
সুশাসন ও ন্যায়পাল
ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ [সূত্র : দেশ রূপান্তর, ১৬ মে ২০২৬]
মানবসমাজে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের সূচনা, বিকাশ-বিবর্তন ঘটেছে শুদ্ধাচারের প্রতি আকিঞ্চন আকাক্সক্ষা ও দায়বদ্ধতা থেকে। শান্তি ও শৃঙ্খলার স্বার্থে, সহযোগিতা-সহমর্মিতার স্বার্থে, ন্যায়নীতিনির্ভরতার স্বার্থে ও তাগিদে সুশাসনকে অগ্রগণ্য সাব্যস্ত করা হয়েছে। ন্যায়নীতিনির্ভরতার মূল্যবোধ যে সমাজে যত বেশি বিকশিত, পরিপালিত, অনুসৃত হয়েছে সে সমাজ তত সাফল্যের শিখরে পৌঁছাতে পেরেছে। বিপরীত অবস্থায় বিপন্ন বিপর্যস্ত হয়েছে বহু সমাজ ও সম্প্রদায়। পঞ্চান্নে পা রাখা বাংলাদেশে, সর্ববিধ বিচার-বিবেচনায় ভৌত অবকাঠামোগত উন্নতির চমক দেখানোর বিপরীতে নিরাপত্তা হেফাজতে মৃত্যু, রাজপথে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে এবং ক্ষেত্র বিশেষে তাদেরও বেপরোয়া আচরণ, বিদেশে বিপুল অর্থপাচারের মতো সিন্ডিকেটের আস্ফালন চলেছে।
সর্বত্রগামী দুর্নীতির অগ্রযাত্রায় অর্থনীতির সমূহ সর্বনাশ সাধন, সেবাধর্মী সরকারি প্রতিষ্ঠানে দুর্নীতির প্রতিকার না পাওয়ার মতো বিষয়গুলো দিন দিনই সাধারণ মানুষকে যাতে আরও উদ্বিগ্ন করে না তোলে, কিংবা কোনো কোনো ক্ষেত্রে কার্যকলাপ জবাবদিহির বাইরে চলে যাওয়ার মতো ঘটনার প্রতিকার পেতে একজন সাংবিধানিক ন্যায়পালের আবশ্যকতা উঠে আসছে। সংবিধান বিশেষজ্ঞরা অভিমত প্রকাশ করছেন, ন্যায়পাল সরকারের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করবে, সরকারি প্রতিষ্ঠানকে আনবে জবাবদিহির মধ্যে, একজন ন্যায়পাল থাকলে সরকারকে মুখোমুখি হতে হবে না অনেক বিব্রতকর পরিস্থিতিরও। মানুষ বিশ^াসের বিশে^ বাস করে। পরস্পরের প্রতি আস্থায় বিশ্বাসের ভিত রচিত হয়।
আস্থার সংকট তৈরি হলে পরাধীনতার প্রতিভু হয়ে দাঁড়ায় সহমত সহ-অবস্থানের। ঔপনিবেশিক শাসন, প্রশাসন যন্ত্রের যাবতীয় অন্যায় অনিয়ম ও শোষণ-বঞ্চনা রহিত সুশাসন সদাচারী সমাজ বিনির্মাণের আকাক্সক্ষা থেকেই ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগ এবং ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের লাখো নিযুতের রক্তত্যাগের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। ২০২৪-এর জুলাই-আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানও ছিল শোষণহীন সমাজ ও স্বৈরাচারমুক্ত সুশাসিত স্বদেশ প্রতিষ্ঠা। সুশাসন প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশের সংবিধানের অনন্য বৈশিষ্ট্যগুলোর একটি হলো, ন্যায়পালের বিধান।
প্রশাসনের অনিয়ম অব্যবস্থা দূর করতে সংবিধানে ন্যায়পালের বিষয়টি সংস্থাপিত হয়। ন্যায়পালের সহযোগিতায় সরকার শুদ্ধাচারের অনুশীলন নিয়ে এগিয়ে যেতে পারবে। একটি উন্নত রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশকে গড়ে উঠতে অব্যবস্থা, অনিয়ম এবং দুর্নীতি দূর করার জন্য জাতীয় পর্যায়ে সম্মিলিত প্রয়াস প্রয়োজন। এটা তখনই সৃষ্টি হতে পারে, যখন এই প্রয়াসে সব শ্রেণি ও পেশার মানুষ শামিল হবে। পৃথিবীর বহু রাষ্ট্রে ন্যায়পাল নিয়োগের মাধ্যমে গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করা হয়েছে। ন্যায়পাল ধারণাটি প্রথমবারের মতো সুইডেনে প্রকাশিত হয়, যার আভিধানিক অর্থ হলো ‘মুখপাত্র’ বা ‘প্রতিনিধি’। সহজ ভাষায় বললে বলতে হয়, ন্যায়পাল হলো এমন একজন ব্যক্তি, যিনি অন্যের জন্য কথা বলেন ও অন্যের স্বার্থকে প্রতিনিধিত্ব করেন।
কোনো কর্মকর্তা যদি নিজের সিদ্ধান্তকে বিধিসম্মত ও আইনানুগ বলে দাবি জানিয়ে ন্যায়পাল প্রদত্ত সুপারিশ প্রত্যাখ্যান করেন, সেক্ষেত্রে ন্যায়পাল বিষয়টি স¤পর্কে আইনসভা কিংবা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীর কাছে রিপোর্ট করতে পারেন। দেশের প্রচলিত আইন ও বিধিগুলোর ত্রুটি নির্দেশ করার অধিকারও তার এখতিয়ারভুক্ত। আমাদের দেশে ১৯৮০ সালে সংবিধানের আলোকে ন্যায়পাল আইন গৃহীত হলেও, এখনো ন্যায়পাল প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা বা প্রবর্তিত হয়নি। প্রসঙ্গত, বাংলাদেশে ২০০৫ সালে ‘কর ন্যায়পাল আইন’ গৃহীত হয়।
কর ন্যায়পাল বিল পাসের প্রস্তাব করে সংসদে সে সময় বলা হয়েছিল, কর ন্যায়পাল প্রতিষ্ঠিত হলে মানুষ কর নিয়ে বিদ্যমান ভীতি থেকে রেহাই পাবে। মানুষ আরও কর দিতে উৎসাহিত হবে। কর আদায়ে হয়রানি রোধেও কর ন্যায়পাল ভূমিকা রাখতে পারবে বলে ওই সময় পাস হওয়া আইনটিতে বলা হয়। মাত্র ছয় বছর পর সংসদে কর ন্যায়পাল (রহিত করণ) বিল, ২০১১ পাসের মধ্য দিয়ে কর ন্যায়পাল পদ ও তার যাবতীয় কাজ রহিত করা হয়। ‘বর্তমানে সরকার কর আদায়ে মানুষকে নানাভাবে উৎসাহিত করার উদ্যোগ নেওয়ায় এ ধরনের ব্যয়সাধ্য প্রতিষ্ঠানের আর কোনো প্রয়োজন নেই। মানুষকে বোঝানো গেছে, প্রত্যেককেই কর দেওয়া উচিত। গত দুবছরে ২ লাখ করদাতা বেড়েছে। তাই করন্যায়পাল বাতিল করা দরকার।’
তখন এটাও বলা হয়েছিল কর, ভ্যাট ও শুল্ক-সম্পর্কিত আইনের সঙ্গে ন্যায়পাল আইনটি সাংঘর্ষিক হওয়ায় মন্ত্রিসভা সেটি রহিতকরণের প্রস্তাব অনুমোদন করে। সে মর্মে সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সুপারিশসহ বিলটি সংসদে উত্থাপন করলে বিরোধী দলের অনুপস্থিতিতে তা কণ্ঠভোটে পাস হয়। পাঁজি-পুঁথিতে দেখা যায়, কর ন্যায়পাল কার্যালয়ে ২০০৬ সালে ১০টি, ২০০৭ সালে ১১৯টি, ২০০৮ সালে ২৪১টি ও ২০০৯ সালে ৩৫৫টি অভিযোগ দায়ের করা হয়েছিল। ‘প্রয়োজনের’ তাগিদেই কর ন্যায়পাল পদ তৈরি হয়েছিল আবার ‘প্রয়োজন নেই’ মনে করেই বাল্য বয়সে এটি বিলুপ্ত করা হয়। প্রয়োজন, অপ্রয়োজনের হিসাব-নিকাশটি যুক্তিযুক্ততার নিরীখে দেখতে গেলে প্রণিধানযোগ্য হয়ে উঠবে যে, দেশে কর রাজস্ব প্রদান ও আহরণের সংস্কৃতিকে বলবান ও বেগবান করতে সুশাসিত পরিবেশ ও প্রেক্ষাপট নির্মাণের বিকল্প নেই।



