মাইক্রোপ্লাস্টিক কেন ভয়াবহ

মাইক্রোপ্লাস্টিক কেন ভয়াবহ
কলামআন্তর্জাতিক

মাইক্রোপ্লাস্টিক কেন ভয়াবহ

২ আগস্ট, ২০২৬

ড. বিভূতি ভূষণ মিত্র [সূত্র : কালের কণ্ঠ, ০২ আগস্ট ২০২৬]

রোমান সাম্রাজ্য প্রাচীন বিশ্বের একটি বিশাল ও শক্তিশালী সাম্রাজ্য। তারা প্রায় এক হাজার ৪০০ বছর রাজত্ব করেছে। রোমান প্রজাতন্ত্রের এই সময়টাকে অনেকে রোমান শান্তি বলে এই কারণে যে দুই শতক তারা রাজনৈতিকভাবে সুস্থির ছিল এবং বেশ সমৃদ্ধও ছিল। বলা হয়ে থাকে, এই রোমান সাম্রাজ্যের একসময় পতন হয়েছিল সিসা বিষক্রিয়ার কারণে। কেননা সে সময় প্রাচীন রোমে জলের পাইপ, রান্নার পাত্র ও মিষ্টি তৈরির কাজে সিসা ব্যবহার করত। অনেকের মতে, সিসা বিষক্রিয়ার কারণে রোমের শাসকদের মানসিক দক্ষতা কমে গিয়েছিল।

 

 

এই কথাগুলো এই জন্য বললাম, বেশ কিছুদিন ধরে বাংলাদেশের সংবাদপত্র ও অন্যান্য মিডিয়ায় মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া যাচ্ছে বিভিন্ন পণ্যে—এমন সংবাদ প্রকাশিত হচ্ছে। এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (ইএসডিও) নামের একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের বরাত দিয়ে মিডিয়ায় এ ধরনের সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। একটি পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের বাজারে পাওয়া ৩৪টি টুথপেস্টের ২৬টিতেই গবষেকরা মাইক্রোপ্লাস্টিক পেয়েছে। পরীক্ষা করা টুথপেস্টের ৭৬.৫ শতাংশেই এর উপস্থিতি পাওয়া গেছে।

 

 


প্রতি ১০০ গ্রাম টুথপেস্টে পাওয়া গেছে ২০ থেকে ৩২০টি মাইক্রোপ্লাস্টিক। গবেষণা সংস্থার তথ্য মতে, মেডিপ্লাস ফ্লোরাইড জেলে প্রতি ১০০ গ্রামে মাইক্রোপ্লাস্টিকের কণার সংখ্যা পাওয়া গেছে ৩২০টি, ক্লোজআপ রেড হট ও ক্লোজআপ মেনথল ফ্রেশে পাওয়া গেছে ১৬০টি, কোডোমো আল্ট্রা শিল্ড ফর্মুলায় (স্ট্রবেরি) পাওয়া গেছে ১৪০টি, পেপসোডেন্ট অ্যাডভাল সল্টে ১০০টি, সেনসোডাইন ফ্রেশ মিন্টে ৮০টি, পেপসোডেন্ট সেনসিটিভ এক্সপার্টে ৬০টি, হোয়াইট প্লাস রেডে ৬০টি, হোয়াইট প্লাস প্রো সেনসিটিভ জেলে ৬০টি, মেরিল বেবি স্ট্রবেরিতে ৬০টি, মেডিপ্লাস টিজিপি ফর্মুলায় ৬০টি, এমপিএম হারবালে ৪০টি, মেডিপ্লাস ডিএসে ৪০টি, পেপসোডেন্ট জার্মি চেকে ৪০টি, মেরিল বেবি অরেঞ্জে ৪০টি, ম্যাজিক হারবালে ৪০টি, মেসওয়াকে ৪০টি, ক্লোজআপ মেনথল ফ্রেশ স্যাশে ৪০টি, ডেন্টিন জেলে ২০টি, পেপসোডেন্ট কিডসে (অরেঞ্জ) ২০টি, ক্লোজআপ লেমন সি সল্টে ২০টি, ব্রাশ আপ হোয়াইটেনিং জেলে ২০টি এবং হোয়াইট প্লাস প্রো সেনসিটিভে ২০টি। 

 

 


মাইক্রোপ্লাস্টিক কেন ভয়াবহটুথপেস্টের পর বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের (বিইউপি) পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগ পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে সংগৃহীত ৬০টি সয়াবিন তেলের নমুনার প্রতিটিতেই মাইক্রোপ্লাস্টিক রয়েছে। প্রতি লিটার তেলে গড়ে ৫৩ হাজার ৯২২টি কণা পাওয়া গেছে। ব্র্যান্ডে বোতলজাত তেলে গড়ে ৪৮ হাজার ৬৭টি এবং খোলা তেলে ৫৯ হাজার ৭৭৮টি কণা পাওয়া গেছে।

 

 


এই গবেষণাটি জার্নাল অব ফুড কম্পোজিশন অ্যান্ড অ্যানালিসিসে প্রকাশিত হয়েছে। এতে গবেষকরা ছয় ধরনের প্লাস্টিকের কণা পেয়েছেন।  এ ছাড়া চিনিতেও পাওয়া গেছে মাইক্রোপ্লাস্টিক। জার্নাল অব ফুড কম্পোজিশন অ্যান্ড অ্যানালিসিসে প্রকাশিত এই গবেষণায় দেখানো হয়েছে, বাংলাদেশের বাজারে বিক্রি হওয়া চিনির বেশির ভাগ নমুনায় পাওয়া গেছে এই মাইক্রোপ্লাস্টিক। ব্র্যান্ডেড চিনির প্রতি কেজিতে ৩২২টি এবং খোলা চিনিতে ৪০৩টি মাইক্রোপ্লাস্টিকের কণা পাওয়া যায়। এখানকার প্লাস্টিকের কণাগুলোর আকার ১২ মাইক্রোমিটারের কম থেকে সর্বোচ্চ ৩.১৯ মিলিমিটার পর্যন্ত। এর মধ্যে ৬৩ শতাংশ ছিল সুতার মতো, ২১ শতাংশ খণ্ড খণ্ড, ১১ শতাংশ পাতলা স্তরের মতো এবং ৫ শতাংশ গোলাকার। 

 

 

মাইক্রো মানে ক্ষুদ্র। অর্থাৎ মাইক্রোপ্লাস্টিক মানে প্লাস্টিকের ক্ষুদ্র কণা। মাইক্রোপ্লাস্টিক দুইভাবে ভাগ করা যায়। একটি শ্রেণিকে বলা হয় প্রাথমিক মাইক্রোপ্লাস্টিক, যা সরাসরি বিভিন্ন খাদ্য; যেমন—পানি, চিনি, লবণ ইত্যাদিতে মেশানো হচ্ছে, সেখান থেকে আমরা পাই। আরেকটি গৌণ মাইক্রোপ্লাস্টিক। এসব আমরা সাধারণত বোতলজাত পানি থেকে পাই। আবার এসব মাইক্রোপ্লাস্টিক ভেঙে হয় ন্যানোপ্লাস্টিক। এসব আমরা দেখতে পাই না। মানে ন্যানোপ্লাস্টিক খালি চোখে দেখা যায় না। এগুলো আমাদের শরীরে সরাসরি কোষ পর্যন্ত যেতে পারে। 

 

 

সম্প্রতি এক গবেষণায় জানা গেছে, পৃথিবীর ৮৫ শতাংশ কলের জলে মাইক্রোপ্লাস্টিক রয়েছে; যেখান থেকে প্রতি মাসে ২১ গ্রাম এবং বছরে ২৫০ গ্রাম এই প্লাস্টিক মানুষের শরীরে ঢুকে গুরুতর ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্লাস্টিকের বর্জ্য মাইক্রো ও ন্যানো কণারূপে মানুষের শরীরে ঢুকে হরমোনজনিত নানা সমস্যা সৃষ্টি করছে। এটি মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রের নানা রোগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। শুক্রাণু ও ডিম্বাণু উৎপাদন ব্যাহত করছে। ক্যান্সারসহ ত্বকের নানা রকম রোগ সৃষ্টি করছে। ফথেলেটস, বিসফেনোন, অর্গানোটিনস, পার ও পরি ফ্লোরোঅ্যালকাইল, বিসফেনল প্রভৃতি রাসায়নিক উপাদান প্লাস্টিকে থাকে, যা স্থ্থূলতা, গর্ভধারণের ক্ষমতা হ্রাস, বিভিন্ন স্নায়ুরোগ ঘটাতে পারে। প্লাস্টিক জনস্বাস্থ্যের জন্যই হুমকি নয় শুধু। এটি পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ওপর মারাত্মক প্রভাব সৃষ্টি করছে। প্লাস্টিকের ক্ষতিকর প্রভাব জানলেও, এর ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা আছে জানলেও আমরা কিন্তু ঘুম থেকে উঠে আবার রাতে ঘুমাতে যাওয়া পর্যন্ত প্লাস্টিকই ব্যবহার করে যাচ্ছি।

 

 

নানাভাবে আমাদের শরীরে মাইক্রোপ্লাস্টিক প্রবেশ করছে। বোতলজাত পানি পান করার মাধ্যমে, সামুদ্রিক খাবার থেকে, লবণ থেকে, চিনি, টি-ব্যাগ, দুধ—এসবের মাধ্যমে আমাদের দেহে এটি প্রবেশ করে। পোশাক-আশাক থেকেও মাইক্রোপ্লাস্টিক আসতে পারে। আমরা যেসব সিনথেটিক, পলেস্টার, নাইলন কাপড় ব্যবহার করি, এখানেও অনেক মাইক্রোপ্লাস্টিক থাকে। প্রতি ছয় কিলোগ্রাম কাপড় থেকে ও ধোয়াতে সাত লাখ মাইক্রোপ্লাস্টিকের তন্তু পাওয়া যেতে পারে। একটি গবেষণা মতে, ৯৩ শতাংশ বোতলজাত পানি থেকে ৩২৫ মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া যায়। ২০০৪ সালের একটি গবেষণা মতে, বোতলজাত প্রতি লিটার পানিতে দুই লাখ ৪০ হাজার ন্যানোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে। 

 

 

এসব মাইক্রোপ্লাস্টিক পরিবেশ তো বটেই, আমাদের শরীরের জন্য ভয়াবহ হয়ে উঠছে। প্লাস্টিকের এই কণা আমাদের হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক এবং রক্ত চলাচলের রাস্তা বন্ধ করে দিতে পারে। ন্যানোপ্লাস্টিক আমাদের মস্তিষ্কে প্রবেশ করতে পারে। প্লাস্টিকের ভেতরের রাসায়নিক পদার্থ হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট করে দেয়। এতে আমাদের প্রজননস্বাস্থ্য মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়ে। বর্তমানে পুরুষদের যে শুক্রাণু হ্রাসের ঘটনা ঘটছে, তারও অন্যতম কারণ ন্যানোপ্লাস্টিক। প্লাস্টিকের এসব কণা আমাদের ফুসফুসের পাশাপাশি পরিপাক প্রক্রিয়ায়ও নানা সমস্যা সৃষ্টি করছে। একটি গবেষণা মতে, মাইক্রোপ্লাস্টিক কোষ ও ডিএনএ নষ্ট করে দিতে পারে।

 

 

সাম্প্রতিক গবেষণায় মানুষের বিভিন্ন অঙ্গ ও কলায় মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো মস্তিষ্ক, হৃৎপিণ্ড, পাকস্থলী ও গর্ভাশয়। এ ছাড়া মূত্র, বুকের দুধ, শুক্রাণুতেও মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে। এগুলো প্রমাণ করছে যে আমরা খারাপ কিছুর দিকে এগোচ্ছি। একটি গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী, মাছ ও পাখিকে মাইক্রোপ্লাস্টিক বেশি বিপৎসংকুল করে তুলছে। মাইক্রোপ্লাস্টিকের কারণে প্রদাহ, রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা ভেঙে পড়া, কলা নষ্ট করা, বিপাকীয় কাজে বাধা, কোষ নষ্ট ও অস্বাভাবিক অঙ্গ গঠনের মতো ঘটনা ঘটার প্রমাণ পেয়েছেন গবেষকরা। এই অবস্থায় খাদ্যগ্রহণ নীতিমালায় সতর্ক হওয়া ছাড়া উপায় নেই।

 

 

প্লাস্টিকের বোতল থেকে শুরু করে রান্নাবান্নার পাত্র হিসেবে প্লাস্টিকের ব্যবহার কমাতে হবে, যদিও বাংলাদেশই বিশ্বে প্রথম প্লাস্টিকের ব্যাগ ব্যবহার নিষিদ্ধ করে ২০০২ সালে। ২০১০ সালে প্লাস্টিকের বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় ন্যাশনাল থ্রি আর নীতি চালু করে। ন্যাশনাল থ্রি আর অর্থ হলো রিডিউস, রিইউজ ও রিসাইকল। প্লাস্টিকের ব্যবহার বন্ধে ২০১০ সালে বাংলাদেশ সরকার জুট প্যাকেজিং আইন পাস করে। সরকারের এসব উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। সুস্থ জাতি গড়ে তুলতে হলে শুধু মানুষকে সচেতন হতে হবে, একই সঙ্গে সরকারকেও এগিয়ে আসতে হবে। 

 

 

লেখক : পরিবেশবিষয়ক লেখক 

ট্যাগ:BCSকলামআন্তর্জাতিক