ব্লু-ইকোনমি : বাংলাদেশের এক অপার সম্ভাবনা

ব্লু-ইকোনমি : বাংলাদেশের এক অপার সম্ভাবনা
কলামবাংলাদেশ

ব্লু-ইকোনমি : বাংলাদেশের এক অপার সম্ভাবনা

১০ আগস্ট, ২০২৬

ড. মো. হাসানুর রহমান [প্রকাশ: কালের কণ্ঠ, ১০ আগস্ট ২০২৬]

ব্লু-ইকোনমি হচ্ছে সমুদ্রকেন্দ্রিক অর্থনীতি। এটি এমন এক অর্থনৈতিক ধারণা, যেখানে সমুদ্র ও সামুদ্রিক সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার, সংরক্ষণ ও টেকসই উন্নয়নকে গুরুত্ব দেওয়া হয়।

 


সমুদ্রের বিশাল নীল জলরাশি এবং এর তলদেশের বিভিন্ন রকম সম্পদ কাজে লাগিয়ে অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করা যায়। ব্লু-ইকোনমি সম্পর্কে প্রথম ধারণা দেন বেলজিয়ামের অর্থনীতির অধ্যাপক গুন্টার পাউলি ১৯৯৪ সালে। পরবর্তী সময়ে ২০১২ সালে রিও+২০ সম্মেলনে এই ধারণাটি বৈশ্বিক পর্যায়ে বিশেষ গুরুত্ব পায়। অধ্যাপক পাউলি এটিকে একটি পরিবেশবান্ধব ও টেকসই অর্থনৈতিক মডেল হিসেবে চিহ্নিত করেন।

 

 

ব্লু-ইকোনমির উল্লেখযোগ্য কার্যক্রমগুলো হলো—১. মৎস্য ও সামুদ্রিক প্রাণিসম্পদ; ২. জলজ খনিজ সম্পদ আহরণ; ৩. জলজ জৈব প্রযুক্তি; ৪. নবায়নযোগ্য শক্তি উৎপাদন; ৫. সামুদ্রিক পরিবহন এবং ৬. সমুদ্রভিত্তিক পর্যটনশিল্প।

 


বাংলাদেশ এরই মধ্যে বাংলাদেশ-মিয়ানমার ও ভারতের সঙ্গে যথাক্রমে ২০১২ ও ২০১৪ সালে বঙ্গোপসাগরের সীমানা বিরোধ নিষ্পত্তিতে আন্তর্জাতিক আদালতের রায়ে মোট এক লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটার এলাকার জলসীমায় নিরঙ্কুশ কর্তৃত্ব ও সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করেছে। এই ঐতিহাসিক বিজয়ে বঙ্গোপসাগরে সামুদ্রিক সম্পদ আহরণে বাংলাদেশের এক বিপুল সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে। সমুদ্রের তলদেশ বৈচিত্র্যময় ভূতাত্ত্বিক অবস্থা এবং প্রাণ-প্রাচুর্যে ভরপূর এক অমিত সম্ভাবনাময় জগৎ।

 

 


বিশ্বের উন্নত রাষ্ট্রগুলো সমুদ্রসম্পদকে কাজে লাগাতে শুরু করেছে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করছে। ইন্দোনেশিয়ার জাতীয় অর্থনীতির প্রায় ৯০ শতাংশ সমুদ্রনির্ভর। অস্ট্রেলিয়া তাদের সমুদ্রসম্পদ থেকে বর্তমানে প্রায় ৪৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় করে থাকে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, বাংলাদেশের সমুদ্রসম্পদের আধার বঙ্গোপসাগরে ব্লু-ইকোনমির ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা কেমন? বাংলাদেশের বঙ্গোপসাগরে গিরিখাতের মতো একটি বিশেষ অঞ্চল রয়েছে, যার দৈর্ঘ্য প্রায় সাত কিলোমিটার, যা মাছের অভয়ারণ্য হিসেবে পরিচিত। বিশেষজ্ঞদের মতে, বঙ্গোপসাগরে প্রায় ৪৯৮ প্রজাতির মাছ, ৩৩৬ প্রজাতির শামুক-ঝিনুক, সাত প্রজাতির কচ্ছপ, ৫২ প্রজাতির চিংড়ি, ১০ প্রজাতির ডলফিন, ছয় প্রজাতির কাঁকড়া এবং পাঁচ প্রজাতির লবস্টার রয়েছে।

 

 

এগুলোর মধ্যে নানা রকমের শামুক, ঝিনুক, শেলফিশ, কাঁকড়া, অক্টোপাস, হাঙর ইত্যাদির একটি আলাদা অর্থনৈতিক চাহিদা রয়েছে। এ ছাড়া রয়েছে নানা রকমের সামুদ্রিক আগাছা, লতা ও গুল্ম। এসব আগাছার মধ্যে ‘স্পিরুলিনা’ নামক সবুজ শৈবাল, যা উচ্চ প্রোটিনসমৃদ্ধ। চীন, জাপান, ইউরোপের বিভিন্ন দেশে এটি খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। বঙ্গোপসাগরের বিশাল আয়তনজুড়ে সামুদ্রিক আগাছা প্রক্রিয়াজাত করে বিভিন্ন রোগের ওষুধও তৈরি করা যেতে পারে।

 

ব্লু-ইকোনমির চিত্র লক্ষ করলে দেখা যায় যে সমুদ্র ঘিরে বিশ্ব অর্থনীতিতে বর্তমানে বছরব্যাপী তিন থেকে পাঁচ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের কর্মকাণ্ড সংঘটিত হচ্ছে। বিশ্বে মানুষের ১৫ শতাংশ আমিষের জোগান আসে সামুদ্রিক মাছ, উদ্ভিদ ও অন্যান্য প্রাণিজ থেকে। পৃথিবীর ৩০ শতাংশ গ্যাস ও জ্বালানি তেল সরবরাহ হয় সমুদ্রতলের বিভিন্ন গ্যাস ও তেল ক্ষেত্র থেকে। এটি বলা হচ্ছে যে ভবিষ্যৎ পৃথিবীর বিপুল জনগোষ্ঠীকে খাদ্যের জন্য হতে হবে সমুদ্রের মুখাপেক্ষী। আজকাল আন্তর্জাতিক সম্মেলনগুলোও হচ্ছে ব্লু-ইকোনমি ঘিরে। অর্থনৈতিক সহায়তা ও উন্নয়ন সংস্থা (ওইসিডি), জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচি (ইউএনইপি), বিশ্বব্যাংক, খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও), ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) প্রভৃতি আন্তর্জাতিক সংস্থার পাশাপাশি বিভিন্ন দেশ ব্লু-ইকোনমিনির্ভর উন্নয়ন কৌশল প্রণয়ন করছে।

 

 
ধারণা করা হয়, বঙ্গোপসাগরের তলদেশে যে খনিজ সম্পদ রয়েছে, তা পৃথিবীর অন্য কোনো সাগর-উপসাগরে নেই। দেশের আয়তনের প্রায় সমপরিমাণ সমুদ্রসীমা এখন মূল্যবান সম্পদের ভাণ্ডার। ব্লু-ইকোনমির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ দুই ধরনের সম্পদ অর্জন করেছে। একটি হলো প্রাণিজ সম্পদ, অপরটি অপ্রাণিজ সম্পদ। প্রাণিজের মধ্যে রয়েছে মৎস্যসম্পদ ও অন্যান্য সামুদ্রিক প্রাণী। অপ্রাণিজ সম্পদের মধ্যে রয়েছে খনিজ সম্পদ। যেমন—তেল, গ্যাস, চুনাপাথর প্রভৃতি। এ ছাড়া সিমেন্ট বানানোর উপযোগী প্রচুর ক্লে রয়েছে সমুদ্রের তলদেশে। সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদ ছাড়াও অন্যান্য উপাদান হচ্ছে, সমুদ্রের লবণ উৎপাদন, সামুদ্রিক জৈব প্রযুক্তি, উপকূলীয় শিপিং, সমুদ্রবন্দর, অভ্যন্তরীণ জলপথে পরিবহন, জাহাজ নির্মাণ, জাহাজ রিসাইক্লিং শিল্প, নবায়নযোগ্য শক্তি, পরিবহনসেবা, জ্বালানিসম্পদ, উপকূলীয় পর্যটনশিল্প ইত্যাদি। এগুলোর পরিকল্পিত ব্যবহার এবং টেকসই উন্নয়নে সমুদ্র অর্থনীতির সুবিশাল সম্ভাবনা লুকিয়ে আছে। বিশ্বের অন্যান্য রাষ্ট্রের মতো বাংলাদেশও এসব সম্পদকে কাজে লাগিয়ে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটাতে পারে।

 

 

বাংলাদেশে ব্লু-ইকোনমি প্রসার ও উন্নয়নে কয়েকটি বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা জরুরি—১. সামুদ্রিক সম্পদের বহুমাত্রিক জরিপ দ্রুত সম্পন্ন করা। ২. তেল-গ্যাস উত্তোলন, মৎস্যসম্পদ আহরণ, বন্দরের সুবিধা এবং পর্যটনশিল্প সম্প্রসারণ। ৩. বর্তমানে বাংলাদেশের ট্রলারগুলো উপকূল থেকে ৩৫-৪০ নটিক্যাল মাইলের মধ্যে মাছ আহরণ করে। কিন্তু আমাদের অর্থনৈতিক অঞ্চল ২০০ নটিক্যাল মাইল। আরো বিস্তৃত পরিসরে নিরাপদ মৎস্য আহরণের আধুনিক কৌশল সৃষ্টি করে অধিক মৎস্য আহরণের বিশেষ সুযোগ রয়েছে। ৪. জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার মতে, ২০২২ সালে বিশ্বের যে চারটি দেশ মাছ চাষে বিপুল সাফল্য অর্জন করেছে, তার মধ্যে প্রথম হচ্ছে বাংলাদেশ। এরপর থাইল্যান্ড, ভারত ও চীন।

 

 

নতুন জলসীমার অধিকার পাওয়ায় ব্লু-ইকোনমি প্রসারে বাংলাদেশের এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো জরুরি। ৫. ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ২১টি সদস্য দেশের সংগঠন ‘ইন্ডিয়ান ওশান রিম অ্যাসোসিয়েশন’-এর সদস্য বাংলাদেশ। ব্লু-ইকোনমি নিয়ে এই জোটের বিভিন্ন দেশ কাজ করছে। এই সুবিধা কাজে লাগিয়ে পারস্পরিক সহযোগিতা সুদৃঢ় করা। ৬. ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির হিসাব মতে, বাংলাদেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রায় ৭০ শতাংশ সামুদ্রিক পরিবহনের সঙ্গে সম্পৃক্ত। এ খাতের আধুনিকায়ন হলে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক কর্মসংস্থান বাড়বে। ৭. বঙ্গোপসাগর থেকে সিমেন্টশিল্পের কাঁচামাল ক্লে উত্তোলন করা গেলে বাংলাদেশের সিমেন্টশিল্পে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে। এ ছাড়া সমুদ্র তলদেশে মহামূল্যবান ইউরেনিয়াম ও থোরিয়ামের অস্তিত্ব থাকতে পারে বলে বিশেষজ্ঞদের ধারণা। বিশ্বে এই ধাতু দুটির চাহিদা কিরূপ, তা সহজেই অনুমেয়। ৮. সমুদ্রনির্ভর অর্থনীতি থেকে যদি ৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করা যায়, তাহলে ‘ভিশন ২০৪১’ পূরণ করা সহজ হবে।

 

 

সমুদ্রকে ব্যবহার করে নবায়নযোগ্য জ্বালানিশক্তি উৎপাদনে বাংলাদেশের রয়েছে বিপুল সম্ভাবনা। সাগর থেকে প্রাপ্ত বায়ু, তরঙ্গ, জোয়ার-ভাটা, জৈব-তাপীয় পরিবর্তন ইত্যাদির মাধ্যমে ব্যাপক পরিমাণে নবায়নযোগ্য শক্তির জোগান পাওয়া সম্ভব। এতে আমাদের পরিবেশে দূষণকারী জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর চাপ কমবে। বাংলাদেশকে যদি পৃথিবীর বৃহৎ অর্থনীতি থেকে সুফল পেতে হয়, তাহলে আমাদের চট্টগ্রাম, মোংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরকে আধুনিকায়ন করে পরিবহনবান্ধব গমনপথ হিসেবে ব্যবহারের কোনো বিকল্প নেই। বঙ্গোপসাগরে যে বিপুল মৎস্যসম্পদ রয়েছে, সেখান থেকে প্রতিবছর ৬৬ লাখ টন মৎস্য আহরণ করা যেতে পারে।

 

 

কিন্তু বাস্তবে আমরা সেখান থেকে খুব কমই আহরণ করছি। এ জন্য আমাদের মৎস্য আহরণের আধুনিক প্রশিক্ষণ ও কলাকৌশল রপ্ত করতে হবে। সমুদ্রের খনিজ সম্পদগুলোর মধ্যে লবণের কথা বলা যায়। আমাদের উপকূলে রয়েছে ৩০০টি লবণ শোধনাগার, যেগুলো সাত বছর ধরে বছরে ৩.৫ লাখ টন করে লবণ উৎপাদন করছে, যা বাজারের চাহিদার তুলনায় যথেষ্ট নয়। লবণশিল্পের দিকে একটু মনোযোগ দিলেই একে একটি রপ্তানিমুখী লাভজনক শিল্পে পরিণত করা সম্ভব। ইউরোপের  উপকূলীয় দেশগুলো সমুদ্র অর্থনীতি থেকে প্রতিবছর বিলিয়ন বিলিয়ন ইউরো আয় করে, যা তাদের জিডিপির ১০ শতাংশ। আন্তর্জাতিক পর্যটকদের জন্য আমাদের কক্সবাজার ও প্রবালদ্বীপ ‘সেন্ট মার্টিন’কে আকর্ষণীয় করে তুলতে পারলে এই অঞ্চলে বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা আরো বৃদ্ধি পাবে এবং পর্যটনশিল্পে ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।

 

 

জাতিসংঘ ২০২৫ সাল-পরবর্তী যে টেকসই উন্নয়ন কর্মসূচি হাতে নিয়েছে, তার মূলকথায় রয়েছে ব্লু-ইকোনমি। বঙ্গোপসাগরের জলরাশির যে সুবিশাল এলাকায় বাংলাদেশের অধিকার নিশ্চিত হয়েছে, তার আয়তন প্রায় আরেকটি বাংলাদেশের সমান। ফলে এর গুরুত্ব কতটা, তা সহজেই অনুমেয়। কিন্তু লক্ষণীয় যে বিশাল সমুদ্রসীমা জয়ের পরও ব্লু-ইকোনমির সুফল পাচ্ছে না বাংলাদেশ। অথচ বিস্তীর্ণ এই সমুদ্রের নীল জলরাশির তলদেশে যে বিশাল সম্পদ লুকিয়ে আছে, তা হতে পারে ভবিষ্যৎ অর্থনীতির সম্বল। ফলে এখনই আমাদের করণীয় কৌশল ও বাস্তব উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।

 

 

সমুদ্রবিজ্ঞানীরা বলছেন, প্রযুক্তিগত সক্ষমতার অভাব এবং তথ্যের অপ্রতুলতায় বাংলাদেশের সমুদ্রসীমার ৮০ শতাংশ এলাকার সম্পদের হিসাব এখনো অজানা। আমাদের পরিকল্পনা করতে হবে কিভাবে এসব সম্পদ কাজে লাগিয়ে আমরা লাভবান হতে পারি। এরই মধ্যে বাংলাদেশ সরকার ২০১৭ সালে ‘ব্লু-ইকোনমি সেল’ গঠন এবং ২০১৯ সালে ‘মেরিটাইম জোন অ্যাক্ট’ প্রণয়ন করে। ২০১৫ সালে প্রতিষ্ঠিত ‘বাংলাদেশ ওশানোগ্রাফিক রিসার্চ ইনস্টিটিউট (বিওআরআই)’ সমুদ্রসম্পদ অনুসন্ধান ও গবেষণায় কাজ শুরু করেছে। সঠিক পরিকল্পনা ও টেকসই প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে ব্লু-ইকোনমি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির এক অপার সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করতে পারে।

 

 

লেখক : অধ্যাপক, উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

ট্যাগ:BCSকলামবাংলাদেশ