জুলাই বিপ্লব: প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি

জুলাই বিপ্লব: প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি
কলামবাংলাদেশ

জুলাই বিপ্লব: প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি

৫ আগস্ট, ২০২৬

মিনার রশীদ [সূত্র : আমার দেশ, ০৫ আগস্ট ২০২৬]

 
 

তরুণরা চেয়েছিল বৈষম্যহীন একটি সমাজে তাদের ন্যায্য অধিকার! বিনিময়ে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ জায়গা থেকে তিরস্কার করা হলো । সেই তিরস্কারকেই নিজেদের অধিকার আদায়ের অস্ত্র বানিয়ে ক্ষুব্ধ তারুণ্য স্লোগান তুললÑতুমি কে আমি কেÑরাজাকার রাজাকার!

 

তারুণ্য উপলব্ধি করল এই স্বৈরাচারকে উৎখাত করে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা না গেলে বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা করা যাবে না । ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা-সংগ্রামের ইতিহাস ঘাঁটলেও দেখা যায় একই বৈষম্য ভাঙার প্রত্যয়! গণতন্ত্রের প্রতি শ্রদ্ধা দেখিয়ে তখনকার শাসকগোষ্ঠী যদি আওয়ামী লীগের হাতে ক্ষমতা অর্পণ করত, তবে দুই পাকিস্তান আলাদা হওয়ার প্রয়োজন পড়ত না। তখন প্রিয়াঙ্কা গান্ধীর দাদিও তাদের দুই চোখের বিষ পাকিস্তানকে ভাঙার ঐতিহাসিক সুযোগটি পেতেন না। ইতিহাসের এই দুটি ঘটনাই একই উদ্দেশ্যে সংঘটিত হয়েছে!

 

 

একটি বিষয় সবার কাছে স্পষ্ট হওয়া দরকার যে ৭১-এর স্বাধীনতাযুদ্ধ এবং ২৪-এর জুলাই বিপ্লব একে অন্যের প্রতিপক্ষ নয়Ñবরং একে অন্যের পরিপূরক বা ধারাবাহিকতা! কিন্তু চিহ্নিত মতলববাজ গোষ্ঠীটি এ দুটির মধ্যে একটি টক্কর বাজাতে চাচ্ছে! এক-এগারোর জনৈক পান্ডা তাদের বিশেষ দৈনিকটিতে এনসিপি-বিএনপির দ্বন্দ্বকে আরো উসকে দিতে বলেছেন, অন্তর্বর্তী সরকার তরুণদের ক্ষমতার লোভ শিখিয়েছে!

 

 

এটির পেছনেও এদের একটি কুমতলব রয়েছে। কারণ বর্তমানে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র বিনির্মাণের যে সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে, তাকে ধূলিসাৎ করাই এক-এগারোর এসব চিহ্নিত পান্ডা এবং তাদের ইন্ডিয়ান মাউথ পিসটির কাজ! কারণ জুলাই বিপ্লবের পক্ষের শক্তিগুলোর মধ্যে জাতীয়তাবাদভিত্তিক একটা ঐক্য আগে থেকেই ছিল। আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে সব পক্ষের সতর্ক অবস্থান এখনো বিদ্যমান!! এখন এই শক্তিগুলোর মধ্যে পারস্পরিক বিবাদ স্রেফ স্বার্থগত, যাকে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধচর্চার মাধ্যমে খুব সহজেই কনটেইন করা যায়।

 

 

জুলাইয়ের পক্ষের শক্তিগুলোর মধ্যে নতুন করে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করার জন্যই এরা জুলাইয়ের মধ্যে ৭১-কে টেনে আনে! প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, বিভেদ-বিভাজন চলতে থাকলে হাসিনা তালি বাজাবেন! আশা করি দেড় যুগ ধরে পোড় খাওয়া এই নেতার সাবধান বাণী শুধু জামায়াতের জন্যই নয়Ñহাইব্রিডসহ তার নিজ দলের অনেক নেতাকর্মীর জন্যও প্রযোজ্য হবে।

 

 

৭১ এবং জুলাইয়ের এই পারস্পরিক সম্পর্কটিকে সম্যক অনুধাবন করতে হলে আমাদের গণতন্ত্রের প্রকৃত অবয়ব এবং যুগে যুগে দেশে দেশে বিভিন্ন জাতির গণতান্ত্রিক সংগ্রামের ইতিহাসগুলো পড়তে হবে।

 

 

গণতন্ত্র মানবসভ্যতার অন্যতম শ্রেষ্ঠ অর্জন। এটি কোনো একক ব্যক্তির আবিষ্কার নয়, কোনো এক জাতির একক সম্পদও নয়। বরং হাজার বছরের মানব-অভিজ্ঞতা, সংঘাত, আত্মত্যাগ, ভুল-শুদ্ধের (Trial and Error) নিরন্তর পরীক্ষা এবং রাজনৈতিক বিবর্তনের মধ্য দিয়ে গণতন্ত্র আজকের অবস্থানে পৌঁছেছে। সভ্য ব্রিটিশ জাতি মোট বারোজন স্পিকারকে হত্যা করে আজকের অবস্থানে পৌঁছেছে। সে ক্ষেত্রে আমরা এ পর্যন্ত শুধু একজন শাহেদ আলীকে হত্যা করেছি মাত্র । তাও এই কাজটির আঞ্জাম দিয়ে গেছেন ফাদার অব দ্য সব গুন্ডামির শিরোমণি!

 

 

আগে ক্ষমতার পরিবর্তন যুদ্ধ, হত্যাকাণ্ড, ষড়যন্ত্র কিংবা রক্তক্ষয়ী বিদ্রোহের মাধ্যমে সংঘটিত হতো । রাজতন্ত্রের ইতিহাস যেমন এই বাস্তবতার সাক্ষী, তেমনি ইসলামের প্রারম্ভিক রাজনৈতিক ইতিহাসেও ক্ষমতার প্রশ্নে গভীর মতপার্থক্য ও সংঘাতের বেদনাদায়ক অধ্যায় রয়েছে।

 

 

আমরা হতাশ হয়ে পড়ি, এ রকম জটিলতা শুধু আমাদের মতো সাধারণ মানুষের বেলাতেই ঘটে। অথচ সেই সাহাবিরা ছিলেন পৃথিবীর সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ শিক্ষকের সর্বোৎকৃষ্ট ছাত্ররা। কাজেই রাজনৈতিক মতপার্থক্য সৃষ্টি হলেই একপক্ষ ফেরেশতা আর অন্যপক্ষ শয়তানÑএই সহজ সমীকরণ থেকে আমাদের বের হয়ে আসতে হবে!

 

 

সুতরাং আজকের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য, উত্তেজনা কিংবা ক্ষমতার প্রতিযোগিতা দেখেই হতাশ হওয়ার কারণ নেই। রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা গণতন্ত্রের একটি স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য। তবে এই প্রতিযোগিতা যেন রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান ধ্বংস, প্রতিহিংসা কিংবা সহিংসতার রূপ না নেয়Ñসেই নিশ্চয়তা তৈরি করাই গণতান্ত্রিক রাজনীতির আসল পরীক্ষা।

 

 

 

পশ্চিমা বিশ্ব গণতন্ত্রের এই ফলটি পুরোপুরি আস্বাদন করলে ও অন্যদের বিশেষ করে মুসলিম বিশ্বের দেশগুলোয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হোক, তা মনেপ্রাণে চায় না। মধ্যপ্রাচ্যের সব রাজা-বাদশাহদের রক্ষক হয়েছেন আমেরিকার নেতৃত্বে গণতান্ত্রিক পশ্চিমা বিশ্ব! মুসলিম বিশ্বের ত্রুটিপূর্ণ গণতন্ত্রের দেশগুলোয়ও সবসময় একটা ঝামেলা বাধিয়ে রাখবেনই!

 

 

আমাদের দেশেও তথাকথিত এক-এগারো নামক ষড়যন্ত্রটি দানা বাঁধিয়েছিল স্থায়ী মোড়লকে সঙ্গে নিয়ে গ্লোবাল ভিলেজের দুই মোড়ল। তজ্জন্যে ২০০৪ সালে দুজন সম্পাদক এবং একজন পলিটিশিয়ান দীর্ঘ বৈঠক করে এক-এগারোর রোডম্যাপ তৈরি করে। আমাদের চরম দুর্ভাগ্যের ব্যাপার, সেই দুই সম্পাদক এখনো নির্বিঘ্নে তাদের সব সাগরেদসহ সেই ইবলিশি ওয়াসওয়াসা চালিয়ে যাচ্ছেন।

 

 

কাজেই দেশের ভেতরের এবং বাইরের ইঁদুর যারা গণতন্ত্র নামক ইমারতটিকে আবার গোপনে কাটা শুরু করেছেÑতাদের প্রতি সবার সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে!

 

 

 

একটি সুস্থ গণতন্ত্র শুধু নির্বাচন দিয়ে টিকে থাকে না। এর জন্য প্রয়োজন এমন একদল নির্ভীক, স্বাধীনচেতা ও নৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য মানুষ, যারা দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে ওঠে জাতির দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থকে প্রতিনিধিত্ব করবেন। তারা হবেন রাষ্ট্র ও সমাজের বিবেক। ক্ষমতাসীনদের ভুল হলে যেমন সমালোচনা করবেন, তেমনি বিরোধী দলের ভুলকেও ছাড় দেবেন না। সত্যই হবে তাদের একমাত্র পক্ষ।

 

 

 

দুঃখজনকভাবে বাংলাদেশে এই জাতীয় বিবেকের পরিসর কখনো শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে পারেনি, মূলত সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক কিছু পালোয়ানদের ফ্যাসিবাদী আচরণের কারণে! ফলে জাতির বিবেক হিসেবে যাদের প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে কিংবা সেভাবে তুলে ধরা হয়েছে, তাদের একটি অংশ বিদেশি খুদকুঁড়োয় লালিত-পালিত এবং বিক্রীত! বাদবাকিরাও হয়ে পড়েছিলেন মেরুদণ্ডহীন নিরীহ প্রাণীর মতোÑবুদ্ধিবৃত্তিক ফ্যাশন হিসেবে যে বয়ানগুলো ছড়িয়ে দেওয়া হতো, এর বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর হিম্মত এরা কেউ দেখানোর সাহস করত না! জুলাই আমাদের এই হীনম্মন্যতা থেকেও তুলে এনেছে।

 

 

 

বাংলাদেশ যদি সত্যিই একটি স্থায়ী, কার্যকর ও মর্যাদাপূর্ণ গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে চায়, তবে রাজনৈতিক সংস্কারের পাশাপাশি এই নৈতিক এবং বুদ্ধিবৃত্তিক পুনর্জাগরণও অপরিহার্য। কারণ রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান আইন দিয়ে গড়া যায়, কিন্তু জাতির বিবেক গড়ে ওঠে স্বাধীন চিন্তা, নৈতিক সাহস এবং সত্যের প্রতি অবিচল অঙ্গীকারের মাধ্যমে।

 

 

বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী সম্প্রতি বলেছেন, জুলাই বিপ্লব ফরাসি বিপ্লবের চেয়ে কম নয়। তার এ কথাটি খুবই প্রণিধানযোগ্য!

 

 

 

প্রতিটি বিপ্লবের মূল্যায়ন একই মানদণ্ডে করা যায় না। ফরাসি বিপ্লব ফ্রান্স ও ইউরোপকে বদলে দিয়েছে। জুলাই বিপ্লবের লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশকে বদলে দেওয়া। একটি জাতির ইতিহাসে যে ঘটনা নতুন প্রজন্মের চিন্তা, সাহস এবং রাজনৈতিক চেতনাকে আমূল পরিবর্তন করে দেয়, সেই বিপ্লবকে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। জুলাই বিপ্লব পুরো তৃতীয় বিশ্বের জেন-জি প্রজন্মকে নতুন দীক্ষায় দীক্ষিত করছে। রাষ্ট্রীয় তিরস্কারকে একইভাবে অধিকার আদায়ের অস্ত্র বানিয়েছে ইন্ডিয়ার ককরোচ জনতা পার্টি! এই বিপ্লবের ছোঁয়া আরো অনেক জায়গায় ছড়িয়ে পড়বে বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে।

 

 

 

জুলাই বিপ্লবের সবচেয়ে বড় অর্জন কোনো সরকার পরিবর্তন নয়; বরং একটি প্রজন্মের মানসিক জাগরণ। বহুদিন ধরে বলা হতো, জেন-জি রাজনীতি বোঝে না; তারা শুধু মোবাইল ফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আর ব্যক্তিগত ক্যারিয়ার নিয়ে ব্যস্ত। জুলাই সেই ধারণাকে ভেঙে দিয়েছে। এই প্রজন্ম দেখিয়ে দিয়েছে, রাষ্ট্র, স্বাধীনতা, ন্যায়বিচার এবং নাগরিক মর্যাদার প্রশ্নে তারাও আপসহীন হতে পারে। চেতনার এই পরিবর্তনই জুলাই বিপ্লবের সবচেয়ে বড় সাফল্য।

ট্যাগ:BCSকলামবাংলাদেশ