
বঙ্গোপসাগর, নতুন ভূরাজনীতি ও বাংলাদেশের কৌশলগত সম্ভাবনা
এ কে এম আহসান উল্লাহ [সূত্র : প্রথম আলো; ১৭ জুলাই, ২০২৬]
চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডরকে অন্ধ সমর্থন কিংবা অন্ধ বিরোধিতার জায়গা থেকে দেখা উচিত নয়। এটি সম্ভাবনা ও ঝুঁকির যুগপৎ প্রকল্প। লিখেছেন এ কে এম আহসান উল্লাহ
চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডর আপাতদৃষ্টিতে একটি অবকাঠামোগত ও বাণিজ্যিক সংযোগ প্রকল্প। কিন্তু গভীরে গেলে এটি শুধু রাস্তা, রেল, বন্দর, পাইপলাইন বা শিল্পাঞ্চলের প্রশ্ন নয়, এটি বঙ্গোপসাগরকে ঘিরে এশিয়ার নতুন ভূ-অর্থনৈতিক মানচিত্র নির্মাণের একটি ইঙ্গিত।
চীন ২০২৬ সালের জুনে বাংলাদেশ, মিয়ানমার ও চীনকে যুক্ত করে একটি অর্থনৈতিক করিডর প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দিয়েছে, যার উদ্দেশ্য আঞ্চলিক সংযোগ, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ গভীর করা বলে জানানো হয়েছে।
এই প্রস্তাব এমন সময়ে এসেছে, যখন চীন ইতিমধ্যে মিয়ানমারের ভেতর দিয়ে ‘চায়না-মিয়ানমার ইকোনমিক করিডর (সিএমইসি)’ এগিয়ে নিচ্ছে এবং দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগ-রাজনীতিতে ভারত, চীন, বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের অবস্থান নতুনভাবে পুনর্বিন্যস্ত হচ্ছে।
প্রথম প্রশ্ন হলো, অর্থনৈতিক করিডর আসলে কী? চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডরকে সরলভাবে বোঝা যায় চীনের ইউনান প্রদেশ, মিয়ানমারের উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চল এবং বাংলাদেশের ভূখণ্ড ও বন্দরব্যবস্থাকে যুক্ত করার একটি সম্ভাব্য বহুমাত্রিক সংযোগব্যবস্থা হিসেবে। এর মধ্যে থাকতে পারে সড়ক, রেল, নদীপথ, সমুদ্রবন্দর, স্থলবন্দর, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি অবকাঠামো, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, লজিস্টিক হাব এবং ডিজিটাল সংযোগ।
এর মূল ভিত্তি সম্ভবত বিদ্যমান চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডর। সিএমইসি সাধারণত ইউনান থেকে মিয়ানমারের মান্দালয় হয়ে রাখাইনের কিয়াউকফিউ বন্দর পর্যন্ত বিস্তৃত একটি ‘ইনভার্টেড ওয়াই-শেপড’ অবকাঠামো করিডর হিসেবে বিবেচিত হয়। কিয়াউকফিউ গভীর সমুদ্রবন্দর, পাইপলাইন ও মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংযোগ যদি বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্ত হয়, তাহলে বঙ্গোপসাগর একটি বৃহত্তর আঞ্চলিক বাণিজ্য অক্ষে পরিণত হতে পারে।
এই ধারণা একেবারে নতুন নয়। নব্বইয়ের দশকের ‘কুনমিং ইনিশিয়েটিভ’ পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ-চীন-ভারত-মিয়ানমার বা বিসিআইএম অর্থনৈতিক করিডরের ধারণায় রূপ নেয়। সেই করিডরে কলকাতা, বাংলাদেশ, মিয়ানমার এবং চীনের কুনমিংকে যুক্ত করার কথা ছিল।
কিন্তু ভারত-চীন সম্পর্কের টানাপোড়েন, সীমান্তবিরোধ, বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই) নিয়ে ভারতের আপত্তি এবং মিয়ানমারের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা বিসিআইএমকে কার্যত স্থবির করে দেয়। নতুন চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ করিডরকে তাই বিসিআইএমের বিকল্প, সংকুচিত বা পুনর্গঠিত রূপ হিসেবেও দেখা যায়, যেখানে ভারত আপাতত অনুপস্থিত; কিন্তু ভৌগোলিকভাবে প্রভাবিত পক্ষ হিসেবে থেকে যাচ্ছে।
২.
এটি কীভাবে বাস্তবায়িত হতে পারে? সম্ভাব্যভাবে তিনটি স্তরে। প্রথমত, চীন থেকে মিয়ানমার পর্যন্ত বিদ্যমান ও পরিকল্পিত অবকাঠামোর উন্নয়ন: ইউনান-মুসে-মান্দালয়-কিয়াউকফিউ রুট, সড়ক ও রেল, পাইপলাইন, বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং বন্দর।
দ্বিতীয়ত, মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশের সঙ্গে সংযোগ: রাখাইন-চট্টগ্রাম-কক্সবাজার-মাতারবাড়ী অঞ্চল, টেকনাফ বা স্থলপথ, অথবা সমুদ্রভিত্তিক বন্দর–সংযোগ।
তৃতীয়ত, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সংযুক্তি: চট্টগ্রাম, মাতারবাড়ী, পায়রা, মোংলা, ঢাকা, সিলেট, উত্তরবঙ্গ এবং শিল্পাঞ্চলকে একটি আঞ্চলিক সরবরাহ–শৃঙ্খলের অংশ করা। তবে এখন পর্যন্ত পূর্ণ করিডরের আনুষ্ঠানিক দৈর্ঘ্য, নির্দিষ্ট রুট, অর্থায়ন কাঠামো বা প্রকল্পের তালিকা স্পষ্ট নয়। বিদ্যমান সিএমইসি প্রায় ১ হাজার ৭০০ কিলোমিটার দীর্ঘ বলে আলোচনায় এসেছে, বাংলাদেশে সম্প্রসারণ হলে তা আরও দীর্ঘ হবে, কিন্তু পূর্ণ দৈর্ঘ্য এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা হয়নি।
এই করিডরে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত হবে চীন, মিয়ানমার ও বাংলাদেশ। কিন্তু পরোক্ষভাবে ভারত, থাইল্যান্ড, নেপাল, ভুটান, আসিয়ান দেশগুলো; জাপান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় শক্তিগুলোও এর ভূরাজনৈতিক প্রভাবের বাইরে থাকবে না। কারণ, বঙ্গোপসাগর এখন শুধু একটি জলসীমা নয়, এটি ভারত মহাসাগরীয় নিরাপত্তা, জ্বালানি পরিবহন, সামুদ্রিক বাণিজ্য, ব্লু ইকোনমি, সাবমেরিন কেব্ল, আঞ্চলিক প্রতিযোগিতা এবং সামরিক উপস্থিতির কেন্দ্র হয়ে উঠছে।
এর মূল ভিত্তি সম্ভবত বিদ্যমান চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডর। সিএমইসি সাধারণত ইউনান থেকে মিয়ানমারের মান্দালয় হয়ে রাখাইনের কিয়াউকফিউ বন্দর পর্যন্ত বিস্তৃত একটি ‘ইনভার্টেড ওয়াই-শেপড’ অবকাঠামো করিডর হিসেবে বিবেচিত হয়। কিয়াউকফিউ গভীর সমুদ্রবন্দর, পাইপলাইন ও মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংযোগ যদি বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্ত হয়, তাহলে বঙ্গোপসাগর একটি বৃহত্তর আঞ্চলিক বাণিজ্য অক্ষে পরিণত হতে পারে।
এই ধারণা একেবারে নতুন নয়। নব্বইয়ের দশকের ‘কুনমিং ইনিশিয়েটিভ’ পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ-চীন-ভারত-মিয়ানমার বা বিসিআইএম অর্থনৈতিক করিডরের ধারণায় রূপ নেয়। সেই করিডরে কলকাতা, বাংলাদেশ, মিয়ানমার এবং চীনের কুনমিংকে যুক্ত করার কথা ছিল।
কিন্তু ভারত-চীন সম্পর্কের টানাপোড়েন, সীমান্তবিরোধ, বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই) নিয়ে ভারতের আপত্তি এবং মিয়ানমারের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা বিসিআইএমকে কার্যত স্থবির করে দেয়। নতুন চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ করিডরকে তাই বিসিআইএমের বিকল্প, সংকুচিত বা পুনর্গঠিত রূপ হিসেবেও দেখা যায়, যেখানে ভারত আপাতত অনুপস্থিত; কিন্তু ভৌগোলিকভাবে প্রভাবিত পক্ষ হিসেবে থেকে যাচ্ছে।
২.
এটি কীভাবে বাস্তবায়িত হতে পারে? সম্ভাব্যভাবে তিনটি স্তরে। প্রথমত, চীন থেকে মিয়ানমার পর্যন্ত বিদ্যমান ও পরিকল্পিত অবকাঠামোর উন্নয়ন: ইউনান-মুসে-মান্দালয়-কিয়াউকফিউ রুট, সড়ক ও রেল, পাইপলাইন, বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং বন্দর।
দ্বিতীয়ত, মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশের সঙ্গে সংযোগ: রাখাইন-চট্টগ্রাম-কক্সবাজার-মাতারবাড়ী অঞ্চল, টেকনাফ বা স্থলপথ, অথবা সমুদ্রভিত্তিক বন্দর–সংযোগ।
তৃতীয়ত, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সংযুক্তি: চট্টগ্রাম, মাতারবাড়ী, পায়রা, মোংলা, ঢাকা, সিলেট, উত্তরবঙ্গ এবং শিল্পাঞ্চলকে একটি আঞ্চলিক সরবরাহ–শৃঙ্খলের অংশ করা। তবে এখন পর্যন্ত পূর্ণ করিডরের আনুষ্ঠানিক দৈর্ঘ্য, নির্দিষ্ট রুট, অর্থায়ন কাঠামো বা প্রকল্পের তালিকা স্পষ্ট নয়। বিদ্যমান সিএমইসি প্রায় ১ হাজার ৭০০ কিলোমিটার দীর্ঘ বলে আলোচনায় এসেছে, বাংলাদেশে সম্প্রসারণ হলে তা আরও দীর্ঘ হবে, কিন্তু পূর্ণ দৈর্ঘ্য এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা হয়নি।
এই করিডরে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত হবে চীন, মিয়ানমার ও বাংলাদেশ। কিন্তু পরোক্ষভাবে ভারত, থাইল্যান্ড, নেপাল, ভুটান, আসিয়ান দেশগুলো; জাপান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় শক্তিগুলোও এর ভূরাজনৈতিক প্রভাবের বাইরে থাকবে না। কারণ, বঙ্গোপসাগর এখন শুধু একটি জলসীমা নয়, এটি ভারত মহাসাগরীয় নিরাপত্তা, জ্বালানি পরিবহন, সামুদ্রিক বাণিজ্য, ব্লু ইকোনমি, সাবমেরিন কেব্ল, আঞ্চলিক প্রতিযোগিতা এবং সামরিক উপস্থিতির কেন্দ্র হয়ে উঠছে।
চীনের জন্য এই করিডর মালাক্কা প্রণালির ওপর নির্ভরতা কমানোর একটি সম্ভাব্য পথ, ইউনানসহ দক্ষিণ-পশ্চিম চীনের স্থলবেষ্টিত প্রদেশগুলোর জন্য সমুদ্রপথে প্রবেশাধিকার এবং বঙ্গোপসাগরে কৌশলগত উপস্থিতি বৃদ্ধির সুযোগ।
বাংলাদেশের জন্য এটি হতে পারে বাজার সম্প্রসারণ, ট্রানজিট আয়, শিল্পায়ন, রপ্তানি বৈচিত্র্য, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে বাস্তব সংযোগ তৈরির সুযোগ। মিয়ানমারের জন্য এটি অবকাঠামো, বিনিয়োগ ও বন্দরভিত্তিক অর্থনীতির সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে, যদিও দেশটির গৃহযুদ্ধ ও সরকারের রাজনৈতিক বৈধতার সংকট এই সম্ভাবনাকে গভীর অনিশ্চয়তার মধ্যে রাখছে।
কে সবচেয়ে বেশি লাভবান হবে, এই প্রশ্নের উত্তর সরল নয়। চীন লাভবান হবে কৌশলগতভাবে; কারণ, করিডর তাকে বঙ্গোপসাগরে আরও কার্যকর প্রবেশাধিকার দেবে। বাংলাদেশ লাভবান হতে পারে অর্থনৈতিকভাবে, যদি প্রকল্পটি বাংলাদেশকেন্দ্রিক মূল্যসংযোজন, শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান, রপ্তানি, প্রযুক্তি স্থানান্তর ও বন্দর ব্যবহারের বাস্তব সক্ষমতা তৈরি করে। মিয়ানমার লাভবান হতে পারে যদি করিডরটি তার জনগণের অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তি, সংঘাত-সংবেদনশীল উন্নয়ন এবং সীমান্ত অঞ্চলের স্থিতিশীলতা বাড়ায়।
কিন্তু সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো, যদি করিডরটি কেবল চীনা পণ্য, চীনা ঋণ, চীনা ঠিকাদার ও চীনা কৌশলগত সুবিধার বাহন হয়ে দাঁড়ায়; তাহলে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার ভোক্তা, ঋণগ্রহীতা ও ভূরাজনৈতিক করিডরে পরিণত হবে। উৎপাদক, দর–কষাকষিকারী ও নীতিনির্ধারক নয়।
৩.
বাংলাদেশের জন্য সম্ভাবনা বড়, কিন্তু শর্তসাপেক্ষ। বাংলাদেশের অর্থনীতি বহু বছর ধরে তৈরি পোশাক, প্রবাসী আয়, কৃষি-শ্রম ও অভ্যন্তরীণ ভোক্তা বাজারের ওপর নির্ভরশীল। এলডিসি উত্তরণ-পরবর্তী সময়, শুল্ক–সুবিধা সংকোচন, রপ্তানি বৈচিত্র্যের প্রয়োজন, জ্বালানিঘাটতি, লজিস্টিক ব্যয় ও বৈদেশিক মুদ্রার চাপ—এসব বাস্তবতায় একটি কার্যকর আঞ্চলিক করিডর নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে।
যদি চট্টগ্রাম-মাতারবাড়ী অঞ্চলকে শুধু বন্দর নয়; বরং শিল্প, লজিস্টিক, কোল্ড চেইন, কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ, ওষুধ, হালকা প্রকৌশল, আইটি ও আঞ্চলিক বাণিজ্যের হাবে রূপান্তর করা যায়, তাহলে বাংলাদেশ শুধু পণ্য চলাচলের রাস্তা হবে না; উৎপাদন ও মূল্যসংযোজনের কেন্দ্র হতে পারে। তবে এর ভূরাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া অনিবার্য।
ভারত এই করিডরকে শুধু অর্থনৈতিক প্রকল্প হিসেবে দেখবে না। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল, শিলিগুড়ি করিডর, বঙ্গোপসাগর, আন্দামান-নিকোবর এবং বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের নিরাপত্তা ইস্যু এই প্রকল্পকে সংবেদনশীল করে তোলে। ভারত দীর্ঘদিন ধরে বিসিআইএম নিয়ে সতর্ক ছিল, বিশেষত চীনের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত হওয়ার কারণে।
ভারতীয় নীতিনির্ধারক ও কৌশলগত মহলে নতুন করিডরকে চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডরের পূর্বাঞ্চলীয় প্রতিরূপ হিসেবেও দেখা হচ্ছে, অর্থাৎ ভারতের পশ্চিমে সিপিইসি এবং পূর্বে বাংলাদেশ-মিয়ানমার-চীন সংযোগ। সাম্প্রতিক ভারতীয় সংবাদমাধ্যমেও এই তুলনা এসেছে। যদিও সংবাদমাধ্যমের ভাষা অনেক সময় উদ্বেগনির্ভর, তবু ভারতের কৌশলগত অস্বস্তি বাস্তব।



