শিক্ষা কমিশন গঠন এখন সময়ের দাবি

শিক্ষা কমিশন গঠন এখন সময়ের দাবি
কলামবাংলাদেশ

শিক্ষা কমিশন গঠন এখন সময়ের দাবি

২৫ জুলাই, ২০২৬

প্রফেসর ড. আনোয়ার উল্লাহ চৌধুরী [প্রকাশ : বাংলাদেশ প্রতিদিন, ২৫ জুলাই ২০২৬]

ব্যাপক কোনো পরিবর্তন পরিমার্জন ছাড়াই গত ৩০ জুন জাতীয় সংসদে ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট অনুমোদিত হয়েছে। নতুন সরকারের এটাই প্রথম বাজেট। বাজেটে শিক্ষা খাতের জন্য ব্যয় বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬০৬ কোটি টাকা, যা মোট বাজেটের ১৪ দশমিক ০৫৬ শতাংশ এবং জিডিপির ২ দশমিক ১ শতাংশ। গত অর্থবছরে (২০২৫-২৬) শিক্ষা খাতে প্রাথমিকভাবে বাজেট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল ৯৫ হাজার ৬৪৪ কোটি টাকা, যা ছিল মোট বাজেটের ১২ দশমিক ১১ শতাংশ এবং জিডিপির ১ দশমিক ৩৯ শতাংশ। পরে বাজেট বরাদ্দ সংশোধন করে ৮৭ হাজার কোটি টাকায় নামিয়ে আনা হয়েছিল। ইউনেস্কোর মতে, একটি দেশের শিক্ষা খাতে মোট জিডিপির অন্তত ৬ শতাংশ ব্যয় বরাদ্দ করা আবশ্যক। নিকট অতীতে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে পরিকল্পিতভাবে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যওয়া হয়েছিল। বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা এমন একটি প্রজন্ম তৈরি করছে, যারা আন্তর্জাতিকভাবে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে সক্ষম নয়। বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা আত্ম-অহমিকাপূর্ণ বেকার তৈরি করছে। এরা সার্টিফিকেটধারী উচ্চশিক্ষিত হলেও কার্যত তারা ‘অর্ধশিক্ষিত’। এই মুহূর্তে শিক্ষাব্যবস্থাকে এমনভাবে ঢেলে সাজাতে হবে যেন বিশ্ব মানদণ্ডে চ্যালেঞ্জ গ্রহণের মতো একটি প্রজন্ম গড়ে উঠতে পারে।

 

 

শিক্ষা একটি জাতির মেরুদণ্ড। মেরুদণ্ডহীন প্রাণী যেমন শিরদাঁড়া উঁচু করে দাঁড়াতে পারে না, তেমনি অশিক্ষিত মূর্খ জাতি কখনোই বিশ্বদরবারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারে না। বর্তমান আধুনিক বিশ্ব অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠেছে। সেখানে টিকে থাকতে হলে অবশ্যই জাতিকে গুণগত মানসম্পন্ন উপযুক্ত শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে গড়ে উঠতে হবে। শিক্ষা মানুষের সুপ্ত সৃজনশীল প্রতিভা বিকশিত করে, যা তাকে প্রতিযোগিতায় সক্ষম করে গড়ে তোলে। অনেকেই বলেন, বর্তমান যুগ অস্ত্র প্রতিযোগিতার যুগ। মনে রাখতে হবে, অস্ত্র তৈরি এবং তার সঠিক ব্যবহারের জন্যও আধুনিক এবং বিজ্ঞানসম্মত জ্ঞানের প্রয়োজন হয়। শিক্ষায় পিছিয়ে পড়া কোনো জাতি অস্ত্র প্রতিযোগিতায় হোক আর জ্ঞানের পরাকাষ্ঠা প্রদর্শনের ক্ষেত্রেই হোক সফল হতে পারে না। পৃথিবীতে এমন একটি জাতিও দেখানো যাবে না, যারা জ্ঞানার্জনকে অবহেলা করে বিশ্বদরবারের মর্যাদার আসনে আসীন হতে পেরেছে। সেই জ্ঞান আপনা-আপনি অর্জিত হয় না; নিরন্তর সাধনার মাধ্যমে তা অর্জন করতে হয়। জ্ঞানার্জন একটি কঠিন কাজ বটে। দুঃখজনক হলেও সত্যি যে দেশের অধিকাংশ শিক্ষার্থীর মাঝে জ্ঞানার্জনের চেয়ে সার্টিফিকেট লাভের প্রতিই বেশি আগ্রহ লক্ষ করা যায়। তাদের উদ্দেশ্য- যেনতেনভাবে উচ্চশিক্ষার সার্টিফিকেট জোগাড় করে কর্মক্ষেত্রে ঝাঁপিয়ে পড়া। কিন্তু তারা ভুলে যান, কর্মক্ষেত্রে সফল হতে হলেও জ্ঞানের প্রয়োজন। শুধু সার্টিফিকেট দিয়ে সেখানে সফল হওয়া যায় না। বিদ্যমান শিক্ষা কার্যক্রম আধুনিকায়ন ও যুগোপযোগী করার জন্য উচ্চপর্যায়ের একটি শিক্ষা কমিশন গঠন করা এখন সময়ের দাবিতে পরিণত হয়েছে।

 

 

 

বাংলাদেশের বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা মোটেও সময়ের চাহিদা পূরণের উপযোগী নয়। বিভিন্ন সময় বেশ কয়েকটি শিক্ষা কমিশন গঠিত হয়েছে। তারা শিক্ষার মানোন্নয়নে নানা সুপারিশ করেছে কিন্তু সেই সব সুপারিশের সামান্যই বাস্তবায়িত হয়েছে। বিভিন্ন সময় গঠিত শিক্ষা কমিশন যেসব সুপারিশ করেছে, তার অন্যতম হচ্ছে শিক্ষা খাতে বাজেট বরাদ্দ বাড়ানো। কিন্তু অতীতে কোনো সরকারই এ ব্যাপারে কার্যকর ও বাস্তবধর্মী পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি। শিক্ষা খাতের জন্য প্রতি বছর বাজেটে যে অর্থ বরাদ্দ করা হয়, তার একটি বড় অংশই ব্যয় করা হয় অবকাঠামোগত উন্নয়ন কাজে। ফলে গবেষণা ও উদ্ভাবনী ব্যয় করার জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণ অর্থ পাওয়া যায় না।

 

 

অর্থাভাবে অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গবেষণাগার স্থাপন করা সম্ভব হয় না। ১৯৯১-১৯৯৬ সময়ে তদানীন্তন সরকার বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের জন্য আইন প্রণয়ন করে। শিক্ষাবিদদের একটি প্রতিনিধিদল তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বেসরকারি খাতে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের যৌক্তিকতা উপস্থাপন করলে তিনি এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণের আশ্বাস দেন। প্রতিনিধিদলে আমিও অন্তর্ভুক্ত ছিলাম। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের উদ্যোগ গ্রহণের মূল কারণ ছিল শিক্ষা কার্যক্রম বিস্তৃতকরণ এবং উচ্চশিক্ষা পর্যায়ে কোনো শিক্ষার্থী ভর্তি হতে না পারার কারণে যেন তার শিক্ষাজীবন বাধাগ্রস্ত না হয়। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশর শিক্ষাব্যবস্থায় নবদিগন্তের সূচনা করেছিল।

 

 

কিন্তু পরবর্তী সময়ে প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ না করেই একান্ত রাজনৈতিক বিবেচনায় ব্যাঙের ছাতার মতো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের অনুমোদন দানের কারণে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের মহৎ উদ্দেশ্য বিঘ্নিত হয়েছে। বর্তমানে অধিকাংশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় অনেকটা ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়েই উপযুক্ত শিক্ষক এবং শিক্ষার পরিবেশ নেই। মুনাফা অর্জনই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শ্রেণির উদ্যোক্তার মূল উদ্দেশ্যে পরিণত হয়েছে। সব পর্যায়ে শিক্ষার মান নিশ্চিত করার জন্য উদ্যোগ নিতে হবে। এজন্য শিক্ষা খাতের বাজেট বরাদ্দ বাড়ানোর বিকল্প নেই। ভবিষ্যতে প্রতি বছর বাজেটে শিক্ষা খাতের ব্যয় বরাদ্দ জিডিপির দশমিক ৫ শতাংশ করে বাড়ানো যেতে পারে। এটা করা হলে আগামী ছয় বছরের মধ্যে শিক্ষা খাতে বাজেট বরাদ্দ জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করা সম্ভব হতে পারে।

 

 

 

শিক্ষা খাতের জন্য বাজেট বরাদ্দ বাড়ানোর পাশাপাশি শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নের জন্য পদক্ষেপ নিতে হবে। যুগোপযোগী শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য বর্তমান মুহূর্তে একটি শক্তিশালী শিক্ষা কমিশন গঠন করা খুবই জরুরি। উচ্চপর্যায়ের একটি শিক্ষা কমিশন গঠন করে শিক্ষা খাতে বিদ্যমান সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে তা সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। আমাদের প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা কোনোভাবেই যুগোপযোগী এবং কর্মসংস্থানমূলক নয়। বর্তমানে দেশে বহমুখী শিক্ষাব্যবস্থা প্রচলিত রয়েছে। বাংলা মিডিয়াম শিক্ষার পাশাপাশি ইংরেজি মিডিয়াম এবং আরবি মিডিয়াম শিক্ষা কার্যক্রম চালু আছে। এই তিন ধারার শিক্ষা কার্যক্রমকে সমন্বিত করে একমুখী শিক্ষাব্যবস্থা প্রবর্তন করার উদ্যোগ নিতে হবে। প্রাথমিক পর্যায়ে থেকে ইংরেজি শিক্ষা বাধ্যতামূলক করতে হবে। উচ্চমাধ্যমিক পর্যায় থেকে ইংরেজির পাশাপাশি অন্য যেকোনো একটি ভাষা শেখার ব্যবস্থা রাখতে হবে। এসব ভাষা শিক্ষা করা হলে কেউ যদি কর্মসংস্থান উপলক্ষে মধ্যপ্রাচ্যসহ সংশ্লিষ্ট দেশগুলোতে যান, তাহলে ভাষাগত সমস্যায় পড়তে হবে না।

 

 

 

সরকার মাধ্যমিক স্তর থেকেই কারিগরি শিক্ষা বাধ্যতামূলক করার উদ্যোগ নিয়েছে; এটা অত্যন্ত ভালো পদক্ষেপ। সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি কারিগরি শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন, যা শিক্ষাজীবনের সমাপ্তিকাল পর্যন্ত চলতে থাকবে। যারা শিক্ষা ক্ষেত্রে অসামান্য প্রতিভার পরিচয় দিতে সক্ষম হবে তারা এইচএসসি পাস করার পর বিশেষায়িত শিক্ষা যেমন চিকিৎসাশাস্ত্র, প্রকৌশলবিদ্যা ইত্যাদি লাইনে চলে যাবে। যারা সাধারণ মানের শিক্ষার্থী, তারা শিক্ষাজীবন শেষে চাকরির জন্য চেষ্টা করবে। আর যদি চাকরি না পাওয়া যায়, তাহলে তারা অর্জিত কারিগরি জ্ঞান ব্যবহার করে আত্মকর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করবে। ক্ষুদ্রায়তন বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম জনবহুল একটি দেশ। চাইলেই সরকারি চাকরি দিয়ে বেকার সমস্যা দূর করা সম্ভব নয়। একমাত্র কারিগরি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আত্মকর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে বেকার সমস্যা নিরসন করা যেতে পারে। একসময় বলা হয়েছিল, অপরিকল্পত জনসংখ্যা বৃদ্ধি বাংলাদেশের ‘এক নম্বর জাতীয় সমস্যা।’ কিন্তু এটা কোনোভাবেই সঠিক মন্তব্য হতে পারে না। কারণ জনসংখ্যা এমনই এক উপকরণ, যা প্রশিক্ষিত এবং দক্ষ হয়ে উঠলে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সম্পদে পরিণত হয়। আবার অপ্রশিক্ষিত এবং অদক্ষ হয়ে থাকলে তা একটি দেশের জন্য ‘দায় বা আপদ’ হিসেবে গণ্য হতে পারে। জনসংখ্যাকে জনসম্পদে পরিণত করতে না পারার ব্যর্থতা রাষ্ট্রের। বর্তমানে যারা বিদেশে কাজ করছেন, তাঁদের বেশির ভাগই অদক্ষ এবং অপ্রশিক্ষিত। এঁদের যদি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ জনশক্তিতে পরিণত করে বিদেশে পাঠানো যায়, তাহলে রেমিট্যান্স প্রবাহ অনেক গুণ বৃদ্ধি পেতে পারে। কারিগরি শিক্ষা বাধ্যতামূলক করে বহুমুখী ধারায় বিভক্ত শিক্ষাব্যবস্থাকে একমুখী শিক্ষাব্যবস্থা হিসেবে গড়ে তোলা যেতে পারে।

 

 

 

শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়নের জন্য সবার আগে শিক্ষকতায় যাঁরা নিয়োজিত আছেন, তাঁদের পেশাগত দক্ষতা উন্নয়নের উদ্যোগ নিতে হবে। আমাদের দেশে প্রায়ই রাজনৈতিক বিবেচনায় শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়। এতে যাঁরা শিক্ষক হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত হন, তাঁদের পেশাগত দক্ষতার ঘাটতি থাকে। যাঁরা শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিত আছেন, তাঁদের নিয়মিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। তাঁদের গবেষণাকাজে উৎসাহিত করতে হবে। শিক্ষার্থীদের জন্য নিয়মিত খেলাধুলা এবং বিনোদনের ব্যবস্থা করতে হবে। পড়াশোনার পাশাপাশি তারা যাতে সুকুমার বৃত্তির চর্চা করতে পারে, সেই ব্যবস্থা করতে হবে। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর অর্ধ শতাব্দী অতিক্রান্ত হয়েছে। কিন্তু আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা এখনো সুষ্ঠু ধারার ওপর প্রতিষ্ঠিত হতে পারেনি। যতই দিন যাবে পৃথিবী ততই প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠবে। আগামীর কঠিন প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে গুণগত মানসম্পন্ন শিক্ষা বিস্তারের বিকল্প নেই।

 

 

দেশকে প্রকৃত শিক্ষার আলোকে উদ্ভাসিত করার জন্য উচ্চপর্যায়ের একটি স্থায়ী শিক্ষা কমিশন গঠন করা যেতে পারে। বিভিন্ন দলমতের সমর্থক এবং জাতীয় পর্যায়ে শিক্ষা বিস্তারের ক্ষেত্রে যাদের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে এমন শিক্ষাবিদদের এই কমিশনের সদস্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়া যেতে পারে। শিক্ষাব্যবস্থাকে সব রকম রাজনীতির ঊর্ধ্বে রেখে জাতীয়ভাবে এর সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করতে হবে। আধুনিক বিশ্বে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভূতপূর্ব উন্নতি সাধিত হয়েছে, যা শিক্ষা ক্ষেত্রে বিরাট পরিবর্তন এনেছে। এই পরিবর্তনের সঙ্গে সংগতি রেখে আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকেও ঢেলে সাজাতে হবে। এ লক্ষ্যে সুনির্দিষ্ট কিছু প্রস্তাব পেশ করতে চাই।

 

 

(ক) উচ্চশিক্ষার মান উন্নয়নের লক্ষ্যে আমাদের ইংরেজি ভাষা শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। শিক্ষার প্রাথমিক পর্যায় থেকেই ইংরেজি শিক্ষা বাধ্যতামূলক করতে হবে। বিভিন্ন শিক্ষা কমিশনের রিপোর্টে তৃতীয় শ্রেণি থেকে শিক্ষার্থীদের ইংরেজি ভাষা শিখতে বলা হয়েছে। প্রাথমিক স্তর থেকে ইংরেজি শিক্ষা গ্রহণ করা হলে পরবর্তী সময়ে সেই শিক্ষার্থীর জন্য ইংরেজিতে দক্ষতা অর্জন সহজ হবে। একই সঙ্গে ইংরেজি ভাষায় লিখিত বিভিন্ন গ্রন্থের বাংলা অনুবাদ গ্রন্থ প্রকাশের উদ্যোগ নিতে হবে।

 

 

(খ) শিক্ষাঙ্গনকে রাজনীতিমুক্ত রাখতে হবে। তার অর্থ এই নয় যে ছাত্ররাজনীতি বন্ধ করতে হবে। ছাত্রদের রাজনীতি করার অধিকার আছে, তবে তারা রাজনৈতিক দলের লেজুড়বৃত্তি করতে পারবে না। ছাত্ররা তাদের নিজস্ব সমস্যা নিয়ে আন্দোলন-সংগ্রাম করবে। কিন্তু কোনোভাবেই ছাত্র রাজনীতির নামে অস্ত্রবাজি করা যাবে না। ছাত্র রাজনীতির নামে শিক্ষাঙ্গনের পরিবেশ যাতে বিনষ্ট না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। জাতীয় রাজনৈতিক দলগুলোকে এ ব্যাপারে একমত হতে হবে যে, তারা ছাত্রদের হীনস্বার্থ চরিতার্থ করার উদ্দেশে ব্যবহার করবে না। আন্দোলনের নামে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় অচল করে দেওয়া যাবে না।

 

 

(গ) শিক্ষাঙ্গনে স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে হবে। তাহলে সেশনজটের আশঙ্কা দূর হবে। এ ব্যাপারে শিক্ষকদের অবদান রাখতে হবে। প্রয়োজনে অতিরিক্ত ক্লাস নিয়ে হলেও সেশন জটমুক্ত রাখতে হবে।

 

 

(ঘ) শিক্ষাঙ্গনে ছাত্রছাত্রী ভর্তির ক্ষেত্রে মেধাই একমাত্র যোগ্যতা হিসেবে বিবেচিত হতে হবে। কোটা বা তদবির কোনোভাবেই ভর্তির যোগ্যতা হিসেবে বিবেচিত হবে না।

 

 

(ঙ) শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে মেধাগত যোগ্যতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। শিক্ষক নিয়োগ ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে মেধা এবং গবেষণাকে গুরুত্ব দিতে হবে। প্রতিটি উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গবেষণা ও জ্ঞানচর্চার উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষকদের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য নিয়মিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। শিক্ষকদের অবশ্যই গবেষণার মাধ্যমে নতুন নতুন জ্ঞান উদ্ভাবনে নিয়োজিত থাকতে হবে।

 

(চ) শিক্ষা খাতের জন্য বাজেট বরাদ্দ বাড়াতে হবে।  শিক্ষকদের জন্য প্রয়োজনে স্বতন্ত্র পে-স্কেল প্রণয়ন করতে হবে। (ছ) প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের জন্য আধুনিক শিক্ষা উপকরণ নিশ্চিত করতে হবে। গ্রন্থাগার ও ল্যাবরেটরিগুলোকে আধুনিকায়ন করতে হবে।  (জ) উচ্চশিক্ষা কার্যক্রমের পাঠ্যসূচি এমনভাবে প্রণয়ন করতে হবে, যাতে তা আধুনিক বিশ্বের জ্ঞানভাণ্ডারের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় সক্ষম জনবল তৈরি করতে পারে। শিক্ষার্থীরা তাদের অর্জিত জ্ঞান যাতে দেশ ও জাতির কল্যাণে ব্যবহার করতে পারে, এমন পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে।

 

 

চব্বিশের ছাত্র-জনতার গণ অভ্যুত্থানের পর দেশ নতুন পথে যাত্রা শুরু করেছে। এই যাত্রা তখনই সফল হবে, যখন আমরা জ্ঞানালোকিত প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত আদর্শবান জাতি গঠন করতে পারব।

 

 

♦ লেখক : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও সাবেক রাষ্ট্রদূত। বর্তমানে প্রফেসর ইমেরিটাস, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

ট্যাগ:BCSকলামবাংলাদেশ