জনমিতিক লভ্যাংশ আদায়ে তরুণদের সঙ্গে অংশীদারত্বের সম্পর্ক গড়তে হবে

জনমিতিক লভ্যাংশ আদায়ে তরুণদের সঙ্গে অংশীদারত্বের সম্পর্ক গড়তে হবে
কলামবাংলাদেশ

জনমিতিক লভ্যাংশ আদায়ে তরুণদের সঙ্গে অংশীদারত্বের সম্পর্ক গড়তে হবে

১২ জুলাই, ২০২৬

ড. নূর মোহাম্মদ [সূত্র : বণিক বার্তা, ১১ জুলাই ২০২৬]

বাংলাদেশসহ বিশ্বের অনেক দেশের উন্নয়নের ভবিষ্যৎ বহুলাংশে তরুণ জনগোষ্ঠীর ওপর নির্ভর করছে। তরুণ গোষ্ঠীর সক্ষমতা, সৃজনশীলতা, উদ্ভাবনী চিন্তা ও পরিবর্তন আনার সক্ষমতাই আগামী দিনের অর্থনীতি, সমাজ ও মানবিক উন্নয়নের প্রধান চালিকাশক্তি।

 

 

ফলে তরুণ প্রজন্মকে উন্নয়নের সুবিধাভোগী নয়, বরং উন্নয়নের সমান অংশীজন হিসেবে প্রতিষ্ঠা করাই সময়ের দাবি। এ বাস্তবতাকেই সামনে রেখে এবারের বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস ২০২৬-এর প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে—‘‌তারুণ্যের আশা-আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন করি, আজকের প্রত্যয়ে সুন্দর আগামী গড়ি’। এটি কেবল একটি প্রতিপাদ্য নয়; বরং একটি বৈশ্বিক আহ্বান। তরুণদের জন্য পরিকল্পনা করার পরিবর্তে তাদের সঙ্গে পরিকল্পনা করা, তাদের নিয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার পরিবর্তে পুরো প্রক্রিয়ার অংশীদার করা এবং উন্নয়নের সুবিধাভোগী হিসেবে নয়, বরং পরিবর্তনের অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে স্বীকৃতি দেয়াই হওয়া উচিত আমাদের অন্যতম প্রধান কাজ ও লক্ষ্য।

 
 
 

জনমিতিক লভ্যাংশ (ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ট) কোনো স্বয়ংক্রিয় প্রক্রিয়া নয়। শিক্ষা, দক্ষতা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, প্রযুক্তি, উদ্ভাবন ও সামাজিক অন্তর্ভুক্তিতে সময়োপযোগী বিনিয়োগ করা হলেই এর সুফল মিলবে। বিশেষ করে তরুণদের যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য এবং অধিকার, মানসম্মত শিক্ষা, ডিজিটাল দক্ষতা, উদ্যোক্তা উন্নয়ন এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত না করলে এ সম্ভাবনার বড় একটি অংশ অপূর্ণ থেকে যাবে।

 
 
 

কিন্তু বিনিয়োগের পাশাপাশি আরো একটি বিষয় সমান গুরুত্বপূর্ণ। সেটি হলো অংশগ্রহণ। বহু বছর ধরে আমরা তরুণদের নিয়ে অসংখ্য কর্মসূচি বাস্তবায়ন করেছি। কিন্তু একটি মৌলিক প্রশ্ন থেকে যায় এসব কর্মসূচির পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন ও মূল্যায়নের প্রতিটি ধাপে তরুণদের প্রকৃত অংশগ্রহণ কতটা নিশ্চিত করা হয়েছে?

 
 
 

এখানেই আসে পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন ও মূল্যায়ন পদ্ধতির গুরুত্ব। তরুণদের জন্য যে কর্মসূচিই নেয়া হোক না কেন, তার পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন ও মূল্যায়নের প্রতিটি ধাপে তরুণদের অর্থবহ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। তাদের মতামত শুনতে হবে, তাদের অভিজ্ঞতাকে মূল্য দিতে হবে এবং তাদের উদ্ভাবনী চিন্তাকে নীতিনির্ধারণ ও কর্মপরিকল্পনার অংশ করতে হবে। তরুণদের নিয়ে সিদ্ধান্ত নয়; তরুণদের সঙ্গে সিদ্ধান্ত—এ দর্শনই হওয়া উচিত আগামী দিনের পথনির্দেশ।

 

 

আজকের তরুণ প্রজন্ম আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি শিক্ষিত, প্রযুক্তিবান্ধব, বিশ্ব-সংযুক্ত ও উদ্ভাবনী। তারা কেবল নির্দেশনা অনুসরণ করতে চায় না, তারা সমাধান তৈরি করতে চায়। তারা কেবল অংশগ্রহণকারী হতে চায় না, তারা অংশীদার হতে চায়। তারা চায় তাদের ওপর আস্থা রাখা হোক, তাদের সক্ষমতার প্রতি বিশ্বাস রাখা এবং তাদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা হোক। উন্নয়নের আলোচনায় তাদের কণ্ঠস্বরকে প্রান্তিক নয়, কেন্দ্রস্থলে স্থান দিতে হবে।

 

 

তরুণরা এ দেশের ভবিষ্যৎ। এ পরিচিত বাক্যটি আমরা বহুদিন ধরেই ব্যবহার করছি। কিন্তু বাস্তবতা হলো শুধু এ আপ্তবাক্য আর যথেষ্ট নয়। তরুণরা শুধু আগামী দিনের নাগরিক নয়। তারা বর্তমান অর্থনীতি, সমাজ, প্রযুক্তি, পরিবেশ ও নীতিনির্ধারণেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এজন্য বলতে হবে তরুণরা আজও, আগামীরও। তাদের ছাড়া বর্তমানে যেকোনো অগ্রগতি বা উন্নয়ন অসম্পূর্ণ। তেমনি ভবিষ্যতের অগ্রগতিও অনিশ্চিত। এ পরিবর্তনের কেন্দ্রে ইয়ং অ্যাডাল্ট পার্টনারশিপকে রাখতে হবে। অভিজ্ঞতা ও উদ্ভাবন যখন একসঙ্গে কাজ করে, তখনই সর্বোত্তম সমাধান সৃষ্টি হয়। বয়োজ্যেষ্ঠদের অভিজ্ঞতা ও তরুণদের সৃজনশীলতা এ দুইয়ের সমন্বয় পারে টেকসই উন্নয়নের শক্তিশালী ভিত্তি গড়ে তুলতে। এখানে সম্পর্কটি অভিভাবকত্বের নয়, অংশীদারত্বের। নির্দেশ দেয়ার নয়, সহযাত্রার। প্রতিনিধিত্বের নয়, সহনেতৃত্বের।

 

 

বাংলাদেশের উন্নয়নের ইতিহাসে তরুণদের অবদান নতুন নয়। ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, গণতান্ত্রিক আন্দোলন, জলবায়ু অভিযোজন, সামাজিক উদ্যোগ, তথ্যপ্রযুক্তি খাত, স্টার্টআপ সংস্কৃতি, স্বেচ্ছাসেবী কার্যক্রম প্রতিটি ক্ষেত্রেই তরুণরা নেতৃত্ব দিয়েছে। আজও দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে শহর পর্যন্ত অসংখ্য তরুণ শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবেশ, নারী অধিকার, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং উদ্যোক্তা উন্নয়নে নতুন নতুন উদ্যোগ সৃষ্টি করছে। এ শক্তিকে আরো সংগঠিত ও সক্ষম করে তুলতে পারলে বাংলাদেশ উন্নয়নের নতুন উচ্চতায় পৌঁছতে পারবে।

 

 

এদিকে তরুণদের সামনে চ্যালেঞ্জও কম নয়। দক্ষতা ও শ্রমবাজারের চাহিদার মধ্যে ব্যবধান, বেকারত্ব, মানসিক স্বাস্থ্য, ডিজিটাল বৈষম্য, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত এবং বৈষম্য—এসব বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে মোকাবেলা করতে হবে। একই সঙ্গে নিশ্চিত করতে হবে, কোনো তরুণ যেন লিঙ্গ, প্রতিবন্ধিতা, ভৌগোলিক অবস্থান, আর্থসামাজিক অবস্থা বা অন্য কোনো কারণে পিছিয়ে না পড়ে। অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নই প্রকৃত উন্নয়ন।

 

 

সরকার, উন্নয়ন সহযোগী, বেসরকারি সংস্থা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বেসরকারি খাত এবং পরিবার—সবারই একটি অভিন্ন দায়িত্ব রয়েছে। তরুণদের জন্য সুযোগ সৃষ্টি করাই যথেষ্ট নয়। সে সুযোগ তৈরির প্রক্রিয়ায়ও তাদের অংশীদার করতে হবে। কারণ মানুষ তখনই নিজের উন্নয়নের মালিকানা অনুভব করে, যখন সে সিদ্ধান্ত নেয়ার কাজে অংশ নিতে পারে। এ মালিকানাবোধই দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের ভিত্তি।

 

 

আমাদের উন্নয়ন চিন্তায় একটি ছোট কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। “তরুণ প্রজন্মের সম্ভাবনার বিকাশে আমরা কী করছি এটি অবশ্যই জরুরি। আবার আমরা তাদের সঙ্গে কাজ করছি কিনা সেটিও জানা জরুরি। যেকোনো উন্নয়নের ক্ষেত্রে তারা ও আমরা, এমন ধারণা ও বিভাজন কমাতে হবে। বরং একতার অনুভূতি শক্তিশালী হলে সেটিই হবে টেকসই।

 

 

বিশ্ব জনসংখ্যা দিবসে আমাদের অঙ্গীকার হোক তরুণদের শুধু শোনা নয়, গুরুত্বের সঙ্গে শোনা। শুধু পরামর্শ নেয়া নয়, সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশীদার করা; শুধু ক্ষমতায়নের কথা বলা নয়, বাস্তব ক্ষমতা ও নেতৃত্বের সুযোগ সৃষ্টি করা। কারণ তরুণদের স্বপ্ন বাস্তবায়ন মানেই বাংলাদেশের স্বপ্ন বাস্তবায়ন। তাদের শক্তি, সৃজনশীলতা, সাহস এবং মানবিক মূল্যবোধই হতে পারে একটি আরো সমৃদ্ধ, ন্যায়ভিত্তিক ও টেকসই বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি।

 

 

আজ সময় এসেছে একটি নতুন বার্তা উচ্চারণ করার—তরুণরা আমাদের ভবিষ্যৎ নয়, তারা আমাদের বর্তমান এবং তারাই আমাদের ভবিষ্যৎ। তাদের সঙ্গে, তাদের নেতৃত্বে এবং তাদের অংশীদারত্বেই বাংলাদেশ তার জনমিতিক সম্ভাবনাকে বাস্তব সমৃদ্ধিতে রূপান্তর করতে পারবে।

 

 

ড. নূর মোহাম্মদ: নির্বাহী পরিচালক, পপুলেশন সার্ভিসেস অ্যান্ড ট্রেনিং সেন্টার (পিএসটিসি)

ট্যাগ:BCSকলামবাংলাদেশ