রাষ্ট্রপতির ক্ষমতায়ন

রাষ্ট্রপতির ক্ষমতায়ন
কলামবাংলাদেশ

রাষ্ট্রপতির ক্ষমতায়ন

২৬ আগস্ট, ২০২৬

আবদুল লতিফ মাসুম [সূত্র : আমার দেশ, ২৬ আগস্ট ২০২৬]

রাষ্ট্রবিজ্ঞানের একটি মৌলিক শিক্ষা হলো—রাষ্ট্রে ক্ষমতা যত গুরুত্বপূর্ণ, তার নিয়ন্ত্রণ ও ভারসাম্য ততই গুরুত্বপূর্ণ। গণতন্ত্র কেবল সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসন নয়; গণতন্ত্র হলো এমন এক প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা, যেখানে কোনো ব্যক্তি, দল বা প্রতিষ্ঠান রাষ্ট্রের সব ক্ষমতার একচ্ছত্র অধিকারী হতে পারে না। ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন স্বল্প মেয়াদে সিদ্ধান্ত গ্রহণকে দ্রুততর করলেও দীর্ঘ মেয়াদে তা জবাবদিহিতা দুর্বল করে, প্রতিষ্ঠানকে অনুগত করে এবং শেষ পর্যন্ত স্বৈরতান্ত্রিক প্রবণতার জন্ম দেয়। তাই আধুনিক সাংবিধানিক রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান নীতি হলো—ক্ষমতার সঙ্গে ক্ষমতার ভারসাম্য এবং ক্ষমতার সঙ্গে জবাবদিহিতা। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা এই সত্যটিকে নতুন করে সামনে এনেছে।

 

 

এই প্রেক্ষাপটে ২০ আগস্ট জাতীয় সংসদে নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর২৫৫ ভোট পেয়ে দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন এবং ২১ আগস্ট শপথ গ্রহণ করেন।

 

রাষ্ট্রপতির ক্ষমতায়নের প্রশ্নটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক । প্রশ্নটি মির্জা ফখরুলকে কেন্দ্র করে নয়; প্রশ্নটি রাষ্ট্রের কাঠামো নিয়ে। একজন ব্যক্তি ভালো হলেই রাষ্ট্রব্যবস্থা ভালো থাকে না। বরং রাষ্ট্রব্যবস্থা এমন হতে হবে, যেখানে ব্যক্তি ভালো না হলেও প্রতিষ্ঠান তাকে সীমাবদ্ধ রাখতে পারে। ইতিহাসের শিক্ষা এখানেই।

 

 

বাংলাদেশের ১৯৭২ সালের সংবিধান মূলত সংসদীয় গণতন্ত্রের ভিত্তিতে নির্মিত হয়েছিল। সেই ব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতি ছিলেন রাষ্ট্রের প্রধান, কিন্তু কার্যকর নির্বাহী ক্ষমতা ছিল প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার হাতে। মূল সংবিধানের ৪৮ অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রপতির অধিকাংশ কার্যক্রম প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শনির্ভর করা হয়। অন্যদিকে ৫৫ অনুচ্ছেদে স্পষ্টভাবে বলা হয়, প্রজাতন্ত্রের নির্বাহী ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রীর কর্তৃত্বে প্রয়োগ হবে। অর্থাৎ ১৯৭২-এর মডেলে রাষ্ট্রপতি ছিলেন সাংবিধানিক রাষ্ট্রপ্রধান, আর প্রধানমন্ত্রী ছিলেন কার্যকর সরকারপ্রধান।

 

 

এই ব্যবস্থার মধ্যে একটি মৌলিক অসামঞ্জস্য শুরু থেকেই ছিল। রাষ্ট্রপতির নামেই সরকারের নির্বাহী কার্যক্রম পরিচালিত হবে, কিন্তু বাস্তব নির্বাহী ক্ষমতা থাকবে প্রধানমন্ত্রীর হাতে। ফলে রাষ্ট্রপতির পদটি মর্যাদায় সর্বোচ্চ হলেও ক্ষমতায় তুলনামূলকভাবে সীমিত। পরবর্তী সময়ে সংবিধানের বিভিন্ন পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার পরিধি আরো সংকুচিত হয়ে বর্তমান সংসদীয় ব্যবস্থায় তিনি প্রায় সম্পূর্ণভাবেই প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শনির্ভর একটি পদে পরিণত হয়েছেন।

 

 

 

১৯৭৫ সালের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে বাংলাদেশ সংসদীয় ব্যবস্থা থেকে রাষ্ট্রপতিশাসিত ব্যবস্থায় চলে গেলে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বিপরীত দিকে মোড় নেয়। রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানের হাতে রাষ্ট্রের নির্বাহী ক্ষমতা ব্যাপকভাবে কেন্দ্রীভূত হয়। অর্থাৎ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে আমরা দুই ধরনের চরম অভিজ্ঞতা দেখেছি—একদিকে এমন রাষ্ট্রপতি, যার হাতে প্রয়োজনীয় স্বাধীন ক্ষমতা নেই; অন্যদিকে এমন রাষ্ট্রপতি ব্যবস্থা, যেখানে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা অতিরিক্তভাবে এক কেন্দ্রে সঞ্চিত হয়েছিল। দুই অভিজ্ঞতার কোনোটিই আমাদের কাঙ্ক্ষিত গণতান্ত্রিক ভারসাম্যের আদর্শ হতে পারে না। আমাদের প্রয়োজন তৃতীয় একটি পথ—শক্তিশালী কিন্তু জবাবদিহিতামূলক রাষ্ট্রপতি এবং ক্ষমতাবান কিন্তু নিয়ন্ত্রিত প্রধানমন্ত্রী।

 

 

ঘোষিত জুলাই সনদে রাষ্ট্রপতিবিষয়ক বিধান ১০, ১১, ১২ ও ১৩ অনুচ্ছেদে বর্ণনা করা হয়েছে। রাষ্ট্রপতি নির্বাচন পদ্ধতি সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘সংবিধানে এরূপ যুক্ত করা হবে যে, বাংলাদেশের একজন রাষ্ট্রপতি থাকবেন, যিনি আইন অনুযায়ী আইনসভার উভয় কক্ষের (নিম্নকক্ষ ও উচ্চকক্ষ) সদস্যদের গোপন ভোটে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে নির্বাচিত হবেন।’ রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার ক্ষেত্রে বিদ্যমান সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৪৮(৪)-এ বর্ণিত যোগ্যতাসমূহ এবং রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হওয়ার সময় কোনো ব্যক্তি কোনো রাষ্ট্রীয়, সরকারি বা রাজনৈতিক দল বা সংগঠনের পদে থাকতে পারবেন না। উল্লেখ করা যেতে পারে, বিএনপিসহ সব রাজনৈতিক দল উচ্চপরিষদের ব্যাপারে নীতিগতভাবে একমত রয়েছে। তবে এই রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে উচ্চপরিষদের গঠন ও কার্যকারিতা পরিলক্ষিত হয়নি।

 

 

হয়তো ভবিষ্যতে এ বিষয়ে পরিবর্তন আনা হতে পারে। রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা ও দায়িত্ব সম্পর্কে জুলাই সনদের ১১ নম্বর অনুচ্ছেদে যা বলা হয়েছে, তা এ রকম—‘রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতায় ভারসাম্য আনয়নের লক্ষ্যে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৪৮(৩) সংশোধনীর প্রস্তাব করে কারো পরামর্শ বা সুপারিশ ছাড়াই নিজ এখতিয়ার বলে রাষ্ট্রপতি নিম্নলিখিত পদে নিয়োগ প্রদান করতে পারবেন—১. বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, ২. এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্যগণ, ৩. জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্যগণ, ৪. তথ্য কমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্যগণ, ৫. বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিলের চেয়ারম্যান ও সদস্যগণ, এবং ৬. আইন কমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্যগণ।’

 

 

উল্লেখ্য, অধিকাংশ রাজনৈতিক দল বিষয়টি সমর্থন করলেও প্রধান বিরোধী দলসহ আরো কয়েকটি দল এ বিষয়ে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দিয়েছে। জুলাই সনদে বর্ণিত রাষ্ট্রপতির অভিশংসন প্রক্রিয়ার বিষয়ে বলা হয়েছে—সংবিধানে এরূপ যুক্ত করা হবে যে, ‘রাষ্ট্রদ্রোহ, গুরুতর অসদাচরণ বা সংবিধান লঙ্ঘনের জন্য রাষ্ট্রপতিকে অভিশংসন করা যাইবে। আইনসভার নিম্নকক্ষে অভিশংসন প্রস্তাবটি দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের ভোটে পাস করিবার পর তাহা উচ্চকক্ষে প্রেরণ এবং উচ্চকক্ষে শুনানির মাধ্যমে দুই-তৃতীয়াংশের সমর্থনে অভিশংসন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হইবে।’ জুলাই সনদে রাষ্ট্রপতির ক্ষমা প্রদর্শনের বিষয়টি শর্তসাপেক্ষ করা হয়েছে। বলা হয়েছে, কোনো আদালত, ট্রাইব্যুনাল বা অন্য কোনো কর্তৃপক্ষ প্রদত্ত যেকোনো দণ্ডের মার্জনা, বিলম্বন ও বিরাম মঞ্জুর করার এবং যেকোনো দণ্ড মওকুফ, স্থগিত বা হ্রাস করার ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির থাকবে এবং আইনের দ্বারা নির্ধারিত মানদণ্ড, নীতি ও পদ্ধতি অনুসরণক্রমে ওই ক্ষমতা প্রয়োগ করবেন।

 

 

সংশ্লিষ্ট আইনে এ ধরনের বিধান রাখা হবে যে, এ ধরনের কোনো আবেদন বিবেচনার আগে মামলার বাদী বা ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির পরিবারের সম্মতি গ্রহণ করা হবে। প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যায়, সুদীর্ঘ আওয়ামী আমলে খুনের আসামিরও রাষ্ট্রপতির ক্ষমা প্রদর্শনের এখতিয়ারের অপপ্রয়োগ হয়েছে। সেটিকে এখন আইনের মাধ্যমে কার্যকর করার সুপারিশ করা হয়েছে। বিশেষত ভুক্তভোগীর মতামতের শর্তের কথা বলে ন্যায়ানুগ ব্যবস্থার শর্ত প্রয়োগ করা হয়েছে।

 

 

এসব প্রস্তাবের তাৎপর্য গভীর। রাষ্ট্রপতিকে প্রধানমন্ত্রীর প্রতিদ্বন্দ্বী বানানো নয়, বরং রাষ্ট্রপতিকে এমন একটি সাংবিধানিক ভারসাম্যের কেন্দ্র করা প্রয়োজন, যিনি সরকারের বাইরে রাষ্ট্রের বৃহত্তর স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব করতে পারেন। প্রধানমন্ত্রী সরকার পরিচালনা করবেন; রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা, সাংবিধানিক ভারসাম্য ও জাতীয় ঐক্যের প্রতীক ও রক্ষাকর্তা হিসেবে কাজ করবেন। এটাই হওয়া উচিত জুলাই-পরবর্তী বাংলাদেশের সাংবিধানিক দর্শন।

 

 

আমাদের অভিজ্ঞতা বলে, প্রধানমন্ত্রীর হাতে যখন দল, সরকার, সংসদ, প্রশাসন ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর অতিরিক্ত প্রভাব একসঙ্গে জমা হয়, তখন ক্ষমতার ভারসাম্য ভেঙে পড়ে। সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা যদি নির্বাহী ক্ষমতার সঙ্গে একীভূত হয়ে যায়, তখন সংসদ সরকারের নিয়ন্ত্রক না হয়ে সরকারের অনুমোদনকারী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। প্রশাসন রাজনৈতিক নির্দেশের ওপর নির্ভরশীল হয়, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলো স্বাধীনতা হারায় এবং বিরোধী মত ক্রমেই সংকুচিত হয়।

 

 

শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনামলের অভিজ্ঞতা এই প্রশ্নটি আরো তীব্র করে তুলেছে। তার শাসনে ক্ষমতার অতিরিক্ত কেন্দ্রীভবন, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে দলীয় প্রভাবের অধীন করা এবং ব্যাপক দুর্নীতির কারবার হয়েছে। এসব বিষয় অস্বীকার করা অসম্ভব—দীর্ঘমেয়াদি একক রাজনৈতিক আধিপত্য বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর গভীর চাপ সৃষ্টি করেছিল। জুলাই-আগস্টের অভ্যুত্থান সেই ক্ষমতার কেন্দ্রীভবনের বিরুদ্ধে জনগণের বিস্ফোরিত প্রতিক্রিয়া হিসেবে বিস্ফোরিত হয়েছে।

 

 

তাই আজকের বাংলাদেশে শুধু সরকার পরিবর্তন যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন ক্ষমতার কাঠামোর পরিবর্তন।

আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় এসেছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন সরকার রাষ্ট্র পুনর্গঠন, গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং প্রতিষ্ঠান সংস্কারের প্রতিশ্রুতি নিয়ে এগোচ্ছে। কিন্তু এখানে একটি মৌলিক সতর্কবাণী উচ্চারণ করা প্রয়োজন। লর্ড অ্যাক্টনের বহুল উদ্ধৃত সতর্কবাণী—‘Power tends to corrupt and absolute power corrupts absolutely’—মানবসভ্যতার রাজনৈতিক ইতিহাসের এক কঠিন সত্যকে ধারণ করে। ক্ষমতা মানুষের চরিত্র পরীক্ষা করে; কিন্তু ক্ষমতার ওপর নিয়ন্ত্রণ না থাকলে সেই পরীক্ষায় ব্যর্থ হওয়ার সম্ভাবনাই বাড়ে। ব্যক্তি যত ভালোই হোন, প্রতিষ্ঠান যদি তাকে সীমাহীন ক্ষমতা দেয়, একসময় ক্ষমতা ব্যক্তিকে প্রভাবিত করতে পারে। ইতিহাসে এর অসংখ্য নজির রয়েছে।

 

 

এ কারণে বিএনপি সরকারের উদ্দেশ্য যতই মহৎ হোক, তাদের জন্যও ক্ষমতার ভারসাম্য অপরিহার্য। আজ যারা ক্ষমতায় আছেন তারা যদি ভাবেন, ‘আমরা অতীতের মতো নই, তাই আমাদের হাতে বেশি ক্ষমতা থাকলেও সমস্যা হবে না,’ তবে সেটি হবে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা অস্বীকার করা। রাষ্ট্র কোনো ব্যক্তির সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করতে পারে না। রাষ্ট্রকে এমনভাবে সাজাতে হয়, যাতে সৎ সরকারও নিয়ন্ত্রিত থাকে এবং অসৎ সরকারও সীমাবদ্ধ থাকে।

 

 

একটি যৌক্তিক প্রস্তাব হলো, রাষ্ট্রপতি যেহেতু সংবিধান অনুযায়ী সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক, তাই প্রতিরক্ষা ও তিন বাহিনী-সংক্রান্ত কিছু গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক দায়িত্ব রাষ্ট্রপতির অধীনে আরো সুস্পষ্টভাবে ন্যস্ত করা যেতে পারে।

 

 

শিক্ষাক্ষেত্রেও রাষ্ট্রপতির ভূমিকা নতুনভাবে ভাবা যায়। বর্তমানে রাষ্ট্রপতি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর চ্যান্সেলর হিসেবে একটি মর্যাদাপূর্ণ কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে আনুষ্ঠানিক ভূমিকা পালন করেন। অথচ রাষ্ট্রপতির এই সাংবিধানিক অবস্থানকে ব্যবহার করে উচ্চশিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগ, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জবাবদিহিতা, জাতীয় শিক্ষানীতি এবং শিক্ষা-প্রশাসনের নিরপেক্ষতার ক্ষেত্রে একটি প্রাতিষ্ঠানিক ভূমিকা তৈরি করা যেতে পারে।

 

 

জুলাই সনদের মূল দর্শনের সঙ্গে এসব প্রস্তাবের মিল রয়েছে। রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বাড়ানোর অর্থ প্রধানমন্ত্রীকে দুর্বল করা নয়; বরং রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার মধ্যে একটি সুস্থ বিভাজন তৈরি করা। প্রধানমন্ত্রী থাকবেন সরকারের রাজনৈতিক নির্বাহী প্রধান; রাষ্ট্রপতি হবেন রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ভারসাম্যের রক্ষক। একটি পক্ষ নীতি বাস্তবায়ন করবে; অন্য পক্ষ নিশ্চিত করবে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো যেন কোনো দল বা ব্যক্তির একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণে না যায়।

 

 

বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ গণতন্ত্রের প্রশ্নটি শেষ পর্যন্ত কোনো ব্যক্তি বা দলের ওপর নির্ভর করা উচিত নয়। এমন একটি ব্যবস্থা প্রয়োজন, যেখানে রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ন্ত্রণ করবেন না, প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রপতিকে নিয়ন্ত্রণ করবেন না; বরং সংবিধান দুজনকেই নিয়ন্ত্রণ করবে। রাষ্ট্রপতির হাতে থাকবে প্রয়োজনীয় স্বাধীন ক্ষমতা, প্রধানমন্ত্রীর হাতে থাকবে প্রয়োজনীয় নির্বাহী ক্ষমতা, সংসদ থাকবে কার্যকর নিয়ন্ত্রণে, বিচার বিভাগ থাকবে স্বাধীন এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলো থাকবে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত।

 

 

জুলাই অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা যদি সত্যিই হয় একটি নতুন বাংলাদেশ, তাহলে সেই নতুন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি নামমাত্র রাষ্ট্রপতি হতে পারেন না। তাকে হতে হবে রাষ্ট্রের সাংবিধানিক অভিভাবক, ক্ষমতার ভারসাম্যের রক্ষক এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতার প্রহরী। বাংলাদেশের রাষ্ট্রব্যবস্থাকে এবার ব্যক্তিনির্ভরতা থেকে প্রতিষ্ঠাননির্ভরতায় যেতে হবে। কারণ ইতিহাসের শিক্ষা একেবারেই পরিষ্কার—ভালো মানুষ দিয়ে ভালো রাষ্ট্র তৈরি করা যায়; কিন্তু ভালো প্রতিষ্ঠান ছাড়া ভালো রাষ্ট্র টিকিয়ে রাখা যায় না।

ট্যাগ:BCSকলামবাংলাদেশ