ত্রিদেশীয় অর্থনৈতিক করিডর : সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ

ত্রিদেশীয় অর্থনৈতিক করিডর : সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ
কলামআন্তর্জাতিক

ত্রিদেশীয় অর্থনৈতিক করিডর : সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ

৭ আগস্ট, ২০২৬

ড. ফরিদুল আলম [সূত্র : কালের কণ্ঠ; ০৭ আগস্ট ২০২৬]

চীনের পক্ষ থেকে বিসিআইএম (বাংলাদেশ, চীন, ভারত, মিয়ানমার) অর্থনৈতিক করিডর সংক্রান্ত একটি প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়েছিল ২০১৩ সালে। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের ভৌগোলিক নৈকট্য, একাধিক স্থলবন্দরের সুবিধা এবং বঙ্গোপসাগরের সুবিধা কাজে লাগিয়ে চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড (বিআরআই) প্রকল্পের অধীনে এই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি গত এক যুগের বেশি সময়ে।

 

এর মূল কারণ ভারতের আপত্তি। আর এই আপত্তির মূল কারণ সম্ভবত যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজিকে (আইপিএস) পাশ কাটিয়ে চীনের বলয়ে ঢুকে না পড়ার বিষয়টি নিয়ে এক ধরনের সচেতন সিদ্ধান্ত। আইপিএসের মূল উদ্দেশ্যই হচ্ছে এই অঞ্চলে চীনের আধিপত্যকে রুখে দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে ইন্দো-প্যাসিফিক দেশগুলোর সঙ্গে এমন একটি সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করা, যার মধ্য দিয়ে সদস্য দেশগুলোর কাঙ্ক্ষিত অর্থনৈতিক উন্নয়ন সাধন করা যায়। ভারত যেহেতু বরাবরই ঐতিহাসিক এবং ভূ-কৌশলগতভাবে চীনের সঙ্গে বৈরী সম্পর্ক ধরে রেখেছে, বিসিআইএম নিয়ে তাদের সেই অর্থে তৎপরতা তাই দৃশ্যমান নয়।

 

 

যদিও সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বরাজনীতির নতুন মেরুকরণে যুক্তরাষ্ট্র-ভারত সম্পর্কের টানাপড়েন, ব্রিকস এবং সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজাশেনের (এসসিও) মতো ফোরামে ভারতের সক্রিয় অংশগ্রহণ কিছু বার্তা দিচ্ছে। এই সঙ্গে এটাও বলে রাখা ভালো যে এর সবটাই হচ্ছে ট্রাম্প প্রশাসনের কিছু সিদ্ধান্তের কারণে, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে শুল্কনীতি। আগামী মার্কিন প্রশাসনগুলো এই ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ন রাখবে কি না, এর ওপর কার্যত নির্ভর করছে অনেক কিছু।

 

ত্রিদেশীয় অর্থনৈতিক করিডর : সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ

বাংলাদেশে পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দুই বছর পর চীন সফর করলেন একজন নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী।

 

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই সফরটি সাবেক প্রধানমন্ত্রীর (যিনি ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার মাত্র কিছুদিন আগে চীন সফর করেছিলেন) সফরের চেয়ে অনেকাংশেই ভিন্ন আমেজের। এই সফরে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের চলমান দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে একটি অর্থবোধক পর্যায়ে নিয়ে যেতে বাংলাদেশের জন্য সাহায্যনির্ভরতাকে অতিক্রম করে পারস্পরিক স্বার্থের আলোকে কিভাবে আরো উচ্চতর পর্যায়ে প্রতিষ্ঠা করা যায়, তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে দুই পক্ষের মধ্যে। এর অন্যতম বিষয় হচ্ছে বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমার হয়ে চীনের সঙ্গে একটি অর্থনৈতিক করিডর প্রতিষ্ঠা। আক্ষরিক অর্থে এটি একটি চমৎকার পরিকল্পনা, যার অর্থ দাঁড়ায় বাংলাদেশ ও চীন এই উভয় দেশের পণ্য এবং সেবা এক দেশ থেকে অন্য দেশে সহজেই পরিবাহিত হবে মিয়ানমারের ভেতর দিয়ে, যার ফলে সময় এবং পরিবহন ব্যয় উভয়ই কমবে, সেই সঙ্গে বাংলাদেশে চীনের বিনিয়োগের পরিবেশ আরো অনুকূল হবে, কর্মসংস্থান বাড়বে, কাঙ্ক্ষিত অর্থনৈতিক উন্নয়ন সাধিত হবে, সেই সঙ্গে এই পথ ব্যবহার করে বাংলাদেশের সঙ্গে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার তথা আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর বাণিজ্য এবং বিনিয়োগের পরিবেশ আরো উন্মুক্ত হবে।

 

বিশ্বরাজনীতির বড় কথাই হলো সব সহজ বিষয় সব সময় সহজে সাধন করা যায় না।

 

এই যে এখানে ভারতের বিষয়টি উল্লেখ করা হলো, যদিও ভারতের এই প্রকল্পে আপাতত যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না, আবার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের দীর্ঘ মেয়াদের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ চিন্তা করে যদি যুক্ত হয়, তাহলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। ভৌগোলিক সুবিধার বাইরে যে আমাদের অনেক সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। কী সেই সীমাবদ্ধতা? এমন প্রশ্নের উত্তরে একবাক্যে এটুকুই সম্ভবত বলা সংগত হবে যে দিনশেষে কিঞ্চিৎ দূরবর্তী চীনের চেয়ে নিকটতম প্রতিবেশী ভারতের মেজাজ-মর্জি বুঝে চলা আমাদের জন্য অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশের মধ্যকার প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক করিডর ভারতের স্বার্থের জন্য কোনো প্রকার ক্ষতিকারক না হলেও চারদিকে ভারতবেষ্টিত বাংলাদেশকে ব্যবহার করে চীনের অর্থনৈতিক স্বার্থের সন্ধান ভারতের জন্য বড় মাথাব্যথার কারণ। অতীতে তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিয়েও একই বিষয় দেখা গেছে। চীনের দেওয়া প্রস্তাব আগের সরকার গ্রহণ না করে এ ক্ষেত্রে ভারতকে সবুজ সংকেত দিয়েছিল ভারতের মন রক্ষার্থে। এবার অবশ্য পরিস্থিতির কিছুটা পরিবর্তন হওয়ার ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে।

 

 

এই করিডর সরল ভাষায় এর সঙ্গে সম্পৃক্ত পক্ষগুলোর জন্য লাভজনক মনে হলেও বাস্তবে রয়েছে কিছু চ্যালেঞ্জ। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় বাধা হচ্ছে মিয়ানমারের অস্থিতিশীল পরিবেশ। সাম্প্রতিক সময়ে মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি খুব একটা ভালো যাচ্ছে না। বরং বলা যায়, অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে পরিস্থিতি বর্তমানে অনেকটাই খারাপ। এটি বোঝা যায় ২০২৩ সালে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে সর্বসম্মতভাবে মিয়ানমার পরিস্থিতি নিয়ে একটি প্রস্তাব পাস হওয়ার মধ্য দিয়ে। এর আগে বিভিন্ন সময়ে মিয়ানমার পরিস্থিতি নিয়ে এবং দেশটিতে গণতন্ত্র ফেরাতে, শান্তি ও স্থিতিশীলতা আনয়নে এ ধরনের প্রস্তাব উত্থাপিত হলেও চীন ও রাশিয়ার বাধার কারণে সেগুলো আলোর মুখ দেখেনি। এই প্রস্তাবটিতে নিরাপত্তা পরিষদের এই দুই স্থায়ী দেশ ও ভারত ভোটদানে বিরত থাকে এবং বাকি ১২টি দেশ এর পক্ষে ভোট দেয়। ফলে মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির উন্নয়নে এবং সেই সঙ্গে রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানে নিরাপত্তা পরিষদের তরফ থেকে কার্যত এক ধরনের ভূমিকা নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। সমস্যা হলো, তিন বছর সময় অতিক্রান্ত হওয়ার পরও এ ক্ষেত্রে কোনো অগ্রগতি অর্জিত হয়নি।

 

 

২০২১ সালে সামরিক শাসন জারির পর থেকে আজ পর্যন্ত দেশটিতে গণতন্ত্র ফেরাতে রাজপথে আন্দোলন চলছে, যা অতীতের যেকোনো সময়ের যেকোনো গণ-আন্দোলনকে ছাপিয়ে ক্রমাগত দেশের প্রতিটি অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ছে। এসব আন্দোলন যতই বাড়ছে, সামরিক বাহিনীর দমন-পীড়নও সমান হারে বাড়ছে। মিয়ানমারে যেহেতু আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রবেশাধিকার নেই, সেহেতু এ ধরনের আন্দোলনে প্রাণহানির বিষয়ে সঠিক ধারণা লাভ করা কঠিন। তবে অনুমান করা যায় যে এখন পর্যন্ত ২৫ হাজারের বেশি বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উল্লেখ করা সংগত যে দুই পক্ষের মধ্যে আন্দোলন এবং আন্দোলন দমাতে শক্তি প্রয়োগের এই মহড়া দেশটিকে এক কঠিন পরিস্থিতির সামনে দাঁড় করিয়েছে। যদি এই অবস্থার দ্রুত অবসান না হয়, তাহলে মারাত্মক গৃহযুদ্ধ আরো বড় বিপর্যয় ডেকে আনবে বলে ধারণা করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা।

 

 

বর্তমান এই সংঘাতের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে সামরিক অভ্যুত্থানের পরও এই অভ্যুত্থানের বিরোধিতাকারী অনেক বেসামরিক মানুষ সামরিক বাহিনীর গুলিতে নিহত হলেও এখন যারা মারা যাচ্ছে, তাদের প্রায় সবাই সামরিক বাহিনীর সঙ্গে মুখোমুখি সংঘাতে নিহত হচ্ছে। দেশটির প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে প্রতিদিন এভাবে মানুষ জড়ো হচ্ছে সামরিক শাসনের প্রতিবাদে। সরাসরি সরকারি বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াইরত এসব সদস্য পরিচিত পিপলস ডিফেন্স ফোর্স (পিডিএফ) নামে। তারা মূলত বেসামরিক মিলিশিয়া গ্রুপগুলোর মধ্যকার একটি নেটওয়ার্ক। সামরিক বাহিনীর ক্ষমতা গ্রহণে তারা ব্যাপকভাবে অসন্তুষ্ট হয় এবং বিভিন্ন নৃগোষ্ঠী পরিচালিত মিলিশিয়াগুলোর সমর্থন ও প্রশিক্ষণ পেতে শুরু করে সীমান্ত এলাকাগুলোতে। এসব গোষ্ঠী দশকের পর দশক ধরে সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। পিডিএফ গঠিত হয়েছে সমাজের সর্বস্তরের মানুষের সমন্বয়ে, যেখানে আছেন কৃষক, গৃহিণী, চিকিৎসক ও প্রকৌশলী।

 

 

এমন বাস্তবতায় চীনের প্রস্তাবিত করিডরটি সে দেশের কুনমিং থেকে মিয়ানমারের মান্দালয় এবং বাংলাদেশের কক্সবাজার হয়ে চট্টগ্রামকে সংযুক্ত করবে। মিয়ানমার অংশে মান্দালয় থেকে আরেকটি অংশ ইয়াঙ্গুন হয়ে যাবে কিয়াউকপিউ গভীর সমুদ্রবন্দর পর্যন্ত। এখানে সুস্পষ্টভাবেই একদিকে মিয়ানমার হয়ে চীনের, আবার অন্যদিকে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার হয়ে কিয়াউকপিউ গভীর সমুগ্রবন্দরের মাধ্যমে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্যের একটি সহজ রুট উন্মোচিত হবে। সুতরাং মিয়ানমারের গুরুত্ব এখানে অপরিসীম। কথা হচ্ছে, ভৌগোলিকভাবে এতটা গুরুত্বপূর্ণ মিয়ানমারের অব্যাহত সংঘাতই এই সম্ভাবনাময় করিডর বাস্তবায়নের পথে সবচেয়ে বড় অন্তরায়।

 

 

আরেকটি কথা না বললেই নয়। মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিশ্চিতকরণের পাশাপাশি রোহিঙ্গা সংকট নিরসনেও এই অর্থনৈতিক করিডরটি একটি বড় সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে। চীনের সঙ্গে মিয়ানমারের দীর্ঘমেয়াদি দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক রয়েছে। বাংলাদেশ ও চীন যখন এর সুফল পেতে থাকবে, অর্থনৈতিক স্বার্থেই চীন তখন এই সমস্যাকে নিজের বলে মনে করবে।

 

 

লেখক : অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় 

ট্যাগ:BCSকলামআন্তর্জাতিক