নিরাপদ অভিবাসনে রাষ্ট্রের নতুন ভাবনা জরুরি

নিরাপদ অভিবাসনে রাষ্ট্রের নতুন ভাবনা জরুরি
কলামবাংলাদেশ

নিরাপদ অভিবাসনে রাষ্ট্রের নতুন ভাবনা জরুরি

৮ আগস্ট, ২০২৬

ড. সুলতান মাহমুদ রানা [প্রকাশ: কালের কণ্ঠ, ০৮ আগস্ট, ২০২৬]

গত ৩০ জুলাই কালের কণ্ঠে প্রকাশিত ‘প্রতারণা ও প্রযুক্তির ফাঁদে বাড়ছে পাচার’ শিরোনামে প্রতিবেদন দেখে বেশ কয়েকটি বিষয় মাথায় ঘুরপাক খেতে শুরু করেছে। ওই প্রতিবেদনে বেশ কিছু হৃদয়বিদারক ঘটনার অবতারণা করা হয়েছে।

 
 
মূলত সারা দেশে প্রতারকচক্র ওত পেতে আছে কিভাবে কার সঙ্গে প্রতারণা করে বিপুল অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেওয়া যায়। বাংলাদেশের গ্রামবাংলার একটি পরিচিত দৃশ্য হলো—পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম সদস্য বিদেশে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। বাড়ির আঙিনায় আত্মীয়-স্বজনের ভিড়, সবার চোখে আশার আলো। কেউ জমি বিক্রি করেছেনকেউ গয়না বন্ধক রেখেছেন, আবার কেউ উচ্চ সুদে ঋণ নিয়েছেন।
 
 

 

 

অনেকের কাছে বিদেশযাত্রা নতুন জীবনের সূচনা হলেও অনেকেই প্রতারণা এবং অনিশ্চয়তার শিকার হচ্ছেন অহরহ।

 

 

প্রতিবছর লক্ষাধিক বাংলাদেশি বিভিন্ন দেশে কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে পাড়ি জমান।

 
 

 

দ্বিতীয়ত, দেশে একই ধরনের শ্রমের জন্য যে পারিশ্রমিক পাওয়া যায়, বিদেশে তার কয়েক গুণ বেশি আয় করার সুযোগ থাকে। একজন নির্মাণ শ্রমিক, ইলেকট্রিশিয়ান, ওয়েল্ডার, প্লাম্বার কিংবা গৃহকর্মী বিদেশে যে আয় করতে পারেন, তা দিয়ে দেশে পরিবার চালানো, ঋণ পরিশোধ এবং কিছু সঞ্চয় করা তুলনামূলকভাবে সম্ভব হয়।

 

 

তৃতীয়ত, বাংলাদেশের বহু অঞ্চলে বিদেশফেরত ব্যক্তিদের সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি পায়। নতুন বাড়ি নির্মাণ, জমি ক্রয়, ব্যবসা প্রতিষ্ঠা কিংবা সন্তানদের উন্নত শিক্ষার ব্যবস্থা—এসব দৃশ্য অন্যদেরও বিদেশে যাওয়ার অনুপ্রেরণা জোগায়। ফলে বিদেশে কর্মসংস্থান একটি অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তের পাশাপাশি সামাজিক আকাঙ্ক্ষায়ও পরিণত হয়েছে।

 

 

চতুর্থত, বৈশ্বিক শ্রমবাজারের চাহিদা। বিশ্বের অনেক উন্নয়নশীল ও উন্নত দেশে নির্মাণ, কৃষি, সেবা ও উৎপাদন খাতে শ্রমিকের চাহিদা রয়েছে। বাংলাদেশ এই চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ শ্রম সরবরাহকারী দেশগুলোর একটি। কিন্তু এই সুযোগ যত বেড়েছে, ততই সক্রিয় হয়েছে প্রতারণাকারী দালালচক্র।

 

 

বাস্তবতা হলো, বেশির ভাগ বিদেশগামী কর্মী সরাসরি অনুমোদিত রিক্রুটিং এজেন্সির সঙ্গে যোগাযোগ করেন না। তাঁরা পরিচিত একজন দালাল, আত্মীয়, গ্রামের প্রভাবশালী ব্যক্তি কিংবা স্থানীয় মধ্যস্বত্বভোগীর ওপর নির্ভর করেন। কারণ তাঁদের ধারণা, এই ব্যক্তিরাই দ্রুত ভিসা, চাকরি ও বিদেশে যাওয়ার ব্যবস্থা করতে পারবেন। এখান থেকেই প্রতারণার শুরু।

 

 

গত ৩০ জুলাইয়ে কালের কণ্ঠে প্রকাশিত উপরোল্লিখিত প্রতিবেদনে প্রতারণার ধরন প্রসঙ্গে ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। আগে প্রতারণা সীমাবদ্ধ ছিল মৌখিক প্রতিশ্রুতিতে; এখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, ভুয়া ওয়েবসাইট, নকল লাইসেন্স, অনলাইন বিজ্ঞাপন এবং ডিজিটাল পেমেন্টের মাধ্যমেও সংঘবদ্ধ প্রতারণা চলছে। অনেক ক্ষেত্রে ভুয়া অফিস খুলে নিজেদের বৈধ প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচয় দেওয়া হয়। বিদেশি কম্পানির নকল লোগো, ভুয়া নিয়োগপত্র এবং জাল কন্ট্রাক্ট ব্যবহার করে সাধারণ মানুষকে বিশ্বাস করানো হয় যে তারা আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করছে। ফলে প্রতারণা আরো সংগঠিত ও প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে উঠেছে।

 

 

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, প্রতারণার শিকার ব্যক্তি শুধু অর্থ হারান না; হারান সময়, আত্মবিশ্বাস এবং পরিবারের ভবিষ্যৎ। যাঁরা ঋণ নিয়ে বিদেশে যাওয়ার চেষ্টা করেন, তাঁদের অনেকেই প্রতারণার পর ঋণের বোঝা বহন করতে গিয়ে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সংকটে পড়েন। অনেক পরিবারে সন্তানদের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়, চিকিৎসা ব্যাহত হয়, এমনকি পারিবারিক সম্পর্কেও টানাপড়েন সৃষ্টি হয়। অর্থাৎ একজন ব্যক্তির প্রতারণা একটি পুরো পরিবারকে বিপর্যস্ত করে দিতে পারে।

 

 

বিষয়টি মানবাধিকার এবং রাষ্ট্র পরিচালনারও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। যে রাষ্ট্র তার নাগরিকদের বৈধভাবে বিদেশে পাঠিয়ে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে, সেই রাষ্ট্রের নৈতিক ও সাংবিধানিক দায়িত্ব হলো তাঁদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। বিদেশযাত্রার প্রতিটি ধাপ—তথ্য প্রদান, নিবন্ধন, প্রশিক্ষণ, আর্থিক লেনদেন, চুক্তি যাচাই এবং বিদেশে আইনি সহায়তা প্রভৃতি যদি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক না হয়, তাহলে প্রতারণার সুযোগ থেকেই যাবে।

 

 

ফেসবুকহোয়াটসঅ্যাপটেলিগ্রাম কিংবা ইউটিউবের মাধ্যমে বিদেশে চাকরির আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপন প্রচার করা হয়। সেখানে বিলাসবহুল জীবনযাপনের ছবি, উচ্চ বেতনের দাবি এবং দ্রুত ভিসার নিশ্চয়তা দিয়ে মানুষের মনস্তত্ত্বকে প্রভাবিত করা হয়। অনেকেই যাচাই-বাছাই না করেই অনলাইনে টাকা পাঠিয়ে দেন। পরে যোগাযোগের সব মাধ্যম বন্ধ হয়ে যায়।

 

 

বিশ্বের অন্যান্য দেশও একসময় একই ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হয়েছিল। কিন্তু তারা ধীরে ধীরে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের মাধ্যমে পরিস্থিতির উন্নতি করেছে। উদাহরণ হিসেবে ফিলিপাইনের কথা উল্লেখ করা যায়। দেশটি বিদেশে শ্রমিক পাঠানোর পুরো প্রক্রিয়াকে কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়ন্ত্রণ করে। লাইসেন্সধারী রিক্রুটিং এজেন্সির তালিকা, অনুমোদিত চাকরির তথ্য, অভিযোগব্যবস্থা, প্রশিক্ষণ এবং শ্রমিকের অধিকার—সবকিছু একটি সমন্বিত কাঠামোর মধ্যে পরিচালিত হয়। বিদেশে কর্মরত শ্রমিকদের সহায়তায় দূতাবাসগুলোর ভূমিকাও অত্যন্ত সক্রিয়।

 

 

নেপালও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শ্রমিকদের জন্য ডিজিটাল নিবন্ধন, চুক্তিপত্র যাচাই এবং অনলাইন তথ্য সেবা সম্প্রসারণ করেছে। ফলে দালালনির্ভরতা কিছুটা কমেছে। শ্রীলঙ্কা বিদেশগামী শ্রমিকদের জন্য বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণ ও নিবন্ধন ব্যবস্থা চালু করেছে। প্রশিক্ষণে শুধু ভাষা বা কাজের দক্ষতা নয়, আইনি অধিকার, আর্থিক ব্যবস্থাপনা এবং বিদেশে সমস্যা হলে কোথায় যোগাযোগ করতে হবে—এসব বিষয়ও শেখানো হয়।

 

 

বাংলাদেশের জন্য এসব অভিজ্ঞতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আমাদের সমস্যার মূল কারণ শুধু কয়েকজন অসাধু ব্যক্তি নয়, বরং পুরো ব্যবস্থার দুর্বলতা। যখন তথ্য সহজলভ্য হয় না, অভিযোগের দ্রুত নিষ্পত্তি হয় না, আর্থিক লেনদেন স্বচ্ছ থাকে না এবং সাধারণ মানুষ অনুমোদিত ও অননুমোদিত প্রতিষ্ঠানের পার্থক্য বুঝতে পারেন না, তখন প্রতারণা অনিবার্য হয়ে ওঠে।

 

 

যদি প্রতারণা ঘটার পর গ্রেপ্তারই একমাত্র কৌশল হয়, তাহলে নতুন দালাল, নতুন অফিস এবং নতুন নামে একই অপরাধ আবার ফিরে আসবে। কিন্তু যদি পুরো নিয়োগব্যবস্থা এমনভাবে গড়ে তোলা যায়, যেখানে প্রতিটি লেনদেন, প্রতিটি চুক্তি, প্রতিটি ভিসা এবং প্রতিটি নিয়োগ অনলাইনে যাচাই করা যায়, তাহলে প্রতারণার সুযোগ অনেকাংশে কমে যাবে। অতএব, নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজন একটি আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর এবং জবাবদিহিমূলক প্রশাসনিক কাঠামো। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার মানুষ। আর সেই মানুষ যদি বিদেশে যাওয়ার আগেই প্রতারণার শিকার হন, তাহলে সেই রাষ্ট্র কোনোভাবেই যথাযথ উন্নয়ন কিংবা অগ্রগতির পথে হাঁটতে পারবে না।

 

লেখক : অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

ট্যাগ:BCSকলামবাংলাদেশ