কিন্তু বাংলাদেশকে উন্নত দেশের কাতারভুক্ত হতে হলে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হবে। বর্তমানে দেশটি স্বল্পোন্নত (এলডিসি) তথা নিম্নমধ্যম আয়ের। স্বল্পোন্নত থেকে উত্তরণ হলে বাংলাদেশ উচ্চমধ্যম আয়ের দেশ তথা উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে পরিচিতি পাবে। মাথাপিছু আয় প্রায় সাড়ে ১৪ হাজার ডলার অতিক্রম করলে বাংলাদেশ উন্নত দেশের সারিতে পড়বে।
জাতিসংঘের বিচারে একটি দেশ স্বল্পোন্নত থেকে উত্তরণের জন্য মাথাপিছু জাতীয় আয় টানা তিন বছর ১ হাজার ২৩০ ডলার, মানবসম্পদ সূচক ৬৬-এর বেশি এবং অর্থনৈতিক ঝুঁকি সূচক ৩২-এর কম হওয়া চাই। হাসিনা সরকার বরাবরই তথ্য জালিয়াতির মাধ্যমে জনগণকে ধোঁকা দিয়েছিল। জনগণের বাহবা অর্জনের জন্য বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো কর্তৃক তথ্য-উপাত্তকে বিভ্রান্তিকরভাবে উপস্থাপনে হাসিনা সরকার ছিল বেজায় পারদর্শী। সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ হাসিনা সরকারের পরিসংখ্যান জালিয়াতিকে এক বিস্ময়কর ‘টপ টু বটম দুর্নীতির উন্নয়ন’ হিসেবে মন্তব্য করেছেন। তার মতে, গত দেড় দশকে আর্থিক খাতকে যেভাবে জালিয়াতি তথ্যের ওপর দাঁড় করানো হয়েছিল তা দেশের ইতিহাসে তো বটেই দুনিয়াতেও বিরল।
স্বল্পোন্নত দেশ থেকে মসৃণ উত্তরণের কৌশল হিসেবে বাংলাদেশ পাঁচ বছরের (২০২১-২৬) মধ্যে রফতানি সম্ভাব্য ১২টি অগ্রাধিকারমূলক খাতের বিকাশে মনোনিবেশ করার কথা ছিল। বর্তমানে রফতানি আয়ের প্রধান উৎস তৈরি পোশাক শিল্প। মোট রফতানি আয়ের প্রায় ৮২ শতাংশ এ খাত থেকে আসে। কিন্তু এর বাইরে ওষুধ, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং, জাহাজ নির্মাণ, প্লাস্টিক পণ্য, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ, সফটওয়্যার ও আইটি সেবা, পর্যটন এবং ধাত্রীসেবার মতো খাতগুলোকে রফতানির উৎস হিসেবে চিহ্নিত করা হলেও এসবের বিকাশে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। এমনকি তৈরি পোশাক রফতানি খাতেও লেগেছে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক ধাক্কা। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রফতানির সবচেয়ে বড় বাজার ইউরোপীয় ইউনিয়ন। কিন্তু এ বাজারে দেশের অবস্থান নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নে পোশাক রফতানিকারক ১০টি শীর্ষ দেশ যথাক্রমে চীন, বাংলাদেশ, তুরস্ক, ভারত, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, পাকিস্তান, মরক্কো, শ্রীলংকা ও ইন্দোনেশিয়া। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাণিজ্য ঘাটতির পরিমাণ ২৭ দশমিক ২৮ বিলিয়ন ডলার, যা পূর্ববর্তী অর্থবছরের তুলনায় ৩৪ শতাংশ বেশি। যদিও রেমিট্যান্স প্রবাহে ইতিবাচক ধারার কারণে সার্বিক লেনদেন ভারসাম্য অনুকূলে আছে, কিন্তু বৈশ্বিক অস্থিরতা ভবিষ্যৎ রেমিট্যান্স প্রবাহে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
এলডিসি থেকে উত্তরণ হলে বাংলাদেশ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শুল্কমুক্ত রফতানি সুবিধা থেকে বঞ্চিত হবে, যার ফলে রফতানি আয় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কমে যাবে। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার প্রাক্কলন অনুযায়ী, বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত থেকে উন্নয়নশীল গোত্রভুক্ত হলে বার্ষিক গড়ে সাড়ে ১৭ বিলিয়ন ডলার মূল্যের রফতানি আয় হারাবে। তাছাড়া ‘ট্রিপস’-এর অধীনে বাংলাদেশ ওষুধ শিল্পে যে সুবিধা ভোগ করে যাচ্ছে, উন্নয়নশীল দেশ হলে তা-ও বাতিল হবে। স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে বাংলাদেশ দাতাসংস্থাগুলো থেকে বর্তমানে নিম্ন সুদে ঋণ পেলেও পরিবর্তিত অবস্থায় ওই সুযোগ থাকবে না এবং বৈদেশিক অনুদানও বন্ধ হয়ে যাবে।
শিগগিরই বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশের শ্রেণীভুক্ত হলে ‘মধ্য-আয়-ফাঁদ’-এ পড়ার সম্ভাবনা খুব বেশি। এ ফাঁদের তাৎপর্য হলো একটি দেশ নিম্ন আয় থেকে মধ্যম আয় পর্যায়ে পৌঁছলে আর অতি সহজে উচ্চ আয়ের দেশে রূপান্তর হতে পারে না। এর কারণ নিম্ন আয়ের দেশে সস্তায় শ্রমিক এবং উৎপাদনের অন্যান্য উপকরণ পাওয়া যায়, কম খরচে দ্রব্য উৎপাদন করা সম্ভব হয় বিধায় দ্রুত প্রবৃদ্ধি ঘটে। মানুষের আয় বৃদ্ধি পেলে সস্তায় শ্রমিক পাওয়া যায় না। ফলে উৎপাদন ও প্রবৃদ্ধি মন্থর হয়ে পড়ে এবং সংশ্লিষ্ট দেশ উচ্চ আয় শ্রেণীতে অন্তর্ভুক্ত হতে পারে না। প্রযুক্তিগত অনুন্নয়ন, অদক্ষ মানবসম্পদ, রফতানিতে বৈচিত্র্যহীনতা, আয়বৈষম্য এবং সুশাসনের অভাবে একটি দেশ মধ্য আয় ফাঁদে আটকা পড়ে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে প্রায় প্রতিটি কারণ প্রাসঙ্গিক। গত দেড় দশকে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোয় পাইকারি হারে দলীয়করণ হয়েছে। সুশাসন এ দেশের মানুষের কাছে অধরাই রয়ে গেছে। নির্বাচিত সরকার আসার পরও উল্লেখযোগ্য কোনো পরিবর্তন হয়নি; কারণ দীর্ঘ সময়ের অনিয়ম-বিশৃঙ্খলার যারা ক্রীড়নক তাদের অধিকাংশই নিজ নিজ অবস্থানে বহাল আছে। সরকারের নীতিনির্ধারকরাও এটি স্বীকার করেছেন। স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী থাকাকালীন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এক বক্তব্যে দেশে নির্বাচনের পরও কোনো কিছু বদলায়নি বলে মন্তব্য করেন (প্রথম আলো, ৩০ জুলাই ২০২৬)। সর্বত্র দুর্নীতি আর অদক্ষতার মধ্যে বাংলাদেশ ২০২৬ সালে উন্নয়নশীল দেশের শ্রেণীভুক্ত হলে আর কখনো উচ্চ আয়ের দেশে পরিণত হতে পারবে কিনা এ ব্যাপারে যথেষ্ট সন্দেহের অবকাশ আছে।
সার্বিক বিষয় বিবেচনা করে বাংলাদেশ ঠিক এখনই স্বল্পোন্নত থেকে উন্নয়নশীল দেশের শ্রেণীভুক্ত হওয়া যৌক্তিক হবে কিনা তার একটি স্বাধীন মূল্যায়নের জন্য অন্তর্বর্তী সরকার গত বছর জাতিসংঘকে অনুরোধ জানিয়েছিল। একই ধারাবাহিকতায় বর্তমান বিএনপি সরকার এ বছরের ২৩ ফেব্রুয়ারি জাতিসংঘের উন্নয়ন নীতি কমিটির (সিডিপি) কাছে আবেদন জানিয়েছে যেন স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণ প্রক্রিয়া তিন বছরের জন্য স্থগিত রাখা হয়।
স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের জন্য জাতিসংঘের কাছে বাংলাদেশ কর্তৃক আরো তিন বছর সময় চাওয়ার আবেদন যথাযথ। এ সময়ে বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ রাজস্ব ও আর্থিক খাতে প্রয়োজনীয় সংস্কার করবে। সংস্কার পরিকল্পনার মধ্যে আছে করের আওতা বৃদ্ধি, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের পূর্ণ স্বয়ংক্রিয়করণ, করভিত্তিকে ব্যাংক ব্যবস্থার সহিত সংযুক্তকরণ, কর কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত ক্ষমতা হ্রাস, কর অব্যাহতির যৌক্তিকীকরণ, মূল্যসংযোজন কর প্রক্রিয়াকে শক্তিশালীকরণ, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোয় সুশাসন নিশ্চিতকরণ, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিকল্পে ডিজিটাল আর্থিক সেবা সম্প্রসারণ, শিল্পের আধুনিকায়ন এবং রফতানি বহুধাকরণ। নির্বিঘ্নে উত্তরণ কৌশল তথা স্মুথ ট্রানজিশন স্ট্র্যাটেজি (এসটিজি) হিসেবে সরকার একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটি গঠনের পরিকল্পনা করেছে। ওই কমিটি ব্যবসায়িক এবং উন্নয়ন অংশীদারদের সঙ্গে প্রতি মাসে পর্যালোচনা বৈঠক করবে। সামষ্টিক অর্থনৈতিক কৌশল হিসেবে সরকার রাজস্ব এবং মুদ্রানীতির যথাযথ মিশ্রণ দ্বারা মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পরিকল্পনা হাতে রেখেছে। ঝুঁকিতে থাকা আর্থিক খাত সংস্কারে আগামী তিন বছর সরকার আইএমএফ এবং বিশ্বব্যাংকের চিহ্নিত ক্ষতগুলো সারানোর চেষ্টা চালাবে।
স্বল্পোন্নত থেকে উন্নয়নশীল দেশে রূপান্তরের প্রক্রিয়া তিন বছর বিলম্বিত করার আবেদন জানিয়ে জাতিসংঘ বরাবর বাংলাদেশ সরকার প্রেরিত আবেদনে ওপরে বর্ণিত পদক্ষেপগুলো উল্লেখ থাকলেও এর বাইরে বাংলাদেশকে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক অনেকগুলো প্রতিকূলতা কাটিয়ে ওঠার সক্ষমতা অর্জন করতে হবে।
দীর্ঘসময় ধরে চলমান এসব জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিকূলতার সঙ্গে সম্প্রতি যুক্ত হয়েছে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়া। কক্সবাজারের মহেশখালীতে থাকা দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের একটি গত ২১ জুলাই অগ্নিকাণ্ডের পর বন্ধ হয়ে যায়। জ্বালানি বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, দেশে দৈনিক প্রায় ৩৮৫ কোটি ঘনফুট গ্যাসের চাহিদার বিপরীতে ঘাটতি প্রায় ১৭৭ কোটি ঘনফুট। এমন অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে অর্থনীতি তাৎক্ষণিক মেয়াদে তীব্র সংকটে পড়েছে। গ্যাসের অভাবে শিল্পোৎপাদন যেমন ব্যাহত হচ্ছে তেমনি পরিবহন সংকটও তীব্রতর হচ্ছে।
নতুন সরকারের আমলে এক শ্রেণীর অসাধু চক্র খোলস পালটিয়ে ক্ষমতার অপব্যবহার করে চাঁদাবাজি এবং দখল উৎসবে মেতে উঠেছে যা অর্থনীতির সার্বিক উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির পথে বিরাট অন্তরায়। এ জাতীয় অ-অর্থনৈতিক উপাদানগুলো অনুন্নত সমাজে বিদ্যমান থাকলেও উন্নত অর্থনীতির চরিত্রের সঙ্গে মোটেও সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। স্বল্পোন্নত (এলডিসি) থেকে উত্তরণ হলে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ও মর্যাদা বৃদ্ধি পাবে, বৈদেশিক বিনিয়োগে আকৃষ্ট হবে, ক্রেডিট রেটিংয়ে উন্নতির কারণে অর্থনৈতিক সুবিধা অর্জন হবে এবং বৈশ্বিক চাকরির বাজারে বাংলাদেশীদের প্রবেশাধিকার বাড়বে। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়ন হলে ২০২৯ সালের নভেম্বরে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের পরিচিতি পরিবর্তন করে উন্নয়নশীল দেশের পরিচয়পত্র গ্রহণ করবে। পরিকল্পিত সংস্কার এবং মেরামত কার্যক্রম টেকসই হলে, দুর্নীতি আর অপশাসন হ্রাস পেলে ২০৪১ সালে না হলেও আগে-পরে বাংলাদেশ উন্নত দেশ হিসেবে বিশ্ব দরবারে স্থান করে নেবে—এমনটিই প্রত্যাশা।
ড. মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম: অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়




