জলাশয়ভিত্তিক অর্থনীতি : ভবিষ্যৎ বিকল্প উন্নয়ন মডেল

জলাশয়ভিত্তিক অর্থনীতি : ভবিষ্যৎ বিকল্প উন্নয়ন মডেল
কলামবাংলাদেশ

জলাশয়ভিত্তিক অর্থনীতি : ভবিষ্যৎ বিকল্প উন্নয়ন মডেল

১২ জুলাই, ২০২৬

কৃষিবিদ অঞ্জন মজুমদার [প্রকাশ: সময়ের আলো, ৪ জুলাই ২০২৬]

বাংলাদেশ একটি নদীমাতৃক দেশ, যেখানে নদী, হাওড়, বিল, বাঁওড়, জলাশয় ও নদীর দ্বীপচর শুধু প্রাকৃতিক সম্পদই নয়, বরং এক বিশাল অর্থনৈতিক সম্ভাবনার ক্ষেত্র। দেশের একটি বড় অংশ মৌসুমি ও স্থায়ী জলাভূমির ওপর নির্ভরশীল। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের জলাশয়কেন্দ্রিক অর্থনৈতিক সফলতা বিবেচনায় ‘ওয়েটল্যান্ড ইকোনমি’ বাংলাদেশের জন্য একটি কার্যকর, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং টেকসই উন্নয়ন মডেল হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা, কৃষিজমির সংকোচন, জলবায়ু পরিবর্তন এবং গ্রামীণ বেকারত্বের প্রভাব বিশ্লেষণের প্রেক্ষাপটে এই মডেল ভবিষ্যতের কর্মসংস্থান ও জিডিপি প্রবৃদ্ধির একটি শক্তিশালী ভিত্তি গড়ে তুলতে সক্ষম হবে।
 
 
 
‘ওয়েটল্যান্ড ইকোনমি’ বলতে বোঝায় এমন একটি সমন্বিত অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, যেখানে জলাভূমিকে কেন্দ্র করে দক্ষ প্রযুক্তিনির্ভর মৎস্য উৎপাদন, ভাসমান কৃষি বা জলাভূমির কৃষি সিস্টেম, হাঁস পালন, জলজ উদ্ভিদ চাষ, গ্রিন এনার্জির ব্যবস্থা (সৌর বায়ু জৈব জ্বালানি), নৌপরিবহন, পর্যটন, প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং পরিবেশ সংরক্ষণ একসঙ্গে কাজ করে। সম্ভাবনাময় এমন অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় একই জমি বা জলাশয় থেকে একাধিক উৎপাদন কার্যক্রম পরিচালনা সম্ভব। ফলে সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত হয় এবং গ্রামাঞ্চলের মানুষের জন্য স্থানীয়ভাবে আয়ের বহুমুখীকরণ ঘটে ও বৈচিত্র্য আনা যায়।
 
 
 
 
বাংলাদেশের হাওড় অঞ্চলগুলো বছরের বড় অংশ পানিতে নিমজ্জিত থাকে। সেখানে বর্ষাকালে প্রচলিত কৃষি সীমিত হলেও মাছ চাষ, ভাসমান সবজি চাষ, হাঁস পালন এবং জলজ সম্পদভিত্তিক ক্ষুদ্র উদ্যোগ সহজেই গড়ে তোলা যায়। বিল ও বাঁওড় এলাকায় কাঁকড়া, চিংড়ি, কুঁচিয়া (দেশি ইল ফিশ) শামুক-ঝিনুক চাষ এবং প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রিত মৎস্য ব্যবস্থাপনা স্থানীয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে পারে। 
 
 
 
বাংলাদেশের নদ-নদী নেটওয়ার্কে সৃষ্ট চরাঞ্চলে মৌসুমি কৃষির পাশাপাশি গবাদিপশু পালন, চিনাবাদাম, সয়াবিন, সরিষা, সূর্যমুখী, তিল, তিসি, কালোজিরা চাষ করা যায়। এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ভোজ্য তেল উৎপাদনে ছোট ছোট অয়েল এক্সট্রাকশন ফ্যাক্টরি বা প্লান্ট স্থাপন, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা এবং গ্রামে এগ্রি-স্টার্টআপ কার্যক্রম নতুন আয়ের উৎস তৈরি করতে পারে।
 
 
 
বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ইতিমধ্যে জলাভূমিভিত্তিক অর্থনীতিকে সফলভাবে কাজে লাগিয়েছে। নেদারল্যান্ডস পানি ব্যবস্থাপনা ও আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির মাধ্যমে নিম্নভূমিকে উচ্চ উৎপাদনশীল অর্থনীতিতে রূপ দিয়েছে। ভিয়েতনামের মেকং ডেল্টায় ধান ও মাছের সমন্বিত চাষ কৃষকদের দ্বৈত আয় নিশ্চিত করছে। চীনের ‘মাছ-হাঁস-চাল’ মডেল পরিবেশবান্ধব কৃষি উৎপাদন বাড়িয়েছে। থাইল্যান্ডে ভাসমান বাজার ও জলভিত্তিক বাণিজ্য স্থানীয় অর্থনীতিকে গতিশীল করেছে এবং বিপুল পরিমাণে বিদেশি পর্যটক আকর্ষণে সক্ষম হচ্ছে। কম্বোডিয়ার ঞড়হষব ঝধঢ় খধশব পুরো একটি জলনির্ভর অর্থনৈতিক (ওয়েটল্যান্ড অর্থনৈতিক ইকোসিস্টেম) সমাজের বাস্তব উদাহরণ।
 
 
 
 
বাংলাদেশের জন্য ওয়েটল্যান্ড ইকোনমি ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থানের একটি বড় উৎস হতে পারে; এটি শ্রমনির্ভর ও স্বল্প পুঁজিনির্ভর হওয়ায় দ্রুত কর্মসংস্থান সৃষ্টি সম্ভব। আধুনিক মৎস্যচাষ, প্রক্রিয়াজাতকরণ, পরিবহন, পর্যটন ও কৃষিভিত্তিক সেবা খাতে লাখ লাখ মানুষের কাজের সুযোগ তৈরি হতে পারে; বিশেষ করে নারী ও যুবসমাজকে যুক্ত করা গেলে গ্রামীণ অর্থনীতি আরও শক্তিশালী হবে।
 
 
 
জিডিপি প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রেও এই খাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বর্তমানে মৎস্য খাত বাংলাদেশের অর্থনীতির একটি বড় অংশ। জলাভূমিভিত্তিক সমন্বিত উৎপাদন বাড়ালে মাছ, চিংড়ি, কাঁকড়া, জলজ উদ্ভিদ (হাই ভ্যালুড শ্যাওলা) চাষ এবং এগুলোর প্রক্রিয়াজাত পণ্যের উৎপাদন বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে। 
 
 
 
ওয়েটল্যান্ড অর্থনৈতিক ইকোসিস্টেমের ফলে অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণ হওয়ার পাশাপাশি রফতানি আয়ও বাড়বে, যা বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে সহায়ক হবে এবং বাংলাদেশের রফতানি বহুমুখীকরণে সহায়ক ভূমিকা রাখবে।
 
 
 
 
‘ওয়েটল্যান্ড অর্থনীতি’ মডেলটি জলবায়ু সহনশীল অর্থনীতির একটি শক্তিশালী উদাহরণ। বন্যা বা জলাবদ্ধতা যেখানে ক্ষতি করে, সেখানে ওয়েটল্যান্ড ইকোনমি সেই পানিকেই উৎপাদনের সম্পদে রূপান্তর করে- যার মাধ্যমে জলা অঞ্চলের দুর্যোগকালেও আয় ও উৎপাদন অব্যাহত রাখা সম্ভব হয় এবং দীর্ঘমেয়াদে গ্রামীণ জনপদের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করে।
 
 
 
 
পরিবেশগত দিক থেকেও ওয়েটল্যান্ড অর্থনৈতিক ইকোসিস্টেম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জলাভূমি সংরক্ষণ জীববৈচিত্র্য রক্ষা, ভূগর্ভস্থ পানির ভারসাম্য বজায় রাখা এবং কার্বন শোষণে সহায়তা করে। একই সঙ্গে ‘ব্লু ইকোনমি’ এবং ‘গ্রিন ইকোনমি’ এই দুই অর্থনৈতিক ইকোসিস্টেমের সেতুবন্ধ হিসেবে ‘গ্রিন সার্কুলার ইকোনমিরও’ বিস্তার ঘটাবে। আগামীর বাংলাদেশের উন্নয়নে পরিকল্পিত পন্থায় এমন সমন্বিত উন্নয়ন মডেল গ্রামাঞ্চলে বিস্তৃত করা খুব সহজেই সম্ভব।
 
 
 
 
ওয়েটল্যান্ড ইকোনমির সঙ্গে ইকো ট্যুরিজম ও এগ্রি-ট্যুরিজম যুক্ত করলে নতুন একটি সম্ভাবনাময় পর্যটন খাত তৈরি হয়। ভারতের কেরালার ব্যাকওয়াটার ট্যুরিজম, হাউসবোট অভিজ্ঞতা এবং গ্রামীণ জীবন পর্যটন আন্তর্জাতিকভাবে সফল হয়েছে, তামিলনাডুতে ফার্ম স্টে ও কৃষিভিত্তিক পর্যটন স্থানীয় কৃষকদের অতিরিক্ত আয় দিচ্ছে। 
 
 
 
 
কর্ণাটকের কফি ও স্পাইস প্লান্টেশন ট্যুরিজম আন্তর্জাতিক পর্যটকদের আকর্ষণ করছে। বাংলাদেশেও হাওড়-বিল অঞ্চল, নদী তীরবর্তী গ্রাম এবং চরাঞ্চলে মাছ ধরার অভিজ্ঞতা, ভাসমান কৃষি দর্শন, নৌভ্রমণ এবং গ্রামীণ সংস্কৃতি পর্যটন গড়ে তোলা গেলে স্থানীয় অর্থনীতিতে বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।
 
 
 
 
তবে এমন সম্ভাবনাকে বাস্তবায়ন করতে হলে প্রয়োজন সঠিক পরিকল্পনা ও নীতি সহায়তা। বর্তমান জলাভূমির রিয়েল টাইমভিত্তিক মানচিত্রায়ণ, কমিউনিটিভিত্তিক ব্যবস্থাপনা, সহজ ঋণ সুবিধা, প্রশিক্ষণ প্রযুক্তি ব্যবহার, গবেষণা এবং শক্তিশালী বাজার সংযোগ নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ ও সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের মাধ্যমে এই খাতকে বিনিয়োগবান্ধব করতে হবে।
 
 
 
 
বাংলাদেশের নদী, হাওড়, বিল ও চরভিত্তিক ‘ওয়েটল্যান্ড ইকোনমিক ইকোসিস্টেম’ কেবল একটি বিকল্প ধারণা নয়, বরং ভবিষ্যতের অপরিহার্য অর্থনৈতিক পথ। এটি কর্মসংস্থান সৃষ্টি, জিডিপি বৃদ্ধি, খাদ্য নিরাপত্তা, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং এগ্রি-ট্যুরিজমের মাধ্যমে বহুমাত্রিক উন্নয়ন নিশ্চিত করতে পারে। 
 
 
 
 
 
সঠিক পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে এই মডেল বাংলাদেশকে একটি টেকসই, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং গ্রামীণ জনপদকে সমৃদ্ধ অর্থনীতির দিকে এগিয়ে নিতে সক্ষম হবে।
 
 
 
 
লেখক : গ্রিন সার্কুলার ইকোনমি স্পেশালিস্ট (মতামত লেখকের নিজস্ব)
ট্যাগ:BCSকলামবাংলাদেশ