স্বল্পোন্নত তালিকা থেকে উত্তরণে মূল বাধা দুর্নীতি

স্বল্পোন্নত তালিকা থেকে উত্তরণে মূল বাধা দুর্নীতি
কলামআন্তর্জাতিক

স্বল্পোন্নত তালিকা থেকে উত্তরণে মূল বাধা দুর্নীতি

১২ জুলাই, ২০২৬

মইনুল ইসলাম [সূত্র : সমকাল, ০৯ জুলাই ২০২৬]

বিশ্বব্যাংকের গত সপ্তাহে প্রকাশিত সর্বশেষ আয়ভিত্তিক শ্রেণিবিন্যাসে শ্রীলঙ্কাকে নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশ থেকে উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশের তালিকায় উন্নীত করা হয়েছে। তিন বছর আগের ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকট কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর এই বিষয়কে আখ্যা দেওয়া হয়েছে ‘পুনরুদ্ধারের গল্প’ হিসেবে।

 

 

বাংলাদেশ নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশের তালিকায় উন্নীত হয়েছিল ২০১৫ সালেই। সর্বশেষ তালিকায় উচ্চ-মধ্যম তালিকার দেশগুলোতে বাংলাদেশের নাম নেই। এদিকে, বরং গত মাসে জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি জানিয়েছে, স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের প্রস্তুতিকাল তিন বছর বাড়ানোর অনুরোধ ইতিবাচকভাবে বিবেচনার জন্য সুপারিশ করা হয়েছে। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠেয় জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভায় বিষয়টি মীমাংসিত হবে। স্বীকার্য, স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে বিভিন্ন দেশের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের প্রবেশাধিকারকে প্রতিযোগীদের তুলনায় সুবিধাজনক রাখতে এবং বিবিধ ‘সফ্‌ট লোন’ পেতে সুবিধা হবে। প্রশ্ন হচ্ছে, স্বল্পোন্নত দেশের তালিকায় থাকার সময় দীর্ঘায়িত করার এমন দৃষ্টিভঙ্গি কতটা সংগত?

 
 
 
 
 
 

ওই হতাশাজনক ভবিষ্যদ্বাণীর জন্য ড. কিসিঞ্জারকে দোষ দেওয়া যাবে না। কারণ, স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষের জন্য বছরে দেড় কোটি টন খাদ্যশস্যের প্রয়োজন হতো। এর মাত্র এক কোটি ১০ লাখ টন উৎপাদন করার নিজস্ব সামর্থ্য ছিল। বাকি ৪০ লাখ টন খাদ্যশস্য অনুদান হিসেবে আনতে হতো। কারণ ওই ঘাটতি খাদ্যশস্য পয়সা দিয়ে আমদানি করার সামর্থ্যও তখন ছিল না আমাদের।

 
 
 
 
 

স্বাধীনতা-পরবর্তী কোনো সরকারই বৈদেশিক ঋণ ও অনুদানের ক্ষেত্রে পাওয়া স্বল্পোন্নত দেশের সুযোগ-সুবিধা ছাড়তে চাইছে না। বস্তুত স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে নানা ধরনের বৈদেশিক অনুদান, সফ্‌ট লোন, রপ্তানি পণ্যের শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকারের সুবিধা বিবেচনায় যে কোনো সরকারের কাছেই স্বল্পোন্নত দেশের ক্যাটেগরি থেকে উত্তরণকে তেমন আকর্ষণীয় মনে হয়নি।

 

 

স্বাধীনতার পর থেকেই বৈদেশিক ঋণ ও অনুদানের ওপর যে নির্ভরতা সূচিত হয়েছিল প্রতিটি সরকারের শাসনামলে; সেটি বেড়েছে বৈ কমেনি। বৈদেশিক ঋণনির্ভর প্রকল্প বাস্তবায়নে অপচয় ও দুর্নীতিরও ক্রমোন্নতি হয়েছে। 

 

 

আশির দশকে ‘দ্য ইকোনমিস্ট’ বাংলাদেশকে আখ্যা দিয়েছিল ‘ক্রোনি ক্যাপিটালিজম’ বা চামচা পুঁজিবাদ হিসেবে। ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকার দেশের অর্থনীতির অবস্থা পর্যালোচনার জন্য শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটি গঠন করেছিল। ওই বছর ডিসেম্বরে এক সংবাদ সম্মেলনে কমিটির প্রধান ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেছিলেন, দেশ ‘চামচা পুঁজিবাদ’ থেকে আরও অবনতি হয়ে ‘ক্লেপটোক্রেসি’ বা চৌর্যতন্ত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

 

 

 

১৯৯১ সাল থেকে দেশে নির্বাচনী গণতন্ত্র চালু হওয়ার পর আশা করা হয়েছিল, দুর্নীতি কমে আসবে। কিন্তু জনগণের গ্রহণযোগ্য ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত বিএনপি এবং আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেও দেশ দুর্নীতিতে ‘বিশ্বচ্যাম্পিয়নশিপ’ অর্জন করে ফেলেছিল। বাংলাদেশের উন্নয়নের পথে এখনও সবচেয়ে বড় বাধা দুর্নীতি, পুঁজি লুণ্ঠন ও পুঁজি পাচার।

 

 

এর মধ্যেও মূলত সাধারণ মানুষের জীবনপণ অর্থনৈতিক সংগ্রামের কারণে দেশের অর্থনীতি বড় হচ্ছিল। তারই ফলে ২০১৮ সালে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের শর্ত পূরণ হয়েছিল। দেশের জনগণের মাথাপিছু জিডিপি চলতি বছর জুনেই ৩০২০ ডলারে পৌঁছে গেছে। এই অঙ্ক স্বাধীনতার আগে আমরা যে দেশের অংশ ছিলাম, সেই পাকিস্তানের চাইতে প্রায় ৭০ শতাংশ বেশি। আইএমএফের হিসাব অনুযায়ী এটি ভারতের মাথাপিছু জিডিপির চাইতেও বেশি।

 

 

শুধু তাই নয়; বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণ ও অনুদানও মোট জিডিপির ১ শতাংশের নিচে নেমে গেছে। বাংলাদেশ এখন আর খাদ্য-সাহায্যের জন্য লালায়িত নয়। বরং খাদ্যশস্য, সবজি, মাছ প্রভৃতি ক্ষেত্রে আমরা ইতোমধ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। রপ্তানি আয় এবং প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স দিয়ে সহজেই প্রয়োজনীয় খাদ্য আমদানিসহ যাবতীয় আমদানি-ব্যয় মেটানো যাচ্ছে। যার ফলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ক্রমবর্ধমান।

 

 

অবশ্য গণঅভ্যুত্থানের পরও গত দুই বছরে প্রধান প্রধান কিছু চ্যালেঞ্জ আমরা উতরাতে পারিনি। এর মধ্যে রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক দুর্নীতি এখনও দেশের এক নম্বর সমস্যা রয়ে গেছে। দ্বিতীয়ত, প্রাথমিক জ্বালানি ও ভৌত অবকাঠামোগত সমস্যাগুলো রয়েছে সংকটাপন্ন অবস্থায়। তৃতীয়ত, গণঅভ্যুত্থানের পর এখনও দেশে পূর্ণ স্থিতিশীল রাজনীতি ফিরে আসেনি। চতুর্থত, খেলাপি ঋণ সমস্যা, পুঁজি পাচার এবং আর্থিক কেলেঙ্কারিগুলোকে এখনও শক্ত হাতে দমন করা যায়নি। পঞ্চমত, আয় পুনর্বণ্টন ব্যবস্থাও গড়ে তোলা যায়নি।

 

 

কিন্তু অর্থনীতিতে ইতোমধ্যে যতটুকু অগ্রযাত্রা অর্জিত হয়েছে, সেটিকে টেকসই করে তুলতে হবে। সে ক্ষেত্রে প্রয়োজন নিজের পায়ে দাঁড়ানোর সাহস। উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণ ঘটলে স্বল্পোন্নত দেশের অনেক সুবিধা খর্ব হবে, সন্দেহ নেই। কিন্তু ভিয়েতনামের মতো দেশগুলো প্রমাণ করে চলেছে– যথোপযুক্ত ব্যবস্থা যথাসময়ে গৃহীত হলে দেশের সম্ভাব্য বিরূপ পরিস্থিতি মোকাবিলায় খুব বেশি অসুবিধা হয় না। 

 

 

আমরা দেখেছি, ভিয়েতনাম ১৯৭৫ সালে অসম যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রকে পরাজিত করে উন্নয়নের অগ্রযাত্রা শুরু করেছিল। তখন ভিয়েতনামের জনগণের মাথাপিছু জিডিপি বাংলাদেশের চাইতেও কম ছিল। এতৎসত্ত্বেও ভিয়েতনাম স্বল্পোন্নত দেশের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ার জন্য আবেদন করেনি। ১৯৮৬ সালে ‘দোই মোই’ সংস্কার কার্যক্রম গ্রহণের পথ ধরে ভিয়েতনাম দ্রুত অর্থনৈতিক উন্নয়ন অর্জনে সফল হয়ে চলেছে। এখন ভিয়েতনামের জনগণের মাথাপিছু জিডিপি আইএমএফের হিসাব অনুযায়ী পাঁচ হাজার ডলার ছাড়িয়ে গেছে। তাদের বার্ষিক রপ্তানি আয় ৪০০ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করেছে। বিভিন্ন দেশে তাদের পণ্য রপ্তানি নির্বিঘ্ন করার জন্য তারা একের পর এক ফ্রি-ট্রেড এগ্রিমেন্ট স্বাক্ষর করে চলেছে। আমরা কি ভিয়েতনাম থেকে শিক্ষা নিতে পারি না?

 

 

তার বদলে আমরা কেন বারবার স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণকে পিছিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে চলেছি? দুর্নীতি বন্ধ করতে পারলে নিজের পায়ে দাঁড়ানো কঠিন হতে পারে না। 

 

 

ড. মইনুল ইসলাম: একুশে 
পদকপ্রাপ্ত অর্থনীতিবিদ; সাবেক সভাপতি,
বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি

ট্যাগ:BCSকলামআন্তর্জাতিক