এআই কোন সংকট ডেকে আনতে পারে

এআই কোন সংকট ডেকে আনতে পারে
কলামআন্তর্জাতিক

এআই কোন সংকট ডেকে আনতে পারে

১২ জুলাই, ২০২৬

ড. মোহাম্মদ দুলাল মিয়া [আপডেট : কালবেলা, ১১ ডিসেম্বর ২০২৫]

চলমান আর্থিক ও ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনা করলে এ কথা বলা যায় যে, বর্তমান বিশ্ব এক অস্থির সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এবং অঞ্চলে অভ্যন্তরীণ এবং আন্তঃদেশীয় কোন্দল, ক্রমাগত উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দেশে দেশে ডানপন্থি রাজনীতির উত্থানের ফলে রক্ষণশীল নীতি এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থার ভঙ্গুর পরিস্থিতি বিশ্ব অর্থনীতিকে এক নাজুক অবস্থার মধ্যে ঠেলে দিয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই খাতে বিনিয়োগের উল্লম্ফন। উন্নত দেশে হাইটেক কোম্পানিগুলো এআই অবকাঠামোতে এত বেশি বিনিয়োগ করেছে, যা বিনিয়োগকারীদের মনে এক আকাশচুম্বী প্রত্যাশার জন্ম দিয়ছে। ফলে, এসব কোম্পানির শেয়ারের দাম বেড়েছে অভাবনীয় হারে।

 

 

 

 উদাহরণস্বরূপ, ২০২২ সালের নভেম্বরে চ্যাটজিপিটি চালু হওয়ার পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের পুঁজিবাজারের আয়ের প্রবৃদ্ধির ৮০ শতাংশই এসেছে এআই কোম্পানির শেয়ারের দাম বৃদ্ধি থেকে। এ ছাড়া, মোট মূলধনি ব্যয় বৃদ্ধির ৯০ শতাংশই করেছে এআই কোম্পানি। শুধু তাই নয়, বিশ্ব পুঁজিবাজার সূচকের (এমএসসিআই, যা বিশ্বের বড় এবং মাঝারি আকারের ১ হাজার ৩০০ কোম্পানির শেয়ারের দাম নিয়ে গঠিত) এক-পঞ্চমাংশ দখল করে আছে মাত্র পাঁচটি কোম্পানি (এনভিডিয়া, মাইক্রোসফট, অ্যাপল, অ্যালফাবেট ও অ্যামাজন)। এ পাঁচটি কোম্পানির সঙ্গে মেটা এবং টেসলা মিলে ‘ম্যাগনিফিসেন্ট সেভেন’ বা ‘অসাধারণ সাত’ কোম্পানির ধারণা তৈরি হয়েছে, যাদের দখলে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের পুঁজিবাজারের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ পুঁজি।

 

 

বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, এআই কোম্পানির প্রকৃত আয়ের তুলনায় বর্তমান দাম অনেক বেশি। নোবেল অর্থনীতিবিদ রবার্ট শিলার’ এর মূল্য-আয় অনুপাত (কোম্পানির বর্তমান মূল্যকে বিগত ১০ বছরে মুদ্রাস্ফীতি-সমন্বিত আয়ের গড় দিয়ে ভাগ করে) এরই মধ্যে ৪০ গুণিতক অতিক্রম করেছে। অর্থাৎ, এআই কোম্পানির বর্তমান বাজার তার গত ১০ বছরের গড় আয়ের ৪০ গুণ। তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে, এ অনুপাত ১৭ থেকে ২৮-এর মধ্যে হলে কাম্য মনে করা হয়। তবে এ অনুপাত যখন ৩০ অতিক্রম করে, তখন সেই বাজারকে অতিমূল্যায়িত বা কোনো নির্দিষ্ট শেয়ারকে অতিমূল্যায়িত শেয়ার হিসেবে ধরা হয়। ২০০০ সালে ডটকম বুদবুদ ধসের পর মূল্য-আয় অনুপাতের এত উল্লম্ফন এবারই প্রথম।

 

 

বাজারের এই উল্লম্ফন প্রত্যক্ষ করে অনেক প্রযুক্তি-বিশেষজ্ঞ ভবিষ্যদ্বাণী করছেন যে, এআই-সম্পর্কিত প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর অধিক ব্যয় পুঁজিবাজারে এরই মধ্যে একটি বাবল বা বুদবুদ তৈরি করেছে। যেমন, ওপেনএআইয়ের প্রধান নির্বাহী স্যাম অল্টম্যান বর্তমান বাজারের পরিস্থিতিকে ১৯৯০ দশকের ডটকম উত্থানের সঙ্গে তুলনা করে বলেছেন যে, এআই কোম্পানির বিনিয়োগ এবং আয়ের প্রত্যাশা কিছুটা অতিরঞ্জিত। একই অভিমত প্রকাশ করেছেন মেটার প্রতিষ্ঠাতা এবং প্রধান নির্বাহী মার্ক জাকারবার্গ। যুক্তরাষ্ট্রের একটি বহুজাতিক ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠান জেপি মর্গান চেজের প্রধান নির্বাহী জেমি ডাইমন বলেছেন, আগামী ছয় মাস থেকে দুই বছরের মধ্যে এআই কোম্পানির শেয়ার দামের একটা বিশাল পতন আসন্ন।

 

 

 

ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায় যে, যখন অল্প কয়েকটি কোম্পানি বাজারের একটি বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করে, তখন পুঁজিবাজার প্রায়ই খারাপের দিকে ধাবিত হয়। অধিকন্তু, বাজারের উত্থান যদি ঋণের টাকায় হয়, তবে তার পরিণতি হয় আরও ভয়াবহ। ১৯২৯ সালের মহামন্দা এবং ২০০৮ সালের অর্থনৈতিক সংকট—উভয়ই অতিরিক্ত ঋণ করে বিনিয়োগের কারণে ঘটেছিল। ২০০৮ সালের সংকটের মূলে ছিল এমন সব বিনিয়োগের উপকরণ, যেগুলোর ঋণমান সঠিকভাবে নির্ণয় সমসাময়িক প্রযুক্তির সামর্থ্যের মধ্যে ছিল না। বর্তমান পরিস্থিতিও অনেকটা একই রকম—অস্বচ্ছতা এবং পুরো ব্যবস্থাজুড়ে অতিরিক্ত ঋণ (ব্যাংক থেকে শুরু করে প্রাইভেট ক্রেডিট এবং ক্রিপ্টো মার্কেট পর্যন্ত)।

 

 

 
 

এআই প্রযুক্তি এত দ্রুত এগোচ্ছে যে, এর প্রভাবে অর্থনীতির পুরোনো অনেক খাত বদলে যেতে বাধ্য হচ্ছে বা একেবারেই বিলীন হয়ে যাচ্ছে। এ অবস্থা প্রযুক্তি বিনিয়োগকারীদের একটা দ্বিধার মধ্যে ফেলে দিচ্ছে। হয় তারা স্রোতে গা না ভাসিয়ে এআই খাতে বিনিয়োগের হাতছানি থেকে দূরে সরে থাকবে, যেমনটা করছে অ্যাপল, অথবা এআই খাতে বিপুল বিনিয়োগ করে লাভ করার পথ খুঁজে বের করবে, যেমনটা করছে গুগল, মেটা, মাইক্রোসফট ও অ্যামাজন। মাইক্রোসফট ও মেটা তাদের মোট বিক্রির এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি এখন বিনিয়োগ করছে এআই খাতে। মোট দেশজ উৎপাদনের হিসাবে ধরলে, এআই অবকাঠামোতে এ ব্যয় এরই মধ্যে ডটকম বুদবুদের সময় টেলিযোগাযোগ এবং ইন্টারনেট অবকাঠামোতে ব্যয়কে অতিক্রম করে এখনো বেড়েই চলছে। যদি এআই প্রযুক্তির বিনিয়োগ থেকে অর্জিত আয় এ বিপুল খরচের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে না বাড়ে, তবে ডেটা সেন্টারগুলোতে ধস নামবে। এতে শেয়ারহোল্ডাররা বড় লোকসানের মুখে পড়বেন এবং কোম্পানিগুলো বিনিয়োগ বন্ধ করে দেবে, যা সরাসরি অর্থনৈতিক মন্দা ডেকে আনতে পারে।

 

 

 

এখনো পর্যন্ত এআইপ্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর আয় এবং ব্যয়ের মধ্যে বিশাল অসামঞ্জস্য রয়েছে। অর্থাৎ, আয়ের চেয়ে বিনিয়োগের পরিমাণ অনেক বেশি। ফলে বিনিয়োগের বাড়তি তহবিল মেটাতে পুরো শিল্পটি বিশাল ঋণের ওপর নির্ভরশীল। ২০২৫ সালের প্রথমার্ধে প্রযুক্তি সংস্থাগুলোর বিনিয়োগ-গ্রেড ঋণ ২০২৪ সালের প্রথম ছয় মাসের তুলনায় ৭০ শতাংশ বেশি ছিল। এপ্রিল মাসে অ্যালফাবেট ২০২০ সালের পর প্রথমবারের মতো বন্ড ইস্যু করেছে। মাইক্রোসফট সম্প্রতি তার নগদ অর্থ কমিয়ে এনেছে। কোম্পানিটির ফিন্যান্স লিজ (যা আদতে ঋণের মতো) ২০২৩ সাল থেকে প্রায় তিনগুণ বেড়েছে। ডেটা সেন্টারের আয়নির্ভর ঋণ সিকিউরিটিজ বাজার ২০১৮ সালের শূন্য থেকে বেড়ে বর্তমানে ৫ হাজার কোটি মার্কিন ডলারে দাঁড়িয়েছে।

 

 

 

আরও ভয়ের বিষয় হলো, এ ঋণের একটা বড় অংশ আসছে অনিয়ন্ত্রিত খাত বা ‘শ্যাডো ব্যাংকিং’ থেকে। হেজ ফান্ডগুলোর ঋণের পরিমাণ ২০২৪ সালে রেকর্ড ৬ লাখ ২০ হাজার কোটি মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। এ ছাড়া বিটকয়েনের মতো ক্রিপ্টোকারেন্সিকে মূলধারার আর্থিক বাজারের সঙ্গে মিশিয়ে ফেলা হয়েছে, যার পেছনে কোনো উৎপাদনশীল সম্পদ নেই। একইভাবে প্রাইভেট ঋণ তহবিল, যেমন ব্যক্তিগত ইক্যুইটি তহবিল, যা অর্থ ধার করে ব্যক্তিগত বাজারে সেই অর্থ ধার দেয়, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ঋণের অন্যতম প্রধান উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ অর্থের একটা বড় অংশ ব্যাংক থেকে ধার করা হয়। তদুপরি, অব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠানেও ব্যাংক ঋণ বর্তমানে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৭০ হাজার কোটি মার্কিন ডলার বা মোট বকেয়া ঋণের ১৪ শতাংশ, যেখানে ২০১৩ সালে এটি ছিল মাত্র ১ শতাংশ। ব্যাংকগুলো প্রাইভেট ঋণ তহবিল এবং অব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে অর্থায়ন করে এআই প্রযুক্তি খাত উত্থানের পথ প্রশস্ত করে দিচ্ছে। যার ফলে ছায়া ব্যাংকিং এবং অব্যাংকিং খাতের ঝুঁকি এখন মূল ব্যাংক খাতেও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

 

 

 

অধিকন্তু, প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো বিনিয়োগ এবং শেয়ার ক্রয়ের মাধ্যমে একে অন্যের সঙ্গে গভীরভাবে সংযুক্ত। যেমন—ওপেনএআইতে মাইক্রোসফট ও এনভিডিয়ার বিনিয়োগ আছে, আবার মাইক্রোসফট ও ওপেনএআই উভয়ই এনভিডিয়ার গ্রাহক। মাইক্রোসফট আবার এআই ক্লাউড কোম্পানি ‘কোরওয়েভ’-এর গ্রাহক, যেখানে এনভিডিয়ার মালিকানা আছে। অর্থাৎ, নিজের গ্রাহকের কোম্পানিতে নিজেই বিনিয়োগ করে তারা কৃত্রিমভাবে শেয়ারের দাম বাড়াচ্ছে। যদি এ চক্র ভেঙে পড়ে এবং এআই তার প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে ব্যর্থ হয়, তবে শেয়ারের দাম কমে যাবে নিশ্চিত। তখন হেজ ফান্ডগুলো তাদের ঋণ শোধ করতে শেয়ার বিক্রি করতে বাধ্য হবে, যা বাজারে ধস নামাবে এবং ব্যাংকগুলোকে বিপদে ফেলবে।

 

 

 

এদিকে নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থাগুলো আর্থিক বাজারকে ক্রিপ্টো বাজারের সঙ্গে একীভূত করার অনুমতি দিয়েছে, যা পুঁজিবাজারের স্থিতিশীলতার জন্য অধিক ঝুঁকিপূর্ণ। বিটকয়েন এবং অন্যান্য ক্রিপ্টো সম্পদ পুঁজিবাজারের ঝুঁকির বিরুদ্ধে একটি সুরক্ষা বলয় হিসেবে কাজ করার কথা বলা হলেও এসব ক্রিপ্টো-সম্পদের মূল্যের গতিবিধি মূলত কোম্পানির শেয়ার দামের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। সুতরাং, এটা সহজেই অনুমেয় যে, এআই কোম্পানির বর্তমান অবস্থার নেতিবাচক কোনো হেরফের হলে ক্রিপ্টো-সম্পদের মূল্যেও আঘাত আসবে।

 

 

অনেক অর্থনীতিবিদ এমন ধারণা করছেন যে, এআই বিনিয়োগের উল্লম্ফনে যে বুদবুদের সৃষ্টি হয়েছে, তার পতন এখন শুধু সময়ের ব্যাপার। এমনটা যদি সত্যিই ঘটে, তবে যেসব অর্থনীতিতে এআই খাতের বড় অবদান রয়েছে, বিশেষ করে বিশ্বের উন্নত অর্থনীতি, সেসব দেশে এর নেতিবাচক প্রভাবটা বেশি পরিলক্ষিত হবে। এটা অনুমেয় যে, এআই-সৃষ্ট বুদবুদ উন্নয়নশীল দেশগুলোকে খুব বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করবে না। তবে উন্নয়নশীল দেশগুলোর সরকারের উচিত হবে এখন থেকেই সাবধানতা অবলম্বন করা। বিশেষ করে, সরকারের উচিত হবে নিজস্ব অভ্যন্তরীণ বাজার শক্তিশালী করা এবং রাজস্ব আয় বাড়ানো, অর্থনৈতিক মন্দা মোকাবিলায় আগে থেকেই নীতিমালা প্রস্তুত রাখা, ছায়া ব্যাংকিং ব্যবস্থার হ্রাস টেনে ধরা, অব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে যথোপযুক্ত নীতিমালার আওতায় নিয়ে আসা, বাণিজ্যের জন্য বিকল্প অংশীদার বা দেশ খুঁজে বের করা। তবে সবচেয়ে জরুরি হলো নিজস্ব কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডিজিটাল মুদ্রা চালু করার ব্যবস্থা করা। এ নীতিগুলোর যদি কার্যকর ব্যবস্থা করা যায়, তাহলে আশা করা যায় যে, বিশ্ব অর্থনীতির প্রতিকূল অবস্থা উন্নয়নশীল দেশগুলোকে খুব একটা প্রভাবিত করবে না।

 

 

লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, কলেজ অব ব্যাংকিং অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল স্টাডিজ, মাস্কাট, ওমান

ট্যাগ:BCSকলামআন্তর্জাতিক