যুদ্ধবিরতি ও মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ

যুদ্ধবিরতি ও মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ
কলামআন্তর্জাতিক

যুদ্ধবিরতি ও মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ

১২ জুলাই, ২০২৬

ডেভিড হার্স্ট [সূত্র : কালবেলা, ১১ জুন ২০২৬]

ইরান ও ইসরায়েলের সাম্প্রতিক পাল্টাপাল্টি হামলা মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান শক্তির ভারসাম্য সম্পর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছে। এটি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর দাবিগুলোর চেয়ে অনেক বেশি বাস্তব। তারা বলেছিলেন, ইরানের সামরিক শক্তি কার্যত ধ্বংস হয়ে গেছে।

 

 

বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চলীয় উপশহর দাহিয়েহে ইসরায়েলি হামলার জবাবে ইরান প্রায় ৩০টি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে। এর মাধ্যমে তারা দেখিয়ে দেয় যে, লেবানন ও গাজার যুদ্ধবিরতির ক্ষেত্রে ইসরায়েল যে একতরফা নিয়ম প্রতিষ্ঠা করেছিল, তা আর আগের মতো কার্যকর নয়। ইরান আরও জানিয়ে দেয়, প্রয়োজনে লেবাননকে রক্ষার জন্য উত্তর ইসরায়েলেও হামলা চালানো হবে। ইরানের সামরিক নেতৃত্ব সতর্ক করে বলেছে, ইসরায়েল যদি আবার হামলা শুরু করে, তাহলে আরও কঠোর জবাব দেওয়া হবে। দীর্ঘ সময় পর তেহরান গাজা, লেবানন ও ইরানের বিরুদ্ধে চলমান অভিযানকে একই সংঘাতের অংশ হিসেবে বিবেচনা করছে।

 

 

লেবানন প্রশ্নে নতুন বাস্তবতা

বিশ্লেষকদের মতে, যদি ইরান ও হিজবুল্লাহ লেবাননে ইসরায়েলি বাহিনীকে আংশিকভাবেও পিছু হটতে বাধ্য করতে পারে, তাহলে সেটি লেবাননের জনগণকে ঘরে ফেরানোর ক্ষেত্রে দেশটির নেতৃত্বের চেয়েও বেশি কার্যকর ভূমিকা হিসেবে বিবেচিত হবে। গবেষক আমাল সাদের মতে, লেবাননের প্রতিনিধিরা যে যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছেন, তা রাজনৈতিক আত্মসমর্পণের বিরল উদাহরণ। কারণ চুক্তিতে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের বিষয়টি প্রধান শর্ত ছিল না। প্রধান শর্ত ছিল হিজবুল্লাহর দক্ষিণ লেবানন থেকে সরে যাওয়া।

 

 

ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর ওপর চাপ

নেতানিয়াহু ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী কাটজ দাবি করছেন যে, ইসরায়েল সব ফ্রন্টে সফল হয়েছে। তারা গাজায় সামরিক উপস্থিতি আরও বিস্তৃত করার কথা বলেছেন। একই সঙ্গে লেবাননেও গাজার মতো কৌশল প্রয়োগের ইঙ্গিত দিয়েছেন। ইরানের প্রতিরোধ ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর সম্পর্কেও নতুন চাপ সৃষ্টি করেছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসরায়েল আবার পূর্ণমাত্রার হামলা শুরু করতে প্রস্তুত থাকলেও ট্রাম্প সরাসরি হস্তক্ষেপ করে তা থামিয়েছেন। পরে তিনি প্রকাশ্যে বলেন যে, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত তার হাতেই রয়েছে। যুদ্ধ শুরুর সময় দুই নেতার ধারণা ছিল, ইরান দ্রুত দুর্বল হয়ে পড়বে। কিন্তু বাস্তবে তেহরান ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতা পুনর্গঠন অব্যাহত রেখেছে। ফলে তাদের পরিকল্পনা প্রত্যাশিত ফল দেয়নি।

 

 

ভিন্ন পথে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল

এখন স্পষ্ট হচ্ছে যে, ইরান প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের লক্ষ্য আর পুরোপুরি এক নয়। ট্রাম্প আলোচনার মাধ্যমে সংকটের সমাধান চান এবং হরমুজ প্রণালি ফের চালুর জন্য সমঝোতার পথ খুঁজছেন। কিন্তু নেতানিয়াহু মনে করেন, ইরানকে অক্ষত রেখে কোনো সমঝোতা হলে মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত লক্ষ্য ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সমালোচকদের মতে, গাজা ও দক্ষিণ লেবাননে জনসংখ্যাগত বাস্তবতা বদলে দেওয়ার যে পরিকল্পনার অভিযোগ উঠছে, তা ১৯৪৮ সালের ‘নাকবার’ চেয়েও বড় মানবিক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। কারণ, এতে শুধু বাড়িঘর, হাসপাতাল ও স্কুল নয়, সমাজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার মৌলিক ভিত্তিগুলোও ধ্বংস হয়ে যাবে।

 

 

উচ্ছেদের যুক্তি

অস্ট্রেলিয়ান গবেষক প্যাট্রিক উলফ বসতি-ঔপনিবেশিকতার মানসিকতাকে বলেছেন ‘উচ্ছেদের যুক্তি’। ইতিহাসবিদ ইলান পাপে লিখেছেন, উপনিবেশবাদীরা স্থানীয় জনগণের প্রতি নিজেদের আচরণকে ন্যায্য প্রমাণ করতে তাদের অমানবিক হিসেবে তুলে ধরত। তাদের ‘অসভ্য’ বা ‘আদিম’ বলে বর্ণনা করা হতো। তবে পাপে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্যের কথাও বলেছেন। ভারতের ক্ষেত্রে ব্রিটিশরা নিজেদের আধুনিকতা নিয়ে আসার বাহক হিসেবে দেখত। কিন্তু বসতি-ঔপনিবেশিকরা ভূমিকে আধুনিক করার কথা বলে। তাদের দৃষ্টিতে ভূমির মানুষদের সরিয়ে দেওয়াই প্রধান লক্ষ্য। নেতানিয়াহু ও কাটজ ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে এ দৃষ্টিভঙ্গিই অনুসরণ করছেন। যুদ্ধের সময়ও, শান্তির সময়ও। গাজায় হামাস সব জিম্মিকে ফিরিয়ে দেওয়ার পরও ইসরায়েল প্রায় তিন হাজারবার যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করেছে। এতে ৯০০ জনের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন প্রায় ২ হাজার ৯০০ জন। আরও বহু মানুষকে ইসরায়েলি বাহিনী আটক করেছে।

 

 

যে সীমারেখা পর্যন্ত ইসরায়েলি বাহিনীর সরে যাওয়ার কথা ছিল, সেটিও ধীরে ধীরে এগিয়ে এসেছে। গাজার ৫৩ শতাংশ এলাকা দখল থেকে তা ৬০ শতাংশে পৌঁছেছে। গত মাসে নেতানিয়াহু বলেছেন, এ নিয়ন্ত্রণ ৭০ শতাংশে নেওয়া হবে। এটিকে তিনি পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার শুরুর ধাপ বলেছেন। তিনি বলেন, ‘আমরা হামাসকে ক্রমাগত চাপে রাখছি। এখন আমরা গাজার ৬০ শতাংশ এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছি। আগে ছিল ৫০ শতাংশ। এখন ৬০ শতাংশ। আমার নির্দেশ হলো আরও এগিয়ে যাওয়া।’ একজন উপস্থিত ব্যক্তি তখন চিৎকার করে বলেন, ‘১০০ শতাংশ।’ নেতানিয়াহু জবাবে বলেন, ‘ধাপে ধাপে এগোই। আগে ৭০ শতাংশে যাই। সেখান থেকেই শুরু করি। আমরা সব দিক থেকে চাপ দিচ্ছি। পরে বাকিটাও সামলানো হবে।’ এদিকে যেসব হামাস নেতা জিম্মিদের মুক্তি দেওয়ার চুক্তিতে অংশ নিয়েছিলেন, তাদের অনেককেই ইসরায়েল হত্যা করেছে। গত মাসে হামাসের সর্বশেষ সামরিক কমান্ডার মোহাম্মদ ওদেহও লক্ষ্যভিত্তিক হামলায় নিহত হন।

 

 

নির্বাসনের পরিকল্পনা

ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার গত জানুয়ারিতে যে পরিকল্পনা উপস্থাপন করেছিলেন, তার কোনো বাস্তব অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না। এক লাখ আবাসন ইউনিট, ২০০ শিক্ষা কেন্দ্র, ৭৫টি চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান এবং ১৮০টি সাংস্কৃতিক, ধর্মীয় ও কারিগরি কেন্দ্র নিয়ে নতুন রাফাহ গড়ার যে পরিকল্পনা ছিল, তার কোনো ভিত্তিপ্রস্তরও স্থাপন করা হয়নি। অথচ এলাকা এখন পুরোপুরি ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে। ফিলিস্তিনি প্রযুক্তিনির্ভর সরকারের কোনো প্রতিনিধি এখনো গাজায় প্রবেশ করেননি। সেখানে কোনো আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষী বাহিনীও নেই। পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থও নেই।

 

 

শান্তি বোর্ডের তহবিল কার্যত শূন্য। গাজার জন্য শান্তি বোর্ডের উচ্চ প্রতিনিধি নিকোলাই ম্লাদেনভ এই অচলাবস্থার জন্য হামাসের নিরস্ত্রীকরণে অস্বীকৃতিকেই দায়ী করেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রথমে হামাস নিরস্ত্র হবে। এরপর আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী আসবে। তারপর ইসরায়েল সেনা প্রত্যাহার করবে। কিন্তু বাস্তবে এর কিছুই ঘটছে না। ফিলিস্তিনিরা মনে করেন, নেতানিয়াহু ও কাটজ ভূমধ্যসাগরের তীরে নতুন কোনো আধুনিক নগরী গড়তে চান না। তারা বিশৃঙ্খলা, গৃহযুদ্ধ এবং বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর সংঘর্ষের পরিবেশ তৈরি করতে চাইছেন। কারণ এতে ফিলিস্তিনিদের এলাকা ছাড়তে বাধ্য করা সহজ হবে। তবে হামাস, হিজবুল্লাহ ও ইরানের নিরস্ত্রীকরণে অস্বীকৃতি ইসরায়েলের এ পরিকল্পনার বড় বাধা হয়ে আছে। তাদের অবস্থান গণহারে জাতিগত উচ্ছেদ বাস্তবায়নকে কঠিন করে তুলেছে।

 

 

আঞ্চলিক বাস্তবতা

হিজবুল্লাহ ২০২৪ সালে একাধিকবার নেতৃত্ব হারানোর পরও নিজেদের সামরিক সক্ষমতা পুনর্গঠন করতে পেরেছে। বিশ্লেষকদের মতে, তারা এখন হামলার সংখ্যা বাড়ানোর পরিবর্তে সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাতের কার্যকারিতার ওপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। তারা কিছু বাহিনী রিজার্ভে রাখছে। স্থানীয় ইউনিটগুলোকে কিছু স্বাধীনতাও দিচ্ছে। একই সঙ্গে কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণও বজায় রাখছে। প্রতিদিনের ড্রোন নজরদারি ও হামলার মধ্যেও এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সক্ষমতা। এ পর্যন্ত ইসরায়েল যেসব যুদ্ধবিরতি চুক্তি করেছে এবং প্রতিবেশী দেশগুলো যেগুলোকে সমর্থন করেছে, সেগুলো অনেকের মতে একই লক্ষ্য অর্জনের নতুন পদ্ধতি মাত্র। সেই লক্ষ্য হলো গাজা ও দক্ষিণ লেবাননকে স্থানীয় জনগণশূন্য করা। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো এখনো পুরোপুরি এ বাস্তবতা উপলব্ধি করেনি।

 

 

 

 বিষয়টি শুধু সম্পর্ক স্বাভাবিক করা বা নিরস্ত্রীকরণের নয়। এটি শক্তির ভারসাম্য ও নিরাপত্তার প্রশ্ন। তুরস্ক, মিশর ও জর্ডানের সামনে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি রয়েছে। কারণ নেতানিয়াহু ক্ষমতায় থাকুন বা না থাকুন, কৌশলগত লক্ষ্য অপরিবর্তিত থাকতে পারে। বর্তমান পরিস্থিতিতে ইসরায়েল অন্য দেশের সার্বভৌমত্বকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিচ্ছে না। তাই মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর জন্য একটি সমন্বিত নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা বাড়ছে। ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শেষ হলেও সেটিকে শেষ অধ্যায় হিসেবে দেখা যাবে না। অনেকের মতে, সেটি হওয়া উচিত এমন একটি আঞ্চলিক উদ্যোগের সূচনা, যা ভবিষ্যতে একই ধরনের সংঘাত প্রতিরোধ করতে সক্ষম হবে।

 

 

লেখক: মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আইয়ের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান সম্পাদক। মিডল ইস্ট আইয়ে প্রকাশিত নিবন্ধটি ভাষান্তর করেছেন তহমিনা মিলি

ট্যাগ:BCSকলামআন্তর্জাতিক