জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সাংবিধানিক বৈধতা

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সাংবিধানিক বৈধতা
কলামবাংলাদেশ

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সাংবিধানিক বৈধতা

৬ আগস্ট, ২০২৬

শামীম ইকবাল [প্রকাশ : যুগান্তর, ০৬ আগস্ট ২০২৬]

জুলাই গণ-অভ্যুত্থান বা যে নামেই অভিহিত করা হোক না কেন, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী ঘটনা। ছাত্রদের স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলনের সঙ্গে সাধারণ জনগণ, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এবং সমাজের নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের অংশগ্রহণে এ অভ্যুত্থান সফল হয়। তবে এর রাজনৈতিক তাৎপর্যের পাশাপাশি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে-এই পরিবর্তন কি সংবিধানের ভেতরে সংঘটিত হয়েছিল, নাকি সংবিধানের বাইরে একটি বিপ্লবী বাস্তবতার মাধ্যমে? এই লেখার উদ্দেশ্য কোনো রাজনৈতিক অবস্থান গ্রহণ নয়; বরং সাংবিধানিক ও আইনি প্রশ্নগুলো বিশ্লেষণ করা।

 

 

তিনটি ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি

জুলাই-পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ে বর্তমানে তিন ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি দেখা যায়-১. ঘটনাটি সম্পূর্ণ সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার মধ্যে সংঘটিত হয়েছে। ২. এটি একটি সফল গণবিপ্লব, যার বৈধতার উৎস জনগণের সার্বভৌম ইচ্ছা। ৩. এটি একটি সংবিধানবহির্ভূত রাজনৈতিক বাস্তবতা, যার জন্য পরবর্তীকালে পৃথক আইনি বৈধতা প্রদান প্রয়োজন। এ তিনটি অবস্থানের প্রতিটির নিজস্ব আইনি যুক্তি রয়েছে।

 

সংসদ ভেঙে দেওয়া : সাংবিধানিক প্রশ্ন

 

৬ আগস্ট ২০২৪ রাষ্ট্রপতি দ্বাদশ জাতীয় সংসদ বিলুপ্ত করেন। এখানে প্রধান প্রশ্ন হলো, সংবিধানের বিদ্যমান বিধান অনুযায়ী সংসদ বিলুপ্তির জন্য যে সাংবিধানিক শর্তাবলি রয়েছে, সেগুলো পূরণ হয়েছিল কিনা। একটি মত হলো, তৎকালীন বাস্তব পরিস্থিতিতে প্রচলিত সাংবিধানিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা কার্যত অসম্ভব ছিল। অপরদিকে আরেকটি মত অনুযায়ী, সংবিধানে নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ না হলে সংসদ বিলুপ্তির বৈধতা ভবিষ্যতে বিচারিক পর্যালোচনার বিষয় হতে পারে।

 

অন্তর্বর্তী সরকার ও সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদ

 

সরকারি বক্তব্য অনুযায়ী, অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের আগে সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদের আলোকে সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগের মতামত গ্রহণ করা হয়েছিল। তবে ভবিষ্যতে যেসব বিষয় নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে-মতামত গ্রহণের পূর্ণ সাংবিধানিক প্রক্রিয়া অনুসৃত হয়েছিল কি? সব বিচারপতিকে অবহিত করা হয়েছিল কি? শুনানি উন্মুক্ত আদালতে অনুষ্ঠিত হয়েছিল কি? মতামতের আনুষ্ঠানিক নথি সংরক্ষিত রয়েছে কি? এসব প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর শুধু বিচার বিভাগই দিতে পারে।

 

 

 

নির্বাচন ও সংবিধানের ১২৩ অনুচ্ছেদ

সংসদ বিলুপ্তির পর নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নির্বাচন আয়োজনের সাংবিধানিক বিধান রয়েছে। যদি নির্বাচন সেই বিধানের বাইরে কোনো বিশেষ আইনগত কাঠামোর অধীনে অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে, তবে তার আইনগত উৎস কী-এই প্রশ্নও ভবিষ্যতে আলোচনার বিষয় হতে পারে।

 

 

প্রজ্ঞাপন নম্বর ০১ এবং আইনি ভিত্তি

 

 

১৩ নভেম্বর ২০২৫-এর প্রজ্ঞাপনকে অনেকেই অন্তর্বর্তী সাংবিধানিক কাঠামোর ভিত্তি হিসাবে বিবেচনা করেন। এক্ষেত্রে কয়েকটি প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ : প্রজ্ঞাপনের উৎস ও বৈধতা কী? এটি কি বিদ্যমান সংবিধানের আওতায় ছিল, নাকি একটি পৃথক বিপ্লবী আইনগত ভিত্তি সৃষ্টি করেছিল? পরবর্তী সংসদ কি এ ব্যবস্থাগুলোকে বৈধতা দিয়েছে?

 

 

আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা

 

 

ফিলিপাইনের ১৯৮৬ সালের People Power Revolution-এর পর দেশটির সুপ্রিম কোর্ট Lawyers League for a Better Philippines v. Aquino মামলায় মত দেয় যে, সফল বিপ্লবের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত সরকারের বৈধতা মূলত একটি Political Question, যা আদালতের পরিবর্তে জনগণের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের বিষয়। পরবর্তীকালে Freedom Constitution জারি করে নতুন সংবিধান প্রণয়নের পথ তৈরি করা হয় এবং ১৯৮৭ সালে গণভোটের মাধ্যমে নতুন সংবিধান অনুমোদিত হয়। ফ্রান্সেও ১৯৫৮ সালে চার্লস দ্য গলের নেতৃত্বে গণভোটের মাধ্যমে নতুন সাংবিধানিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়। এসব উদাহরণ দেখায় যে বড় রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বিভিন্ন দেশে নতুন সাংবিধানিক বৈধতা সৃষ্টির ভিন্ন ভিন্ন পথ অনুসৃত হয়েছে।

 

 

অষ্টাদশ সংশোধনী : সম্ভাব্য আইনি প্রশ্ন

 

 

বর্তমানে অষ্টাদশ সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ চলমান। যদি এই সংশোধনীর মাধ্যমে ৫ আগস্ট ২০২৪-পরবর্তী সব কার্যক্রম, অধ্যাদেশ ও প্রাতিষ্ঠানিক সিদ্ধান্তকে বৈধতা দেওয়া হয়, তাহলে ভবিষ্যতে তা বিচারিক পর্যালোচনার মুখোমুখি হতে পারে। বিশেষ করে বাংলাদেশ ইতোমধ্যে পঞ্চম সংশোধনী বাতিলের রায়ে অসাংবিধানিক ক্ষমতা দখল ও পরবর্তীকালের বৈধতা প্রদানের প্রশ্নে গুরুত্বপূর্ণ নীতি নির্ধারণ করেছে। সেই রায়ে আপিল বিভাগ বলেছিল-‘We are putting on record our total disapproval of Martial Law and suspension of the Constitution. Let us bid farewell to all kinds of extra constitutional adventure for ever.’

 

 

অতএব, ভবিষ্যতে কোনো সাংবিধানিক সংশোধনী এ নজিরের আলোকে বিচারিক পরীক্ষার সম্মুখীন হতে পারে। সংবিধান সংশোধন, নাকি নতুন সংবিধান? মূল প্রশ্নটি এখানেই। যদি জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকে বিদ্যমান সংবিধানের ধারাবাহিকতার অংশ হিসাবে দেখা হয়, তবে সংবিধান সংশোধনের পথ যথেষ্ট হতে পারে। কিন্তু যদি এটি একটি সফল বিপ্লব হিসাবে বিবেচিত হয়, যার বৈধতার উৎস জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতা, তাহলে নতুন সাংবিধানিক বন্দোবস্ত, গণপরিষদ বা গণভোটের মতো বিকল্প পথও আলোচনায় আসতে পারে।

 

 


জুলাই গণ-অভ্যুত্থান বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি বাস্তব ও তাৎপর্যপূর্ণ রাজনৈতিক ঘটনা। তবে এর সাংবিধানিক চরিত্র, পরবর্তী রাষ্ট্রিক পদক্ষেপের বৈধতা এবং ভবিষ্যতের সাংবিধানিক কাঠামো-এসব প্রশ্নের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি এখনো হয়নি। রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকতেই পারে; কিন্তু রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার জন্য এমন একটি সাংবিধানিক সমাধান প্রয়োজন, যা জনগণের গণরায়, আইনের শাসন এবং বিচার বিভাগের প্রতিষ্ঠিত নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়। ইতিহাসের এ সন্ধিক্ষণে রাজনৈতিক আবেগের চেয়ে সাংবিধানিক প্রজ্ঞাই ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের জন্য অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ।

 

 


শামীম ইকবাল : সাবেক সরকারি কর্মকর্তা

ট্যাগ:BCSকলামবাংলাদেশ