বাংলাদেশের জনমিতিক লভ্যাংশের অদেখা সংকট

বাংলাদেশের জনমিতিক লভ্যাংশের অদেখা সংকট
কলামবাংলাদেশ

বাংলাদেশের জনমিতিক লভ্যাংশের অদেখা সংকট

১২ আগস্ট, ২০২৬

মোহাম্মদ সফি উল্যাহ [প্রকাশ: কালের কণ্ঠ, ১২ আগস্ট ২০২৬]

প্রতিবছর ১২ আগস্ট আন্তর্জাতিক যুব দিবস পালিত হয়। এ দিবসটি তরুণসমাজের সম্ভাবনা, তাদের অধিকার এবং সামাজিক-অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জকে বৈশ্বিক পরিসরে তুলে ধরার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ।

 

 


২০২৫ সালের আন্তর্জাতিক যুব দিবসের প্রতিপাদ্য ছিল ‘স্থানীয় যুব কার্যক্রমের মাধ্যমে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন’। এই প্রতিপাদ্য নির্দেশ করে যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনের ভিত্তি গড়ে ওঠে স্থানীয় পর্যায়ে তরুণদের সক্রিয় অংশগ্রহণ, উদ্ভাবনী চিন্তা ও নেতৃত্বের মাধ্যমে। জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিষয়ক বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এসডিজির ৬৫ শতাংশেরও বেশি অগ্রগতি নির্ভর করে স্থানীয় পর্যায়ে কার্যকর বাস্তবায়ন ও সুশাসনের ওপর, যেখানে তরুণরাই পরিবর্তনের অন্যতম প্রধান অনুঘটক।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই বৈশ্বিক উদ্যোগের গুরুত্ব অপরিসীম।

 

 


বিভিন্ন পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশটি বর্তমানে জনমিতিক লভ্যাংশ অর্জনের এক গুরুত্বপূর্ণ সময়ে রয়েছে, যেখানে মোট জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি কর্মক্ষম যুবশক্তি। তবে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা বলছে, শুধু বিপুল যুব জনসংখ্যা অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি নিশ্চিত করে না। এই জনশক্তিকে মানসম্মত শিক্ষা, প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষতা এবং উৎপাদনশীল কর্মসংস্থানের সঙ্গে কার্যকরভাবে যুক্ত করতে পারলেই জনমিতিক লভ্যাংশ টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির শক্তিতে পরিণত হতে পারে।

 


বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ‘জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২২’-এর জাতীয় প্রতিবেদন দেশের জনমিতিক কাঠামোর একটি সুস্পষ্ট চিত্র তুলে ধরেছে।

 

 


প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ১৫-২৪ বছর বয়সী যুব জনসংখ্যা প্রায় তিন কোটি ১৫ লাখ ৭০ হাজার (৩১.৫৭ মিলিয়ন)। ১৫-২৯ বছর বয়সী জনগোষ্ঠীকে অন্তর্ভুক্ত করলে এ সংখ্যা আরো বৃদ্ধি পায়। জনমিতিক তত্ত্ব অনুযায়ী, যখন কোনো দেশের কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর অনুপাত নির্ভরশীল জনগোষ্ঠীর তুলনায় বেশি থাকে, তখন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি হয়, যা জনমিতিক লভ্যাংশ নামে পরিচিত। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই সুযোগ আগামী দুই থেকে আড়াই দশক পর্যন্ত বিদ্যমান থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে কর্মসংস্থানের বাস্তব চিত্র উদ্বেগজনক।

 

 

জনশুমারির তথ্য অনুযায়ী, ১৫ বছর ও তদূর্ধ্ব কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর মাত্র ৪২.০২ শতাংশ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নিয়োজিত। কর্মরতদের মধ্যে ৪৩.৭০ শতাংশ সেবা খাতে, ৩৭.৯০ শতাংশ কৃষি খাতে এবং মাত্র ১৮.৪০ শতাংশ শিল্প খাতে কর্মরত। শিল্প খাতে তুলনামূলকভাবে কম কর্মসংস্থান নির্দেশ করে যে উচ্চ উৎপাদনশীল ও দক্ষতানির্ভর প্রাতিষ্ঠানিক চাকরির সুযোগ এখনো সীমিত। ফলে জনমিতিক লভ্যাংশকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির শক্তিতে রূপান্তরের পথ নানা কাঠামোগত চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে।

 


বাংলাদেশের জনমিতিক লভ্যাংশ অর্জনের পথে অন্যতম বড় প্রচ্ছন্ন চ্যালেঞ্জ হলো ‘এনইইটি’ (নট ইন এডুকেশন, এমপ্লয়মেন্ট অর ট্রেনিং) জনগোষ্ঠীর ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সংজ্ঞা অনুযায়ী, ১৫-২৪ বছর বয়সী যেসব তরুণ-তরুণী শুমারির সময় কোনো আনুষ্ঠানিক শিক্ষা, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বা কারিগরি ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না, তারা ‘এনইইটি’ জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত।

 

 

বাংলাদেশের জনমিতিক লভ্যাংশের অদেখা সংকটজাতীয় পর্যায়ে ১৫-২৪ বছর বয়সী যুবকদের মধ্যে ‘এনইইটি’ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা এক কোটি আট লাখ ১১ হাজার ৪০৪ জন। অর্থাৎ এই বয়সসীমার ৩৪.২৬ শতাংশ বা প্রতি তিনজন যুবকের একজন শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন ও উৎপাদনশীল কর্মসংস্থানের বাইরে অবস্থান করছে। জনমিতিক লভ্যাংশ অর্জনের পথে এটি একটি বড় কাঠামোগত ঝুঁকি। এই সংকটের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিকটি লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য। ১৫-২৪ বছর বয়সী পুরুষদের মধ্যে ‘এনইইটি’র হার ১৩.২৮ শতাংশ (১৯,৬৪,৫৫৮ জন), অথচ নারীদের ক্ষেত্রে তা ৫২.৭৬ শতাংশ (৮৮,৪৬,৮৪৬ জন)। এটি নারী শ্রমশক্তির সীমিত অংশগ্রহণের পাশাপাশি শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন, সামাজিক রীতি এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশে বিদ্যমান কাঠামোগত বৈষম্যের প্রতিফলন।

 

 

বসতিভিত্তিক বিশ্লেষণেও বৈষম্য স্পষ্ট। গ্রামীণ এলাকায় ‘এনইইটি’র হার ৩৬.৯৬ শতাংশ, যেখানে শহরাঞ্চলে তা ২৮.৯৬ শতাংশ। এটি শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানের সুযোগে নগর-গ্রাম বৈষম্যকে নির্দেশ করে। বয়সভিত্তিক উপাত্তও উদ্বেগজনক। ১৫-১৯ বছর বয়সে ‘এনইইটি’র হার ২৬.১৪ শতাংশ, যা ২০-২৪ বছর বয়সে বেড়ে ৪৩.২৩ শতাংশে পৌঁছায়। অর্থাৎ মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকের পর বিপুলসংখ্যক তরুণ-তরুণী উচ্চশিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন বা শ্রমবাজারের সঙ্গে কার্যকরভাবে যুক্ত হতে পারছে না। এই বিচ্ছিন্নতাই বাংলাদেশের জনমিতিক লভ্যাংশকে বাস্তব অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপান্তরের অন্যতম প্রধান অন্তরায়।

 

 

দেশের অভ্যন্তরীণ স্থানিক বৈষম্য যুব নিষ্ক্রিয়তার সংকটকে অঞ্চলভেদে আরো তীব্র করেছে। জেলাভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের উপকূলীয় জেলা এবং সিলেটের হাওরাঞ্চলে ‘এনইইটি’ জনগোষ্ঠীর ঘনত্ব তুলনামূলকভাবে বেশি। লক্ষ্মীপুরে ‘এনইইটি’র হার সর্বোচ্চ ৪২.১৬ শতাংশ, এরপর ব্রাহ্মণবাড়িয়া (৪১.৭০ শতাংশ) ও নোয়াখালী (৪১.৬৪ শতাংশ)। বিপরীতে শিল্পায়িত ঢাকা (২৫.৪৪ শতাংশ) ও গাজীপুরে (২৬.৩৭ শতাংশ) এই হার উল্লেখযোগ্যভাবে কম।

 

 

তবে শতকরা হার পুরো বাস্তবতা তুলে ধরে না। ‘এনইইটি’র হার তুলনামূলকভাবে কম হলেও বিপুল জনসংখ্যার কারণে ঢাকা জেলায়ই দেশের সর্বাধিক ‘এনইইটি’ যুবকের বসবাস—সাত লাখ ২২ হাজার ৩৩৮ জন। তাই নীতিনির্ধারণে শতকরা হার ও পরম সংখ্যা— উভয়কেই সমান গুরুত্ব দিতে হবে।

 

 

এ ছাড়া আর্থিক অন্তর্ভুক্তি ও ‘এনইইটি’র হারের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ঋণাত্মক সহসম্পর্ক (-০.৫৩৩) রয়েছে। একই সঙ্গে ইন্টারনেট ব্যবহারের বৈষম্যও সংকটকে গভীর করছে। ঢাকায় যেখানে ৫২.৯৮ শতাংশ মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করে, সেখানে পঞ্চগড়ে এ হার মাত্র ১৫.১৬ শতাংশ। এই ডিজিটাল বৈষম্য প্রান্তিক অঞ্চলের তরুণদের অনলাইন শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন, ফ্রিল্যান্সিং ও ডিজিটাল অর্থনীতিতে অংশগ্রহণের সুযোগকে সীমিত করছে। এ পরিসংখ্যানসমূহের পেছনে রয়েছে গভীর সামাজিক, অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বাস্তবতা। বিশেষ করে তিনটি কাঠামোগত কারণ বাংলাদেশের ‘এনইইটি’ সংকটকে তীব্রতর করছে।

 

 

প্রথমত, নারীদের মধ্যে অস্বাভাবিকভাবে উচ্চ ‘এনইইটি’ হার (৫২.৭৬ শতাংশ) শুধু শিক্ষার সীমিত সুযোগের ফল নয়। এর পেছনে রয়েছে প্রথাগত সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি, বাল্যবিবাহ, অল্প বয়সে মাতৃত্ব এবং পারিবারিক পরিচর্যামূলক অবৈতনিক কাজের অর্থনৈতিক স্বীকৃতির অভাব। জনশুমারির তথ্য অনুযায়ী, ১৫ বছর ও তদূর্ধ্ব জনগোষ্ঠীর ২৮.৬৩ শতাংশ গৃহস্থালি কাজে নিয়োজিত, যার বেশির ভাগই নারী। ফলে বিপুলসংখ্যক নারী আনুষ্ঠানিক শ্রমবাজারের বাইরে থেকে ‘এনইইটি’ জনগোষ্ঠীর অংশে পরিণত হচ্ছেন।

 

 

দ্বিতীয়ত, রেমিট্যান্সনির্ভর অঞ্চলে একটি প্রচ্ছন্ন স্থবিরতা লক্ষ করা যায়। লক্ষ্মীপুর, নোয়াখালী ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মতো জেলায় রেমিট্যান্স প্রবাহ বেশি হলেও ‘এনইইটি’র হারও উচ্চ। আন্তর্জাতিক অভিবাসনের প্রত্যাশা ও প্রবাস আয়ের ওপর নির্ভরশীলতা অনেক তরুণকে দীর্ঘ সময় দক্ষতা উন্নয়ন ও স্থানীয় কর্মসংস্থান থেকে দূরে রাখে। তৃতীয়ত, দ্রুত নগরায়ণ ও গ্রাম থেকে শহর অভিবাসনও সংকটকে জটিল করছে। উন্নত জীবিকার আশায় শহরে এলেও প্রয়োজনীয় কারিগরি দক্ষতার অভাবে অনেক তরুণ অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের অনিশ্চিত কাজে সীমাবদ্ধ থাকেন বা কর্মহীন হয়ে পড়েন। ফলে তাদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ দীর্ঘ সময় ‘এনইইটি’ অবস্থায় আটকে থাকে।

 

 

যুব নিষ্ক্রিয়তার অন্যতম প্রধান কারণ হলো দেশের বিদ্যমান শিক্ষাব্যবস্থা ও শ্রমবাজারের চাহিদার মধ্যে গভীর অসামঞ্জস্য। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ১৫ বছর ও তদূর্ধ্ব জনগোষ্ঠীর ৮৯.২৬ শতাংশ প্রথাগত সাধারণ শিক্ষায় যুক্ত, অথচ কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষায় অংশগ্রহণকারী মাত্র ০.৮১ শতাংশ। অর্থাৎ কারিগরি ও প্রয়োগমুখী শিক্ষার অংশীদারি ১ শতাংশেরও কম। এটি স্পষ্ট করে যে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা ডিগ্রিধারী স্নাতক তৈরি করলেও শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তুলতে এখনো সক্ষম নয়।

 

 

এই সংকট মোকাবেলায় ভৌগোলিক তথ্য ব্যবস্থা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং বিগ ডেটা বিশ্লেষণের সমন্বয়ে একটি জাতীয় দক্ষতা মানচিত্র গড়ে তোলা জরুরি। এর মাধ্যমে অঞ্চলভিত্তিক শ্রমবাজারের চাহিদা বিশ্লেষণ করে দক্ষতা উন্নয়নের পরিকল্পনা গ্রহণ করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচিকে তিনটি প্রধান স্তম্ভে পুনর্গঠন করা প্রয়োজন।

 

 

প্রথমত, চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের প্রযুক্তিগত দক্ষতা, যেমন— কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ডেটা সায়েন্স, জিআইএস ও রিমোট সেন্সিং। দ্বিতীয়ত, সবুজ দক্ষতা, যেমন— নবায়নযোগ্য জ্বালানি, সার্কুলার ইকোনমি ও জলবায়ু-সহনশীল কৃষি। তৃতীয়ত, প্রয়োগমুখী কারিগরি শিক্ষা ও উদ্যোক্তা উন্নয়ন, যেখানে ট্রেডভিত্তিক প্রশিক্ষণ, ডিজিটাল বিপণন এবং ফ্রিল্যান্সিং ও অনলাইনভিত্তিক স্বাধীন কর্মসংস্থানের দক্ষতার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।

 

 

বাংলাদেশের জনমিতিক লভ্যাংশকে বাস্তব অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর করতে হলে ডিগ্রিকেন্দ্রিক শিক্ষা থেকে দক্ষতাকেন্দ্রিক শিক্ষাব্যবস্থায় রূপান্তরের বিকল্প নেই। এক কোটি আট লাখেরও বেশি ‘এনইইটি’ যুবককে শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন ও উৎপাদনশীল কর্মসংস্থানের বাইরে রেখে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা বাস্তবসম্মত নয়। বিশেষ করে দারিদ্র্য বিমোচন, মানসম্মত শিক্ষা, শোভন কাজ ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, বৈষম্য হ্রাস এবং জলবায়ু কার্যক্রম বাস্তবায়নের জন্য এই জনগোষ্ঠীকে মূলধারায় অন্তর্ভুক্ত করা অপরিহার্য। তাই ‘এনইইটি’ সংকটের স্থানিক ও কাঠামোগত কারণ মোকাবেলায় নিম্নোক্ত নীতিগত পদক্ষেপগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন।

 

 

জিআইএস-ভিত্তিক জাতীয় ‘এনইইটি’ ডেটা বেইস প্রণয়ন : ওয়ার্ড ও ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত ‘এনইইটি’ যুবকদের সুনির্দিষ্ট অবস্থান ও বৈশিষ্ট্য চিহ্নিত করে একটি রিয়েল-টাইম, জিআইএস-ভিত্তিক জাতীয় ডেটা বেইস গড়ে তুলতে হবে। এর ভিত্তিতে অঞ্চলভিত্তিক শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে। উচ্চ ‘এনইইটি’ জেলায় ‘ইয়ুথ স্কিল হাব’ প্রতিষ্ঠা : লক্ষ্মীপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, নোয়াখালী, সুনামগঞ্জ, চাঁদপুর ও ভোলার মতো উচ্চ NEET হারসম্পন্ন জেলায় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ‘ইয়ুথ স্কিল হাব’ প্রতিষ্ঠা করে তথ্য-প্রযুক্তি, কারিগরি শিক্ষা এবং চতুর্থ শিল্প বিপ্লবসংশ্লিষ্ট দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।

 

 

নারীকেন্দ্রিক দক্ষতা উন্নয়ন ও কেয়ার ইকোনমি নীতি : নারীদের ডিজিটাল ফ্রিল্যান্সিং, ই-কমার্স, হস্তশিল্পসহ আয়মুখী কর্মকাণ্ডে যুক্ত করতে বিশেষ প্রশিক্ষণ ও প্রণোদনা দিতে হবে। একই সঙ্গে তাদের শ্রমবাজারে অংশগ্রহণ বাড়াতে মানসম্মত ডে কেয়ার ও শিশু পরিচর্যা সেবা সম্প্রসারণ জরুরি।

 

 

জাতীয় সবুজ কর্মসংস্থান নীতি : জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে বাংলাদেশে উপকূলীয়, চর ও জলবায়ু সংবেদনশীল অঞ্চলের তরুণদের অভিযোজন ও প্রশমন কার্যক্রমের অংশীদার হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। এ লক্ষ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস (ডিআরআর), পরিবেশবান্ধব উৎপাদন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, টেকসই কৃষি এবং উপকূলীয় ও সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্র সংরক্ষণের মতো খাতে সবুজ কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং প্রয়োজনীয় নীতিগত প্রণোদনা ও বিনিয়োগ নিশ্চিত করা জরুরি।

 

 

যুব উদ্ভাবন তহবিল ও সরকারি-বেসরকারি অংশীদারি : বাংলাদেশের যুবসমাজ শুধু ভবিষ্যতের সম্ভাবনা নয়; তারা বর্তমানের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, সামাজিক রূপান্তর এবং উদ্ভাবনের প্রধান চালিকাশক্তি। জনমিতিক লভ্যাংশ  অর্জনের যে ঐতিহাসিক সুযোগের জানালায় বাংলাদেশ আজ অবস্থান করছে, তা অনির্দিষ্টকাল উন্মুক্ত থাকবে না। তাই এক কোটি আট লাখেরও বেশি ‘এনইইটি’ যুবককে শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন ও উৎপাদনশীল কর্মসংস্থানের বাইরে রেখে একটি সমৃদ্ধ, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব নয়।

 

 

আন্তর্জাতিক যুব দিবসের বৈশ্বিক আহ্বানের আলোকে অঞ্চলভিত্তিক বৈষম্য হ্রাস, ডিজিটাল অবকাঠামোর সুষম সম্প্রসারণ, কারিগরি ও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার বিস্তার এবং তথ্যভিত্তিক, সময়োপযোগী নীতি প্রণয়ন এখন সময়ের অপরিহার্য দাবি। রাষ্ট্র যদি স্থানিক উপাত্তভিত্তিক পরিকল্পনা, দক্ষতা উন্নয়ন ও তরুণদের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে পারে, তবে আজকের ‘এনইইটি’ সংকটই আগামী দিনের জনমিতিক লভ্যাংশে রূপ নিয়ে একটি টেকসই, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার শক্তিশালী ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে।

লেখক : অধ্যাপক, ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

ট্যাগ:BCSকলামবাংলাদেশ