
চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের জন্য প্রস্তুত হতে হবে
এম এ আজিজ [সূত্র : কালবেলা, ১১ জুন ২০২৬]
বিজ্ঞানভিত্তিক অত্যাধুনিক প্রযুক্তির যুগে বাংলাদেশে কতটুকু প্রস্তুত। এই অত্যাধুনিক প্রযুক্তি এখন বিশ্বে কর্মজীবী মানুষের বিকল্প হয়ে উঠেছে। এরই মধ্যে বাংলাদেশের শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোও উন্নত বিশ্বের মতোই এ অত্যাধুনিক প্রযুক্তির দখলে চলে যেতে শুরু করেছে। অর্থাৎ, বাংলাদেশও স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি ব্যবহার শুরু করেছে।
বর্তমান সরকার ঢাকা শহরের গুরুত্বপূর্ণ ট্রাফিক সিগন্যালসহ কয়েকটি খাতে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) প্রযুক্তি ব্যবহার শুরু করেছে। এর আগে কয়েকটি গার্মেন্টস এবং ফার্নিচার শিল্পে রোবট ব্যবহারে শ্রমিকরা কর্মহীন হয়েছে। এ ছাড়া আধা অটোমেশন শিল্প তো আছেই। অটোমেশন এমন একটি প্রযুক্তিগত প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে মানুষের সরাসরি হস্তক্ষেপ বা শারীরিক শ্রম ছাড়াই কোনো কাজ বা সিস্টেম স্বয়ংক্রিয়ভাবে সম্পন্ন করে।
চলমান চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগে বিশ্বে পর্যায়ক্রমে অত্যাধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বদলে দিচ্ছে মানুষের জীবন-জীবিকার গতিপথ। কিন্তু এ স্বয়ংক্রিয়তার যুগে দেশের বর্তমান শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো ‘সনদপ্রাপ্ত অদক্ষ শিক্ষিত জনশক্তি সৃষ্টি’ করে কর্মহীন মানুষের তালিকা আরও দীর্ঘ করছে। স্বয়ংক্রিয়তার এ যুগে টিকে থাকতে হলে বাংলাদেশকে বিজ্ঞানভিত্তিক অত্যাধুনিক প্রযুক্তির শিক্ষায় শিক্ষিত দক্ষ জনশক্তি তৈরি করার বিকল্প নেই।
বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে বর্তমানে ৫৬ থেকে ৫৮টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, মোট ১১৬টি অনুমোদিত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, যার মধ্যে ১১০টিতে নিয়মিত শিক্ষা কার্যক্রম চলছে। পাশাপাশি, সরকার-স্বীকৃত আলিয়া মাদ্রাসা মোট ৯ হাজারটি এবং কওমি মাদ্রাসা আছে ১৯ হাজার ১৯৯টি। বর্তমানে সর্বমোট শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ৩ কোটি ৭০ লাখ। তবে উচ্চশিক্ষা বা বিশ্ববিদ্যালয় স্তরে শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ৩০ লাখ। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় সাধারণ স্কুল-কলেজে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কিছুটা কমলেও মাদ্রাসায় শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়ে প্রায় ২৮ লাখ ছুঁয়েছে।
বিজ্ঞানভিত্তিক অত্যাধুনিক প্রযুক্তিই সারা বিশ্বের গতিপথ বদলে দিচ্ছে। যেমন, এখন পর্যন্ত পৃথিবীর ইতিহাসে তিনটি শিল্পবিপ্লব ঘটেছে। চতুর্থটি চলমান। ১৭৮৪ সালে প্রথম শিল্পবিপ্লবে পানি ও বাষ্পীয় ইঞ্জিনের নানামুখী ব্যবহারের কৌশল আবিষ্কার হয়। ১৮২০-১৮৩০ সালে দ্বিতীয় শিল্পবিপ্লবে প্রথম বিদ্যুৎ উৎপাদনের বুনিয়াদি তত্ত্ব আবিষ্কারের পর ওই তত্ত্বের ভিত্তিতে ১৮৭০ সালে বিদ্যুতের ব্যবহারিক দিক আবিষ্কার হয়। ১৯৬৯ সালে তৃতীয় শিল্পবিপ্লবে ইন্টারনেটের আবিষ্কার হয় ও ১৯৮৯ সালে ইন্টারনেট ওয়েবসাইট ‘ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েব (www)’ নামে পরিচিতি পায় এবং ১৯৯১ সালে বিশ্বের প্রথম ওয়েবসাইট খোলা হয়।
চলমান চতুর্থ শিল্পবিপ্লবে আগামী পৃথিবী হবে জ্ঞানভিত্তিক ‘রোবটিক্স, ন্যানো, আইওটি, ডাটা সায়েন্স প্রযুক্তির পৃথিবী’। চতুর্থ বিপ্লব পাল্টে দেবে মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার চিরচেনা রূপ। এ আধুনিক স্মার্ট প্রযুক্তি ব্যবহার করে প্রচলিত উৎপাদন এবং শিল্প ব্যবস্থার স্বয়ংক্রিয়করণের একটি চলমান প্রক্রিয়া। প্রযুক্তির প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে পুরো বিশ্বেই শ্রমিকরা কাজ হারাতে থাকবে। বিশ্ব প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে এবং দেশের উন্নয়নের চাকা চলমান রাখতে অবশ্যই বাংলাদেশকে জ্ঞানভিত্তিক অত্যাধুনিক প্রযুক্তির উপযোগী দক্ষ কর্মজীবী জনশক্তি তৈরি করা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই।
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, বিশ্বের প্রায় ১৭৬টি দেশে কাজের সন্ধানে গেছেন প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখের বেশি বাংলাদেশি। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগে আগামী কমবেশি ১০ থেকে ১২ বছর পর বর্তমানের এ অদক্ষ বাংলাদেশিদের জন্য আধুনিক বিশ্বে কাজের সুযোগ খুবই সংকুচিত হয়ে আসবে। ফলে দেশের জিডিপিতে প্রবাসীদের অবদান ৫ থেকে ৬ শতাংশ ধরে রাখাও সম্ভব হবে না। চলমান চতুর্থশিল্প বিপ্লবে ১০ প্রযুক্তি বিশ্বে শ্রমিকদের বিকল্প হয়ে উঠবে। যেমন, ১. অ্যাডভান্সড ম্যাটেরিয়ালস, ২. ক্লাউড টেকনোলজি, ৩. অটোনোমাস ভেহিকল, ৪. সিনথেটিক বায়োলজি, ৫. ভার্চুয়াল অগমেন্টেড রিয়েলিটি, ৬. আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স, ৭. রোবট, ৮. ব্লাক চেইন, ৯. থ্রিডি প্রিন্টিং ও ১০. ইন্টারনেট অব থিংকস।
চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের সূচনা স্মার্টফোনের মাধ্যমে বিশ্বের তথ্যপ্রযুক্তি খাতের পরিবর্তন, ইন্টারনেট অব থিংস, অত্যাধুনিক প্রযুক্তির পরিচালনায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রয়োগ, রোবোটিকস, জৈবপ্রযুক্তি, কোয়ান্টাম কম্পিউটিংয়ের মতো বিষয়গুলো। সামনে আসছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), রোবট এবং ইন্টারনেট অব থিংস (আইওটি), যা সম্পূর্ণরূপে মানবসম্পদের বিকল্প হিসেবে কাজ করবে। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবে বড় ভূমিকা রাখবে ‘ক্লাউড কম্পিউটিং’, ‘ইন্টারনেট অব থিংস’ ও ‘আর্টিফিসিয়াল ইন্টিলিজেন্স’ প্রযুক্তি।
ইন্টারনেট অব থিংস (আইওটি): আমাদের চারপাশের সব বস্তু নিজেদের মধ্যে ইন্টারনেটের মাধ্যমে যখন নেটওয়ার্ক গড়ে তুলবে, সেটাই আইওটি। এরই মধ্যে আমরা গুগল হোম, এ্যামাজনের আলেক্সার ঘরের বাতি, সাউন্ড সিস্টেম, দরজাসহ অনেক কিছুই নিয়ন্ত্রণ শুরু করেছে। উদাহরণ স্বরূপ: আপনি বাজার করবেন। আপনার ফ্রিজ নিজেই ভেতরে কী আছে, তা আপনাকে জানাবে বা নিজেই সরাসরি অনলাইনে অর্ডার দিয়ে প্রয়োজনীয় জিনিস কিনবে। আপনার বাসার চুলাকে আপনি একবার শিখিয়ে দেবেন সকালে, দুপুরে বা রাতে কী খেতে চান, চুলা তাই আপনার জন্য রান্না করে রাখবে। আবার বৃষ্টির দিনে আপনি খিচুড়ি ভালোবাসেন, আপনার চুলা সেটা মনে রাখবে এবং বাইরে বৃষ্টি হলেই সেদিন চুলা আপনার জন্য খিচুড়ি রান্না করে রাখবে।
ক্লাউড কম্পিউটিং: ক্লাউড কম্পিউটিং মানে আপনার কম্পিটারের হার্ডডিস্কের ওপর আর চাপ থাকবে না। যে কোনো স্টোরেজ, সফটওয়্যার এবং যাবতীয় অপারেটিং সিস্টেমের কাজ চলে যাচ্ছে হার্ডডিস্কের বাইরে। শুধু ইন্টারনেট থাকলেই ক্লাউড সার্ভারে কানেক্ট হয়েই সব সুবিধা নেওয়া যাবে। কম্পিউটারের হার্ডডিস্ক নষ্ট হওয়া বা সমস্যা হওয়ার সুযোগ থাকলেও ক্লাউড সার্ভার ডাউন হওয়ার সুযোগ নেই।
যুক্তরাষ্ট্রের ওয়ার্ল্ডোমিটার ও জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালে বাংলাদেশের জনসংখ্যা প্রায় ১৭ কোটি ৭৮ লাখ। ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বের জনসংখ্যা হবে ৮০০ কোটি। পরের ২০ বছরে বেড়ে হবে ৯০০ কোটি। ফলে সামগ্রিক চাহিদা বাড়বে, কিন্তু উন্নত দেশসহ বিশ্বের বেশিরভাগ দেশে জন্মহার কমছে বলে বার্ধক্যে উপনীত হওয়া জনশক্তিকে প্রতিস্থাপন করার মতো পর্যাপ্ত সংখ্যক তরুণ থাকবে না।
মোট জনসংখ্যার ৪২ দশমিক ৮৪ শতাংশ ১৫ থেকে ৩৯ বছর বয়সী। এ ছাড়া শূন্য থেকে ১৪ বছর বয়সী ২৮ দশমিক ৮১ শতাংশ এবং চল্লিশোর্ধ্ব মানুষের হার ২৮ দশমিক ৭১ শতাংশ। অর্থাৎ, তরুণ শ্রেণির সংখ্যা মোট জনসংখ্যার ৪৬ শতাংশ। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগে এ তরুণ শ্রেণির জনসংখ্যাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বর্তমানে দেশে যেহেতু তরুণদের সংখ্যা মোট জনসংখ্যার ৪৬ শতাংশ, সেহেতু আগামী ২০ বছর জুড়ে তরুণ বা কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী সংখ্যাগরিষ্ঠ থাকতে পারে। এ সময়ই চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের সুফল ভোগ করার শ্রেষ্ঠ সময়। দেশে কর্মক্ষম জনশক্তি ৬৫ দশমিক ২৩ শতাংশ। এর অর্থ হলো, দেশ এখন ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের সুবিধা ভোগ করছে। ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ হলো কোনো দেশের কর্মক্ষম জনসংখ্যার আধিক্য। এরপর এ আশীর্বাদের ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড নাও থাকতে পারে। সুতরাং এখনই দেশের তরুণ জনগোষ্ঠীকে স্বয়ংক্রিয়তার অগ্রগতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে উপযুক্ত জ্ঞানভিত্তিক বিজ্ঞানমনস্ক জনশক্তিতে গড়ে তুলতে হবে। অন্যথায়, দেশের অগ্রগতি বা জিডিপির চাকা নাও ঘুরতে পারে। এ অত্যাধুনিক প্রযুক্তি প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে পুরো বিশ্বের শ্রমিকরাই কাজ হারাতে থাকবে। বিশ্বে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে এবং দেশের উন্নয়নকে চলমান রাখতে হলে এ জ্ঞানভিত্তিক প্রযুক্তিই প্রধান ভরসা।
রোবট: রোবট একটি যান্ত্রিক কৃত্রিম কার্যসম্পাদক। এটি সাধারণত একটি ইলেক্ট্রো-যান্ত্রিক ব্যবস্থা, যার কাজকর্ম, অবয়ব ও চলাফেরা প্রায় মানুষের মতো, যা বিভিন্ন কাজে মূলত মানুষের বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় পরিচালিত অত্যাধুনিক যন্ত্র। রোবটকে দিয়ে নিখুঁতভাবে মানুষের দেহে জটিল অপারেশনসহ যে কোনো কাজ করানো যায়।
চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের চ্যালেঞ্জ: ১. তথ্যের সুরক্ষা নিশ্চিতকরণ, ২. প্রযুক্তিগত সমস্যায় উৎপাদনে ব্যাঘাত সৃষ্টি, ৩. ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা করা, ৪. ইন্টারনেট ও অন্যান্য প্রযুক্তির মধ্যে অব্যাহত সংযোগ নিশ্চিত করা এবং ৫. স্বয়ংক্রিয়তার কারণে বহু মানুষের কাজের সুযোগ হ্রাস পাওয়া।
চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের সম্ভাবনা: ১. স্বয়ংক্রিয়তার প্রভাবে কর্মক্ষেত্রে ঝুঁকি হ্রাস, ২. উৎপাদন শিল্পে নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধি, ৩. স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা খাতে বড় পরিবর্তন এবং ৪. বিশেষায়িত পেশার চাহিদা।
লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট



