সামগ্রিক অর্থনীতি, শিল্প উৎপাদন, কৃষি ব্যবস্থা, রফতানি সক্ষমতা, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, কর্মসংস্থান থেকে শুরু করে সামাজিক স্থিতিশীলতাও ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা অনিরাপদ অবস্থায় রয়েছে। আমদানিনির্ভর জ্বালানি নীতি অনুসরণ করায় বাংলাদেশকে বর্তমানে একদিকে জ্বালানি পণ্য সরবরাহ ঘাটতি এবং অন্যদিকে ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের মতো ‘ডবল প্রেশার’ বা দ্বৈত চাপের মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে। এদিকে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাত, বিশেষত সৌরবিদ্যুতের সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর ক্ষেত্রেও আমরা অনেক পিছিয়ে আছি। বর্তমানে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অবদান ৫ শতাংশেরও নিচে। অথচ বিশ্বব্যাপী এ হার অনেক স্থানে ৩০ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। এক্ষেত্রে নীতিগত, আর্থিক, করশুল্ক-সংক্রান্ত এবং প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিবন্ধকতার কারণেই আমরা পিছিয়ে আছি। প্রযুক্তিগত সংকট এখানে গুরুত্বপূর্ণ নয়।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারে অর্থনৈতিক সুবিধা আদায়ের আঞ্চলিক প্রতিযোগিতার দিক বিবেচনায়ও বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়ছে। ভারত, পাকিস্তান, ভিয়েতনাম ও চীন নবায়নযোগ্য জ্বালানি সরঞ্জামের ওপর শূন্য বা অত্যন্ত কম আমদানি শুল্ক, কর অব্যাহতি এবং স্বল্প সুদের অর্থায়ন করেছে। এভাবে দেশগুলো সৌর ও বায়ুবিদ্যুৎ খাতে দ্রুত অগ্রগতি অর্জন করেছে। অনেক দেশে লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি এবং এনার্জি স্টোরেজ সিস্টেমের ওপর শুল্ক শূন্য বা খুব কম রাখা হয়েছে। অথচ বাংলাদেশে বর্তমানে ব্যাটারি আমদানির ওপরও ৫০-৬০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করা হয়।
দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের মূল প্রতিবন্ধকতাগুলো সামান্য নয়। নবায়নযোগ্য জ্বালানি ভিত অবকাঠামো স্থাপনের সরঞ্জামের ওপর ২৮-৮৯ শতাংশ পর্যন্ত আমদানি শুল্ক, ভ্যাট ও কর আরোপ করা হয়েছে। আবার নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারে উৎসাহ দিতে রুফটপ সোলার ও আবাসিক গ্রাহকদের জন্য সহজ ঋণের অভাব রয়েছে। যদিও বা এ-সংশ্লিষ্ট অর্থায়ন ব্যবস্থা রয়েছে কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের তহবিলের সীমাবদ্ধতার কারণে তা সম্ভাব্য সব গ্রাহকের কাছে পৌঁছাচ্ছে না। অর্থায়নের প্রক্রিয়া জটিল ও অনুমোদনেও অনেক সময় লাগে।
নেট মিটারিং ব্যবস্থার ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রতা ও প্রশাসনিক বাধা আরেকটি সমস্যা। রুফটপ সোলার, ইউটিলিটি সোলার, ভাসমান সোলার, এগ্রিভোল্টাইকস, সৌর সেচের মতো আলাদা আলাদা ক্ষেত্রের অন্য পৃথক ও সুস্পষ্ট নীতিমালার অভাব আছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি জনপ্রিয় করতে মার্চেন্ট পাওয়ার পলিসিরও অভাব আছে। স্থানীয় পর্যায়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের অবকাঠামো নির্মাণের ক্ষেত্রেও ব্যাপক দুর্বলতা দেখা গেছে। গ্রিড অবকাঠামো, স্মার্ট গ্রিড এমনকি গোটা ব্যবস্থাকে ডিজিটালাইজেশনের ক্ষেত্রেও উদ্যোগ নেই। এসব সমস্যার কারণেই নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের পূর্ণাঙ্গ সম্ভাবনাকে আমরা কাজে লাগাতে পারছি না। এজন্য একটি সমন্বিত, ধাপভিত্তিক ও বাস্তবমুখী জাতীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি পথনকশা নেয়া জরুরি। এ পথনকশায় স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পর্যায়ে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা যেতে পারে।
স্বল্পমেয়াদে গুরুত্ব পাক দ্রুত সংকট নিরসন
মূলত প্রাথমিকভাবে ছয় মাসের মধ্যে দ্রুত সংকট নিরসন, লোডশেডিং কমানো এবং ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করা যায় এমন পরিকল্পনাগুলোকে স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনায় রাখতে হবে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি সরঞ্জামের ওপর কাস্টমস ডিউটি এবং অন্যান্য কর থাকলে তা শূন্যে নামিয়ে আনা জরুরি। নবায়নযোগ্য জ্বালানি অবকাঠামোর সরঞ্জাম ও প্রযুক্তির ওপর শুল্ক সম্পূর্ণরূপে প্রত্যাহার করতে হবে। রুফটপ সোলার স্থাপন করা হলে ১৫-৩০ দিনের মধ্যেই নেট মিটারিং চালু করতে হবে। এ প্রক্রিয়াকে সহজ করার পাশাপাশি ওয়ান স্টপ সার্ভিসও চালু করতে হবে।
শিল্প ও বাণিজ্যিক খাতগুলোতে সৌরবিদ্যুৎ অবকাঠামো স্থাপনের জন্য বিশেষ প্রণোদনা দেয়া জরুরি। দেশে স্থগিত বা বাতিল হওয়া ৩১টি সোলার প্রকল্পকে আবার পুনর্মূল্যায়ন করা যেতে পারে। এর মধ্যে লাভবান প্রকল্পগুলোকে আবার পুনরুজ্জীবিত করা যায়। নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পগুলো যৌক্তিক পর্যায়ে নির্ধারণ করতে হবে। যেহেতু নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও জীবাশ্ম জ্বালানির নীতিসহায়তার মধ্যে ব্যাপক পার্থক্য আছে, সেহেতু নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পগুলোর বিদ্যুৎ সঞ্চালন ব্যয়ও কমিয়ে আনতে হবে। মূলত এ জ্বালানিকে এখন জনপ্রিয় করতে হবে। সেজন্য রুফটপ সোলার একটি জনপ্রিয় পদ্ধতি। কিন্তু এর জন্য স্বল্প সুদের ঋণ চালু করতে হবে। টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বা স্রেডাকেও স্বাধীন ও শক্তিশালী কমিশনে রূপ দেয়া জরুরি।
মধ্যমেয়াদে গুরুত্ব পাক নবায়নযোগ্য জ্বালানির স্থিতিশীলতা ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি
মধ্যকালীন সময়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে বেসরকারি খাতে প্রসারের বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে। এজন্য ১০-১৫ বছর মেয়াদি নবায়নযোগ্য জ্বালানি অর্থায়ন সুবিধা চালু করা যায়। এ ধরনের ঋণ সহায়তায় ৫ শতাংশ সুদ আরোপ করা যায়। এ সময়ের মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানি অবকাঠামো সরঞ্জামের এলসি সীমা ৫ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা জরুরি। গৃহস্থালি পর্যায়ের সৌরবিদ্যুতের প্রসারের জন্য ভূমি ব্যাংক ও গ্রিড অবকাঠামো নির্মাণ এ পর্যায়ে শুরু করা জরুরি। বিভিন্ন সোলার প্রকল্পের জন্য ১০-১৫ বছরের কর হলিডে চালু করা গেলে এ সময়ের মধ্যেই এ খাত জনপ্রিয় হয়ে উঠবে। কৃষি খাতেও নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে হবে। দেশে ১৭ লাখ ডিজেলচালিত সেচ পাম্পকে সোলার পাম্পে রূপান্তর করতে হবে।
সরকারি ভবনগুলোর ছাদে রুফটপ সোলার বাধ্যতামূলক করতে হবে। ধীরে ধীরে শিল্পকারখানা ও বাণিজ্যিক ক্ষেত্রগুলোর ছাদেও এ প্রযুক্তির প্রসার বাড়াতে হবে। এজন্য প্রণোদনাও দেয়া যেতে পারে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারে সংশ্লিষ্টদের দক্ষতা ও জ্ঞান বাড়াতেই আলাদা প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু করা যেতে পারে। আবাসিক ভবনের নকশা অনুমোদনের সময় ছাদে সৌরবিদ্যুৎ অবকাঠামো স্থাপনের বিষয়টি আছে কিনা তা নিশ্চিত হতে হবে। এমনকি ভবনগুলো যেন এ প্রযুক্তি স্থাপন সহযোগী হয় তা বাধ্যতামূলক নির্দেশনা হিসেবে রাখা জরুরি। আবাসিক ভবনগুলোতে জেনারেটরের বদলে হাইব্রিড সোলার সিস্টেমকে বাধ্যতামূলক করার বিষয়টিও ভাবতে হবে।
দীর্ঘমেয়াদে টেকসইয়তা নিশ্চিত করায় গুরুত্ব পাক
দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে ২০৩০ সাল নাগাদ ১০ হাজারেরও বেশি মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা অর্জন করার লক্ষ্যে যেতে হবে। এজন্য অফশোর ও অনশোর বায়ুবিদ্যুৎ ব্যবস্থার উন্নয়ন করতে হবে। ভাসমান ও নদীতীরবর্তী সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে উৎপাদন সক্ষমতা ক্রমান্বয়ে বাড়ানো যাবে। পরিবেশ সংবেদনশীল সৌরবিদ্যুৎ মডেল তৈরির জন্য গবেষণা ও পরীক্ষা বাড়াতে হবে।
জাতীয় পর্যায়ে জ্বালানি সংরক্ষণ নীতিমালাও এ সময়ের মধ্যে তৈরি করতে হবে। জ্বালানি খাতকে সম্পূর্ণ ডিজিটালাইজেশনের আওতায় এনে ব্যয় ও বিতরণ নিশ্চিত করতে হবে। স্থানীয় পর্যায়ে নীতিসহায়তা দিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদন বাড়াতে হবে। আঞ্চলিক পর্যায়ে জ্বালানি বাণিজ্য সম্প্রসারণে কূটনৈতিক পদক্ষেপ বাড়াতে হবে।
উল্লিখিত পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়ন করা হলে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক, কৌশলগত ও সামাজিক সুফল অর্জন করতে পারবে। জ্বালানি আমদানি ব্যয় কমবে, বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ হ্রাস পাবে, শিল্প খাতে উৎপাদন ব্যয় কমে প্রতিযোগিতা বাড়বে, রফতানি সক্ষমতা শক্তিশালী হবে এবং ভর্তুকির বোঝা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে। একই সঙ্গে প্রতি মেগাওয়াটে ২০-২৫ জনের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারে, যা বৃহৎ পরিসরে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করবে। এসব খাতে নতুন দক্ষ জনশক্তি ও উদ্যোক্তা তৈরি হবে।
দেশের বর্তমান জ্বালানি সংকট একটি বড় চ্যালেঞ্জ হলেও এটি একই সঙ্গে একটি ঐতিহাসিক সুযোগ। এ মুহূর্তে সঠিক নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা গেলে বাংলাদেশ আমদানিনির্ভর, ব্যয়বহুল ও অনিশ্চিত জ্বালানি ব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে এসে একটি স্বনির্ভর, সাশ্রয়ী, বিনিয়োগবান্ধব এবং টেকসই জ্বালানি ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে পারবে। ভবিষ্যতের প্রশ্ন এটি নয় যে বাংলাদেশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি গ্রহণ করবে কিনা। আসল প্রশ্ন হলো বাংলাদেশ কত দ্রুত ও পরিকল্পিতভাবে এবং কত সাহসিকতার সঙ্গে এ রূপান্তর সম্পন্ন করতে পারবে।
মোহাম্মদ আতাউর রহমান সরকার রোজেল: প্রকৌশলী; সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ সাসটেইনেবল অ্যান্ড রিনিউয়েবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশন (বিএসআরইএ) চেয়ারম্যান, ফিলামেন্ট ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেড




