অভিবাসন ক্রমেই ঝুঁকিপূর্ণ হচ্ছে

অভিবাসন ক্রমেই ঝুঁকিপূর্ণ হচ্ছে
কলামআন্তর্জাতিক

অভিবাসন ক্রমেই ঝুঁকিপূর্ণ হচ্ছে

১২ জুলাই, ২০২৬

ওসমান বেলবেইসি [প্রকাশ : কালবেলা, ১০ মে ২০২৬]

বিদেশের দেশের সরকারের প্রতিনিধিরা যখন নিউইয়র্কে দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক অভিবাসন পর্যালোচনা ফোরামে একত্রিত হচ্ছেন, তখন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে—বৈশ্বিক অভিবাসন চুক্তি কি সত্যিই অভিবাসীদের পরিস্থিতির উন্নতি করছে? ২০১৮ সালে গৃহীত নিরাপদ, সুশৃঙ্খল ও নিয়মিত অভিবাসনবিষয়ক বৈশ্বিক চুক্তি ছিল অভিবাসনকে আরও নিরাপদ ও মানবিক করার লক্ষ্যে প্রথম আন্তর্জাতিক উদ্যোগ। মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার ‘গ্লোবাল ওভারভিউ অব মাইগ্রেশন রুটস ২০২৫’ প্রতিবেদনে একটি মিশ্র চিত্র উঠে এসেছে। এতে দেখা যাচ্ছে, কিছু অভিবাসন পথ বদলেছে; কিন্তু যাত্রাপথের ঝুঁকি এখনো অত্যন্ত ভয়াবহ, কিছু ক্ষেত্রে তা আরও বেড়েছে।

 

 

এ প্রবণতা একটি বড় বাস্তবতাকে সামনে আনে। যখন সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ কঠোর হয় বা পথ পরিবর্তিত হয়, তখন যাত্রা আরও দীর্ঘ, বিচ্ছিন্ন ও বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। মানুষ চলাচল বন্ধ করে না; কিন্তু নিরাপদ বিকল্প কমে যাওয়ায় অনেকেই অনিয়মিত ও ঝুঁকিপূর্ণ পথে যেতে বাধ্য হয়।

 

 

সুদান দেখিয়েছে, কীভাবে একটি সংকট পুরো অঞ্চলের মানুষের চলাচলের ধরন বদলে দিতে পারে। ২০২৩ সালের এপ্রিলে সংঘাত শুরু হওয়ার তিন বছর পর সুদান এখন বিশ্বের সবচেয়ে বড় বাস্তুচ্যুতি সংকটের মুখে। একসময় অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা তিন গুণের বেশি বেড়ে ১ কোটি ১৫ লাখ ছাড়িয়ে যায়। প্রায় ৪০ লাখ মানুষ নিজ এলাকায় ফিরেছে, যদিও তাদের অনেকের ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত বা আংশিক ধ্বংস হয়ে গেছে। তবুও প্রায় ৯০ লাখ মানুষ এখনো বাস্তুচ্যুত অবস্থায় রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে ভূমধ্যসাগরের পূর্ব ও মধ্যাঞ্চলীয় পথে সুদানি নাগরিকদের সংখ্যা বেড়ে যাওয়াটা অস্বাভাবিক নয়। অনেকের জন্য এই যাত্রা কোনো পছন্দ নয়, এটি শেষ ভরসা।

 
 
 
 

মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা অঞ্চল বৈশ্বিক অভিবাসনের সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত। ২০২৫ সালে এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল থেকে ইউরোপে মানুষের চলাচল উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। অনিয়মিতভাবে ইউরোপে পৌঁছানো প্রতি তিনজনের একজন ওই অঞ্চল থেকে এসেছে। এসব যাত্রার অনেকগুলোই উত্তর আফ্রিকা ও পূর্ব ভূমধ্যসাগরের পথ অতিক্রম করে। একটি দেশের ভিসানীতি পরিবর্তন, অন্য কোথাও সংঘাত বৃদ্ধি বা কোনো নতুন সীমান্ত ব্যবস্থা হাজার কিলোমিটারজুড়ে ঝুঁকির ধরন পাল্টে দিতে পারে।

 
 

একই সময়ে এই অঞ্চলে মানুষের চলাচলের পেছনের মূল কারণগুলোও কমছে না। মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকায় বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তরুণ জনগোষ্ঠী রয়েছে, যেখানে যুব বেকারত্ব অনেক দেশে ২০ শতাংশের বেশি। খরা, বন্যা ও তাপপ্রবাহের মতো জলবায়ুজনিত সংকট সংঘাত ও অর্থনৈতিক চাপের সঙ্গে মিলে পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে। এসব কারণ একে অন্যকে প্রভাবিত করে অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুতি ও সীমান্ত পেরিয়ে যাত্রাকে বাড়িয়ে তুলছে।

 

 

 

নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে এর অর্থ কী? কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

 

 

ভূমধ্যসাগর অঞ্চলে শুধু আগত মানুষের সংখ্যা দেখে পুরো পরিস্থিতি বোঝা যায় না। ২০২৫ সালে মধ্য ভূমধ্যসাগরীয় পথ দিয়ে ইতালি ও মাল্টায় পৌঁছেছে প্রায় ৬৬ হাজার ৫০০ মানুষ, যা আগের বছরের প্রায় সমান। পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় পথে গ্রিস, সাইপ্রাস ও বুলগেরিয়ায় আগমন প্রায় ৩০ শতাংশ কমেছে। পশ্চিম ভূমধ্যসাগরীয় পথে কিছুটা বৃদ্ধি দেখা গেছে। ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জমুখী পশ্চিম আফ্রিকান আটলান্টিক পথে আগমন ৬২ শতাংশ কমেছে।

 

 

সংখ্যাগুলো আলাদাভাবে দেখলে মনে হতে পারে ইউরোপের সীমান্তে চাপ কমেছে। কিন্তু কম আগমন মানেই নিরাপদ যাত্রা নয়। পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় পথে এক বছরের মধ্যে মৃত্যু ও নিখোঁজের সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। পশ্চিম আফ্রিকান আটলান্টিক পথেও আগমন কমলেও মৃত্যুর সংখ্যা খুব বেশি কমেনি, অর্থাৎ সমুদ্রে মৃত্যুর ঝুঁকি বেড়েছে। আর মধ্য ভূমধ্যসাগরীয় পথে ২০২৫ সালে ১ হাজার ৩০০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে, যা এটিকে এখনো বিশ্বের সবচেয়ে প্রাণঘাতী অভিবাসন পথগুলোর একটি করে রেখেছে।

 

 
 

প্রথমত, উদ্ধার ও অনুসন্ধান সক্ষমতাকে বর্তমান বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নিতে হবে। কোথাও আগত মানুষের সংখ্যা স্থিতিশীল থাকা বা কমে যাওয়া মানেই ঝুঁকি কমে গেছে, এমন ধারণা করা ঠিক নয়। কিছু অভিবাসন পথে মৃত্যুর সংখ্যা দ্রুত বেড়ে যাওয়া দেখিয়ে দিচ্ছে যে, বিপদ মোকাবিলায় আরও শক্তিশালী সমন্বয়, মৃত্যু ও নিখোঁজ মানুষের বিষয়ে নির্ভুল তথ্য এবং সীমান্তবর্তী জনগোষ্ঠীর জন্য দীর্ঘমেয়াদি সহায়তা জরুরি। স্থল ও সমুদ্রে মানুষের জীবন রক্ষা করা মানবিক, নৈতিক এবং আইনি দায়িত্ব।

 

 

দ্বিতীয়ত, নিরাপদ ও নিয়মিত অভিবাসনের পথ আরও বাড়াতে হবে। যখন বৈধ সুযোগ সীমিত থাকে, তখন সহিংসতা, দারিদ্র্য বা পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন মানুষ অনিয়মিত পথে যেতে বাধ্য হয়। সঠিকভাবে পরিকল্পিত শ্রমভিত্তিক অভিবাসন ব্যবস্থা, পরিবার পুনর্মিলনের সুযোগ এবং মানবিক সহায়তাভিত্তিক পথ ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রার ওপর নির্ভরতা কমাতে পারে। একই সঙ্গে এটি উৎস ও গন্তব্য উভয় দেশের উন্নয়নেও সহায়তা করবে।

 

 

তৃতীয়ত, নির্ভুল ও সমন্বিত তথ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বৈশ্বিক অভিবাসন প্রতিবেদন এবং সুদানের বাস্তুচ্যুতি পরিস্থিতি দেখিয়েছে, আগমনের পরিসংখ্যান, মানুষের অভিপ্রায়সংক্রান্ত জরিপ এবং মৃত্যু ও নিখোঁজের তথ্য একসঙ্গে বিশ্লেষণ করলে বাস্তব চিত্র পরিষ্কার হয়। জাতীয় তথ্যব্যবস্থায় ধারাবাহিক বিনিয়োগ সরকারগুলোকে আগাম চাপ বুঝতে এবং কার্যকর নীতি তৈরি করতে সাহায্য করতে পারে।

 

 

সবশেষে, আরও জোরালো আন্তর্জাতিক সহযোগিতা প্রয়োজন। এই সপ্তাহে নিউইয়র্কে বিশ্বের ১৩০টি দেশ বৈশ্বিক অভিবাসন চুক্তির বাস্তবায়ন এগিয়ে নিতে আলোচনা করছে। তারা স্বীকার করছে যে, অভিবাসনের মতো জটিল বিষয় কেবল নীতিনিষ্ঠ ও গঠনমূলক অংশীদারত্বের মাধ্যমেই সঠিকভাবে পরিচালনা করা সম্ভব। এই আন্তর্জাতিক ফোরামের মূল বিষয় হলো সহযোগিতা এবং ভবিষ্যৎ করণীয় সম্পর্কে স্পষ্ট সিদ্ধান্ত। নিরাপদ ও নিয়মিত অভিবাসনের পথ বাড়াতে হবে। ন্যায্য নিয়োগব্যবস্থা ও শ্রমিক সুরক্ষা জোরদার করতে হবে। জীবনরক্ষাকারী তথ্য ও সুরক্ষা ব্যবস্থায় বিনিয়োগ করতে হবে। একই সঙ্গে সীমান্তপাড়ের অপরাধী চক্র মোকাবিলায় সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে।

 

 

আমরা যদি সঠিকভাবে এগোতে পারি, তাহলে কম মানুষ কষ্ট পাবে, কম প্রাণহানি ঘটবে এবং আরও বেশি মানুষ ও সমাজ উন্নতির সুযোগ পাবে। এ সম্ভাবনাই এখন আমাদের সামনে রয়েছে। আসুন, আমরা সবাই মিলে সে সুযোগ কাজে লাগাই।

 

 

 

লেখক: মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা অঞ্চলের আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার আঞ্চলিক পরিচালক। আলজাজিরায় প্রকাশিত নিবন্ধটি ভাষান্তর করেছেন আবিদ আজাদ

ট্যাগ:BCSকলামআন্তর্জাতিক