
বর্ধিত জনসংখ্যা : বাংলাদেশের নীরব অর্থনৈতিক সংকট
রুবাইয়াত সাইমুম চৌধুরী [সূত্র : আমাদের সময়, ১৫ জুলাই ২০২৬]
বাংলাদেশের উন্নয়নের গল্প বলতে গেলে আমরা সাধারণত জিডিপি প্রবৃদ্ধি, দারিদ্র্য হ্রাস, তৈরি পোশাক রপ্তানি কিংবা বৈদেশিক রেমিট্যান্সের কথা বলি। কিন্তু একটি মৌলিক প্রশ্ন এখন ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে এখন, এই উন্নয়নের ভিত্তি কি ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাপ সামাল দিতে পারবে?
স্বাধীনতার সময় বাংলাদেশের জনসংখ্যা ছিল প্রায় সাড়ে ৭ কোটি। বর্তমানে তা প্রায় ১৭ কোটি ৬০ লাখ। অথচ দেশের আয়তন মাত্র ১,৪৮,৪৬০ বর্গকিলোমিটার। অর্থাৎ বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ দেশ হিসেবে বাংলাদেশে প্রতি বর্গকিলোমিটারে এক হাজারেরও বেশি মানুষের বসবাস। এই বাস্তবতা শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়; এটি অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, পরিবেশ এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপের প্রতিচ্ছবি।
দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ পরিবার পরিকল্পনার সাফল্যের জন্য আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত হয়েছে। ১৯৭৫ সালে যেখানে একজন নারী গড়ে ছয়টির বেশি সন্তানের জন্ম দিতেন, সেখানে কয়েক দশকের প্রচেষ্টায় মোট প্রজনন হার (Total Fertility Rate) প্রতিস্থাপন পর্যায়ের কাছাকাছি নেমে আসে। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিভিন্ন জরিপে দেখা যাচ্ছে, এই অগ্রগতির গতি কমেছে। বিশেষ করে কিছু অঞ্চলে কিশোরী মাতৃত্ব, বাল্যবিবাহ এবং আধুনিক জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির ব্যবহার কমে যাওয়ায় জন্মহার প্রত্যাশিত গতিতে আর কমছে না। একই সঙ্গে জনসংখ্যা বৃদ্ধির আরেকটি শক্তিশালী কারণ হলো Population Momentum অর্থাৎ অতীতে জন্ম নেওয়া বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠী এখন সন্তান ধারণের বয়সে পৌঁছেছে। ফলে প্রতিটি পরিবারে সন্তান সংখ্যা কমলেও মোট জনসংখ্যা আরও কয়েক দশক ধরে বাড়তেই থাকবে। এটি এমন এক অবস্থা যা শুরু হলে তার ফল কয়েক দশক পর্যন্ত ভোগ করতে হয়।
এই বাস্তবতার সবচেয়ে বড় অভিঘাত পড়ছে শ্রমবাজারে। প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক তরুণ কর্মসংস্থানের বাজারে প্রবেশ করছে। কিন্তু অর্থনীতি সেই অনুপাতে উচ্চ উৎপাদনশীলতার কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারছে না। অনেকেই উচ্চশিক্ষা শেষ করে দীর্ঘদিন বেকার থাকছেন, আবার অনেকে নিজেদের যোগ্যতার তুলনায় কম দক্ষতার কাজে যুক্ত হচ্ছেন। NEEt-এর জরিপে দেখা যায়, ২০২২ সালে ৪১% তরুণ-তরুণী শিক্ষা, কর্মসংস্থান বা প্রশিক্ষণ- এর কোনোটিতেই ছিল না, তরুণীদের ক্ষেত্রে এই হার ছিল ৬২%। এর ফলে মানবসম্পদের একটি বড় অংশ অপর্যাপ্তভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। জনমিতিক সুবিধা (Demographic Dividend) তখনই অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপ নেয়, যখন কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর জন্য দক্ষতা উন্নয়ন ও উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা যায়। অন্যথায় একই জনগোষ্ঠী অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে।
বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো এই চাপ সবচেয়ে বেশি অনুভব করছে। গত এক দশকে জীবনযাত্রার ব্যয়, শিক্ষা ব্যয় এবং স্বাস্থ্য ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। একটি সন্তানকে মানসম্মত বিদ্যালয়ে পড়ানো, কোচিং, ডিজিটাল ডিভাইস, স্বাস্থ্যসেবা এবং দক্ষতা উন্নয়নে যে ব্যয় প্রয়োজন, তা অনেক পরিবারের আয়ের তুলনায় দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে সন্তানদের শিক্ষায় আপস করছে অথবা উচ্চশিক্ষার সুযোগ সীমিত করে দিচ্ছে। একদিকে এটি অর্থনৈতিক বৈষম্য আরও প্রকট হওয়ার আশঙ্কা তৈরি করছে, অন?্যদিকে সেই সন্তানের জীবনকেও অপ্রয়োজনীয়ভাবে কঠিন করে, সংগ্রামের জীবন বেছে নিতে বাধ?্য করা হচ্ছে, যা তার মানসিক ভারসামে?্যর জন?্যও ক্ষতিকর। রাষ্ট্রের সামনেও একই ধরনের চ্যালেঞ্জ। প্রতিবছর নতুন বিদ্যালয়, শিক্ষক, হাসপাতাল, চিকিৎসক, রাস্তা, গণপরিবহন, বিদ্যুৎ, পানি ও নগরসেবা নিশ্চিত করতে বিপুল বিনিয়োগ প্রয়োজন। কিন্তু সরকারি সম্পদ সীমিত। বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত এখনও নিম্ন পর্যায়ে থাকায় জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়ে সামাজিক অবকাঠামো সম্প্রসারণ করা কঠিন হয়ে পড়ছে। ফলে সেবার মান ও প্রাপ্যতার মধ্যে বৈষম্য বাড়ছে। ঢাকাকে কেন্দ্র করে দ্রুত নগরায়ণ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। কর্মসংস্থানের আশায় প্রতিদিন হাজারো মানুষ শহরে আসছেন। কিন্তু আবাসন, পরিবহন, ড্রেনেজ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং স্বাস্থ্যসেবার সক্ষমতা একই গতিতে বাড়েনি। যানজটে নষ্ট হওয়া কর্মঘণ্টা, বায়ুদূষণের কারণে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং অনিয়ন্ত্রিত নগর সম্প্রসারণ, এসবই অর্থনীতির জন্য অদৃশ্য ব্যয় ( Hidden Economic Cost) তৈরি করছে। এই ব্যয় জাতীয় আয়ের হিসাবে সরাসরি দৃশ্যমান না হলেও উৎপাদনশীলতা কমিয়ে দেয়।
খাদ্যনিরাপত্তার প্রশ্নেও নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। কৃষিজমি কমছে, কিন্তু মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বন্যা, নদীভাঙন, লবণাক্ততা ও খরার প্রভাব কৃষিকে আরও অনিশ্চিত করে তুলছে। আগামী দুই দশকে একই জমি থেকে আরও বেশি উৎপাদন নিশ্চিত করা ছাড়া বিকল্প থাকবে না। এর জন্য কৃষিতে প্রযুক্তি, গবেষণা এবং উচ্চফলনশীল ও জলবায়ু সহনশীল জাতের ব্যবহার বাড়াতে হবে।
জনসংখ্যা বৃদ্ধির একটি কম আলোচিত দিক হলো এর সামাজিক প্রভাব। যখন একটি পরিবার সীমিত আয়ের কারণে প্রতিটি সন্তানের জন্য মানসম্মত শিক্ষা, পর্যাপ্ত পুষ্টি, প্রযুক্তিগত দক্ষতা বা ইতিবাচক সামাজিক পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারে না, তখন অনেক শিশু ও কিশোর পিছিয়ে পড়ে। আবার রাষ্ট্রের পক্ষেও যদি সবার জন্য সমান মানের শিক্ষা, খেলাধুলা, কারিগরি প্রশিক্ষণ এবং মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা সম্ভব না হয়, তবে এক ধরনের সামাজিক বঞ্চনা তৈরি হয়। গবেষণা বলছে, দীর্ঘমেয়াদি বেকারত্ব, শিক্ষাবিচ্ছিন্নতা, সামাজিক বৈষম্য এবং হতাশা কিশোর অপরাধ, মাদকাসক্তি, কিশোর গ্যাং এবং সহিংস উগ্রবাদে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তাই এটি শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়; এটি অর্থনৈতিক উন্নয়ন, মানবসম্পদ গঠন এবং সামাজিক বিনিয়োগেরও একটি প্রশ্ন। প্রতিটি শিশুর মানসম্মত শিক্ষা ও দক্ষতা নিশ্চিত করা কেবল মানবিক দায়িত্ব নয়, বরং ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার পূর্বশর্ত।
সঠিক শিক্ষাবঞ্চিত, স্বল্পশিক্ষিত এবং কুশিক্ষিত অদক্ষ বিশাল হতাশ এবং কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী শুধু সমাজের নয়, দেশের নিরাপত্তার জন্যও হুমকি। এই জনগোষ্ঠীকে খুব সহজে মেনিপুলেট করা যায়, নিজের স্বার্থে মোবিলাইজ করা যায়, যে কেনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মতের দিকে নিয়ে চরমপন্থি কাজ করানো যায়। এমন আবহের কিছু নমুনা সাম্প্রতিক সময়ে বেশ প্রকট হয়েছে। তার প্রভাব আমরা সরাসরি আমাদের দেশের বৈদেশিক বিনিয়োগ বা এফডিআই’র ওপর দেখছি। যার কারণে বাংলাদেশের এফডিআই উগান্ডার চেয়েও কম। অথচ ভৌগোলিক, অর্থনৈতিক এবং জনমিতিকভাবে আমাদের এখানে এখন বিনিয়োগের স্বর্ণযুগ চলার কথা। তবে পুরো চিত্রটি হতাশার নয়। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তিও এই বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠী। বর্তমানে দেশের কর্মক্ষম বয়সের মানুষের সংখ্যা ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে। দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, ভিয়েতনাম এবং চীন দেখিয়েছে, জনসংখ্যা তখনই সম্পদে পরিণত হয় যখন রাষ্ট্র দক্ষ মানবসম্পদ, প্রযুক্তি, উদ্ভাবন এবং শিল্পায়নে ধারাবাহিক বিনিয়োগ করে। বাংলাদেশও সেই সুযোগ এখনও হারায়নি। কিন্তু সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। আগামী কয়েক দশকে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বাড়তে শুরু করবে। তখন একই সঙ্গে স্বাস্থ্য ব্যয়, পেনশন এবং সামাজিক নিরাপত্তার চাপও বৃদ্ধি পাবে।
এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের জন্য কয়েকটি নীতিগত পদক্ষেপ জরুরি। প্রথমত, পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচিকে নতুন করে শক্তিশালী করতে হবে এবং আধুনিক জন্মনিয়ন্ত্রণ সেবাকে সর্বজনীন করতে হবে। দ্বিতীয়ত, কিশোরী শিক্ষা ও বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে আরও কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। তৃতীয়ত, শিক্ষাব্যবস্থাকে শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে কারিগরি ও প্রযুক্তিগত দক্ষতার ওপর জোর দিতে হবে। চতুর্থত, শ্রমঘন শিল্পের পাশাপাশি উচ্চ মূল্য সংযোজনকারী শিল্প, ডিজিটাল অর্থনীতি এবং উদ্ভাবনভিত্তিক উদ্যোক্তা তৈরিতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। পঞ্চমত, পরিকল্পিত নগরায়ণ, গণপরিবহন ও সাশ্রয়ী আবাসনের মাধ্যমে বড় শহরগুলোর ওপর চাপ কমাতে হবে।
বাংলাদেশের উন্নয়নের পরবর্তী অধ্যায় নির্ভর করবে শুধু কত মানুষ আছে, তার ওপর নয়; বরং সেই মানুষগুলো কতটা দক্ষ, উৎপাদনশীল, উদ্ভাবনী এবং উদারÑ তার ওপর। জনসংখ্যা নিজে কখনও আশীর্বাদ বা অভিশাপ নয়। সঠিক নীতি, দক্ষ মানবসম্পদ এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি একটি বড় জনসংখ্যাকে জাতীয় সম্পদে পরিণত করতে পারে। আর নীতিগত ব্যর্থতা একই জনসংখ্যাকে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকটে রূপ দিতে পারে।
বাংলাদেশের সামনে তাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন আর জনসংখ্যা কত বাড়বে, সেটি নয়; বরং আজ জন্ম নেওয়া প্রতিটি শিশুকে আমরা কতটা শিক্ষিত, দক্ষ, সুস্থ এবং উৎপাদনশীল নাগরিকে পরিণত করতে পারব সেটি। এই প্রশ্নের শুধু সরকারের কাছে থাকবে না, থাকবে প্রত্যেক বাবা-মা এবং বাবা-মা হতে যাওয়া তরুণ-তরুণীদের কাছেও। তাদের অনাগত সন্তানের জন্য তারা নিজেরা কতটা মানসিক-অর্থনৈতিক- সামাজিকভাবে প্রস্তুত? এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে ২০৪১ সালের তাদের নিজের পরিবার তথা বাংলাদেশের কেমন রূপ থাকবে। উন্নত, সভ্য, সুন্দর একটা দেশ নাকি গরিব, জীবন আর জীবিকা বাঁচাতে, একটু নিরাপদে থাকতে সংগ্রাম করতে থাকা একটা দেশ।
রুবাইয়াত সাইমুম চৌধুরী : সহযোগী অধ্যাপক, ফিন্যান্স অ্যান্ড ফিনটেক, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি



