বিভাজিত বিশ্বে বাংলাদেশ : সুযোগ ও চ্যালেঞ্জ

বিভাজিত বিশ্বে বাংলাদেশ : সুযোগ ও চ্যালেঞ্জ
কলামবাংলাদেশ

বিভাজিত বিশ্বে বাংলাদেশ : সুযোগ ও চ্যালেঞ্জ

১২ জুলাই, ২০২৬

ড. মোহাম্মদ ইমরান হোসাইন আনসারী [সূত্র : যুগান্তর , ১২ জুন ২০২৬]

১ মার্চ, ২০২৬-এর সকালে বাংলাদেশ যে বিশ্বের মুখোমুখি হয়েছিল, তা আগের দিনে ছিল না। আমেরিকা ও ইসরাইলের যৌথ হামলায় ইরান বিধ্বস্ত হওয়ার পরের সেই সকালে ঢাকাজুড়ে দেখা যায় জ্বালানির জন্য লম্বা লাইন, হযরত শাহজালাল বিমানবন্দরে শত শত বাংলাদেশি শ্রমিক আটকা পড়ে, উপসাগরীয় স্বপ্ন থমকে যায় ভূরাজনৈতিক আগুনের মুখে। আর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এমন একটি বিবৃতি দিল, যেখানে যা বাদ দেওয়া হয়েছিল, তা যা বলা হয়েছিল তার চেয়ে বেশি কথা বলে গেল।

 

 

সেই বিবৃতিতে ইরানের পালটা হামলায় উপসাগরীয় দেশগুলোর সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের নিন্দা করা হয়েছিল। কিন্তু ইরানে আগ্রাসন চালানো যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরাইলের নাম নেই। এটি কোনো ভুল ছিল না। এটি ছিল পরবর্তী মাসগুলোয় বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিকে সংজ্ঞায়িত করবে এমন এক কৌশলের পূর্বাভাস : ভাঙনশীল বিশ্বব্যবস্থায় নিখুঁতভাবে প্রয়োগ করা কৌশলগত অস্পষ্টতা।

 

সোমবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান মস্কোয় সের্গেই ল্যাভরভের সামনে বসেছেন-বর্তমান পদে তার প্রথম রাশিয়া সফর। এ মুহূর্তে সেই কৌশলের পূর্ণ রূপরেখা দৃশ্যমান। এবং এটি প্রথম দেখায় যা মনে হয়েছিল তারচেয়ে অনেক বেশি তাৎপর্যপূর্ণ-এবং অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ।

 

‘সবার আগে বাংলাদেশ’ : বিএনপি সরকারের পররাষ্ট্রনীতির মূলমন্ত্র, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার প্রথম নির্বাচন-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনেই যা ঘোষণা করেছেন, তা আপাতদৃষ্টিতে সহজ : ‘বাংলাদেশই প্রথম।’ চীন, ভারত, পাকিস্তান, তুরস্ক, আমেরিকা, রাশিয়া-প্রতিটি সম্পর্ক বিচার হবে একটিমাত্র মানদণ্ডে : জাতীয় স্বার্থ। ‘আমাদের বন্ধু ও অংশীদার আছে, প্রভু নয়’

 

গত বৃহস্পতিবার তুর্কি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর পাশে দাঁড়িয়ে এ কথা বলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। এ দর্শন হাসিনা যুগ থেকে সুস্পষ্ট সরে আসা-যখন ঢাকাকে নয়াদিল্লির কৌশলগত কক্ষপথে আবদ্ধ বলে মনে করা হতো।

 

তুর্কি-বাংলা সম্পর্কের নতুন দিগন্ত : সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোর সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ কূটনৈতিক ঘটনা হলো বাংলাদেশ-তুরস্ক সম্পর্কের নতুন যাত্রা। তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান ৪ জুন ঢাকায় পা রাখেন-বাংলাদেশে কোনো তুর্কি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এটাই প্রথম সফর।

 

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাকে সাদরে গ্রহণ করেন। ফিদান ঘোষণা করেন, এই সফর ‘বাংলাদেশ-তুরস্ক সম্পর্ককে কৌশলগত পর্যায়ে উন্নীত করার প্রথম পদক্ষেপ।’ দুই দেশ মন্ত্রী পর্যায়ের বার্ষিক পররাষ্ট্র পরামর্শ সভায় সম্মত হয়, মুক্তবাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা শুরু করে এবং বাংলাদেশে একটি বিশেষ তুর্কি অর্থনৈতিক অঞ্চল (SEZ) প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দেয়।

 

 

 লক্ষণীয়, ফিদান কেবল সরকারি দলের নেতাদের সঙ্গেই সাক্ষাৎ করেননি-তিনি বিরোধী দল এবং নতুন দল এনসিপির নেতাদের সঙ্গেও আলাদাভাবে বৈঠক করেছেন। এটি তুরস্কের স্পষ্ট বার্তা : আঙ্কারা কোনো একটি দলের সঙ্গে নয়, বাংলাদেশের মানুষের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক গড়তে চায়। ফিদানের রোহিঙ্গা শিবির পরিদর্শন ছিল সুপরিকল্পিত বার্তা : তুরস্ক বাণিজ্যিক স্বার্থের বাইরে গিয়ে সভ্যতাগত সংহতির ভাষায় কথা বলছে।

 

চীন, পাকিস্তান এবং নতুন জ্যামিতি : চীন-বাংলাদেশ সম্পর্ক তীব্র গতিতে এগিয়েছে। খলিলুর রহমান মে মাসে চীন সফর করে যৌথ বিবৃতি দেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজে জুনের শেষে বেইজিং যাবেন বলে প্রত্যাশা-সম্ভবত তার প্রথম বড় দ্বিপাক্ষিক বিদেশ সফর।

 

 

 এই তথ্য যে কোনো বক্তব্যের চেয়ে বেশি কথা বলে। পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক আশ্চর্যজনক গতিতে উষ্ণ হয়েছে। ইসলামাবাদ-ঢাকা সরাসরি বিমান চলাচল এ বছর জানুয়ারিতে পুনরায় শুরু-চৌদ্দ বছরে প্রথম। গত জুনে কুনমিংয়ে বাংলাদেশ-চীন-পাকিস্তানের প্রথম ত্রিপক্ষীয় জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বৈঠক নতুন এক কৌশলগত জ্যামিতির বার্তা দেয়। বাংলাদেশ বিমানবাহিনী চীনে ড্রোন উৎপাদন কারখানা স্থাপনের চুক্তি করেছে; পাকিস্তান জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমান দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে।

 

 

 

বাংলাদেশ এখন আর পরাশক্তির মনোযোগের নিষ্ক্রিয় প্রাপক নয়। দেশটি নীরবে এমন এক বহুমুখী কাঠামো গড়ছে, যাকে কোনো একক শক্তি নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না।

 

ওয়াশিংটন ও মস্কো : কেন্দ্রবিন্দুতে উত্তেজনা : যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের বৃহত্তম রপ্তানি বাজার-নতুন সরকারের সঙ্গে উষ্ণভাবে সম্পৃক্ত হয়েছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নির্বাচনের পরপরই অভিনন্দন জানিয়েছেন। ইউনূস আমলের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যচুক্তি বহাল আছে, তবে ঢাকা এটিকে ‘পর্যালোচনাযোগ্য ও শর্তসাপেক্ষ’ বলে উপস্থাপন করছে-একদিকে ওয়াশিংটনকে আশ্বস্ত করতে, অন্যদিকে সার্বভৌমত্ব রক্ষার বার্তা দিতে।

 

 

 কিন্তু জ্বালানি প্রশ্নে গভীরতর সংকট দৃশ্যমান। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কারণে রাশিয়া থেকে জ্বালানি কিনতে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ছাড় চেয়েছে বলে খবর বেরিয়েছে। এটি ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির মূল সংকটকে উন্মোচন করে : অর্থনৈতিক বাধ্যবাধকতা কখনো কখনো এমন পথে নিয়ে যায়, যেখানে কথার মারপ্যাঁচ কাজে আসে না। আর এ কারণেই মস্কো সফর এত গুরুত্বপূর্ণ।

 

বাংলাদেশ-রাশিয়া বার্ষিক দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ২ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যায়। রূপপুর প্রকল্প দুই দেশকে এক প্রজন্মের জন্য বেঁধে রেখেছে। মস্কো খলিলুর রহমানকে ‘ভারসাম্যপূর্ণ ও বাস্তববাদী কূটনীতিক’ বলে প্রকাশ্যে প্রশংসা করেছে এবং প্রত্যাশা রাখছে যে বাংলাদেশি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি গ্লোবাল সাউথের পক্ষে কথা বলবেন।

 

 

এ সফর শুধু দ্বিপাক্ষিক আলোচনা নয়-এটি বাংলাদেশের একটি স্পষ্ট বার্তা : আমরা কারও বলয়ে বন্দি নই। যে ঝুঁকিগুলোর কথা বলতেই হবে : গত তিন মাসে বাংলাদেশ যে বহুমুখী কৌশল নিয়েছে, বর্তমান বাস্তবতায় তা যৌক্তিক। তবে তিনটি গুরুতর ঝুঁকি সৎভাবে স্বীকার করতে হবে।

 

প্রথম ঝুঁকি : অসংগতি। কল্পনা করুন-দুই হাতে পাঁচটি পূর্ণ গ্লাস ধরে উঁচুনিচু মেঝেতে হাঁটছেন। তুরস্কের SEZ, চীনের ড্রোন কারখানা, পাকিস্তানের যুদ্ধবিমান, রাশিয়ার পারমাণবিক জ্বালানি এবং আমেরিকার বাণিজ্য চুক্তি-এই পাঁচটি গ্লাস একসঙ্গে বহন করছে বাংলাদেশ। আলাদাভাবে প্রতিটি অর্থবহ।

 

 

 কিন্তু মেঝে যখন কাত হবে-যখন বেইজিং ও নয়াদিল্লি স্পষ্ট উত্তর চাইবে, বা ওয়াশিংটন রূপপুর আর বাণিজ্য সুবিধার মধ্যে বেছে নিতে বলবে, তখন কী হবে? সবাইকে খুশি রাখার নীতি সংকটের মুহূর্তে প্রায়ই কাউকেই খুশি রাখতে পারে না।

 

দ্বিতীয় ঝুঁকি : নীরবতার নৈতিক মূল্য। ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলকে আগ্রাসী বলতে অস্বীকার করা কেবল কূটনৈতিক কৌশল ছিল না-এটি ছিল লাখ লাখ বাংলাদেশির কাছে পাঠানো একটি বার্তা, যারা ইরানের মানুষের সঙ্গে গভীর মানবিক ও ধর্মীয় একাত্মতা অনুভব করেছিলেন। পররাষ্ট্রনীতির বিশ্বাসযোগ্যতা সম্পর্কের বিশ্বাসের মতো-গড়তে বছরের পর বছর লাগে, একটিমাত্র সুচিন্তিত নীরবতায় তার ক্ষয় শুরু হয়।

 

তৃতীয় ঝুঁকি : বক্তৃতা আর বাস্তবতার ফাঁক। আমাদের গার্মেন্ট শ্রমিকদের রেমিট্যান্স এই অর্থনীতির শ্বাস-প্রশ্বাস। আমাদের কারখানা বেঁচে আছে সেই বাজারের অর্ডারে, যার ভূরাজনৈতিক সিদ্ধান্তে মন্তব্য করতে আমরা সাহস পাই না।

 

 

আমাদের বিদ্যুৎ জ্বলে সেই অঞ্চলের জ্বালানিতে, যাকে বিরাগভাজন করতে আমরা ভয় পাই। ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ একটি জোরালো স্লোগান-কিন্তু প্রকৃত কূটনৈতিক স্বাধীনতা মঞ্চ থেকে ঘোষণায় আসে না, আসে অর্থনৈতিক সক্ষমতায়। এক অনিশ্চিত কিন্তু আশাবাদী সূচনা তবু অর্জিত সাফল্যকে ছোট করার সুযোগ নেই।

 

 জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতিত্ব নিছক কূটনৈতিক পুরস্কার নয়-এটি ১৭ কোটি মানুষের একটি জাতির বৈশ্বিক স্বীকৃতি। যে বিশ্বে নিয়মভিত্তিক ব্যবস্থার ভিত ফাটল ধরেছে এবং যে কোনো পরাশক্তির খেয়ালখুশিতে হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যেতে পারে, সেই বিশ্বে মাঝারি শক্তির কৌশলগত সুযোগ আশ্চর্যজনকভাবে বেড়েছে। বড় শক্তিগুলো নিজেদের মধ্যে টানাটানিতে ব্যস্ত; ছোট ও মাঝারি দেশগুলোর জন্য নিজের জায়গা তৈরির এই মুহূর্ত ইতিহাসে বিরল।

 

প্রশ্ন একটাই-এবং এটি কেবল কূটনৈতিক নয়, জাতিগত : সেই জায়গা পূরণের মতো দূরদৃষ্টি, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা এবং নৈতিক সাহস কি আমাদের আছে? নাকি আমরা সুযোগের দরজায় দাঁড়িয়ে থাকব, ভেতরে না ঢুকে?

 

সেই উত্তর এখনো লেখা হয়নি। এ জুনের সকালে, যখন আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মস্কোতে এবং পৃথিবী পুরোনো ছাঁচ ভেঙে নতুন রূপ নিচ্ছে-সেই অনুত্তরিত প্রশ্নটিই বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ এবং সবচেয়ে বড় দায়।

 

 

ড. মোহাম্মদ ইমরান হোসাইন আনসারী : সহকারী অধ্যাপক, স্টেইট ইউনিভার্সিটি অব নিউইয়র্ক-ডাচেস; নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজ

ট্যাগ:BCSকলামবাংলাদেশ