
ট্রাম্পের চীন সফরের গুরুত্ব কতটা
ড. বদরুল আলম খান [প্রকাশ : যুগান্তর, ১৬ মে ২০২৬]
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার বহু প্রত্যাশিত চীন সফর সম্পন্ন করেছেন। ২০১৭ সালের পর এই প্রথম কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্ট চীনে শীর্ষ সম্মেলন করে গেলেন। এ সফর হওয়ার কথা ছিল আরও আগে। কিন্তু উপসাগরীয় যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে সেই সফর আমেরিকা স্থগিত রাখে। এ সফর এমন এক সময় হলো, যখন ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে আমেরিকা সুবিধাজনক অবস্থানে নেই। সে কারণে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে ট্রাম্প বৈঠক করেন দুর্বল অবস্থান থেকে।
দুই দিনের সফরে তার সঙ্গে ছিলেন আমেরিকার ব্যবসায়ীদের একটি দল। তাদের মধ্যে ছিলেন টেসলা এবং স্পেস এক্সের প্রধান ইলন মাস্ক, অ্যাপেল কোম্পানির টিম কুক, নিভিডা কোম্পানির জেন্সেন হুয়াং, ব্ল্যাকরকের কেলি ওর্টবার্গ এবং মেটা কোম্পানির ডিনা ম্যাককর্মিক। স্বভাবতই আলোচনার মূল বিষয় ছিল বাণিজ্য এবং ব্যবসায়িক সহযোগিতা। ধরে নেওয়া যায়, হাইটেক এবং আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স সংক্রান্ত আলোচনা ছিল বৈঠকের একটি প্রধান বিষয়। আমেরিকা চীনের সবচেয়ে বড় বাণিজ্য অংশীদার। চীন আমেরিকায় ইলেক্ট্রনিক্স, কম্পিউটার, মোবাইল ফোন, বস্ত্রসহ নানা ভোগ্যপণ্য রপ্তানি করে। অন্যদিকে আমেরিকা থেকে চীন মেশিনারি, রাসায়নিক দ্রব্য, উড়োজাহাজ উপকরণ ইত্যাদি আমদানি করে। কিন্তু চীনের সঙ্গে আমেরিকার বাণিজ্য ঘাটতির পরিমাণ বিপুল। ২০১৮ সালে ওই ঘাটতি ছিল ৩৭৭ বিলিয়ন ডলার। এ বছর চীনের বাণিজ্য উদ্বৃত্ত ১ ট্রিলিয়ন ডলারেরও বেশি।
দ্বিতীয় দফায় প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর ২০১৮ সালে চীনা পণ্যের ওপর ট্রাম্প নানা ধরনের ট্যারিফ আরোপ করেন। এরপর দুদেশের মধ্যে ট্যারিফ যুদ্ধ শুরু হয়। সেই যুদ্ধে চীন আমেরিকায় দুষ্প্রাপ্য খনিজসম্পদ রপ্তানি সীমিত করে এবং আমেরিকা থেকে সয়াবিন কেনা বন্ধ করে দেয়। এরপর দুই দেশ কয়েক দফা আলোচনার মাধ্যমে তাদের বিরোধ নিষ্পত্তি করে। অবশ্য ট্যারিফ নিয়ে ট্রাম্পের মাথাব্যথা কমেনি। ইতোমধ্যে দুই দফায় আমেরিকার হাইকোর্ট ওই ট্যারিফ আইনবিরোধী বলে রায় দিয়েছে। ফলে বাণিজ্য সংক্রান্ত আলোচনায় ট্রাম্প দুর্বল অবস্থানে ছিলেন।
অন্য যেসব বিষয় নিয়ে এ শীর্ষ সম্মেলনে আলোচনা হয়, তার মধ্যে ভূরাজনীতি প্রধান। ইরান যুদ্ধ নিয়ে বেইজিং-ওয়াশিংটন সম্পর্কের অবনতি ঘটে। এর বেশ কয়েকটি কারণ ছিল। চীন ইরানকে সামরিক সাহায্য দিচ্ছে, এ অভিযোগ তুলে আমেরিকা চীনের তেল শোধনাগার এবং উপগ্রহ সংক্রান্ত চীনা কোম্পানির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। ওই নিষেধাজ্ঞাকে চীন আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থি বলে ব্যাখ্যা করে আমেরিকার সমালোচনা করে। চীন ইরানের সার্বভৌমত্ব রক্ষার যুদ্ধে ইরানকে সমর্থন দিয়েছে। রাশিয়া ও চীন এ ব্যাপারে ঐকমত্য পোষণ করে তাদের বিবৃতি দিয়েছে। তাছাড়া চীন চায় আমেরিকা গাল্ফ এলাকা ত্যাগ করুক এবং গাল্ফ দেশগুলো নিজেদের মতো করে একটি নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তুলুক। চীনের মূল লক্ষ্য হচ্ছে, পরাশক্তিদের মধ্যে একটি স্থায়ী, ন্যায়ভিত্তিক ও উত্তেজনাহীন সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করা-যেখানে প্রতিটি দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা পাবে এবং প্রতিটি দেশের অধিকারের প্রতি সম্মান দেখানো হবে, ঠিক যেভাবে ১৬৪৮ সালে ওয়েস্টফালিয়া চুক্তি আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্কের একটি কাঠামো প্রস্তুত করে ইউরোপে ৩০ বছর ধরে চলা যুদ্ধের সমাপ্তি টেনেছিল।
চীন-যুক্তরাষ্ট্র দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল তাইওয়ান। এটি চীনের জন্য অত্যন্ত স্পর্শকাতর একটি ইস্যু। চীন চায় আমেরিকা তাইওয়ানকে তার সামরিক সাহায্য বন্ধ করুক এবং একটি ভারসাম্য নীতির ভিত্তিতে সম্পর্ক উন্নত করার সুযোগ সৃষ্টি হোক। এ ভারসাম্য বিনষ্ট করার বিভিন্ন পদক্ষেপকে কেন্দ্র করে জো বাইডেন প্রেসিডেন্ট থাকাকালে চীনের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি ঘটে। মার্কিন কংগ্রেস তাইওয়ানের স্বাধীনতার পক্ষে। ইতোমধ্যে ট্রাম্পের সঙ্গে শি জিনপিং দুই ঘণ্টাব্যাপী একান্ত আলাপ সম্পন্ন করেছেন। সেখানে শি ট্রাম্পকে সতর্ক করে দিয়েছেন যে, তাইওয়ান সমস্যার দ্রুত সমাধান না হলে দুদেশের মধ্যে সংঘর্ষের আশঙ্কা বাড়বে। অন্যদিকে, এ খবর আসতে শুরু করেছে যে, দুই নেতার মধ্যে তাইওয়ান সংক্রান্ত যে আলাপ হয়েছে, হোয়াইট হাউজ তার ওপর কোনো মন্তব্য করবে না। আমেরিকা বরং হরমুজ প্রণালি প্রশ্নে অনেক বেশি উৎসাহ দেখাচ্ছে।
ট্রাম্প ও শি জিনপিংয়ের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে ইউক্রেন যুদ্ধ একটি অন্যতম প্রধান ভূ-রাজনৈতিক আলোচ্য বিষয় হিসাবে স্থান পায়। প্রায় দুই ঘণ্টার এ বৈঠকে দুই নেতা ইউক্রেন সংকট নিরসনে নিজ নিজ অবস্থান তুলে ধরেন এবং বিশ্ব স্থিতিশীলতা নিয়ে মতবিনিময় করেন।
এক্ষেত্রে ট্রাম্পের একটি প্রিয় বিষয় হলো-চীন, রাশিয়া ও আমেরিকাকে নিয়ে কোনো আঁতাত (Entente) গঠন করা যায় কিনা, তা খতিয়ে দেখা। এ সংক্রান্ত আলোচনা আদৌ সম্ভব কিনা, তা নিয়ে সন্দেহ থাকা স্বাভাবিক। কিন্তু ট্রাম্প যাকে সবচেয়ে বেশি শ্রদ্ধা করেন, তিনি এককালের মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার। কিসিঞ্জার আন্তর্জাতিক সম্পর্কে বিশেষ একটি নীতি মেনে চলতেন। তাকে একবার প্রশ্ন করা হয়েছিল, কোন দেশকে আপনি আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বিরূপ দেশ হিসাবে দেখেন? উত্তরে তিনি বলেছিলেন, যে দেশ আমার মিত্র। সেদিক থেকে যদি ভাবি, তাহলে মস্কো-বেইজিং-ওয়াশিংটন সংযোগকে কল্পনাপ্রসূত ভাবনা বলা যায় না। এক্ষেত্রে লক্ষ্য করার বিষয় হলো, ইউরোপীয় ইউনিয়ন বা ন্যাটো আমেরিকার মিত্র হিসাবে বিবেচিত। কিন্তু ওই দুই জোটকে ট্রাম্প অত্যন্ত অপছন্দ করেন। ফলে রাশিয়া ও চীন আমেরিকার প্রতিদ্বন্দ্বী হলেও তাদের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো করার ক্ষেত্রে ট্রাম্প অনেক বেশি উৎসাহী হবেন।
এদিক থেকে ভাবলে ইউরোপীয় ইউনিয়ন বিপদে আছে বলে মনে করি। রাশিয়ার সঙ্গে ইউক্রেন যুদ্ধ ইস্যুতে দুপক্ষের মধ্যে সম্পর্ক নেই বললেই চলে। এতে করে ইউরোপ অনেক বেশি ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। নর্ড স্ট্রিম-২ ক্ষতিগ্রস্ত করার পর রাশিয়া থেকে সস্তায় গ্যাস জার্মানিতে যায় না। ফলে জার্মানিসহ গোটা ইউরোপে মানুফ্যাকচারিং সেক্টর ধ্বংসের পথে। সেখানে উৎপাদন সীমিত হয়ে এসেছে এবং অন্য দেশের ওপর ইউরোপের নির্ভরতা বৃদ্ধি পেয়েছে। আরও বিপদের দিক হচ্ছে, সেখানে সরকারি উদ্যোগে উৎপাদনের সামরিকায়ন চলছে। অর্থাৎ আগে যেসব শিল্প মোটরগাড়ি নির্মাণ করত, তারা এখন ট্যাংক তৈরি করছে। একে অনেকে ‘মিলিটারি কেন্সিয়ানবাদ’ বলছেন। এতে করে ইউরোপ আরও জটিল পরিস্থিতিতে পড়তে পারে। ফলে ট্রাম্পের মূল ভাবনা সংকটে নিমজ্জিত ইউরোপকে নিয়ে নয়। তিনি বরং আমেরিকার অর্থনীতিকে চাঙ্গা করার ক্ষেত্রে রাশিয়া ও চীনের দিকে ঝুঁকবেন।
তবে ট্রাম্পের সফর নিয়ে খোদ আমেরিকায় বিতর্ক চলছে। ডেমোক্রেটিক পার্টি এ সফরের বিরুদ্ধে ছিল। তাদের মধ্যে এখনো নতুন করে স্নায়ুযুদ্ধ শুরুর মনোভাব দূর হয়নি। তারা মানবাধিকার, ভিন্নমতাবলম্বীদের সাজা দেওয়া, তাইওয়ানের স্বাধীনতা ইত্যাদি প্রশ্ন সামনে এনে ট্রাম্পের সফরকে আক্রমণ করেছে। তারা ট্রাম্পকে চীনের সঙ্গে কোনো ধরনের চুক্তি সই করা থেকে বিরত রাখতে চায়। অন্যদিকে সাধারণ মানুষের মধ্যে চীনভীতি ধীরে ধীরে হ্রাস পাচ্ছে, বিশেষ করে সেসব ক্ষেত্রে, যেখানে মানুষ চীনা পণ্যের ওপর নির্ভরশীল।
সবশেষে বলতে পারি, এ সফর বিশেষ গুরুত্বের। অস্থির আন্তর্জাতিক সম্পর্কে যেভাবে ঘন কালো মেঘ জমতে শুরু করেছে, তাতে করে যে কোনো আলোচনাকে আমি ইতিবাচক বলে মনে করি।
ড. বদরুল আলম খান : অস্ট্রেলিয়াপ্রবাসী আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক



