বাংলাদেশের উন্নয়ন মডেলের মৌলিক সংকট

বাংলাদেশের উন্নয়ন মডেলের মৌলিক সংকট
কলামবাংলাদেশ

বাংলাদেশের উন্নয়ন মডেলের মৌলিক সংকট

৭ আগস্ট, ২০২৬

ড. ইউসুফ জারিফ [সূত্র : আমার দেশ; ০৭ আগস্ট ২০২৬]

উপনিবেশ-উত্তর দেশগুলোর অর্থনৈতিক অগ্রগতি বিশ্লেষণ করলে এটি স্পষ্ট যে, যারা অগ্রগতি করেছে, তারা বুঝে-শুনে নিজ দেশের পরিপ্রেক্ষিতে উন্নয়ন মডেল অনুসরণ করেছে। কোনো বিশেষ মডেলকে অন্ধভাবে অনুকরণ করেনি। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সফল রাষ্ট্রগুলোর সাফল্যের পেছনে স্বাধীন বা অটোনমাস উন্নয়ন মডেলের প্রভাব অনেক ব্যাপক। এসব দেশে দৃঢ় ও সৎ নেতৃত্ব অত্যন্ত সফলভাবে স্বাধীন উন্নয়ন মডেল বাস্তবায়ন করতে সক্ষম হয়েছিল। বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভের পর থেকে যে উন্নয়ন কৌশল প্রয়োগ করে আসছে, এর মধ্যে অনেক মৌলিক সংকট আছে। স্বাধীনতা লাভের পরপরই যথেষ্ট বিচার-বিশ্লেষণ ছাড়া সমাজতান্ত্রিক ধারার উন্নয়ন কৌশল প্রয়োগের নীতি গ্রহণ করা হয়। সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার নামে সব জাতীয় প্রতিষ্ঠান দখল করা বা রাজনীতিকীকরণ করা হয়।

 

 

 ফলে সব ক্ষেত্রে প্রশাসনিক সুশাসন ও মেরিটোক্রেসিকে অবমূল্যায়ন করা হয়। এর ফলে নীতি-সক্ষমতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলার পরিবর্তে নীতি-বিভ্রান্তি এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। এই প্রাতিষ্ঠানিক বিশৃঙ্খলার ফল এতটা গভীর হয় যে, বিশৃঙ্খলা আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক মূল্যবোধে পরিণত হয়, যা থেকে কবে পরিত্রাণ পাব, তা আমরা জানি না। আদমজী পাট কল, চট্টগ্রাম স্টিল মিল, বিভিন্ন চিনি কল ও চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর বিশৃঙ্খল নীতি-পদ্ধতির প্রধান বলিতে পরিণত হয়। বিভ্রান্তমূলক সমাজতান্ত্রিক মডেলের কারণে একটি রাষ্ট্র শুরুর সময় যে শৃঙ্খলা ও প্রশাসনিক নৈতিকতা তৈরি করার কথা ছিল, তা করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়।

 

 

কিন্তু ১৯৭০ দশকের মাঝামাঝি থেকে আমরা আর একটি বিভ্রান্তি এবং ফাঁদের মধ্যে পড়েছি, যা এখনো চলমান। সমাজতান্ত্রিক মডেলকে প্রত্যাখ্যান করতে গিয়ে এমন এক বাজার ব্যবস্থাকে আলিঙ্গন করা হয়েছে, যেখানে নীতি-সক্ষমতার ঘাটতি শুধু আরো গভীর হলো না, বরং নীতি-পরাধীনতা এবং এলিট তোষণ নীতি-মীমাংসিত সত্য হিসেবে আবির্ভূত হলো। তাই বাংলাদেশের উন্নয়ন কৌশলের বর্তমান মৌলিক সংকট বিশ্লেষণ করা জরুরি হয়ে পড়েছে। আমরা বাজারব্যবস্থা বলতে বিনা দ্বিধায় পশ্চিমের নীতি-পদ্ধতি অনুসরণ করা বুঝেছি এবং রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা ও দায়িত্ববোধকে উপেক্ষা করেছি। এর ফল হলো আমরা রাজনৈতিকভাবে উপনিবেশ ব্যবস্থা থেকে মুক্তি লাভ করলেও নতুন করে চিন্তার উপনিবেশিকতায় আবদ্ধ হলাম এবং এমন একটি ইকো-সিস্টেম তৈরি হলো, যেখানে স্বাধীনভাবে চিন্তা করা প্রায় অসম্ভব হলো।

 

শুধু রাজনৈতিক নেতৃত্ব নয়; বরং সমাজের অন্যান্য অংশীজনÑযেমন বুদ্ধিজীবী সমাজ, নাগরিক সমাজ, থিংক-ট্যাংক, যাদের প্রধান ভূমিকা হচ্ছে রাজনৈতিক নেতৃত্বকে জবাবদিহির মধ্যে রাখা এবং জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষা দেওয়া, বরং এ ইকো-সিস্টেমকে দৃঢ় থেকে দৃঢ়তর করল। উন্নয়ন বলতে পাশ্চাত্যকে অন্ধ অনুসরণের মডার্নাইজেশন থিওরি আরোপ করা হলো। এই ঔপনিবেশিক ইকো-সিস্টেমের প্রভাব সমাজের সব ক্ষেত্রে বিস্তৃত হলো। আবহমান ঐতিহ্য-মূল্যবোধের সঙ্গে সংঘাত সৃষ্টিসহ সমাজে বিভক্তি প্রসারিত হলো। বিশেষ করে, পাশ্চাত্য সহায়তানির্ভর সিভিল-সোসাইটি ও এনজিও আন্দোলন সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মূল্যবোধকে অযাচিতভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করতে শুরু করল। পশ্চিমের অনেক পণ্ডিত বাংলাদেশকে উন্নয়ন ল্যাবরেটরিতে পরিণত করল। সামগ্রিকভাবে প্রিন্সিপাল-এজেন্ট থিওরির আলোকে আমরা পশ্চিমা মূলনীতির স্থানীয় এজেন্ট হয়ে গেলাম।

 

 

বাংলাদেশে পাশ্চাত্যের সঙ্গে সংযোগের মাধ্যমে গড়ে ওঠা এনজিও শ্রেণি এবং নীতিনির্ধারক এলিট শ্রেণি প্রতিষ্ঠিত সামাজিক মূল্যবোধকে আঘাত করাকে উন্নয়নের অন্যতম প্রধান কৌশল হিসেবে বিবেচনা করে। ফলে সমাজে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা তৈরি হয় এবং সংহতি বিনষ্ট হয়।

জাতীয় সংহতি বিনষ্টের ফলে পাশ্চাত্য শক্তি এবং তাদের উন্নয়ন মডেলের ওপর আমাদের নীতিমহল ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের নির্ভরতা বৃদ্ধি পায়। পাশাপাশি রাজনৈতিক উন্নয়নের ক্রম অবনয়ন, রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানের ওপর আস্থার সংকট এবং নির্বাচনব্যবস্থার ভঙ্গুরতা ও অকার্যকারিতা নীতি-সক্ষমতাকে চূড়ান্তভাবে নতজানু করে। ফলে বাংলাদেশের উন্নয়ন মডেল বিগত ৫০ বছর ধরে আন্তর্জাতিক শক্তির অধীনে কাজ করছে। বাংলাদেশের উন্নয়ন মডেলের প্রধান মৌলিক সংকট হচ্ছে নীতি-পরাধীনতা। বিশেষত, ১৯৮০-এর দশক থেকে অর্থনীতি উন্নয়নের সব প্রধান সেক্টরে (স্বাস্থ্য, শিক্ষা, জনপ্রশাসন, স্থানীয় সরকার, পাবলিক ফাইন্যান্স ব্যবস্থাপনা, দারিদ্র্যদূরীকরণ, জ্বালানি নিরাপত্তা, অবকাঠামো উন্নয়ন, জেন্ডার ও নারী উন্নয়ন) আন্তর্জাতিক ঋণ প্রদানকারী গোষ্ঠীর পরামর্শে ও নির্দেশনায় নীতি-প্রণয়ন করা হয়েছে। এমনকি ঋণপ্রদানকারী গোষ্ঠীর চাপিয়ে দেওয়া নীতির কার্যকারিতা পর্যালোচনার জন্য কোনো স্বাধীন প্রচেষ্টা গ্রহণ করা হয়নি। ঋণ প্রদানকারী গোষ্ঠীর সহায়তায় গড়ে ওঠা থিংক-ট্যাংক এবং কনসালট্যান্ট-বুদ্ধিজীবী-নীতি নতজানুতাকে বৈধতা দিয়েছে। উচ্ছিষ্টভোগী এনজিও শ্রেণি ঋণদানকারী গোষ্ঠীর উন্নয়ননীতির বৈধতা সৃষ্টিতে সহায়তা করেছে।

 

 

স্বাধীনতার পর থেকে অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য ঋণ প্রদানকারী দেশ-সংস্থাগুলোর ওপর নির্ভরতা এ পর্যায়ে পৌঁছেছে যে আমরা কোনোভাবে তথাকথিত উন্নয়ন সহযোগীদের বাইরে কোনো কিছু চিন্তা করতে সক্ষম নই। ঋণ বা তথাকথিত অনুদাননির্ভর প্রকল্পে যেহেতু বখরা তৈরির সুযোগ হয়, তাই রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও আমলাতন্ত্র এবং রাষ্ট্রের অন্যান্য সুবিধাভোগী শ্রেণি এ ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। প্রকল্প ছাড়া উন্নয়ন কৌশল আমাদের চিন্তার বাইরে। পাশ্চাত্য সাহায্যনির্ভর সিভিল সোসাইটি জাতীয় স্বার্থকে সামনে রেখে বিভিন্ন এজেন্ডা উপস্থাপন করলেও আড়ালের মূল সত্যটা হলো এনজিও/সিভিল সোসাইটি নেতৃত্ব এবং কনসালট্যান্ট-বুদ্ধিজীবী শ্রেণির মূল লক্ষ্য হলো বিভিন্ন উন্নয়ন এজেন্ডার নামে বিলাসী জীবন নিশ্চিত করা।

 

 

নীতি-পরাধীনতার কারণে আমরা প্রায়ই আমাদের প্রধান রাজনৈতিক নেতৃত্বকে অন্য দেশের শ্রমবাজার উন্মুক্ত করার অনুরোধ করতে দেখি। জনগণকে অভ্যন্তরীণভাবে কাজে লাগানোর সক্ষমতা ও অঙ্গীকারের অভাবে আমরা বিদেশে প্রেরণকে বেশি সহজ ও গুরুত্বপূর্ণ মনে করি। অস্বীকার করার উপায় নেই যে রেমিট্যান্স বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান স্তম্ভ হিসেবে বিবেচিত হয়। কিন্তু সস্তা শ্রমের দোহাই দিয়ে একটি দেশ বছরের পর বছর ধরে মানব সন্তানকে রপ্তানি করতে পারে না। মানুষ পণ্য নয়। এ ছাড়া বৈদেশিক কর্মসংস্থান ব্যবস্থায় আমরা এমন একটি এলিট-তোষণবাদী ও কায়েমি স্বার্থবাদী ব্যবস্থা তৈরি করেছি, যার কারণে বিদেশে আমরা আমাদের শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি নিশ্চিতের ব্যবস্থাও গ্রহণ করি না। বছরের পর বছর ধরে আমাদের শ্রমিকরা দেশীয় ও আন্তর্জাতিক মাফিয়াদের দ্বারা শোষিত হচ্ছে। অথচ রাষ্ট্র ও প্রশাসন নির্বিকার।

 

কিন্তু দক্ষিণ কোরিয়ার স্বাধীন নীতিকাঠামো আমাদের ভিন্ন বার্তা দেয়। জাপান কর্তৃক শোষণ ও গৃহযুদ্ধে দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থনীতি মারাত্মকভাবে বিপর্যস্ত হয়। দক্ষিণ কোরিয়া ১৯৫০-৬০-এর দশকে পৃথিবীর সবচেয়ে দরিদ্র দেশ হিসেবে বিবেচিত হয়। দক্ষিণ কোরিয়ার কিছু জনগণ তৎকালীন পশ্চিম জার্মানিতে অভিবাসী শ্রমিক (মাইনার ও নার্স) হিসেবে যায়। দক্ষিণ কোরিয়ার অভিবাসী শ্রমিকদের কর্মতৎপরতায় খুশি হয়ে তৎকালীন পশ্চিম জার্মান প্রেসিডেন্ট হেনরিখ লুবকে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট জেনারেল পার্ককে পশ্চিম জার্মানি সফরে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। জেনারেল পার্ক অভিবাসী শ্রমিকদের সঙ্গে যখন দেখা করেন, তখন এক হৃদয়বিদারক অবস্থার সৃষ্টি হয়। নিজ দেশের নাগরিকদের আর যাতে বিদেশে পণ্য হিসেবে পাঠাতে না হয়, সেজন্য তিনি তাদের সেদিন আশ্বস্ত করেছিলেন। ভবিষ্যতে কোনো কোরীয় নাগরিককে বিদেশে বিক্রি করা হবে না মর্মে যে ঘোষণা জেনারেল পার্ক সেদিন দিয়েছিলেন, এটাই হচ্ছে নীতিস্বাধীনতা, এটাই হচ্ছে নেতৃত্ব। জেনারেল পার্ক তার কথা রেখেছিলেন; পরে দক্ষিণ কোরিয়ার নাগরিকরা অভিবাসী শ্রমিক হিসেবে বিদেশে যায়নি।

 

 

আমরা যেকোনো অর্থনৈতিক সংকটে বিচার-বিশ্লেষণ ছাড়া ঋণদাতা গোষ্ঠীর শরণাপন্ন হই। যেসব দেশ নীতি-দৃঢ়তায় বিশ্বাস করে, তারা তা করে না। বিগত আওয়ামী লীগ সরকার অর্থনীতিকে সংকটময় অবস্থায় রেখেছিল, এটি অস্বীকার করার উপায় নেই। তবে কারণগুলো যথাযথভাবে বিশ্লেষণ না করে ‘বাজেট সহায়তা’র যে বিলাসী নীতি নেওয়া হয়েছে, তা জাতীয় নীতি-নির্ভরতাকে আরো শক্তিশালী করবে। বাছ-বিছার ছাড়া কয়েক বছর ধরে বাজেট সহায়তা নেওয়া হচ্ছে। আমরা এটাও শুনছি যে সরকার তথাকথিত ‘বাংলাদেশ উন্নয়ন ফোরামকে (বিডিএফ) আবার পুনরুজ্জীবিত করবে। বিডিএফ বাংলাদেশের নীতিপরাধীনতার একটি আনুষ্ঠানিক কাঠামো। বিডিএফ বাংলাদেশের নীতিস্বাধীনতা ও কার্যকর উন্নয়ন কৌশলের কোনো বাস্তবভিত্তিক সমাধান নয়। বরং এটি ঋণদানকারী গোষ্ঠীর একটি আনুষ্ঠানিক কাঠামো, যা বাংলাদেশের উন্নয়ননীতিকে ঋণ প্রদানকারী গোষ্ঠীর স্বার্থে প্রভাবিত করে। একইভাবে সেক্টর পর্যায়ে লোকাল কনসালটেটিভ গ্রুপের (এলসিজি) নামে যে নীতি-অবকাঠামো আছে, তাও জাতীয় স্বার্থের জন্য হুমকি। জাতীয় সংসদে এসব নীতি-অবকাঠামোর প্রাতিষ্ঠানিক অবস্থান এবং নীতি-প্রণয়নে প্রভাব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা-পর্যালোচনা প্রয়োজন।

 

 

এখন প্রশ্ন উঠতে পারে, বাংলাদেশের বিদ্যমান নীতি-অধীনতা দেশকে এলডিসি থেকে উত্তরণে কতটুকু চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি করতে পারে। এটি স্পষ্ট যে, অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গোষ্ঠীর চাপে সরকার এলডিসি থেকে উত্তরণে স্বাধীন পদক্ষেপ নেওয়ার অবস্থায় নেই। অভ্যন্তরীণভাবে গার্মেন্টস মালিকরা, যাদের অনেকে সরকারি নীতি-প্রণয়নের সঙ্গে জড়িত, সরকারের নীতিকে তাদের গোষ্ঠী স্বার্থে অনেক দিন ধরে ব্যবহার করছে। ফলে রপ্তানি ডাইভারসিটি তৈরি হচ্ছে না। এমনকি এলডিসি থেকে উত্তরণকেও আমরা প্রকল্পনির্ভর করেছি। জাতীয় সক্ষমতা তৈরির জন্য যেসব পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন, সেগুলোও জাতীয় পর্যায়ে অনুপস্থিত। মানবসম্পদ উন্নয়নের কোনো কার্যকর মডেল দেখা যাচ্ছে না। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার শাসকশ্রেণি নিজস্ব সংকট ও সম্ভাবনা সম্পর্কে অবহিত ছিলেন। সে আলোকে প্রতিষ্ঠান নির্মাণ করেছেন, আমলাতন্ত্র গড়ে তুলেছেন এবং উন্নয়ন নীতি-প্রণয়ন করেছেন। জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, মালয়েশিয়া, রুয়ান্ডা, সিঙ্গাপুর, এসব দেশ নীতিস্বাধীনতাকে সবার ওপরে স্থান দিয়েছেন। ঋণদানকারী গোষ্ঠীর কাছে বা বিদেশি সহায়তানির্ভর কনসালট্যান্ট-বুদ্ধিজীবীর কাছে জাতীয় নীতি-প্রণয়ন প্রক্রিয়া বা কাঠামো তুলে দেননি। পাশাপাশি তারা সততা ও মেরিটোক্রেসির নীতিকে অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন। ফলে তারা তাদের অর্থনৈতিক রূপান্তরে সক্ষম হয়েছিলেন।

 

 

এলডিসি থেকে উত্তরণ একটি বহুমাত্রিক কাঠামোগত পরিবর্তন। এটিকে শুধু ট্রেড/বাণিজ্য বা বিদেশি ঋণের লেন্সে দেখলে চলবে না। এলডিসি থেকে উত্তরণের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত সামগ্রিকভাবে রাষ্ট্রের সক্ষমতাবৃদ্ধি করা ও নাগরিক মর্যাদা উন্নীত করা। এজন্য বহুমাত্রিক নীতিকৌশল দরকার। পাশাপাশি প্রয়োজন সৎ ও দৃঢ় নেতৃত্ব। এসবের ব্যত্যয় করে কেউ উন্নতি করতে পারেনি, বাংলাদেশের পক্ষেও সম্ভব নয়। আমরা সরকার পরিবর্তন হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি পরিবর্তন করি, আমলাতন্ত্রকে নিয়ন্ত্রণ করি, বাংলাদেশ ব্যাংকে নীতি-শিথিলতার মাধ্যমে ব্যাংক দখল করি ও স্বজনতোষী পলিসি গ্রহণ করে নিজ দলের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিবর্গকে আর্থিক এবং নীতি-সহায়তা দিই। কিন্তু দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াসহ অন্য সফল দেশগুলোর অভিজ্ঞতা সম্পূর্ণ ভিন্ন।

 

 

এসব দেশ প্রতিষ্ঠান নির্মাণকে গুরুত্ব দিয়েছে, সরকারি প্রতিষ্ঠানে শৃঙ্খলা ও মেধাতন্ত্রকে মূল বিবেচনা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে, আমলাতন্ত্রকে রাজনীতি থেকে বিযুক্ত করেছে, মানব উন্নয়নে কার্যকর নীতি গ্রহণ করেছে ও যথাযথ বিনিয়োগ করেছে। তাই সিঙ্গাপুরের মতো ছোট দেশে বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আমরা ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমলের খ্যাতনামা প্রতিষ্ঠানগুলোকে (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা কলেজ) ধ্বংস করেছি। তাই এলডিসি থেকে উত্তরণ সময় বৃদ্ধি বা জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসির (সিডিপি) সুপারিশের ওপর নির্ভর করবে না। নেতৃত্বের দৃঢ়তা ও সততা এবং জাতীয় নীতি-শৃঙ্খলা ও সক্ষমতার ওপর নির্ভর করবে। বর্তমান বাস্তবতায় আশার জায়গা সম্প্রসারিত না হয়ে সংকুচিত হচ্ছে। এলডিসি থেকে উত্তরণে সম্ভবত এটিই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

লেখক : গভর্ন্যান্স ও পাবলিক পলিসি এক্সপার্ট, ইউরোপের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক এবং একাধিক গবেষণা পুস্তকের লেখক

 

 

 

ট্যাগ:BCSকলামবাংলাদেশ