কৃষিতে উৎপাদন বাড়াতে নানামুখী উদ্যোগ প্রয়োজন

কৃষিতে উৎপাদন বাড়াতে নানামুখী উদ্যোগ প্রয়োজন
কলামবাংলাদেশ

কৃষিতে উৎপাদন বাড়াতে নানামুখী উদ্যোগ প্রয়োজন

১২ জুলাই, ২০২৬

ড. জাহাঙ্গীর আলম [প্রকাশ : যুগান্তর, ১৬ মে ২০২৬]

বাংলাদেশের কৃষকরা আবহমান কাল ধরেই অবহেলিত। তাঁদের আয় সীমিত।

উৎপাদন কার্যক্রমে প্রণোদনা কম। খরচ বেশি। কৃষি উপকরণ সংগ্রহ করার জন্য প্রায়ই গলদঘর্ম হতে হয় কৃষকদের। উৎপাদিত পণ্য বিক্রি করার সময় তাঁরা অহরহই ন্যায্য দাম পান না।
 
 
 
 
 
 
 

 

বাংলা বর্ষপঞ্জির ১৪৩৩ সালের প্রথম লগ্নে গত পহেলা বৈশাখ টাঙ্গাইলের শহীদ মারুফ স্টেডিয়ামে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান উদ্বোধন করেন কৃষক কার্ড। প্রথম ধাপে দেশের ১০টি জেলার ১১টি উপজেলায় প্রায় ২১ হাজার ভূমিহীন, প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষকদের মধ্যে এই কার্ড বিতরণ করা হচ্ছে। আগামী চার বছরের মধ্যে দেশের সব কৃষকের কাছে এই কার্ড পৌঁছে দেওয়া হবে।

 

 

কৃষি কার্ড মূলত কৃষকদের শনাক্তকরণ কার্ড। এটিকে কৃষকদের জন্য মর্যাদার স্বীকৃতি ও সুরক্ষার প্রতীক হিসোবে বিবেচনা করেছেন অনেকে। এ কার্ডের মাধ্যমে ১০ প্রকার সুবিধা পাবেন একজন কৃষক। এগুলো হলো এক. ন্যায্যমূল্যে কৃষি উপকরণ, দুই. ন্যায্যমূল্যে সেচ সুবিধা, তিন.  সহজ শর্তে কৃষিঋণ, চার. স্বল্পমূল্যে কৃষি যন্ত্রপাতি প্রাপ্তি, পাঁচ. সরকারি ভর্তুকি ও প্রণোদনা, ছয়. মোবাইল ফোনে আবহাওয়ার পূর্বাভাস ও বাজার তথ্য, সাত. কৃষিবিষয়ক প্রশিক্ষণ, আট. ফসলের রোগ-বালাই দমনের পরামর্শ, নয়. কৃষি বীমা সুবিধা এবং দশ. ন্যায্যমূল্যে কৃষিপণ্যের বিক্রি সুবিধা। এ কার্ডের মাধ্যমে ফসল উৎপাদনকারী কৃষকের পাশাপাশি মৎস্য চাষি/আহরণকারী, প্রাণিসম্পদ খাতে নিয়োজিত খামারি ও ফসল চাষি সরকারের তথ্যভাণ্ডারে সংযুক্ত থাকবে।  এতে ভূমিহীন, প্রান্তিক, ক্ষুদ্র, মাঝারি ও বড় শ্রেণির কৃষককে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থায়নের ক্ষেত্রে এ কার্ড বিশেষ ভূমিকা পালন করতে পারে। এটি একটি ব্যাংকিং ডেবিট কার্ড। সোনালী ব্যাংকের স্থানীয় পর্যায়ের শাখায় সংশ্লিষ্ট কৃষকদের নামে এই কার্ডের বিপরীতে ব্যাংক হিসাব খোলা হচ্ছে। এর মাধ্যমে ভূমিহীন, প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষকদের বছরে আড়াই হাজার টাকা নগদ দেওয়া হবে।

 

 

আগের সরকারের আমলেও কৃষি উপকরণ কার্ড বিতরণ করা হয়েছিল কৃষকদের মধ্যে। কিন্তু এর তেমন কোনো ব্যবহার ছিল না। অনেক কৃষক এটি পলিথিনে মুড়িয়ে ট্রাংক অথবা আলমারিতে বন্দি করে রেখেছিলেন। সরকারের পক্ষ থেকে নগদ সহায়তা পেতে ব্যবহৃত হয়েছে জাতীয় পরিচয়পত্র। ডিলারের মাধ্যমে তাঁরা সার ও বীজ নিয়েছেন স্বাভাবিক নিয়মে, কোনো কার্ড ছাড়াই। এবার প্রগতিশীল হারে ভর্তুকিযুক্ত উপকরণ এবং নগদ সহায়তা নিতে হলে নতুন কৃষি কার্ড যথেষ্ট গুরুত্ব বহন করতে পারে। তা ছাড়া লক্ষ্যভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবা প্রদান ও দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যুর ক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণ প্রদানে এ কার্ডটি ব্যবহার করা যেতে পারে। বর্তমানে কৃষিঋণের প্রাপ্তি অনেকটা জামানতের ওপর নির্ভরশীল। ভূমিহীন ও বর্গাচাষিদের পক্ষে জামানত প্রদানের সুযোগ কম। সে ক্ষেত্রে কৃষক কার্ডই জামানত হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। কৃষকদের বৃদ্ধ অবস্থায় পেনশন সুবিধা চালু করা ও সরকারি অনুদান কৃষকদের হাতে পৌঁছে দেওয়ার জন্যও কৃষক কার্ড ব্যবহৃত হতে পারে।

 

 

বিএনপি সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম যে প্রশংসনীয় কাজটি করে, সেটা হলো ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া কৃষিঋণ সুদসহ মওকুফ। ২০২৬ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। এর আগে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সরকারের ১৯৯১-৯৬ মেয়াদকালে পাঁচ হাজার টাকা কৃষিঋণের সুদ-আসল মওকুফ করা হয়েছিল। এবার ১০ হাজার টাকা মওকুফের বিষয়টি বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে সন্নিবেশিত ছিল। এই উদ্যোগে প্রায় ১৩ লক্ষ ১৭ হাজার ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক উপকৃত হয়েছেন বলে জানা গেছে। তাতে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে এক হাজার ৫৬৮ কোটির বেশি টাকা ব্যয় হচ্ছে। ফসল, মৎস্য ও পশুপালন খাতে নেওয়া ঋণের ওপর এই সুবিধা প্রযোজ্য হয়েছে। এর মূল  লক্ষ্য হলো দরিদ্র কৃষকদের সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং কৃষি খাতের মেরুদণ্ডকে শক্তিশালী করা। এর ফলে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকরা ঋণের দায় থেকে মুক্ত হতে পারবেন। যা তাদের কর্মস্পৃহাকে বৃদ্ধি করবে এবং দেশের কৃষি খাতে উৎপাদন বৃদ্ধিতে সহায়তা করবে।

 

 

বাংলাদেশে বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময়ও কৃষিঋণের সুদ অথবা সুদ-আসল মওকুফ করার দৃষ্টান্ত আছে। কিন্তু এটিকে সবাই স্বাগত জানায় না। তাতে এক ধরনের ঋণ পরিশোধ না করার সংস্কৃতি গড়ে ওঠে। ফলে খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি পায়। তার চেয়ে সঠিকভাবে ঋণের ব্যবহার এবং কৃষির উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির ওপর তারা গুরুত্ব আরোপ করেন। যাতে কৃষকদের ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। একই সঙ্গে কৃষি খাতে প্রাতিষ্ঠানিক ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধির ওপরও গুরুত্ব আরোপ করা হয়। বর্তমানে মোট প্রাতিষ্ঠানিক ঋণের মাত্র ২ শতাংশ কৃষিতে প্রদান করা হয়। মোট কৃষি পরিবারের মাত্র ২২ শতাংশ উক্ত প্রাতিষ্ঠানিক ঋণের আওতায় এসেছে। এর পরিসর বাড়ানো দরকার।

 

 

সরকারের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ খাল-নদী খনন ও পুনঃখননের কর্মসূচি বাস্তবায়ন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গত ১৬ মার্চ দিনাজপুরের কাহারোলে সাহাপাড়া খাল পুনঃখনন কার্যক্রম উদ্বোধনের মাধ্যমে দেশব্যাপী খাল খনন কর্মসূচির সূচনা করেন। এই উদ্যোগের লক্ষ্য হচ্ছে, আগামী পাঁচ বছরে ২০ হাজার কিলোমিটার নদী-নালা, খাল-বিল খনন বা পুনঃখনন করে সেচব্যবস্থার উন্নয়ন, জলাবদ্ধতা নিরসন এবং কৃষি উৎপাদন বাড়ানো। শুষ্ক মৌসুমে ভূ-উপরিস্থ পানি ব্যবহারের মাধ্যমে সেচ সম্প্রসারণ ও বৃষ্টির পানি ধরে রেখে কাজে লাগানো এর প্রধান উদ্দেশ্য। এ কর্মসূচি স্থানীয় কৃষিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে এবং গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করবে বলে আশা করা হচ্ছে।

 

 

বাংলাদেশে মোট সেচ এলাকা ৯৭.৯০ লক্ষ হেক্টের। মোট আবাদি জমির প্রায় ৭৪ শতাংশ সেচের আওতাভুক্ত। এর মধ্যে ৭১.৭৩ শতাংশ ভূ-গর্ভস্থ পানি ব্যবহার করে সেচ দেওয়া হয়। ভূ-উপরিস্থ পানি ব্যবহার করে সেচ দেওয়া হয় ২৮.৫৭ শতাংশ জমিতে। পানি সেচের ক্ষেত্রে ভূ-গর্ভস্থ পানির বিপুল ব্যবহারের কারণে ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর ক্রমেই নিচে নেমে যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে এখন নলকূপের পাম্প দিয়ে প্রয়োজনীয় পানি উঠে আসছে না। তাতে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের শঙ্কা দেখা দিয়েছে। এ কারণে ভূ-উপরিস্থ পানি ব্যবহারের মাধ্যমে সেচ সম্প্রসারণের জন্য গুরুত্ব আরোপ করা হচ্ছে। সে ক্ষেত্রে নদী ও খাল খনন এবং পুনঃখননের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। আমাদের দেশের অধিকাংশ নদী বর্তমানে নাব্যতা হারিছে। খালগুলো ভরাট হয়ে পানিপ্রবাহে বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে। অনেক খাল দখল করে বাড়িঘর নির্মাণ করা হচ্ছে। তাতে পানি সেচ ও নিষ্কাশন হুমকির মুখে পড়েছে। কোনো কোনো এলাকায় জলাবদ্ধতার কারণে ফসল বিনষ্ট হচ্ছে। এর প্রতিকার দরকার।

 

 

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে ব্যাপকভাবে খাল খনন ও পুনঃখনন কর্মসূচির সূত্রপাত হয় ১৯৭৬ সালে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের উদ্যোগে। পরবর্তী ছয় বছর প্রায় পৌনে ছয় হাজার কিলোমিটার খাল খনন, পুনঃখনন কাজ সম্পন্ন হয়। তার ইতিবাচক প্রভাব পরিলক্ষিত হয় খাদ্যশস্যের উৎপাদন বৃদ্ধির ওপর। ১৯৮১ সালে দেশকে খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ম্ভর বলে ঘোষণা করা হয়। ওই বছর ১০ হাজার টন চাল বিদেশে রপ্তানি করা হয়। সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের উদ্যোগে পরিচালিত উলশি যদুনাথপুর খাল খনন প্রকল্প বাংলাদেশের কৃষির ইতিহাসে এবং স্থানীয় উন্নয়নের ক্ষেত্রে একটি ঐতিহাসিক ও গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। ১৯৭৬ সালের ১ নভেম্বর তিনি যশোরের শার্শা উপজেলার উলশি যদুনাথপুর এলাকায় এই খাল খনন কর্মসূচির উদ্বোধন করেছিলেন। এটি ছিল স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে দেশব্যাপী খাল খনন কর্মসূচির প্রথম প্রকল্প। 

 

 

 

বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে খাল-নদী খনন ও পুনঃখননের যে কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে তাতে স্বেচ্ছাশ্রমের উপকরণ থাকতে পারে। তাতে এ কর্মসূচির প্রতি জনগণের সম্পৃক্ততা বৃদ্ধি পাবে। তবে বৃহত্তর পরিসরে এর সাফল্য নির্ভর করবে রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগের ওপর।  তাতে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পাবে। গরিব খেটে খাওয়া মানুষের আয়ের পথ সুগম হবে। তাদের দারিদ্র্য লাঘব হবে। এ ক্ষেত্রে সরকারি অর্থ খরচের স্বচ্ছতা ও গুণগত মান নিশ্চিত করা প্রয়োজন। শীতকালে যে খালগুলো খনন করা হয়, বর্ষার শুরুতে তা যেন পার ভেঙে ভরাট হয়ে না যায় সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে। দখল করা নদী ও খালগুলো পুনরুদ্ধার করতে হবে। স্থানীয় গরিব জনগণকে সম্পৃক্ত করে নদী ও খালের পারে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে। মৎস্য ও হাঁস প্রতিপালনে উৎসাহিত করে সমন্বিত কৃষি উৎপাদনব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। তাতে অর্থনৈতিক ও প্রাকৃতিক সম্ভারে ভরে উঠবে স্থানীয় খাল-বিল ও নদী-নালাগুলো।

 

 

 

বাংলাদেশ বর্তমানে কৃষি উন্নয়নের ক্ষেত্রে একটি সংকটকাল অতিক্রম করছে। বৈশ্বিক জ্বালানি ও সারসংকটের কারণে এখানেও কৃষিতে বিরূপ প্রভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। আশঙ্কা করা হচ্ছে, এবারের বোরো ধানের উৎপাদন সাড়ে ৭ শতাংশ হ্রাস পাবে। তাতে খাদ্যশস্যের দাম বেড়ে যাবে। যা খাদ্য মূল্যস্ফীতিকে উসকে দেবে। এমন পরিস্থিতিতে পরবর্তী আউশ ও আমন ধান উৎপাদনের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। রবিশস্য উৎপাদনের জন্য আগে থেকেই পর্যাপ্ত উপকরণ সরবরাহের নিশ্চিয়তা বিধান করতে হবে। এর জন্য কৃষি খাতে ভর্তুকি ও বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। কৃষকদের জন্য সমন্বিত সুরক্ষা কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। তাঁদের দীর্ঘদিনের অবহেলা ও বঞ্চনার অবসান ঘটাতে হবে। একটি স্বনির্ভর অর্থনীতি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কৃষি খাতের উৎপাদন বৃদ্ধির প্রচেষ্টাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে।

 

লেখক : কৃষি অর্থনীতিবিদ ও সাবেক উপাচার্য, ইউনিভার্সিটি অব গ্লোবাল ভিলেজ

ট্যাগ:BCSকলামবাংলাদেশ