ব্রিকসের মঞ্চে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সুযোগ

ব্রিকসের মঞ্চে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সুযোগ
কলামবাংলাদেশ

ব্রিকসের মঞ্চে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সুযোগ

১৩ আগস্ট, ২০২৬

ড. ইমতিয়াজ আহমেদ [সূত্র : আমাদের সময়, ১৩ আগস্ট ২০২৬]

গত সোমবার বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। স্বাভাবিকভাবেই এই সাক্ষাৎকে শুধু একটি সৌজন্য সাক্ষাৎ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এর পেছনে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের নানা বিষয় যেমন রয়েছে, তেমনি সামনে রয়েছে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন- ভারতে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী যাবেন কি না।

 

 

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাতের আগে ভারতের হাইকমিশনার পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গেও বৈঠক করেছেন। ফলে বিষয়টি নিয়ে ভারতের আগ্রহ যে রয়েছে, সেটি বোঝা যায়। একই সময়ে বাংলাদেশের সামনে যে সিদ্ধান্তটি রয়েছে, সেটি হলো- আমন্ত্রিত হয়ে প্রধানমন্ত্রী ব্রিকস সম্মেলনে অংশ নেবেন কি না।

 

 

আমার মনে হয়, এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হওয়া উচিত বাংলাদেশের লাভ-ক্ষতির হিসাব। প্রধানমন্ত্রী যাবেন কী যাবেন না- এটা শুধু ভারতকে কেন্দ্র করে দেখলে চলবে না। ব্রিকস ভারতের নিজস্ব কোনো সংগঠন নয়। এখানে চীন, রাশিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, ইন্দোনেশিয়াসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্র রয়েছে। ফলে সম্মেলনে অংশ নেওয়া মানে শুধু ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয় নয়; বরং একাধিক দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগের সুযোগ তৈরি হওয়া।

 

 

এখানেই বাংলাদেশের জন্য বড় একটি সম্ভাবনা রয়েছে। বড় কোনো আন্তর্জাতিক সম্মেলনে শুধু মূল বৈঠকই গুরুত্বপূর্ণ নয়, এর পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানদের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বা সাইড মিটিংয়ের সুযোগও থাকে। বাংলাদেশ চাইলে সেই সুযোগ কাজে লাগাতে পারে। চীন, রাশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকাসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সম্পর্ক নিয়ে সরাসরি আলোচনা করা সম্ভব হতে পারে।

 

 

বিশেষ করে বাংলাদেশের জন্য এখন বিনিয়োগ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানো প্রয়োজন। ফলে প্রধানমন্ত্রী যদি সম্মেলনে যান, তাহলে শুধু আনুষ্ঠানিক উপস্থিতির মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে সাইড মিটিংগুলোকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত। ইন্দোনেশিয়া বা দক্ষিণ আফ্রিকার মতো দেশের রাষ্ট্রপ্রধানের সঙ্গে সরাসরি বৈঠক করে বাংলাদেশে বিনিয়োগ বাড়ানোর আহ্বান জানানো যেতে পারে। একইভাবে চীন ও রাশিয়ার সঙ্গেও অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও বিনিয়োগের নতুন ক্ষেত্র নিয়ে আলোচনা হতে পারে।

 

 

বাংলাদেশ এরই মধ্যে চীন সফর করেছে এবং সেখানে একাধিক সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে। অর্থনৈতিক করিডর নিয়েও আলোচনা হয়েছে। ফলে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে একক কোনো দেশের ওপর নির্ভরশীল না হয়ে বহুমুখী সম্পর্ক গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা আরও স্পষ্ট হয়েছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, প্রধানমন্ত্রী যদি ব্রিকস সম্মেলনে না যান, তাহলে বাংলাদেশের লাভটা কোথায়? অবশ্যই সরকারকে নিজের কূটনৈতিক হিসাব-নিকাশ করেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তবে না যাওয়ার ফলে সম্ভাব্য ক্ষতির দিকটিও বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। কারণ বাংলাদেশ যদি আমন্ত্রণ পেয়েও এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্মেলনে অংশ না নেয়, তাহলে ব্রিকসের সদস্য ও অংশীদার দেশগুলোর কাছে এমন একটি বার্তা যেতে পারে যে বাংলাদেশ তাদের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করার বিষয়ে খুব বেশি আগ্রহী নয়।

 

 

অন্যদিকে বাংলাদেশ যদি অংশ নেয়, তাহলে সেটি একটি ইতিবাচক কূটনৈতিক বার্তা হতে পারে। বিশেষ করে বাংলাদেশ ভবিষ্যতে ব্রিকসের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হতে চাইলে এই সুযোগকে কাজে লাগানো যেতে পারে। আমরা যদি সদস্য হওয়ার বিষয়ে আগ্রহী হই, তাহলে সম্মেলনে উপস্থিত হয়ে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক বাড়ানোর সুযোগ কেন নষ্ট করব?

 

 

এখানে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক সম্পর্কের বিষয়টিও আলাদাভাবে দেখতে হবে। ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কে কিছু গুরুত্বপূর্ণ মতপার্থক্য রয়েছে। শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা, সার্বভৌম সমতা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধার মতো বিষয় সামনে এসেছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাতে এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলেও জানা গেছে। কিন্তু ভারত-বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় মতপার্থক্যকে ব্রিকস সম্মেলনে অংশ নেওয়ার প্রশ্নের সঙ্গে এক করে দেখা ঠিক হবে না। ভারতের সঙ্গে আমাদের যে দ্বন্দ্ব বা মতপার্থক্য রয়েছে, তা ভারতের সঙ্গে আলাদাভাবে কূটনৈতিক পথে সমাধানের চেষ্টা করতে হবে। ব্রিকসকে শুধু ভারতীয় একটি প্ল্যাটফর্ম হিসেবে দেখলে বাংলাদেশেরই ক্ষতি হবে।

 

 

আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। আমরা যদি শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সিদ্ধান্তহীনতায় থাকি এবং শেষ সময়ে গিয়ে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত নিই, তাহলে সাইড মিটিংয়ের সুযোগ পাওয়াও কঠিন হতে পারে। কারণ অন্য দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদেরও নিজেদের বৈঠকের ব্যস্ততা থাকবে। সুতরাং যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলে এখন থেকেই প্রস্তুতি নেওয়া প্রয়োজন। কোন কোন দেশের সঙ্গে বৈঠক হবে, কী বিষয়ে আলোচনা হবে, বাংলাদেশ কী চাইবে- এসব আগেই ঠিক করতে হবে।

 

 

বর্তমান বিশ্বব্যবস্থা দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়া, ভারতসহ বড় শক্তিগুলোর মধ্যে নতুন ধরনের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সমীকরণ তৈরি হচ্ছে। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে ভারসাম্য রাখা অত্যন্ত জরুরি। একটি দেশের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো রাখতে গিয়ে অন্য গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের সুযোগ নষ্ট করা কোনোভাবেই বাংলাদেশের জন্য লাভজনক হবে না।

 

 

আমার মনে হয়, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ব্রিকস সম্মেলনে অংশগ্রহণের সম্ভাবনাকে বাংলাদেশের বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থের জায়গা থেকে দেখা দরকার। সেখানে গেলে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের একটি সুযোগ তৈরি হবে, আবার একই সঙ্গে চীন, রাশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকাসহ গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলোর সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের সুযোগও পাওয়া যাবে। সুতরাং সিদ্ধান্তটি ভারতকে খুশি করা বা কোনো একটি পক্ষকে অসন্তুষ্ট করার হিসাব দিয়ে নেওয়া উচিত নয়। প্রশ্ন হওয়া উচিত- বাংলাদেশের জন্য কোন সিদ্ধান্তে বেশি কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক ও কৌশলগত লাভ রয়েছে। সেই হিসাব করলে আমার মনে হয়, এই সুযোগ হাতছাড়া করা ঠিক হবে না। বাংলাদেশ যদি যায়, তাহলে শুধু উপস্থিত থাকার জন্য নয়; বরং সাইড মিটিং, বিনিয়োগ, বাণিজ্য ও বহুপক্ষীয় সম্পর্ক সম্প্রসারণের সুযোগকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েই যাওয়া উচিত।

 

 

ড. ইমতিয়াজ আহমেদ : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক

ট্যাগ:BCSকলামবাংলাদেশ