এফটিএ এবং এলডিসি: বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের ভবিষ্যৎ কী?

এফটিএ এবং এলডিসি: বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের ভবিষ্যৎ কী?
কলামবাংলাদেশ

এফটিএ এবং এলডিসি: বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের ভবিষ্যৎ কী?

১২ জুলাই, ২০২৬

দুঃখজনক হলেও সত্য, বাংলাদেশ এফটিএ নিয়ে অনেক দেরিতে ভাবতে শুরু করেছে। ভারত যেখানে প্রায় এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ধারাবাহিক আলোচনার মাধ্যমে ইইউর সঙ্গে চুক্তি সম্পন্ন করেছে, সেখানে বাংলাদেশ এখনো আলোচনার প্রাথমিক প্রস্তুতিতেই রয়েছে। আহসান হাবিব বরুন [সূত্র : ইত্তেফাক, ১৪ মে ২০২৬]

ইউরোপের বড় বড় ব্র্যান্ডের দোকানে “মেড ইন বাংলাদেশ' লেখা ট্যাগ যেন বাংলাদেশের অর্থনীতির এক নীরব বিজয়গাথা। যুদ্ধবিধ্বস্ত, দারিদ্র্যপীড়িত এক দেশ কীভাবে বিশ্ব পোশাকবাজারের দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানিকারকে পরিণত হলো—এ গল্প শুধু অর্থনীতির নয়, এটি লাখো শ্রমিকের ঘাম, নারীর ক্ষমতায়ন, উদ্যোক্তাদের সাহস এবং রাষ্ট্রের দীর্ঘ সংগ্রামের গল্প।

 

 

কিন্তু বিশ্ববাণিজ্যের মানচিত্র এখন দ্রুত বদলে যাচ্ছে। নতুন জোট, নতুন চুক্তি, নতুন অর্থনৈতিক বলয় তৈরি হচ্ছে। আর এই পরিবর্তনের কেন্দ্রে এসে দাঁড়িয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ও ভারতের সাম্প্রতিক মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি বা এফটিএ। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি একে 'মাদার অব অল ডিলস' বলে আখ্যা দিয়েছেন। কথাটি নিছক রাজনৈতিক অলংকার নয়; এর ভেতরে লুকিয়ে আছে বৈশ্বিক বাণিজ্যের এক নতুন বাস্তবতা।

 

 

 

এই বাস্তবতা বাংলাদেশের জন্য যেমন সতর্কবার্তা, তেমনি এটি ভবিষ্যৎ নির্ধারণেরও একটি কঠিন পরীক্ষা। কারণ বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণভোমরা এখনো তৈরি পোশাকশিল্প। দেশের মোট রপ্তানির ৮০ শতাংশের বেশি আসে এই একটি খাত থেকে। আর সেই পোশাকের অর্ধেকেরও বেশি যায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে। ফলে ইইউ- ভারত এফটিএ কেবল একটি আন্তর্জাতিক চুক্তি নয়; এটি বাংলাদেশের অর্থনীতির ভবিষ্যতের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত এক ভূরাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক সংকেত।

 

 

বাংলাদেশ বর্তমানে স্বল্পোন্নত দেশ বা এলডিসি-সুবিধার আওতায় ইইউ বাজারে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পাচ্ছে। এই সুবিধাই গত দুই দশকে বাংলাদেশের পোশাকশিল্পকে বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানে নিয়ে গেছে। কিন্তু ২০২৯ সালে এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের পর সেই বিশেষ সুবিধার বড় অংশ হারানোর আশঙ্কা রয়েছে। অর্থাৎ এখন যে বাজারে বাংলাদেশ শূন্য শুল্কে পোশাক রপ্তানি করছে, ভবিষ্যতে সেখানে ১০ থেকে ১২ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক দিতে হতে পারে।

 

 
 
 
 
 

এখানেই বাংলাদেশের দুর্বলতা সবচেয়ে বেশি। আমরা পোশাক তৈরি করি, কিন্তু সেই পোশাকের কাঁচামালের বড় অংশ আসে বিদেশ থেকে। অর্থাৎ আমরা এখনো পূর্ণাঙ্গ শিল্পশক্তি হয়ে উঠতে পারিনি। বিশ্ববাজারে দীর্ঘ মেয়াদে টিকে থাকতে হলে শুধু শ্রমিকের কম মজুরি বা উৎপাদনদক্ষতা যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন শক্তিশালী শিল্পভিত্তি, প্রযুক্তি, গবেষণা এবং কাঁচামালের স্বনির্ভরতা।

 

 

দুঃখজনক হলেও সত্য, বাংলাদেশ এফটিএ নিয়ে অনেক দেরিতে ভাবতে শুরু করেছে। ভারত যেখানে প্রায় এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ধারাবাহিক আলোচনার মাধ্যমে ইইউর সঙ্গে চুক্তি সম্পন্ন করেছে, সেখানে বাংলাদেশ এখনো আলোচনার প্রাথমিক প্রস্তুতিতেই রয়েছে। এ বাস্তবতা নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক। কারণ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে সময়ই সবচেয়ে বড় শক্তি। যে দেশ আগে প্রস্তুতি নেয়, ভবিষ্যৎ বাজারও তার দখলে যায়।

 

 

বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের একটি বড় অংশ দীর্ঘকাল ধরে বলছিলেন যে, এলডিসি সুবিধা শেষ হলেও বড় ধরনের সমস্যা হবে না। কিন্তু বিশ্ববাণিজ্যের বর্তমান বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। এখন আর শুধু উৎপাদন করলেই হবে না; বাজারে প্রবেশাধিকারের জন্যও কঠিন কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক লড়াই করতে হবে।

 

 

বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশের জন্য এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ইইউর জিএসপি প্লাস সুবিধা নিশ্চিত করা। কিন্তু সেটিও সহজ হবে না। কারণ জিএসপি প্লাস পেতে হলে শ্রম অধিকার, পরিবেশ সুরক্ষা, সুশাসন, মানবাধিকার এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন কনভেনশন বাস্তবায়নের কঠোর শর্ত পূরণ করতে হবে। শুধু কাগজে কলমে নয়, বাস্তব ক্ষেত্রেও এগুলোর অগ্রগতি দেখাতে হবে।

 

 

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো 'ডাবল স্টেজ রুলস অব অরিজিন'। অর্থাৎ শুধু পোশাক তৈরি করলেই হবে না; ব্যবহৃত সুতা বা কাপড়ের উৎসও নির্দিষ্ট মানদণ্ড পূরণ করতে হবে। বাংলাদেশ যদি এই শর্তে কোনো ছাড় না পায়, তাহলে প্রতিযোগিতা ভয়াবহ কঠিন হয়ে উঠবে।

 

 

তবে সংকটের মধ্যেও সম্ভাবনার জায়গা আছে। যুক্তরাজ্য ইতিমধ্যে বাংলাদেশকে এলডিসি-পরবর্তী সময়েও কিছু বিশেষ সুবিধা বহাল রাখার ইঙ্গিত দিয়েছে। এর অর্থ হলো, সঠিক কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালাতে পারলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের কাছ থেকেও অনুকূল শর্ত আদায় করা অসম্ভব নয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো— আমরা কি সেই প্রস্তুতি নিচ্ছি?

 

 

বাংলাদেশের শিল্প খাতের _ অন্যতম বড় সমস্যা হলো নীতির ধারাবাহিকতার অভাব। উদ্যোক্তারা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করতে চান, কিন্তু নীতির ঘনঘন পরিবর্তন, অবকাঠামোগত দুর্বলতা, জ্বালানিসংকট, বন্দরজট এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতা তাদের প্রতিযোগিতাশক্তি কমিয়ে দিচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে যেখানে প্রতিটি সেন্ট হিসাব করে মূল্য নির্ধারণ হয়, সেখানে বিদ্যুতের লোডশেডিং বা বন্দরে কনটেইনার আটকে থাকা বড় ধরনের ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

 

 

ভারত শুধু এফটিএ করছে না; তারা শিল্পনীতিতেও অ্যাগ্রেসিভ পলিসি নিয়েছে। কম দামে জমি, কর অবকাশ, দক্ষতা উন্নয়ন সহায়তা এবং অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে তারা নিজেদের টেক্সটাইল খাতকে অনেক এগিয়ে নিয়েছে। ফলে ভবিষ্যতের প্রতিযোগিতা শুধু শুল্কের নয়; এটি হবে রাষ্ট্রীয় সক্ষমতারও প্রতিযোগিতা।

 

 

 

বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় শিক্ষা হওয়া উচিত—শুধু পোশাকের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা বিপজ্জনক। আজ যদি ইউরোপীয় বাজারে বড় ধাক্কা আসে, তাহলে পুরো অর্থনীতি চাপের মুখে পড়বে। তাই রপ্তানি বহুমুখীকরণ সময়ের দাবি; এটি অর্থনৈতিক নিরাপত্তার প্রশ্ন।

 

 

ফার্মাসিউটিক্যালস, আইটি, লেদার, কৃষিভিত্তিক প্রক্রিয়াজাত পণ্য, জাহাজ নির্মাণ কিংবা হালকা প্রকৌশল খাতে দ্রুত বিনিয়োগ ও নীতিসহায়তা প্রয়োজন। একই সঙ্গে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির দিকে নজর দিতে হবে। কারণ ভবিষ্যতের বিশ্ববাজারে শুধু কম মজুরির শ্রম দিয়ে টিকে থাকা যাবে না; প্রয়োজন প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন।

 

 

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো শ্রমিকদের ভবিষ্যৎ। বাংলাদেশের পোশাকশিল্পে প্রায় ৪০ লাখ মানুষ সরাসরি কাজ করেন, যাদের বড় অংশ নারী। এই শিল্পের কোনো ধাক্কা মানে কেবল অর্থনৈতিক সংকট নয়; এটি সামাজিক স্থিতিশীলতার ওপরও বড় প্রভাব ফেলবে। তাই এফটিএ এবং এলডিসি-পরবর্তী বাস্তবতা নিয়ে এখনই জাতীয় পর্যায়ে সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করা জরুরি।

 

 

বাংলাদেশের সামনে সময় খুব বেশি নেই। ২০২৯ সাল হয়তো ক্যালেন্ডারের হিসাবে দূরে মনে হতে পারে, কিন্তু আন্তর্জাতিক বাণিজ্য আলোচনার বাস্তবতায় এটি খুবই স্বল্প সময়। আজ যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে, তার ফল ভোগ করবে আগামী প্রজন্ম। ইইউ-ভারত এফটিএ আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে, বৈশ্বিক বাণিজ্যে আবেগ নয়, প্রস্তুতিই শেষ কথা। যারা সময়মতো নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করতে পারবে, ভবিষ্যতের বাজার তাদের দখলেই থাকবে। বলা যায়, বাংলাদেশের পোশাকশিল্প এখন এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। সামনে হয় নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলবে, নয়তো প্রতিযোগিতার চাপে ধীরে ধীরে বাজার হারানোর ঝুঁকি তৈরি হবে। সুতরাং সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এখনই। কারণ বিশ্ববাণিজ্যের ট্রেন কখনো কারো জন্য অপেক্ষা করে না। সরকার ও সংশ্লিষ্ট সবার সমন্বিত সিদ্ধান্তের ওপরই নির্ভর করছে বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের ভবিষ্যৎ।

 

 


• লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

ট্যাগ:BCSকলামবাংলাদেশ