
সবার স্বার্থে সুশাসন
মোহাম্মদ আবদুল মজিদ [সূত্র : আমাদের সময়; ১০ জুলাই ২০২৬]
রাষ্ট্রীয় সম্পদ, সৌভাগ্য তথা স্বাধীনতার সুফল সবার মধ্যে সুষম বণ্টন ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও সুনিশ্চিত সুশাসন এবং জবাবদিহির সুযোগ ছাড়া গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রতি আস্থা গড়ে ওঠে না। গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার জন্য অযুত ত্যাগ স্বীকারের প্রকৃত প্রতিফল অর্জন সম্ভব হয় না সুশাসন সুনিশ্চিত না হলে। সম্পদ অর্জনের নৈতিক ভিত্তি বা প্রক্রিয়া স্বচ্ছ না হলে বণ্টন ব্যবস্থাপনাও সুষ্ঠু হয় না। সমাজে বণ্টনবৈষম্য দূর করার ক্ষেত্রে সুশাসন প্রেরণা ও প্রভাবক ভূমিকা পালন করে থাকে। এটি দায়িত্ববোধ গড়ে তোলার জন্যও জরুরি। যেমন- আজকাল এক দেশ বা অর্থনীতির প্রচুর অর্থ বিদেশে কিংবা অন্য অর্থনীতিতে দেদার পাচার হয়ে থাকে। বিনা বিনিয়োগে বা বিনা পরিশ্রমে প্রকৃত পণ্য ও সেবা উৎপাদন ছাড়া অর্থ অর্জিত হলে অবৈধভাবে অর্জিত সেই অর্থ পাচার হবেই। অর্থ বৈধ পন্থায় উপার্জিত না হলে সেই অর্থের মালিকানার প্রতি দায়দায়িত্ববোধও গড়ে ওঠে না।
জাতীয় ঐক্য ও সংহতি শক্তিশালীকরণেও স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিমূলক পরিবেশের আবশ্যকতা রয়েছে। কেননা, সমাজে একপক্ষ বা কতিপয় কেউ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির মধ্যে থাকলে, আর অধিকাংশ কারও কাছে কোনো জবাবদিহির মধ্যে না থাকলে অর্থাৎ একই যাত্রায় ভিন্ন আচরণে নিষ্ঠ হলে পারস্পরিক অভিযোগের নাট্যশালায় জাতীয় ঐক্য গড়ে ওঠে না। সমতাবিধানের জন্য, সবার প্রতি সমান আচরণের (যা গণতন্ত্রের মর্মবাণী) জন্যও স্বচ্ছতা তথা আস্থার পরিবেশ প্রয়োজন।
আরেকটি বিষয়, সুশাসনের অবর্তমানে জবাবদিহিবিহীন পরিবেশে, আয়-ব্যয় ব্যবস্থাপনায় অস্বচ্ছতার অবয়বের (cause) অন্যতম প্রতিফল (effect) হলো দুর্নীতি। দুর্নীতি শুধু ব্যক্তিবিশেষ অর্থাৎ যে দুর্নীতি করে তাকে ন্যায়নীতিহীনতার জন্য ক্ষতিগ্রস্ত করে তা নয়, তার দ্বারা সমাজকে নেতৃত্বদান বা যেকোনো ক্ষেত্রে দৃঢ়চিত্ত অবস্থান গ্রহণে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালনকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে দেয়। সর্বত্র তাকে দুর্বল করে দেয়। দুর্নীতিবাজ নেতৃত্বের জন্য বা কারণে সমাজে আস্থার সংকট সৃষ্টি হয়। নেতৃত্বের এই অধোগতির প্রেক্ষাপটই প্রত্যক্ষভাবে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির অভাবজনিত পরিবেশ নির্মাণ করে। নেতৃত্বের কার্যকলাপে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি না থাকলে সমাজে সংসারে সে নেতৃত্বের অধীনে আস্থার সংকট তৈরি হয়। এটি পরস্পর প্রযুক্ত সমস্যা। স্বচ্ছতা-জবাবদিহির অনুপস্থিতির অবসরে আত্মঘাতী পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
স্বচ্ছতা-জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার অন্যতম উপায় হলো যার যা কাজ তাকে সেভাবে করতে দেওয়া বা ক্ষমতা দেওয়া। যেমন- স্থানীয় সরকার। স্থানীয় সরকার পরিচালনা, আয়-ব্যয় ব্যবস্থাপনার ভার স্থানীয় সরকারের হতে দেওয়া হলে সে সরকার হবে প্রকৃত প্রস্তাবে তার নির্বাচকমণ্ডলীর কাছে জবাবদিহিমূলক স্থানীয় পর্যায়ের সরকার। স্থানীয় সরকারই সেখানকার ভোটারদের কাছে জবাবদিহি করবে। স্থানীয় সরকার পরিচালনার জন্য সেখান থেকে তারা যে কর নেবে তা থেকেই সেখানে সেবামূলক কাজ নিশ্চিত করবে, যে প্রতিশ্রুতি তারা দেবে তা তারাই পূরণ করবে। তাহলেই সেটা অর্থবহ ও কার্যকর হবে।
স্থানীয় সরকারের পুরোপুরি স্বায়ত্তশাসনের সুযোগ থাকতে হবে। তবেই স্থানীয় সরকার শব্দটির যথার্থতা ফুটে উঠবে। জাপানে দেখেছি, একেক প্রিফেকচার বা প্রদেশ বা রাজ্য নিজ নিজ আয়-ব্যয়, উন্নয়নের জন্য সার্বিকভাবে ক্ষমতাপ্রাপ্ত। সেখানে এক স্থানীয় সরকার অন্য স্থানীয় সরকারের চেয়ে সরকার পরিচালনায় কতটা পারদর্শী তার প্রতিযোগিতা চলছে।
স্বচ্ছতা আনয়নে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বা সংস্থায় দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়ে অধিষ্ঠিত কর্তাব্যক্তিদের দায়িত্ব পালনে অর্পিত ক্ষমতা প্রয়োগে প্রতিশ্রুত (commitment) ও দৃঢ়চিত্ততা প্রয়োজন। নিজেদের অধিক্ষেত্রে প্রদত্ত ক্ষমতাবলে নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের পরিবর্তে আদিষ্ট হয়ে যদি তাদের কর্মধারা পরিচালিত হয় সে ক্ষেত্রে কোনো প্রতিষ্ঠান কার্যকরভাবে জবাবদিহিমূলক ভূমিকা পালন করতে পারে না। এ ক্ষেত্রে স্বেচ্ছাচার ও স্বচ্ছতার অভাবে আকীর্ণ হয়ে উঠতে পারে, স্বেচ্ছচারিতার অজুহাত যৌক্তিকতা এমনকি স্বজনপ্রীতির পরিবেশ বা ক্ষেত্র তৈরি হয়। সুশাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে এটি প্রধান প্রতিবন্ধকতা।
পাবলিক সার্ভিসে প্রতিটি কর্মকর্তার নিজ নিজ দায়িত্ব যথাযথ পরিপালনের মাধ্যমে একটা স্বচ্ছ ও আস্থার পরিবেশ সৃষ্টির সুযোগ থাকার দরকার। যারা নীতি প্রণয়ন করে, নীতি উপস্থাপন করে তাদের প্রত্যেকেরই নিজস্ব দৃঢ়চিত্ততা এবং নীতি-নিয়ম পদ্ধতির প্রতি দায়িত্বশীল থাকা আবশ্যক। এর পরিবর্তে তার যদি চাকরি যাওয়ার বা পদোন্নতি আটকে যাওয়ার ভয় থাকে কোনো বিভাগই স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে না। ফলে তাদের দ্বারা প্রতিষ্ঠা পায় না স্বচ্ছতা, জবাবদিহির নিশ্চয়তা আসে না। সুশাসন, স্বচ্ছতা-জবাবদিহি প্রয়োজন সবার স্বার্থে, গণতন্ত্রের স্বার্থে, অর্থনৈতিক উন্নয়নের স্বার্থে। কারণ এটা পরস্পরের পরিপূরক।
মানবসম্পদ তৈরিতে যেকোনো জাতির জন্য শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে হয়ে থাকে সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ। কারণ শিক্ষাই ভবিষ্যৎ জনসম্পদ তৈরি করবে। মূল্যবোধসম্পন্ন মানুষ তৈরি করবে। দায়িত্বশীল মানুষ তৈরি করবে। দায়িত্বশীল নেতা তৈরি করবে। যে মানুষ থাকবে লাঙলের পেছনে সে মানুষ খাঁটি সৃজনশীল মানুষ হিসেবে দেশের ভবিষ্যৎ নির্মাণ করবে। ঠিক তেমনিভাবে স্বাস্থ্য খাত থেকে মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত হলে, মানুষ সুস্থ হলেই না তার উৎপাদনশীলতা, সৃজনশীলতা সবই বাড়বে। স্বাস্থ্য খারাপ থাকলে, পুষ্টিহীন হলে কর্মী ভালো কাজ করতে সমর্থ হয় না।
বরং তাকে সুস্থ ও কর্মক্ষম করে তোলার জন্য পরিবার ও রাষ্ট্রকে বাড়তি অর্থ ব্যয় করতে হয়। স্বাস্থ্য খাতে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ এ জন্য দরকার যে, সবাইকে সুস্থ, নীরোগ ও স্বাস্থ্যবান নিরাপদ জীবন পেতে হবে। লোকবল সুস্থ হলেই সবকিছু বিকাশ লাভ করবে। যদি দেখা যায় স্বাস্থ্য খাতে ধীরে ধীরে বাজেট বাড়ছে কিন্তু অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বিবেচনার বাইরে থেকে যাচ্ছে, হাসপাতালে ওষুধ দেওয়া হচ্ছে কিন্তু তা রোগী পাচ্ছে না, রোগীকে বাইরে থেকে ওষুধ কিনতে হচ্ছে, চিকিৎসককে বেতন দেওয়া হচ্ছে যাতে তারা হাসপাতালে বা সরকারি চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠানে রোগীকে সুষ্ঠু চিকিৎসা দেন, অথচ হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা না দিয়ে তাদের বাধ্য করা হচ্ছে ডাক্তারের প্রাইভেট চেম্বারে কিংবা বেসরকারি ক্লিনিকে যেতে।
জনগণের দেওয়া করের টাকায় চিকিৎসককে, শিক্ষককে, পাবলিক সার্ভেন্টকে বেতন দেওয়া হচ্ছে শিক্ষা-স্বাস্থ্য-প্রশাসনিক নিরাপত্তা, আইনশৃঙ্খলা তথা স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার জন্য। কিন্তু সেভাবে সেবাপ্রাপ্তি ঘটছে না। শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষে যথাযথভাবে না পড়িয়ে তাদের কোচিং/প্রাইভেট পড়তে বলা হচ্ছে। শিক্ষার্থীকে দ্বিগুণ খরচ করতে হচ্ছে। উপযুক্ত ও গুণগত শিক্ষাদানের প্রয়াস-প্রচেষ্টায় বাণিজ্যিক মনোভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। তার মানে সেখানে শিক্ষক বা চিকিৎসকের দায়িত্ব পালনে স্বচ্ছতা-জবাবদিহির পরিবেশ পরিব্যাপ্ত হচ্ছে না।
দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের একটি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান যখন দেখলেন, অনেক অভিভাবক সন্ধ্যায় সন্তানদের পড়াশোনার তদারকিতে পর্যাপ্ত সময় দিতে পারছেন না; বরং বিদেশি টেলিভিশন চ্যানেলের ধারাবাহিক নাটক দেখায় ব্যস্ত থাকছেন, তখন তিনি ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নেন। তাঁর নেতৃত্বে স্কুল-কলেজে সান্ধ্য পাঠদানের ব্যবস্থা চালু করা হয়। এ কার্যক্রমে শিক্ষকেদের পাশাপাশি উচ্চ শ্রেণির মেধাবী শিক্ষার্থী, সুশিক্ষিত অভিভাবক এবং বিভিন্ন সরকারি কর্মকর্তারাও স্বেচ্ছায় যুক্ত হন। ফলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনাকে কেন্দ্র করে একটি স্বেচ্ছাসেবাভিত্তিক, অংশগ্রহণমূলক ও স্বতঃপ্রণোদিত শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ গড়ে ওঠে।
নানা আঙ্গিকে পরীক্ষা-পর্যালোচনায় দেখা যায়, শিক্ষক-চিকিৎসক-আইনজীবী-ব্যবসায়ী এমনকি চাকরিজীবীদেরও বাঞ্ছিতভাবে জবাবদিহির আওতায় আনা সম্ভব হয় না। অতিমাত্রায় কোটারি, সিন্ডিকেট বা দলীয় বা রাজনীতিকরণের কারণে পেশাজীবী, সংস্থা-সংগঠন এবং এমনকি সুশীল সেবকদেরও প্রজাতন্ত্রের হয়ে দলনিরপেক্ষ অবস্থানে থাকতে হিমশিম খেতে হচ্ছে, গলদঘর্ম হতে হচ্ছে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে এমন একটি পরিবেশ তৈরি হয় যার ছত্রছায়ায় নানাভাবে অবৈধ অর্জন চলতে এর পথ সুগম হতে পারে। সেবক প্রভুতে পরিণত হলে সম্পদ আত্মসাৎ, ক্ষমতার অপব্যবহারের দ্বারা অর্জিত অর্থ দখলের লড়াইয়ে অর্থায়িত হয়ে এভাবে একটি ঘূর্ণায়মান দুষ্টচক্র বলয় হয়ে থাকে।
অর্থাৎ সুশাসনের অভাবে স্বচ্ছতার অস্বচ্ছতায় ঘুরেফিরে পুরো প্রক্রিয়াকে বিষিয়ে তোলে। সুতরাং সব ক্ষেত্রে সর্বাগ্রে উচিত স্বচ্ছতা-জবাবদিহি নিশ্চিত করা। এটি প্রয়োজন গণতন্ত্র ও সার্বিক উন্নয়নের স্বার্থে। বলার অপেক্ষা রাখে না, সুশাসন, স্বচ্ছতা-জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে সত্যিকার উন্নয়ন হবে না। এটা পরস্পরের পরিপূরক। স্বচ্ছতার অস্বচ্ছতায় যে উন্নয়ন হয় তাতে জনগণের সুফল নিশ্চিত হয় না। এ উন্নয়নের কোনো উপযোগিতা বা রিটার্ন নেই। এটা এক ধরনের আত্মঘাতী ভেল্কিবাজি।
জিডিপি প্রবৃদ্ধির মূলকথা হলো, যে অর্থই ব্যয় করা হোক না কেন সেই আয় ব্যয় বা ব্যবহারের দ্বারা অবশ্যই পণ্য ও সেবা উৎপাদিত হতে হবে। পণ্য ও সেবা উৎপাদনের লক্ষ্যে যে অর্থ আয় বা ব্যয় হবে সেটাই বৈধ। আর যে আয়-ব্যয় কোনো পণ্য ও সেবা উৎপাদন করে না সেটা অবৈধ, অপব্যয়, অপচয়। জিডিপিতে তার থাকে না কোনো ভূমিকা। আরও খোলাসা করে বলা যায়, যে আয় পণ্য ও সেবা উৎপাদনের মাধ্যমে অর্জিত হয় না এবং যে ব্যয়ের মাধ্যমে পণ্য ও সেবা উৎপাদিত হয় না সেই আয়-ব্যয় জিডিপিতে কোনো অবদান রাখে না। কোনো প্রকার শ্রম বা পুঁজি বিনিয়োগ ছাড়া যে আয় তা সম্পদ বণ্টনবৈষম্য সৃষ্টিই শুধু করে না সেভাবে অর্জিত অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রেও সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ধার ধারা হয় না। ফলে তা সৃষ্টি করে আর্থিক বিচ্যুতি। এভাবে যে অর্থ আয় বা খরচ করা হয় তা প্রকারান্তরে অর্থনীতিকে পঙ্গু ও পক্ষাঘাতগ্রস্ত করে।
মোহাম্মদ আবদুল মজিদ : সাবেক সচিব ও এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান



