কিন্তু প্রায় পাঁচ দশক পরও দেশের মোট স্থায়ী মূলধন গঠনে পুঁজিবাজারের সামষ্টিক অবদান মাত্র ৬ শতাংশের মতো। এটি কেবল একটি হারানো সুযোগ নয়, বরং এটি গভীর কাঠামোগত ব্যর্থতাও। এ ব্যর্থতা করপোরেট অর্থায়নের ভারসাম্য নষ্ট করার পাশাপাশি ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর অস্বাভাবিক চাপ তৈরি করেছে এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নে একক ও ক্রমেই ঝুঁকিপূর্ণ উৎসের ওপর নির্ভরশীল করে তুলছে। সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যের ভিত্তিতে বণিক বার্তার প্রতিবেদনে যে পরিসংখ্যান তুলে ধরা হয়েছে, তা উদ্বেগজনক। ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত মোট ইস্যুকৃত মূলধন দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৩ হাজার ২৫৮ কোটি টাকায় (প্রায় ৮ দশমিক ৪১ বিলিয়ন ডলার)। এর বিপরীতে দেশের মোট স্থায়ী মূলধন গঠন ১৩৮ দশমিক ১৯ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ ৫০ বছরে গড়ে ওঠা পুরো ইকুইটি বাজার জাতীয় বিনিয়োগের মাত্র ৬ শতাংশের মতো অর্থায়ন করতে পেরেছে। জিডিপির অনুপাতে বাজার মূলধন এখন মাত্র ৬ দশমিক ২২ শতাংশ। এদিকে দক্ষিণ এশিয়ার দেশ পাকিস্তান অর্থনৈতিক সংকটেও এ অনুপাত ১৬ দশমিক ৫ শতাংশে ধরে রেখেছে। খেলাপি ঋণের সংকট থেকে ঘুরে দাঁড়ানো শ্রীলংকায় তা ২৬ দশমিক ৪ শতাংশ। ভারত, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও ফিলিপাইন—সব দেশই বাংলাদেশের তুলনায় অনেক এগিয়ে। এশিয়ার বড় কোনো উদীয়মান অর্থনীতিতে পুঁজিবাজারের ভূমিকা বাংলাদেশের মতো এত সীমিত নয়।
পুঁজিবাজার সম্প্রসারণ না হওয়ার পেছনে বিদ্যমান কারণগুলো অজানা নয়; বরং বহুদিনের, গভীরভাবে প্রোথিত। এর মধ্যে একটি হলো আস্থার সংকট। গত দেড় দশকে ১৪৯টি কোম্পানি প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) মাধ্যমে ১১ হাজার কোটি টাকার বেশি সংগ্রহ করেছে। এর বড় অংশই বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) বিতর্কিত খায়রুল হোসেন যুগে। উদ্বেগের বিষয় হলো, এসব কোম্পানির উল্লেখযোগ্য অংশ বর্তমানে আর্থিকভাবে দুর্বল; কিছু কোম্পানি উৎপাদন বন্ধ করে দিয়েছে। আইপিওর অর্থ ভিন্ন খাতে সরিয়ে নেয়া হয়েছে, শেয়ারের দাম কারসাজি করা হয়েছে এবং অভিযোগ রয়েছে যে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের প্রাক-আইপিও প্লেসমেন্ট শেয়ার উপহার হিসেবে দেয়া হয়েছিল, যারা পরে তালিকাভুক্তির পর অতিমূল্যায়িত দামে তা বিক্রি করে মুনাফা নিয়েছেন। বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব পাবলিকলি লিস্টেড কোম্পানিজের সভাপতি রিয়াদ মাহমুদের ভাষায়, কিছুসংখ্যক অসাধু উদ্যোক্তার কার্যকলাপও পুরো বাজারের ওপর বহুগুণ নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
অন্যদিকে দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে বাজারে নতুন কোনো আইপিও আসেনি—এটি নজিরবিহীন। সর্বশেষ ২০২৩-২৪ অর্থবছরে নয়টি কোম্পানি আইপিওর মাধ্যমে ৮৪১ কোটি টাকা সংগ্রহ করেছিল। মন্দাবাজার পরিস্থিতিতে উদ্যোক্তারা কম দামে শেয়ার বিক্রির আশঙ্কা করেন; ২০২৪-পরবর্তী কঠোরতর প্রকাশনা ও স্বচ্ছতা বিধি তালিকাভুক্তির ব্যয় বাড়িয়েছে; আর সাম্প্রতিক মার্কিন-ইরান উত্তেজনা ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর যে সামান্য পুনরুদ্ধারের ইঙ্গিত দেখা দিয়েছিল, তাতেও ধাক্কা দিয়েছে। এর বাইরে রয়েছে পারিবারিক ব্যবসা সংস্কৃতি।
বাংলাদেশের করপোরেট খাত এখনো প্রধানত পরিবারনিয়ন্ত্রিত। মালিকানা হ্রাস বা অংশীদারত্ব ভাগাভাগির বিষয়ে উদ্যোক্তাদের অনীহা প্রবল। বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ইফতেখার আলমের মতে, অনেক উদ্যোক্তা মনে করেন, প্রকাশ্য কোম্পানি হওয়ার খরচ—তথ্য প্রকাশ, সুশাসন, নিয়ন্ত্রক তদারকি—এর সুবিধার তুলনায় বেশি, বিশেষ করে যখন ব্যাংক ঋণ তুলনামূলক সহজলভ্য।
আরেকটি সমস্যা হলো দেশের পুঁজিবাজার অগভীর ও একমাত্রিক। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত ৬৪৫টি সিকিউরিটিজের মধ্যে মাত্র ৩৬০টি কোম্পানি। এর মধ্যে ৩২টির উৎপাদন বন্ধ এবং ৩৮টির আর্থিক প্রতিবেদনে going concern বা অব্যাহত কার্যক্রম নিয়ে সংশয় রয়েছে। বাকিগুলোর মধ্যে রয়েছে ট্রেজারি বন্ড, মিউচুয়াল ফান্ড, ডিবেঞ্চার এবং মাত্র ১৬টি করপোরেট বন্ড—৪৬০ বিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির জন্য যা অত্যন্ত অপ্রতুল।
বিশ্বের উন্নত দেশের পুঁজিবাজার বহুমাত্রিক। সেখানে বন্ড, ডেরিভেটিভস, কমোডিটি, সিকিউরিটাইজড অবকাঠামো পেপারসহ নানা উপকরণ থাকে। বাংলাদেশের বাজার কার্যত শুধু ইকুইটিনির্ভর—তাও খুবই সরু ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে। এসব কারণে বিদেশী বিনিয়োগকারীরাও ধীরে ধীরে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে নিট বিদেশী পোর্টফোলিও বিনিয়োগ সর্বোচ্চ ৬ হাজার ৭৯০ কোটি টাকায় উঠেছিল। কিন্তু ২০২০-২১ অর্থবছর থেকে তা ধারাবাহিকভাবে নেতিবাচক।
চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে নিট বিদেশী পোর্টফোলিও বিনিয়োগে ৮ দশমিক ২ মিলিয়ন ডলারের ঘাটতি দেখা গেছে। বিদেশী মূলধন কার্যত বাজার ত্যাগ করছে। এসব সমস্যার সমাধান চাইলে নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, করনীতি ও বাজার স্থাপত্য—এ তিন ক্ষেত্রেই পরিকল্পিত পুনর্বিন্যাস প্রয়োজন। এক্ষেত্রে করণীয় হতে পারে—
প্রয়োগযোগ্য শাস্তির মাধ্যমে আস্থা পুনর্গঠন: নতুন বিএসইসি নিয়মকানুন কঠোর করার উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু শুধু নিয়ম কঠোর করলেই হবে না; অতীতের কারসাজিকারীদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান, সময়বদ্ধ ও বিশ্বাসযোগ্য ব্যবস্থা নিতে হবে। গত দশকের বাজার অপরাধের বিচার না হলে কোনো প্রক্রিয়াগত সংস্কারই বিনিয়োগকারীর আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারবে না।
আইপিও অর্থকে প্রকৃত অর্থে কার্যকর করা: আইপিওর অর্থ দিয়ে ব্যাংক ঋণ পরিশোধের সীমা বর্তমানে ৩০ শতাংশ। বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব পাবলিকলি লিস্টেড কোম্পানিজের প্রস্তাব অনুযায়ী, এ সীমা ৯০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর বিষয়টি গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করা উচিত। করপোরেট ঋণের সুদ যখন ১২ শতাংশের বেশি, তখন উচ্চব্যয়ী ঋণকে ইকুইটির মাধ্যমে পুনঃঅর্থায়ন করতে দিলে কোম্পানির মূলধন ব্যয় কমবে, ব্যালান্সশিট শক্তিশালী হবে এবং ব্যাংক খাতের ওপর চাপ কমবে। করপোরেট খাতের ঋণভার কমানো নিজেই একটি উৎপাদনশীল বিনিয়োগ।
প্রকৃত বন্ডবাজার গঠন: ৪৬০ বিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে মাত্র ১৬টি করপোরেট বন্ড থাকা লজ্জাজনক। ব্যাংক আমানতের সঙ্গে করসমতা, ডিএসইতে কার্যকর গৌণবাজার এবং বিশ্বাসযোগ্য yield curve তৈরি করতে সার্বভৌম বন্ড ইস্যু—এসবই পূর্বশর্ত। অবকাঠামো অর্থায়নে সিকিউরিটাইজেশন ব্যবহারের যে পরিকল্পনা বহুদিন ধরে আলোচনায় আছে, এখন সেটিকে বক্তৃতা থেকে বাস্তব ইস্যুতে রূপান্তর করতে হবে। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ইঙ্গিত দিয়েছেন যে বিষয়টি সরকারের এজেন্ডায় রয়েছে; এখন মূল পরীক্ষা হলো বাস্তবায়ন।
তালিকাভুক্তির প্রণোদনা বাড়ানো: তালিকাভুক্ত ও অ-তালিকাভুক্ত কোম্পানির করহারের পার্থক্য এতই কম যে এটি পরিবারনিয়ন্ত্রিত কোম্পানিগুলোকে মালিকানা ছাড়তে উৎসাহিত করে না। তালিকাভুক্ত কোম্পানির জন্য অর্থবহ করছাড়, বেনামি মালিকানার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা এবং বড় অ-তালিকাভুক্ত কোম্পানির জন্য কঠোর সুশাসন বিধি প্রণয়ন করলে উদ্যোক্তাদের হিসাব-নিকাশ বদলাতে পারে।
বড় প্রকল্পে পুঁজিবাজার অংশগ্রহণ বাধ্যতামূলক করা: একটি নির্দিষ্ট সীমার ওপর প্রকল্প অর্থায়নে ইকুইটি, বন্ড বা সুকুকের মতো পুঁজিবাজারভিত্তিক উপাদান বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে। ব্যাংক খাতে দীর্ঘস্থায়ী তারল্য চাপের বাস্তবতায় এটি আর বিলাসী চিন্তা নয়, বরং প্রয়োজনীয় সংস্কার।
প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীর ভিত্তি গভীর করা: পেনশন ফান্ড, দীর্ঘদিন বিলম্বিত সর্বজনীন পেনশন স্কিম, বীমা রিজার্ভ এবং সুশাসিত মিউচুয়াল ফান্ড—এসবই পুঁজিবাজারের প্রয়োজনীয় দীর্ঘমেয়াদি মূলধনের উৎস। কিন্তু তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণের জন্য নিয়ন্ত্রক স্বচ্ছতা, করনিরপেক্ষতা ও ইনসাইডার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে কঠোর প্রয়োগ দরকার।
কৌশলগত অপরিহার্যতা
বাংলাদেশের পুঁজিবাজার সংকট কেবল শেয়ারবাজারের সংকট নয়, এটি জাতীয় অর্থায়ন কাঠামোর সংকট। ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর আরো চাপ বাড়িয়ে বাংলাদেশ শিল্পায়নের পরবর্তী ধাপে যেতে পারবে না, প্রবৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়তে পারবে না এবং ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের বোঝাও কমাতে পারবে না। হিসাবটি আর মেলে না।
প্রতিটি সফল এশীয় অর্থনীতিতে কার্যকর পুঁজিবাজার করপোরেট অর্থায়নের দ্বিতীয় ইঞ্জিন হিসেবে কাজ করেছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ব্যাংক ব্যবস্থা এমন বোঝা বহন করছে, যার জন্য সেটি নকশাগতভাবে প্রস্তুত নয়; আর ইকুইটি বাজার ৫০ বছর পরও মোট বিনিয়োগের মাত্র ৬ শতাংশ অর্থায়ন করছে। এ অচলাবস্থা নিজে নিজে ভাঙবে না। প্রশ্ন হলো, বর্তমান সরকারের কি সেই রাজনৈতিক সুযোগ ও প্রাতিষ্ঠানিক সদিচ্ছা আছে, যা পূর্ববর্তী সরকারগুলো দেখাতে পারেনি?
এম কবির হাসান: নিউ অরলিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের ফাইন্যান্সের অধ্যাপক ও মফেট চেয়ার; এএওআইএফআইয়ের নৈতিকতা ও গভর্ন্যান্স বোর্ডের সদস্য




