
সার্ক কি আদৌ কার্যকর হবে?
এম এ আজিজ [প্রকাশ : কালবেলা, ২৫ জুন ২০২৬]
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ পৃথিবীর প্রথাগত সামরিক শক্তির ধারণা বদলে দিয়েছে এবং বিভিন্ন দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতার হিসাবও পাল্টে গেছে। প্রশ্ন উঠেছে বিশ্বের আঞ্চলিক জোটগুলো কার্যকারিতা, সামরিক শক্তি এবং অর্থনৈতিক বিষয়গুলো নিয়ে। বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতির বাস্তবতায় সার্কসহ আঞ্চলিক জোটগুলো কি আদৌ কার্যকর করা সম্ভব?
বাংলাদেশের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য একটি আঞ্চলিক জোট গঠনের উদ্যোগ নিয়ে কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে ১৯৮৫ সালের ৮ ডিসেম্বর দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা-সার্ক (South Asian Association for Regional Cooperation-SAARC) গঠনে সফল হন।
মূলত ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার রাজনৈতিক বৈরিতা, সীমান্ত বিরোধ এবং গভীর অনাস্থার কারণে সার্ক গত দুই দশকের বেশি সময় ধরে অকার্যকর হয়ে আছে। সার্ক সনদের ১০ নম্বর ধারা বলছে, ‘সদস্য দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ বা দ্বিপক্ষীয় বিরোধগুলো সার্কের মঞ্চে আলোচনা করা যাবে না।’ ফলে ভারত-পাকিস্তানের রাজনৈতিক সংকট আঞ্চলিক পর্যায়ে সমাধানের সুযোগ নেই। যদি না এই দুই দেশ নিজেরা নিজেদের সমস্যাগুলো সমাধান না করে অথবা সমস্যাগুলোর ঊর্ধ্বে উঠে আঞ্চলিক সহযোগিতা ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য সার্ককে সক্রিয় না করে। সার্কের স্থবিরতার কারণে সদস্য দেশগুলো এখন বিমসটেক (BIMSTEC) বা বিবিআইএন (BBIN)-এর মতো উপআঞ্চলিক ও বিকল্প ফোরামে বেশি মনোযোগ দিচ্ছে।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার চলমান উত্তেজনা এবং সম্ভাব্য যুদ্ধ পরিস্থিতি এড়াতে পাকিস্তান ও কাতারের মধ্যস্থতায় আয়োজিত সুইজারল্যান্ডে যে উচ্চ পর্যায়ের শান্তি আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়, সেখানে চরম উত্তেজনার মধ্যেও দুপক্ষ ৬০ দিনের মধ্যে একটি চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানোর রোডম্যাপে সম্মত হয়েছে। উভয়পক্ষ একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষর করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ইরানি বন্দরগুলোয় নৌ-অবরোধ তুলে নেওয়া এবং তেল বিক্রির ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের আশ্বাসের বিনিময়ে ইরান হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে সম্মত হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে অন্তর্বর্তীকালীন ১৪ দফা সমঝোতা স্মারকের খুঁটিনাটি বিষয়ে আলোচনান্তে সমঝোতা হতে পারে এ সম্ভাবনা থেকে, চীন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর জোটে (আসিয়ান) নিজেদের প্রভাব বাড়াতে বহুমুখী সহযোগিতা নিয়ে এগিয়ে আসছে। আসিয়ান দেশগুলোর জ্বালানি সংকট ও অর্থনৈতিক ক্ষতি সামাল দিতে কৌশলগতভাবে চীনকে একটি নির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসেবে পেতে চেষ্টা করছে।
এদিকে পাকিস্তান গত দুই বছর ধরে সার্ক পুনরুজ্জীবনের জন্য বাংলাদেশের ভূমিকা আশা করে। ভারত যেহেতু এ মুহূর্তে সার্ক সচল চায় না, তাই বাংলাদেশ সার্ক পুনরুজ্জীবনের উদ্যোগ নিয়ে সফল হওয়ার সম্ভাবনা নেই। এমনিতেই অন্তর্বর্তী সরকারের সময় থেকেই ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশে সম্পর্কে টানাপোড়েন চলছে। বাংলাদেশ এ সময়ে এ উদ্যোগ নিলে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের আরও অবনতি হতে পারে। দক্ষিণ এশিয়ার এ বাস্তবতায় এ মুহূর্তে সার্ক পুনরুজ্জীবনের কোনো সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। তা ছাড়া ইরান যুদ্ধের মধ্য দিয়ে কোনো জোটই আসলে কার্যকর হতে পারবে কি না, সে প্রশ্নও সামনে এসেছে।
৫০ বছর আগের চিন্তায় তৈরি হওয়া দক্ষিণ এশিয়ার সার্ক প্রথমে সাত দেশ, পরে আফগানিস্তানকে নিয়ে আট দেশের এই সার্ক জোটের গুরুত্ব বা প্রয়োজনীয়তা আদৌ আছে কি? প্রথমত, এ জোটের আটটি দেশের একে অপরের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক নেই। তাই এ দেশগুলো নিয়ে একটি জোট কীভাবে কার্যকর হবে? তা ছাড়া এ আটটি দেশের ছয়টি দেশে বিভিন্ন নামে ধর্মাশ্রয়ী রাজনীতি মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। যে দেশে ধর্মাশ্রয়ী রাজনীতি সামনে চলে আসে, সেই দেশের উদারপন্থি মধ্যবিত্ত শ্রেণির জনগণ বিপন্ন থাকে। যেহেতু আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ধারণার মূল ভিত্তিই উদারপন্থি মধ্যবিত্ত শক্তি, তাই এ জোটের বেশিরভাগ রাষ্ট্রই এখন নিজ দেশের জনগণকে নিয়ে সুসংগঠিত নয়। বরং অনেকেই বিভক্ত জনগোষ্ঠীর সমস্যায় ভুগছে।
অন্যদিকে, ইরান যুদ্ধে যে প্রযুক্তি ব্যবহার হচ্ছিল, সেখানে নিরাপত্তার বিষয়টি বেশ জটিল; বড় কোনো দেশের সামরিক ঘাঁটি আর নিরাপত্তা দিতে পারছে না বরং ওই গালফ স্টেটগুলোর মতো বিপদ ডেকে আনতে পারে। এমনকি প্রথাগত প্রতিরক্ষায় বা আক্রমণে সুবিধার জন্য বাফার স্টেট তৈরির যে সুবিধা পাওয়া যেত, তা দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন ব্যবহারের মাধ্যমে এ বাফার জোনের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তাও ফুরিয়ে গেছে। তাই দুই মাসেরও কম সময়ের ইরান যুদ্ধে প্রমাণ হয়েছে, পৃথিবীতে সামগ্রিক অর্থনৈতিক সংকটে নিজেকে সামাল দেওয়ার মতো দেশ খুবই কম।
চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ক্রমবর্ধমান ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার মাঝে, আসিয়ান দেশগুলো কোনো পক্ষ না নিয়ে বরং চীনের সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে বাণিজ্য ও নিরাপত্তার ভারসাম্য বজায় রাখার নীতি গ্রহণ করছে। চীন ও আসিয়ানের মধ্যকার মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (FTA) এবং অবকাঠামোগত বিনিয়োগের ফলে আসিয়ান দেশগুলো যুদ্ধের অর্থনৈতিক ধাক্কা সামলাতে চীনের বর্তমান অর্থনীতির ওপর উল্লেখযোগ্যভাবে নির্ভর করতে পারে। তবে চীন আসিয়ানকে পুরোপুরি এককভাবে সহযোগিতা করার পরিবর্তে নিজস্ব কৌশলগত স্বার্থ রক্ষায় বেশি মনোযোগী। ফলে আসিয়ানের জন্য চীনের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল না হয়ে, বহুপক্ষীয় সম্পর্কের মাধ্যমে কৌশলগত ভারসাম্য বজায় রাখাই প্রধান হাতিয়ার হিসেবে কাজ করছে।
অন্যদিকে, আমেরিকা ইরান আক্রমণ করার এক বছর আগে ইরান ব্রিকসের সদস্য হয়েছে। অথচ ইরান যুদ্ধে ব্রিকসের কোনো ভূমিকা নেই। ভূমিকা রাখার সুযোগও নেই। একই অবস্থা ন্যাটোর। এ জোটের সদস্যরা ইউক্রেন যুদ্ধেও যেমন এক হয়ে কোনো ভূমিকা রাখতে পারেনি, তেমনি ইরান যুদ্ধেও কোনো ভূমিকা রাখতে পারছে না। ভূমিকা রাখার সমর্থ যেমন নেই, তেমনি বাস্তবতাও নেই। কোনো জোট তৈরি না করেও অনেকগুলো গালফ স্টেট আমেরিকার সামরিক ছায়ায় এতদিন নিজেদের নিরাপদ মনে করেছিল।
এ ছাড়া জোটের দুই পারমাণবিক শক্তির দেশ ভারত ও পাকিস্তানের সম্পর্ক নিকট ভবিষ্যতেও ভালো হওয়ার সম্ভাবনা কম। পাকিস্তানের পারমাণবিক শক্তিকে ভারত শুধু নয়, পৃথিবীর অনেক দেশই মনে করে বিপজ্জনক। কারণ যে রাষ্ট্রের রাজনৈতিক শক্তি ও সিভিল প্রশাসন দুর্বল এবং রাষ্ট্র নিজেই আন্তর্জাতিক জঙ্গিবাদকে প্রশ্রয় দেয়, সেই রাষ্ট্রের হাতে পারমাণবিক শক্তি পৃথিবীর যে কোনো দেশের জন্য হুমকি।
আবার ভারতে ‘পেহেলগাম’ জঙ্গি হামলা ও তার প্রতিবাদে ভারতের অপারেশন সিঁদুরের ভেতর দিয়ে প্রমাণিত হয়েছে যে, ন্যাটো এবং ওয়ারশ ক্লাবের বাইরে যে আধুনিক সমরাস্ত্র তৈরি হয়েছে, পাকিস্তানের হাতে সে সমরাস্ত্রও আছে। তাই ওই অপারেশনের পরের বাস্তবতা হলো, কেউ প্রকাশ করুক আর না করুক, দুই দেশের নিজস্ব অস্ত্র সম্ভার গোপনে হলেও আধুনিকায়ন ও আকার বৃদ্ধির একটি প্রতিযোগিতা চলবে। দেশ দুটি যখন এ ধরনের একটি প্রতিযোগিতায়, তখন বন্ধুত্বের বিষয়টি চিন্তা করার খুব কোনো যৌক্তিকতা নেই।
অন্যদিকে, পাকিস্তানের খনিজ, সমুদ্র ও বন্দর সম্পদ এখন দুটি বড় শক্তির পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণের দিকে ক্রমেই এগিয়ে চলছে। যখন কোনো দেশ এমন একটি অধ্যায়ে ঢুকে যায়, তখন ওই দেশ পরিবর্তনকালীন সময়ে গেছে ধরে নিতে হয়। যেমন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী যখন সেন্টো প্যাক্টে যোগদান করেন, সে সময় মওলানা ভাসানী বিরোধিতা করেছিলেন। কারণ, অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ হিসেবে তিনি বুঝেছিলেন, এই প্যাক্টে ঢুকে যাওয়ার অর্থই হলো পাকিস্তান বড় শক্তির খেলনা হতে যাচ্ছে।
ইতিহাসের দিকে লক্ষ করলে দেখা যায়, শেখ মুজিবুর রহমান ওই সময় থেকে পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসনের দাবি তোলেন। মওলানা ভাসানী আইয়ুব খানকে কোনো সহযোগিতা না করার নীতি নিয়ে ১৯৬৯ সালে তিনি স্পষ্ট বোঝেন একক পাকিস্তানের দিন ফুরিয়ে গেছে। তাই তিনি শেখ মুজিবকে সহযোগিতা করেছিলেন। আবার ১৯৫৫ সালে সেন্টো প্যাক্টে যোগ দেওয়ার পর মনে হয়েছিল পাকিস্তান অনেক বেশি বিশ্বমঞ্চে এগিয়ে গেছে। কিন্তু ১৯৫৫ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত মাত্র ১৬ বছরের মধ্যে পাকিস্তানের বড় পরিবর্তন হয়ে যায়। তবে ঘটনাপ্রবাহ পাকিস্তানকে খনিজ সম্পদ হারানোর দিকে এবং ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ স্মুথ হওয়ার দিকেই নিয়ে যায়। তাই এ সময়ে ভারতের সঙ্গে পাকিস্তানের বন্ধুত্ব হবে না। তাই ভারত-পাকিস্তান সম্পর্ক উন্নয়ন ছাড়া সার্কের কার্যকারিতা চিন্তা করা অসম্ভব।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের ভবিষ্যৎ নিয়ে দেওয়া সাক্ষাৎকারে লি কুয়ান অনেক স্পষ্ট করেই এটা বলেছিলেন, আসিয়ান গঠিত হয়েছে প্রস্তুতি ছাড়া। তাই ওই অর্থে আসিয়ানভুক্ত দেশগুলো জোটের মাধ্যমে লাভবান হবে না। তেমনি ইউরোপীয় ইউনিয়ন গঠিত হয়েছে প্রস্তুতি ছাড়া। তারা যা চাচ্ছে, সেই ঐক্য তাদের মধ্যে নেই। তাই তারা ব্যর্থ হবে একপর্যায়ে। লি কুয়ান যে সঠিক ছিলেন, তার প্রমাণ অনেকটাই এখন পাওয়া যাচ্ছে। আবার ইরান যুদ্ধের আগেই ইউরোপীয় ইউনিয়ন ভেঙে ব্রিটেন বেরিয়ে গেছে। ইরান যুদ্ধে আসিয়ানেরও অর্থনীতি, রাজনীতি, নিরাপত্তাসহ সব কিছুর জন্য বাড়তি কিছু সত্য বের হয়ে এসেছে। এমনকি অনেক গুরুত্বহীন হয়ে পড়েছে কোয়াড ও ব্রিকস। এগুলোকে অস্বীকার করলে ভবিষ্যৎ সিদ্ধান্ত সঠিক নাও হতে পারে।
তাই এমন একটি ভবিষ্যতের আশঙ্কা ও বর্তমানের এ নতুন বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে পৃথিবীতে মত ও পথের ভিন্নতায় ভরা দেশগুলো যতই এক এলাকার হোক, তাদের নিয়ে পুরোনো চিন্তার আঞ্চলিক জোটগুলো কি আদৌ কার্যকর করা সম্ভব?



