বাংলাদেশে ব্যারাজ কি মরীচিকায় পরিণত হতে যাচ্ছে

বাংলাদেশে ব্যারাজ কি মরীচিকায় পরিণত হতে যাচ্ছে
কলামবাংলাদেশ

বাংলাদেশে ব্যারাজ কি মরীচিকায় পরিণত হতে যাচ্ছে

২৩ জুলাই, ২০২৬

ভাটিতে ব্যারাজের যে বহু নেতিবাচক অভিঘাত হবে, ফারাক্কা ও গজলডোবা ব্যারাজ তার বড় প্রমাণ এবং বাংলাদেশ নিজেই তার ভুক্তভোগী। বাংলাদেশে ব্যারাজ কীভাবে মরীচিকায় পরিণত হতে যাচ্ছে, তা নিয়ে লিখেছেন নজরুল ইসলাম, অর্থনীতিবিদ ও গবেষক [সূত্র : প্রথম আলো, ২৩ জুলাই ২০২৬]

ব্যারাজ নিয়ে বিভ্রান্তি
সাম্প্রতিক কালে বাংলাদেশে ব্যারাজের মূল উদ্দেশ্য সম্পর্কে কিছু বিভ্রান্তি দেখা দিয়েছে। সরকারি মহল থেকে বলা হচ্ছে, প্রস্তাবিত ব্যারাজের ফলে বর্ষাকালের প্রবাহ নদীতে ধরে রাখা যাবে এবং তা শীতকালে ব্যবহার করা যাবে। সম্প্রতি মালয়েশিয়া সফরকালে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও এই ধারণা ব্যক্ত করেছেন। স্পষ্টতই তিনি এই ধারণা পেয়েছেন প্রস্তাবিত গঙ্গা ব্যারাজ প্রকল্পের প্রবক্তাদের কাছ থেকে এবং এই প্রকল্পের ‘সম্ভাব্যতা প্রতিবেদন’ (ফিজিবিলিটি রিপোর্ট) থেকে।

 

 

কিন্তু সম্ভাব্যতা প্রতিবেদনে প্রদত্ত হিসাবই প্রমাণ করে যে এই ধারণাটি সঠিক নয়। যেমন এই প্রতিবেদন জানায় যে পাংশাতে ব্যারাজের মাধ্যমে পানির উচ্চতা সর্বোচ্চ ১২.৫ মিটার করা সম্ভব হবে এবং তার ফলে রাজশাহীর পাংখা থেকে রাজবাড়ীর পাংশা পর্যন্ত বাংলাদেশের গঙ্গা নদীতে জমাকৃত পানির পরিমাণ হবে ২৮৯ কোটি ঘনমিটার।

 


এদিকে আমরা জানি যে বাংলাদেশে গঙ্গার বর্ষাকালীন প্রবাহের মোট পরিমাণ আনুমানিক ২ হাজার ৮৮০ কোটি ঘনমিটার। অর্থাৎ প্রস্তাবিত গঙ্গা ব্যারাজ যে পরিমাণ পানি সঞ্চিত করতে পারবে (২৮৯ কোটি ঘনমিটার), তা হবে বাংলাদেশে গঙ্গার মোট বর্ষাকালীন প্রবাহের মাত্র ১.০৪ শতাংশ!

 

 

বিষয়টিকে অন্যভাবেও দেখা যায়। যেমন গঙ্গা ব্যারাজ প্রকল্পের সম্ভাব্যতা প্রতিবেদন জানায় যে ব্যারাজের মাধ্যমে গঙ্গার পানির উচ্চতা বৃদ্ধি করে বাংলাদেশের গঙ্গার পাঁচটি শাখা নদী এবং দুটি পাম্পহাউসে মোট গড়ে ২ হাজার ৭৬৮ কিউমেক পানি সরবরাহ করা হবে। এর মধ্যে থাকবে গঙ্গার ডান পাশের হিসনা-মাথাভাঙ্গায় ৩২৭, ভেড়ামারা পাম্পহাউসে ৯৩, গড়াই-মধুমতীতে ২ হাজার ১০৮ এবং চন্দনা-বারসিয়াতে ৩০০; এবং বাঁ পাশের গোদাগাড়ী পাম্পহাউসে ৪০, বড়ালে ২১ এবং ইছামতীতে ১৫.৫ কিউমেক। শুধু যদি প্রস্তাবিত ব্যারাজ দ্বারা সঞ্চিত (২৮৯ কোটি ঘনমিটার) পানি দ্বারা এই সরবরাহ করা হয়, তাহলে মাত্র ৭.৫ দিনে তা নিঃশেষিত হয়ে যাবে। কাজেই পরিষ্কার যে প্রস্তাবিত ব্যারাজ দ্বারা বাংলাদেশে গঙ্গার বিভিন্ন শাখা এবং পাম্পহাউসে যে পানি সরবরাহ করা হবে, তা মূলত গঙ্গার চলতি প্রবাহ থেকে, সঞ্চিত পানি থেকে নয়। 

 

 


পাংশায় গঙ্গার পানি আধাআধি ভাগ হবে


লক্ষণীয় প্রকল্পের বাস্তবায়ন প্রতিবেদনের হিসাব অনুযায়ী, শুষ্ক মৌসুমে (নভেম্বর-মে) উপর্যুক্ত সাতটি অভিমুখে প্রবাহিত পানির পরিমাণ হবে ১ হাজার ২১০ কিউমেক। এই প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয় ১৯৯৭-২০১০ সময়কালে এই শুষ্ক মাসগুলোয় বাংলাদেশে গঙ্গার প্রবাহের পরিমাণ ছিল ২ হাজার ৬৯৪ কিউমেক। তাহলে বিষয়টা দাঁড়ায় যে শুষ্ক মৌসুমে যেটুকু পানি ফারাক্কা পেরিয়ে বাংলাদেশে আসে, তার প্রায় অর্ধেক (৪৫%) গোয়ালন্দের দিকে যেতে পারবে না। সে কারণেই প্রকল্পের সম্ভাব্যতা প্রতিবেদনে দেখা যায় যে পাংশার উজানে গঙ্গার পানি উচ্চতা ১২.৫ মিটার হলেও ভাটিতে এই উচ্চতা ২ মিটারের নিচে নেমে আসে।

 

 

► একপেশে সম্ভাব্যতা প্রতিবেদনের ভিত্তিতে কীভাবে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদ প্রস্তাবিত ব্যারাজ প্রকল্প অনুমোদন করে, তা বিস্ময় উদ্রেক না করে পারে না। ► ব্যারাজের মাধ্যমে যদি বর্ষাকালের পানিকে শীতকালে পুনর্বিতরণ করা যেত, তাহলে ফারাক্কা ও গজলডোবা ব্যারাজের কারণে শীতকালে পদ্মায় ও তিস্তায় পানি থাকে না কেন?

 

 

অর্থাৎ অনেকটা ফারাক্কায় যেমন শুষ্ক মৌসুমে গঙ্গার পানি ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে আধাআধি ভাগ হয়, তেমনি পাংশায় বাকি পানিটুকু উজান ও ভাটি এলাকার মধ্যে আধাআধি ভাগ হবে। এই রূঢ় সত্যকে এড়ানোর সুযোগ নেই। (এসব বিষয়ে আরও বিস্তারিত জানার জন্য ১৯ মে ডেইলি স্টার–এ প্রকাশিত বাংলাদেশের বিশিষ্ট পানিবিশেষজ্ঞ, যুক্তরাষ্ট্রের কমনওয়েলথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মো. খালেকুজ্জামানের সাক্ষাৎকার দেখুন)।

 

 

ব্যারাজ নিয়ে ‘মির‍্যাজ’
ব্যারাজ দ্বারা মূলত পদ্মার বর্ষাকালীন প্রবাহ ধরে রেখে তা শীতকালে ব্যবহার করা হবে, এটা একটা কাহিনি (ইংরেজিতে যাকে বলে মিথ), যার সঙ্গে বাস্তবতার মিল সামান্য। এই বয়ানের মধ্য দিয়ে ব্যারাজের উদ্দেশ্য নিয়ে এক মরীচিকা (ইংরেজিতে মির্যাজ) সৃষ্টি করা হচ্ছে, যা কখনোই অর্জিত হওয়ার নয়। 

 

 

এই মরীচিকার বিষয়টি প্রস্তাবিত দ্বিতীয় তিস্তা ব্যারাজের জন্যও প্রযোজ্য হবে। এই ব্যারাজের প্রস্তাব একেবারেই নতুন ও আকস্মিক। ডালিয়াতে বাংলাদেশের তিস্তা ব্যারাজ থাকা সত্ত্বেও কেন এই ব্যারাজ নির্মাণ করতে হবে এবং কোথায় তা নির্মাণের কথা ভাবা হচ্ছে, তা–ও পরিষ্কার নয়। তবে যদি এটা নির্মিতও হয়, এটারও মূল কাজ হবে নদীপ্রবাহের ভৌগোলিক দিক পরিবর্তন—বর্ষাকাল থেকে শীতকালে পানির লভ্যতার পরিবর্তন নয়।

 

 

বস্তুত এই মৌলিক বিষয়টি বোঝার জন্য এত হিসাবের প্রয়োজন হয় না। চোখের সামনেই রয়েছে ভারতের ফারাক্কা ও গজলডোবা ব্যারাজের অভিজ্ঞতা। ব্যারাজ দ্বারা যদি মূলত বর্ষাকালের পানিকে শীতকালে পুনর্বিতরণ করা যেত, তাহলে এসব ব্যারাজের কারণে শীতকালে বাংলাদেশের গঙ্গায় ও তিস্তায় পানি থাকে না কেন?

 

 

ডালিয়ায় নির্মিত তিস্তা ব্যারাজের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য আরও বেশি প্রাসঙ্গিক। ব্যারাজের মূল কাজ যদি হয় বর্ষাকালের পানি শীতকালে ব্যবহার করা, তাহলে ডালিয়া থেকে চিলমারী পর্যন্ত তিস্তা নদীতে শীতকালে পানি থাকে না কেন? কেন তিস্তা আজ সংকটে এবং তিস্তার জন্য ‘মহাপরিকল্পনা’র প্রয়োজন হচ্ছে?

 

 


কাপ্তাই বাঁধ ও হ্রদের অভিজ্ঞতা
আসলে এক ঋতু থেকে অন্য ঋতুতে পানি পুনর্বিতরণের জন্য প্রয়োজন হয় বিরাট আয়তনের হ্রদের, যেটা সাধারণত ব্যারাজের পরিবর্তে বাঁধ (ড্যাম) দ্বারা সৃষ্টি করা হয়। বাংলাদেশের কাপ্তাই বাঁধ তার একটি উদাহরণ। এর দ্বারা সৃষ্ট কাপ্তাই হ্রদের আয়তন ৬৮৮ বর্গকিলোমিটার এবং তাতে ৬৪৮ কোটি ঘনমিটার পানি সঞ্চিত হতে পারে, যেটা প্রস্তাবিত পদ্মা ব্যারাজের রিজার্ভারের দ্বিগুণের বেশি (২২৪%)। অন্যদিকে বাংলাদেশে গঙ্গার ১১ হাজার ৫০০ কিউমেকের তুলনায় কর্ণফুলীর গড় বার্ষিক প্রবাহ ১ হাজার ৯০১ কিউমেক, অর্থাৎ গঙ্গার আনুমানিক এক-ষষ্ঠাংশ।

 

 

সুতরাং প্রবাহের অনুপাত হিসেবে সংরক্ষণাগারের ঘনফলের (ভলিউমের) বিচারে প্রস্তাবিত গঙ্গা ব্যারাজের তুলনায় কাপ্তাইয়ের সক্ষমতা ১৩.৬ গুণ বেশি। ফলে কাপ্তাই হ্রদ কিছুটা হলেও বর্ষাকালের পানি ধরে রেখে তা শীতকালে ছাড়তে পারে। তবে দিন দিন সেটাও কঠিন হয়ে পড়েছে। কারণ, পলিপতনের কারণে কাপ্তাই হ্রদের ধারণক্ষমতা ১৯৯০–এর দশক নাগাদই ২৫% হ্রাস পায়।

 

 

গত ৩০ বছরে তা কমপক্ষে আরও ২৫% হ্রাস পেয়েছে বলে অনুমান করা যায়। ফলে এই বাধা থাকা সত্ত্বেও কর্ণফুলীতে শীতকালে প্রবাহ ২০০ কিউমেকের নিচে নেমে যায়। সে কারণে কাপ্তাই বাঁধ দ্বারা উৎপাদিত বিদ্যুতের পরিমাণ মাত্র ৪০ মেগাওয়াটে হ্রাস পায় এবং অনেক সময় পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। বস্তুত ভবিষ্যতে কাপ্তাই বাঁধকে অপসারণ করার প্রয়োজন দেখা দেবে। কারণ, তা না হলে এই বাঁধের ওপর দিয়ে কর্ণফুলী প্রবাহিত হওয়া শুরু করবে এবং তা এক বিপজ্জনক পরিস্থিতি সৃষ্টি করবে। একইভাবে আন্ডারস্লুইস যোগ করা সত্ত্বেও প্রস্তাবিত ব্যারাজের উজানে পলিপতন ঘটবে এবং ব্যারাজের পানি সংরক্ষণের ক্ষমতা ক্রমান্বয়ে হ্রাস পাবে। এ ছাড়া উজানে ফানেলের প্রভাব ঘটবে, পাড়ভাঙন তীব্র হবে, নদী অযাচিতভাবে প্রশস্ত হবে। 

 

ট্যাগ:BCSকলামবাংলাদেশ