পরিবেশ সংকটজনিত দুর্যোগ ও করণীয়

পরিবেশ সংকটজনিত দুর্যোগ ও করণীয়
কলামআন্তর্জাতিক

পরিবেশ সংকটজনিত দুর্যোগ ও করণীয়

৯ আগস্ট, ২০২৬

বিধান চন্দ্র দাস [প্রকাশ : কালের কণ্ঠ, ০৯ আগস্ট ২০২৬]

বর্তমানে পরিবেশ সংকটজনিত দুর্যোগ অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে। ইউরোপের স্পেন, ফ্রান্স, ইতালি, পর্তুগাল, গ্রিসসহ বিভিন্ন দেশে নজিরবিহীন দাবানলে লাখ লাখ হেক্টর বনভূমি পুড়ে যাওয়া, মানুষের মৃত্যু এবং বিপুলসংখ্যক মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার ঘটনায় বহু মানুষ উদ্বিগ্ন ও আতঙ্কিত।

 


এই লেখাটি তৈরির তারিখে (২৮ জুলাই ২০২৬) স্পেন ও ফ্রান্সের একাধিক এলাকায় দাউদাউ করে জ্বলছে দাবানল। কানাডায় শত শত দাবানল এ বছর অনেক দিন ধরে জ্বলেছে এবং এর ধোঁয়া সীমান্ত অতিক্রম করে যুক্তরাষ্ট্রের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের বায়ুমানকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। উত্তর গোলার্ধের অনেক দেশে তীব্র তাপপ্রবাহের তাপমাত্রা ৪০ থেকে ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস অতিক্রম করে জনস্বাস্থ্য, বিদ্যুৎ সরবরাহ ও পানির চাহিদার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে। পৃথিবীর অনেক জায়গায় দীর্ঘস্থায়ী খরার কারণে বহু এলাকায় নদী কিংবা জলাশয়ের পানি কমে যায়, কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হয় এবং বনভূমি দাবানলের জন্য আরো ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে।

 

 
‘ইমার্জেন্সি ইভেন্টস ডেটা বেইস’-এর ২০২৬ সালের (২৮ জুলাই পর্যন্ত) তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী বন্যা ও বৃষ্টিজনিত ভূমিধসকেন্দ্রিক ৩৬টি দুর্যোগ সংঘটিত হয়েছে। মৃত্যু হয়েছে অনেক মানুষের। এ ছাড়া এই ডেটা বেইসে তীব্র আবহাওয়াজনিত ঝড়, উষ্ণমণ্ডলীয় ঘূর্ণিঝড়, তুষারঝড়, বজ্রঝড় ও টর্নেডো—সব মিলিয়ে মোট ৫৮টি বড় ধরনের ঝড়ের পরিসংখ্যানও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। রিলিফওয়েব এবং জাতিসংঘের মানবিক বিষয়ক সমন্বয় কার্যালয়ের প্রতিবেদনে আফগানিস্তান, বাংলাদেশ, ভারতসহ এশিয়া, আফ্রিকা ও আমেরিকার বহু দেশে সংঘটিত বন্যা ও ভূমিধসের কারণে মানবিক সংকটের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।

 

 

চলতি বছরে একাধিক মহাদেশে সংঘটিত হয়েছে বন্যা, ভূমিধস ও ঝড়। এসবের ব্যাপকতা এবং মানবিক প্রভাব সাম্প্রতিক দশকগুলোতে ক্রমবর্ধমান চরম বৃষ্টিপাত ও জলবায়ুজনিত দুর্যোগের দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ‘আন্তঃসরকার জলবায়ু পরিবর্তন প্যানেল’-এর ষষ্ঠ মূল্যায়ন প্রতিবেদন এবং বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার মূল্যায়নে বলা হয়েছে যে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফলে বিশ্বের বহু অঞ্চলে তীব্র দুর্যোগের ঘটনা ঘন ঘনই ঘটছে।

 


পরিবেশ সংকটজনিত দুর্যোগ ও করণীয়তাপপ্রবাহ, খরা, দাবানল, ঝড়, বন্যা ও বৃষ্টিজনিত ভূমিধসের ঘটনাবলি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে বৈশ্বিক পরিবেশ সংকট ক্রমেই আরো গভীর ও জটিল রূপ ধারণ করছে। ‘স্টেট অব দ্য গেস্নাবাল ক্লাইমেট (এসওটিজিসি)’ ২০২৫ (প্রকাশিত ২০২৬) এবং ‘ওয়ার্ল্ড ওয়েদার অ্যাট্রিবিউশন’ (২০২৫/২০২৬)-এর সাম্প্রতিক মূল্যায়ন অনুযায়ী, মানবসৃষ্ট বৈশ্বিক উষ্ণায়ন উপরোক্ত দুর্যোগগুলোর ঘনত্ব, তীব্রতা এবং অনেক ক্ষেত্রে সংঘটনের আশঙ্কা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করছে।

 

 

এসওটিজিসি উল্লেখ করেছে, ২০২৫ সালে পৃথিবীর বার্ষিক গড় পৃষ্ঠতলের তাপমাত্রা প্রাক-শিল্পযুগের (ভিত্তিকাল ১৮৫০-১৯০০) গড়ের তুলনায় প্রায় ১.৪৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল এবং ২০২৩-২০২৫ সময়কালের সমন্বিত গড় উষ্ণতা প্রায় ১.৪৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছেছিল। বিশেষজ্ঞরা উপরোক্ত দুর্যোগসংক্রান্ত পরিসংখ্যানগুলোকে মানবসৃষ্ট বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ধারাবাহিক তীব্রতার প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করছেন।

 


প্রায় তিন দশক ধরে বিশেষজ্ঞ ও নীতিনির্ধারকরা বৈশ্বিক উষ্ণায়নজনিত দুর্যোগ মোকাবেলায় জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার দ্রুত হ্রাস, গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন কমানো, জলবায়ুসহনশীল কৃষি গড়ে তোলা, বন ও প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্র সংরক্ষণ ও পুনরুদ্ধার, জলসম্পদ ব্যবস্থাপনা শক্তিশালীকরণ, জলবায়ুসহিষ্ণু নগর উন্নয়ন, কার্যকর আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা, দুর্যোগসহনশীল অবকাঠামো নির্মাণ এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও অর্থায়ন বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করে আসছেন।

 

তবে বর্তমানে কয়েকটি বিষয়ে নতুন করে বিশেষভাবে জোর দেওয়ার কথা বলা হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে—পজিটিভ টিপিং পয়েন্ট (নবায়নযোগ্য শক্তি, বৈদ্যুতিক যানবাহন বা পরিচ্ছন্ন প্রযুক্তির ব্যবহার এমন পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়া, যেখানে এগুলোর বিস্তার স্বয়ংক্রিয়ভাবে দ্রুত বৃদ্ধি পায়), রূপান্তরমূলক অভিযোজন (শুধু বাঁধ বা প্রতিরক্ষা অবকাঠামো নির্মাণ নয়, প্রয়োজনে নগর, উপকূলীয় বসতি ও কৃষি ব্যবস্থার মৌলিক পুনর্বিন্যাস), চরম তাপপ্রবাহকে একটি স্বতন্ত্র জনস্বাস্থ্য সংকট হিসেবে বিবেচনায় নেওয়া (তাপপ্রবাহ মোকাবেলায় স্বাস্থ্যব্যবস্থা, কর্মপরিবেশ ও নগর পরিকল্পনা নতুনভাবে সাজানো), দুর্যোগ-পরবর্তী প্রতিক্রিয়ার পরিবর্তে আগাম প্রস্তুতিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার, এল নিনো ও মানবসৃষ্ট উষ্ণায়নের যুগপৎ প্রভাবের জন্য পূর্বপ্রস্তুতি এবং জলবায়ুব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ টিপিং পয়েন্ট (জলবায়ুব্যবস্থার এমন একটি সীমা, যা অতিক্রম করলে দ্রুত ও অনেক ক্ষেত্রে অপরিবর্তনীয় পরিবর্তন শুরু হয়) অতিক্রম না করার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ।

 

 

২০২৬ সালের জুলাই মাসের শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত প্রাপ্ত সরকারি তথ্য অনুযায়ী, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নে সম্মিলিতভাবে প্রায় ৫০ লাখ হেক্টর বৃক্ষাচ্ছাদিত ভূমি দাবানলে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে অন্যান্য দেশও (রাশিয়া, চিলি, আর্জেন্টিনা, অস্ট্রেলিয়া, তুরস্ক ইত্যাদি) দাবানলের দ্বারা আক্রান্ত হয়েছে, যদিও এসব দাবানলে ক্ষতির পরিমাণ সম্পর্কে এখনো কোনো পরিসংখ্যান তৈরি করা হয়নি। ‘গ্লোবাল ফরেস্ট ওয়াচ’-এর দেওয়া তথ্যানুযায়ী, ২০২৫ ও ২০২৪ সালে বিশ্বের যথাক্রমে (প্রায়) ২.৮৬ কোটি ও তিন কোটি হেক্টর বৃক্ষাচ্ছাদিত ভূমি দাবানলের শিকার হয়েছে।

 

 

দাবানল সম্পূর্ণরূপে প্রতিরোধ করা সম্ভব না হলেও এর ঝুঁকি ও ক্ষয়ক্ষতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। উপগ্রহভিত্তিক আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা, জ্বালানি (শুকনা পাতা, ঝোপঝাড় ও মৃত গাছ) ব্যবস্থাপনা, বিশেষজ্ঞদের তত্ত্বাবধানে নিয়ন্ত্রিত অগ্নিসংযোগ, ফায়ারব্রেক নির্মাণ, দ্রুত অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা, মানবসৃষ্ট অগ্নিকাণ্ড প্রতিরোধ এবং প্রাকৃতিক বহুবৈচিত্র্যময় বন সংরক্ষণ কার্যক্রম সমন্বিতভাবে বাস্তবায়নের মাধ্যমে দাবানলের ঝুঁকি ও ক্ষয়ক্ষতি হ্রাস করা যেতে পারে। বিজ্ঞানীদের মতে, এ ধরনের সমন্বিত বন ব্যবস্থাপনা বর্তমান সময়ে বৃহৎ ও বিধ্বংসী দাবানল নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে কার্যকর উপায়।

 

 

দাবানল বা অন্য কারণে ধ্বংস হওয়া বনভূমি শুধু বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে সম্পূর্ণরূপে প্রতিস্থাপন করা চ্যালেঞ্জিং। কারণ একটি পরিণত প্রাকৃতিক বন ধ্বংস হলে শুধু গাছ নয়, সেখানকার মাটি, অণুজীব, অন্যান্য বন্য প্রাণ এবং জটিল বাস্তুতান্ত্রিক সম্পর্কও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। নতুন করে বৃক্ষরোপণ বন পুনরুদ্ধারের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায় হলেও অনেক ক্ষেত্রেই সেখানে দ্রুতবর্ধনশীল এক বা কয়েকটি প্রজাতির গাছ নিয়ে মনোকালচার (একক প্রজাতিনির্ভর বনায়ন) গড়ে তোলা হয়, যা প্রাকৃতিক বহুবৈচিত্র্যময় বনের বিকল্প হতে পারে না। ফলে গাছের সংখ্যা বৃদ্ধি পেলেও জীববৈচিত্র্য, কার্বন সঞ্চয়ক্ষমতা, মাটির স্বাস্থ্য এবং বাস্তুতন্ত্রের কার্যকারিতা আগের অবস্থায় ফিরে আসে না। একটি শতবর্ষী প্রাকৃতিক বনের পরিবেশগত বৈশিষ্ট্য পুনরুদ্ধারে কয়েক দশক থেকে কয়েক শতাব্দী সময় লাগতে পারে; অনেক ক্ষেত্রে তা আর সম্পূর্ণভাবে পুনরুদ্ধার করাও সম্ভব হয় না। তবু ধ্বংসপ্রাপ্ত বনভূমির ক্ষতি যতটা সম্ভব পুষিয়ে নেওয়ার জন্য সেখানকার বাস্তুতত্ত্বের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বহুবৈচিত্র্যময় বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে কৃত্রিম বনভূমি সৃষ্টি করা প্রয়োজন।  

 

 

বনভূমির মতো জলাভূমি ধ্বংস হয়ে গেলেও তা প্রতিস্থাপন করা কঠিন। আসলে পরিবেশ সংকট মোকাবেলার প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত প্রকৃতির জড় ও জীবজ উপাদানগুলো অর্থাৎ বাস্তুতন্ত্র সংরক্ষণ করা। যে কারণগুলোর জন্য বাস্তুতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়, সেগুলো হচ্ছে—ভূমি ও জলাশয়ের ব্যবহার পরিবর্তন, জীব ও প্রাকৃতিক সম্পদের অতিরিক্ত আহরণ, দূষণ, অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও অবকাঠামো নির্মাণ, নিবিড় ও একফসলি কৃষি, অতিরিক্ত সার ও কীটনাশক ব্যবহার, আবাসস্থল খণ্ডিতকরণ ইত্যাদি। এগুলো যতটা সম্ভব নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন। 

 

 

বাংলাদেশে সাম্প্রতিক বন্যা, অতিবৃষ্টি ও বৃষ্টিজনিত ভূমিধসের পেছনে বৈশ্বিক উষ্ণায়নজনিত জলবায়ু পরিবর্তন একটি গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করলেও দুর্যোগের তীব্রতা, স্থায়িত্ব ও ক্ষয়ক্ষতি বৃদ্ধির জন্য দেশের স্থানীয় মানবসৃষ্ট কর্মকাণ্ড; যেমন—বন উজাড়, পাহাড় কাটা, জলাভূমি ভরাট, প্রাকৃতিক নিষ্কাশন ব্যবস্থা নষ্ট করা, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং উন্নয়ন কার্যক্রমও দায়ী বলে গবেষণায় উঠে এসেছে। কাজেই এগুলো বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। এ ছাড়া ‘সেন্দাই ফ্রেমওয়ার্ক ফর ডিজাস্টার রিস্ক রিডাকশন ২০১৫-২০৩০’-এর মূল চারটি সূত্র—১. দুর্যোগের ঝুঁকি সম্পর্কে ভালোভাবে বোঝা; ২. দুর্যোগ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করা; ৩. দুর্যোগঝুঁকি কমাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা; ৪. কার্যকর প্রস্তুতি, দ্রুত সাড়া এবং পুনর্গঠনকালে আরো সহনশীল অবকাঠামো ও সমাজ গড়ে তোলাকেও যথাযথভাবে গুরুত্ব দেওয়া দরকার। তবে এসবের জন্য নিবিড় গবেষণার কোনো বিকল্প নেই।

 

 

লেখক : অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়  

ট্যাগ:BCSকলামআন্তর্জাতিক