস্তানের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সামরিক সম্মাননা ‘হিলাল-ই-জুরাত’ প্রদান করা হয়। উল্লেখ্য, পাকিস্তানের সর্বোচ্চ সামরিক পদক ‘নিশান-ই-হায়দার’, যা এ পর্যন্ত ১০ জন পেলেও তারা কেউ জীবিত ছিলেন না। সে হিসাবে বলা যায়, হিলাল-ই-জুরাত এখন পর্যন্ত পাকিস্তানের সর্বোচ্চ সামরিক পুরস্কার যা জীবিতদের দেওয়া হয়।

 

 

দুই. বীরউত্তম জিয়া : মুক্তিযুদ্ধের ব্যতিক্রম কমান্ডার

 

জিয়াউর রহমান একজন খুবই ব্যতিক্রম সামরিক কর্মকর্তা যিনি কিনা দুটি যুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ অবদান রেখে সর্বোচ্চ সম্মাননা লাভ করেছেন। পুরো বিশ্বের ইতিহাসে এমন সামরিক কর্মকর্তা একেবারে নগণ্য। যে কয়েকজন আলোচনায় আসে তাদের মধ্যে বাংলাদেশের জিয়াউর রহমান, যুক্তরাষ্ট্রের স্মেডলি বাটলার, যুক্তরাজ্যের আর্থার মার্টিন লিক এবং নিউজিল্যান্ডের চার্লস উপহাম সবচেয়ে বেশি আলোচিত। ১৯৬৫ সালে পাকিস্তানের হয়ে ‘হিলাল-ই-জুরাত’ অর্জনকারী মেজর জিয়া ১৯৭১ সালে সেই পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বীরোচিত ভূমিকা রেখে লাভ করেছেন ‘বীরউত্তম’ সম্মাননা। এটি বাংলাদেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বীরত্বসূচক সামরিক পদক হলেও জীবিত কর্মকর্তাদের প্রদেয় হিসাবে করলে এটিই সর্বোচ্চ পদক। তিনি প্রথমে বাংলাদেশের পক্ষ হয়ে ‘উই রিভোল্ট’ ঘোষণা দিয়ে বিদ্রোহ করলেন। তারপর মুক্তিযুদ্ধের একটি সেক্টরের নেতৃত্ব দিলেন। যুদ্ধের রণকৌশলে গতি আনতে গঠন করলেন ব্রিগেড ফোর্স। তার প্রতিষ্ঠিত ‘জেড ফোর্স’ ছিল মুক্তিযুদ্ধের সবচেয়ে কার্যকর ব্রিগেড ফোর্স।

 

 

তিন. স্বাধীনতার ঘোষণা : বাংলাদেশের প্রথম অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি

 

২৬ মার্চের স্বাধীনতার ঘোষণা ছিল বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। সেই তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনার মূল নায়ক হচ্ছেন মেজর জিয়াউর রহমান। তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর প্রথম বাঙালি অফিসার যিনি পাকিস্তান সরকারের আনুগত্য অস্বীকার করে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেন। সেই ঘোষণায় তিনি সুস্পষ্টভাবে বলেন, Dear fellow freedom fighters, "I, Major Ziaur Rahman, Provisional President and Commander-in- Chief of Liberation Army do hereby proclaim independence of Bangladesh and appeal for joining our liberation struggle. Bangladesh is independent. We have waged war for the liberation of Bangladesh. Everybody is requested to participate in the liberation war with whatever we have. We will have to fight and liberate the country from the occupation of Pakistan Army. Inshallah, victory is ours. "

 

 

পরের দিন অর্থাৎ ২৭ মার্চ স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করে মেজর জিয়া আবার স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। সেই ঘোষণায় তিনি বলেন, "I, Major Zia, provisional commander-in-chief of the Bangladesh liberation army, hereby proclaim, on behalf of Sheikh Mujibur Rahman, the independence of Bangladesh. I, also declare, we have already formed a sovereign, legal government under Sheikh Mujibur Rahman which pledges to function as per law and the constitution. The new democratic government is committed to a policy of non-alignment in international relations. It will seek friendship with all nations and strive for international peace.I app eal to all governments to mobilize public opinion in their respective countries against the brutal genocide in Bangladesh."

 

 

পরে ২৮-৩০ মার্চ তারিখে মেজর জিয়াউর রহমান একাধিকবার নিজেকে অস্থায়ী রাষ্ট্রপ্রধান হিসাবে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। ফলে সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে আশা ও উদ্দীপনার সৃষ্টি হয়। মুক্তিকামী জনতা স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য উদগ্রীব হয়ে ওঠে।

 

 

৪. রাষ্ট্রনায়ক

একটি রাষ্ট্রের অগ্রযাত্রার নেপথ্যে মূল ভূমিকা রাখতে পারে একমাত্র রাষ্ট্রনায়ক। স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে ক্ষমতার পালাবদলে অনেকে সরকারপ্রধান বা রাষ্ট্রপ্রধান হিসাবে ক্ষমতায় আসীন থাকলেও রাষ্ট্রনায়োকচিত ভূমিকা কেউ রাখতে পারেনি। একমাত্র জিয়াউর রহমানই সেক্ষেত্রে রাষ্ট্রনায়কোচিত ভূমিকা রেখেছিলেন। তার রাষ্ট্রনায়কোচিত ভূমিকার প্রধান সাফল্য হচ্ছে-বহুদলীয় গণতন্ত্রের পুনরুজ্জীবন। ১৯৭৫ সালের চরম অস্থিতিশীল সময়ে তিনি ক্ষমতায় এসে শেখ মুজিবের বাকশালী শাসনকে প্রত্যাখ্যান করে গণতন্ত্রের দরজা উন্মুক্ত করেন। তার হাত ধরে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’ আদর্শ। তিনি পররাষ্ট্রনীতিকে ‘জোট-নিরপেক্ষতা’ নীতিতে পরিচালিত করে বাংলাদেশকে প্রথমবারের মতো জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে অস্থায়ী সদস্য নির্বাচিত হওয়ার অবস্থানে নিয়ে গিয়েছিলেন। মূলত, রাষ্ট্রগঠন প্রক্রিয়ায় অসামান্য অবদান, জনবান্ধব কর্মসূচি শহীদ জিয়াউর রহমানকে সফল রাষ্ট্রনায়ক হিসাবে চিরস্মরণীয় করে রেখেছে।

 

 

ফয়সাল আকবর : রাজনৈতিক বিশ্লেষক; সাবেক সহকারী অধ্যাপক, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি

ট্যাগ:BCSকলামবাংলাদেশ