
বৈদেশিক কর্মসংস্থান বাড়াতে হলে কমাতে হবে অভিবাসন ব্যয়
ড. মো. বখতিয়ার উদ্দিন [প্রকাশ : যুগান্তর, ০৭ আগস্ট ২০২৬]
বর্তমান সরকারের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হলো কর্মসংস্থান সৃষ্টি। দীর্ঘদিন ধরেই দেশের শ্রমবাজার স্থবির। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কার রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং ইরান-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল সংঘাতের পর বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশে নতুন বিনিয়োগে নিরুৎসাহিত করছে। গত এক দশকে বাংলাদেশের অর্থনীতি মূলত ‘কর্মসংস্থানহীন প্রবৃদ্ধি’ (জবলেস গ্রোথ) অর্জন করেছে। ফলে ক্রমবর্ধমান শ্রমশক্তির মধ্যে হতাশা ও অনিশ্চয়তা বাড়ছে। বিশেষ করে শিক্ষিত তরুণদের ক্ষেত্রে এ সংকট আরও প্রকট।
সাম্প্রতিক শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, শিক্ষার স্তর যত বাড়ছে, বেকারত্বের হারও তত বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রাথমিক শিক্ষাপ্রাপ্তদের মধ্যে বেকারত্বের হার ১ দশমিক ৯৬ শতাংশ, মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রাপ্তদের মধ্যে ২ দশমিক ৯১ শতাংশ; অথচ উচ্চশিক্ষিতদের ক্ষেত্রে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৩ দশমিক ৫৪ শতাংশে। এর প্রধান কারণ সম্ভবত আনুষ্ঠানিক খাতে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের অভাব, যেখানে অধিকাংশ উচ্চশিক্ষিত তরুণ কাজের সুযোগ খোঁজেন।
বাংলাদেশের অভিবাসন ও রেমিট্যান্স নীতিতে দারিদ্র্য বিমোচনের অন্যতম কার্যকর হাতিয়ার হিসাবে বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও রেমিট্যান্সকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) এবং আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানও দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের অস্বাভাবিক উচ্চ অভিবাসন ব্যয় নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে।
সরকার বিভিন্ন গন্তব্য দেশের জন্য অভিবাসন ব্যয়ের সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ করেছে। যেমন ২০১৭ সালে সৌদি আরব, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরে যেতে যথাক্রমে ১ লাখ ৬৫ হাজার, ১ লাখ ৬০ হাজার এবং ২ লাখ ৬২ হাজার ২৭০ টাকা নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু বাস্তবে অধিকাংশ কর্মীকেই সরকারি নির্ধারিত সীমার কয়েকগুণ বেশি অর্থ ব্যয় করতে হয়।
অত্যধিক অভিবাসন ব্যয়ের অন্যতম প্রধান কারণ বাংলাদেশের বহুস্তরবিশিষ্ট জনশক্তি নিয়োগ ব্যবস্থা। অধিকাংশ রিক্রুটিং এজেন্সি বিদেশি নিয়োগকর্তার কাছ থেকে সরাসরি চাহিদাপত্র (ডিমান্ড লেটার বা ভিসা) সংগ্রহ করে না; বরং বিদেশি দালাল বা এজেন্সির কাছ থেকে অতিরিক্ত দামে তা কিনে আনে। অনেক ক্ষেত্রে একটি ডিমান্ড লেটার বাংলাদেশে পৌঁছানোর আগে একাধিকবার হাতবদল হয়। ডিমান্ড লেটার দেশে আসার পর রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো স্থানীয় দালালদের মাধ্যমে কর্মী সংগ্রহ করে। প্রতিটি স্তরের দালাল নিজস্ব কমিশন যোগ করে। শেষ পর্যন্ত এ কমিশন ও অতিরিক্ত মুনাফার পুরো বোঝা বহন করতে হয় অভিবাসী কর্মীদের।
বিদেশে কর্মসংস্থান ও অভিবাসী আইন ২০১৩ অনুযায়ী, অভিবাসীকর্মীর যাতায়াতের বিমানভাড়া নিয়োগকর্তার বহন করার কথা। কিন্তু বাস্তবে বিদেশি দালাল ও দেশের রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো নিয়োগকর্তাদের এ দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিয়ে সেই ব্যয়ও কর্মীদের ওপর চাপিয়ে দেয়। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে চাহিদাপত্র সংগ্রহের জন্য কম বেতনে কর্মী পাঠানোর চুক্তিও করা হয়। অন্যদিকে উপসাগরীয় দেশগুলোতে অদক্ষ শ্রমিকের চাহিদা কমছে, অথচ বাংলাদেশ থেকে সরবরাহ বাড়ছে। চাহিদা ও সরবরাহের এ ভারসাম্যহীনতা অভিবাসন ব্যয় বৃদ্ধির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। দক্ষতা কম হওয়ায় বাংলাদেশি কর্মীদের দরকষাকষির ক্ষমতাও কম থাকে।
এর বিপরীতে দক্ষ কর্মী ও পেশাজীবীরা তুলনামূলক কম খরচে বিদেশে যেতে পারেন। মধ্যপ্রাচ্যে, বিশেষ করে সৌদি আরবে নারী গৃহকর্মীর চাহিদা বেশি। অন্যান্য শ্রম রপ্তানিকারক দেশ নারীদের নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে তুলনামূলক সতর্ক থাকায় বাংলাদেশি নারী কর্মীদের চাহিদা বেড়েছে এবং তাদের অভিবাসন ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। এটি প্রমাণ করে, চাহিদা ও সরবরাহের ভারসাম্য থাকলে দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যবস্থার মধ্যেও অভিবাসন ব্যয় অনেক কমানো সম্ভব। তাই আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তুলতে পারলে অভিবাসন ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে। পাশাপাশি পাসপোর্ট, পুলিশ ক্লিয়ারেন্স, স্বাস্থ্য পরীক্ষা, বিমানভাড়া ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক ব্যয়ও যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনতে হবে এবং এসব সেবায় দুর্নীতি রোধ করতে হবে।
দেশে রিক্রুটিং এজেন্সির অনেক মালিক রাজনীতিতে সক্রিয় এবং তাদের কেউ কেউ সংসদ সদস্যও হয়েছেন। রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে এ ধরনের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের একটি অংশ অভিবাসন ব্যবস্থাপনায় বিশেষ সুবিধা অন্বেষণ (রেন্ট-সিকিং) ও নানা অনিয়মের মাধ্যমে অভিবাসন ব্যয় বাড়িয়ে তুলছে। উদাহরণ হিসাবে লক্ষ্মীপুরের একজন সাবেক সংসদ সদস্যের ঘটনা উল্লেখ করা যায়। তিনি একটি রিক্রুটিং এজেন্সির মালিক ছিলেন এবং ২০২০ সালে কুয়েতে ভিসা বাণিজ্য, ঘুস ও অবৈধভাবে বাংলাদেশি কর্মী পাঠানোর অভিযোগে গ্রেফতার হন। অভিযোগ রয়েছে, তিনি কুয়েতের এক সাবেক মন্ত্রী ও কয়েকজন কর্মকর্তার সহযোগিতায় ২০ হাজারের বেশি বাংলাদেশি কর্মীকে সরকার নির্ধারিত ব্যয়ের প্রায় সাড়ে সাতগুণ বেশি অর্থের বিনিময়ে কুয়েতে পাঠিয়েছিলেন।
অত্যধিক অভিবাসন ব্যয় শুধু বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য নয়, শ্রমগ্রহণকারী দেশগুলোর জন্যও সমস্যা সৃষ্টি করে। কারণ বিদেশে গিয়ে অনেক কর্মী অতিরিক্ত ব্যয় পুষিয়ে নিতে অনৈতিক বা অবৈধ কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন। এ সমস্যা সমাধানে মালয়েশিয়া ২০১২ সালে সরকার-টু-সরকার (জিটুজি) পদ্ধতি চালু করেছিল। এতে অভিবাসন ব্যয় বাজারভিত্তিক ব্যবস্থার তুলনায় প্রায় সাত ভাগের এক ভাগে নেমে আসে। কিন্তু পরবর্তীকালে দুর্নীতি ও প্রভাবশালী গোষ্ঠীর স্বার্থসংশ্লিষ্ট অনিয়মের কারণে এ উদ্যোগ টেকসই হয়নি।
উচ্চ অভিবাসন ব্যয়ের ফলে বিদেশে যাওয়ার সুযোগ এখনো মূলত সমাজের তুলনামূলক সচ্ছল মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। ফলে গ্রামীণ এলাকায় রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়লেও সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য আরও তীব্র হচ্ছে। অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হলে এবং দেশের বেকারত্ব সমস্যা কার্যকরভাবে মোকাবিলা করতে হলে সরকারকে অভিবাসন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে হবে। একইসঙ্গে অভিবাসন ব্যবস্থাপনায় সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। তাহলেই বিদেশে এক কোটি কর্মী পাঠানোর উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য বাস্তবায়নের সম্ভাবনা তৈরি হবে।
ড. মো. বখতিয়ার উদ্দিন : অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ ও ডিন, সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়, ত্রিশাল, ময়মনসিংহ



