কেমন হলো ট্রাম্পের চীন সফর

কেমন হলো ট্রাম্পের চীন সফর
কলামআন্তর্জাতিক

কেমন হলো ট্রাম্পের চীন সফর

১২ জুলাই, ২০২৬

ড. নাসির উদ্দিন আহাম্মেদ [সূত্র : কালের কণ্ঠ, ২২ মে ২০২৬]

দীর্ঘ ৯ বছর পর কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টের চীন সফর আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। নব্বইয়ের দশকের শুরু থেকে স্নায়ুযুদ্ধের অবসান তথা রুশ-মার্কিন দ্বৈরথের অবসান ঘটলে মার্কিনিদের সামনে নতুন পরাশক্তিরূপে আবির্ভূত হয় নয়া চীন। বর্তমান প্রেক্ষাপটে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী দুই রাষ্ট্র আমেরিকা ও চীন শুধু নিজেদের জন্য নয়, পুরো বিশ্বের অর্থনীতি, নিরাপত্তা ও কূটনীতির ওপর বিশাল প্রভাব ফেলে। তাই দীর্ঘ বিরতির পর এ ধরনের সফর দুই দেশ যে সম্পর্কের নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করতে চাইছে অথবা বড় ধরনের উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে, এমনটাই ইঙ্গিত দেয় বলে বিশ্লেষকদের অধিকাংশের ধারণা। এ সফর-সংক্রান্ত কোনো ধরনের সরকারি ভাষ্য প্রকাশের আগেই ধারণা করা হয়েছিল

 

 

যে, বিশ্ব রাজনীতিতে উত্তেজনা কমানোর চেষ্টা, গত কয়েক বছরে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে নানা বিষয়ে সৃষ্ট উত্তেজনা হ্রাস, তাইওয়ান প্রশ্ন, দক্ষিণ চীন সাগরে আধিপত্য, প্রযুক্তি যুদ্ধ, বাণিজ্য শুল্ক, সামরিক প্রতিযোগিতা ও মানবাধিকার ইস্যুর মতো স্পর্শকাতর বিষয়গুলো উভয় শীর্ষ নেতার আলোচনায় ঠাঁই পাবে। বিবদমান যে কোনো দুই দেশের শীর্ষ নেতা সরাসরি বৈঠক করলে ভুল বোঝাবুঝি বা সংঘাতের ঝুঁকি কমানোর সুযোগ তৈরি হয়। বিশেষ করে সামরিক যোগাযোগ পুনরুদ্ধারের ক্ষেত্রে নিয়ামক শক্তি হয়ে ওঠে। পক্ষান্তরে যে কোনো পক্ষের ভুল হিসাব কখনো কখনো সংঘাতকে উসকে দেয়।

 

 

যুক্তরাষ্ট্র ও চীন বিশ্বের দুই বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ। এ দুটি দেশের সম্পর্ক খারাপ হলে বিশ্ববাজারে অস্থিরতা বাড়ে, তেলের দাম প্রভাবিত হয় এবং সরবরাহ ব্যবস্থা (supply chain) বিঘ্নিত হয়। এতে সমগ্র বিশ্ব অর্থনীতিতে ধাক্কা লাগলেও উন্নয়নশীল দেশগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সর্বোচ্চ পর্যায়ের নেতাদের সফরের মাধ্যমে বাণিজ্য ও বিনিয়োগে কিছু স্থিতিশীলতা এলে বিশ্ব অর্থনীতিতে তাৎক্ষণিক স্বস্তি ফায়ার আসে। তাই চীন-মার্কিন সম্পর্কের সরাসরি প্রভাব পড়ে প্রযুক্তি খাত বিশেষত সেমিকন্ডাক্টর শিল্প, জাহাজ পরিবহন, কাঁচামাল বাজারের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে। অন্যদিকে বর্তমানে প্রযুক্তি ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতার বড় অনুষঙ্গ হচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ও চিপস প্রযুক্তি। যুক্তরাষ্ট্র চীনের ওপর উন্নত চিপস ও প্রযুক্তি রপ্তানিতে নানা সীমাবদ্ধতা দিয়েছে। তথাপি চীন প্রযুক্তিতে আত্মনির্ভরশীল হওয়ার পথে দ্রুতই এগিয়ে যাচ্ছে। সফরকালে এ প্রযুক্তি যুদ্ধ নিয়েও আলোচনা প্রত্যাশিত ছিল।

 

 

উভয় দেশের জন্যই তাইওয়ান ইস্যু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সংবেদনশীল। চীন বরাবর তাইওয়ানকে নিজের অংশ বলে মনে করে, আর যুক্তরাষ্ট্র তাইওয়ানের নিরাপত্তাকে নিজেদের স্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করে। তাই মার্কিন প্রেসিডেন্টের চীন সফরের সময় তাইওয়ান নিয়ে সৃষ্ট উত্তেজনা কমানোর চেষ্টা এবং সম্ভাব্য সংঘর্ষ এড়ানোর উপায় বের করা বিশ্বের শান্তিকামী মানুষের প্রত্যাশিত ছিল। আবার এ সফর এমন সময় হয়েছে—যখন প্রচ্ছন্নভাবে মার্কিন সমর্থনপুষ্ট ইউক্রেন ও মার্কিনিদের আরেক প্রতিদ্বন্দ্বী রাশিয়া এক দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধে লিপ্ত রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে ইরান সরাসরি লড়ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে, যা গোটা মধ্যপ্রাচ্যকে অস্থির করে তুলেছে। হরমুজ প্রণালিতে ইরানের একক আধিপত্য ও দখল বিশ্বের ২০ শতাংশ তেল সরবরাহ থামিয়ে দিয়েছে, যার অন্যতম গন্তব্য ছিল চীন। যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও মার্কিনিদের ইউরোপীয় মিত্রদের বিশ্বাস, চীনের প্রত্যক্ষ প্রযুক্তিগত সহায়তা ও সামরিক ক্ষেত্রে পরোক্ষ সহায়তার ওপর ভিত্তি করেই ইরানের সেনারা সমানে জবাব দিচ্ছে আমেরিকা ও ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা বাহিনীকে।

 

 


বিশ্বের এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্তে বিশেষত এশিয়ায় চীন দ্রুত সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তি বাড়াচ্ছে। এ লক্ষ্যে চীন গড়ে তুলেছে ব্রিকস (BRICS) নামের জোট। যেখানে রয়েছে ব্রাজিল, রাশিয়া, ইন্ডিয়া, চীন ও সাউথ আফ্রিকা। এর বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্র সৃষ্টি করেছে অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য ও আমেরিকা নিয়ে গড়া ত্রিদেশীয় জোট আকুস (AUKUS)। আবার কোয়াড (Quad) নামের জোটে আমেরিকার সঙ্গে রয়েছে অস্ট্রেলিয়া, ভারত ও জাপান। স্কোয়াড (Squad) নামের আরও একটি জোটের সদস্য আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, জাপান এবং ফিলিপাইন। এমনি এক প্রেক্ষাপটে এ সফর বিশ্বজুড়ে বিশেষত এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ভবিষ্যৎ শক্তির ভারসাম্য নির্ধারণে বিশেষ ভূমিকা রাখার কথা ছিল, যা বাংলাদেশের মতো দেশের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।

 

 

৯ বছর বিরতির পর সফর মানে দুই দেশ বুঝতে পারছে যে, সম্পূর্ণ সংঘাত বা ‘কোল্ড ওয়্যার’ তথা স্নায়ুযুদ্ধ ও বিচ্ছিন্নতা তাদের কারও জন্যই সহজ কোনো প্রক্রিয়া নয়। তাই এমন সফর কূটনীতির নবযাত্রা (reset) বা সৃষ্ট ক্ষতিপূরণের (damage control) ইঙ্গিত দিয়েছিল। তবে বাস্তবতা হলো, ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক চীন সফরকে পুরোপুরি সফল বা পুরোপুরি ব্যর্থ—কোনোটিই বলা কঠিন। অধিকাংশ বিশ্লেষকের মতে এটি ছিল ‘আংশিক সফল কিন্তু সীমিত ফলাফলপূর্ণ’ একটি কূটনৈতিক সফর। সফরটির যে দিকগুলোকে সফল বলা যায়, তার মধ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে কয়েক মাসের উত্তেজনার পর দুই দেশের শীর্ষ পর্যায়ে সরাসরি সংলাপ ফের সক্রিয় হয়েছে।

 

 

 এটিকে অনেকেই ইতিবাচক মনে করছেন। বাণিজ্য নিয়ে কিছু প্রাথমিক সমঝোতা হয়েছে বলে উভয়পক্ষ জানিয়েছে। বিশেষ করে কৃষিপণ্য, বিমান ক্রয় এবং কিছু শুল্ক ইস্যুতে আলোচনার অগ্রগতি হয়েছে। ইরান ইস্যুতে উত্তেজনা কমানোর ক্ষেত্রে চীনের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখা ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। পরবর্তী সময়ে ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য হামলা স্থগিত করার পেছনে ‘গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা’র কথা বলেছেন। দুই দেশই প্রকাশ্যে সম্পর্ক স্থিতিশীল রাখার বার্তা দিয়েছে, যা বৈশ্বিক বাজার ও কূটনীতিতে কিছুটা ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। যে কারণে অনেকে সফরটিকে সীমিত সফল বা আংশিক ব্যর্থ বলছেন।

 


তাইওয়ান, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), দক্ষিণ চীন সাগর বা ইরান—এসব বড় কৌশলগত বিষয়ে কোনো বড় অগ্রগতি হয়নি। চীনের পক্ষ থেকে ঘোষিত অনেক চুক্তিকেই ‘প্রাথমিক’ বা প্রারম্ভিক বলা হয়েছে; অর্থাৎ বাস্তবায়নের নিশ্চয়তা এখনো নেই। ট্রাম্প তাইওয়ান প্রশ্নে তুলনামূলক নরম অবস্থান নিয়েছেন বলে সমালোচনা উঠেছে। বিশেষ করে তাইওয়ানে মার্কিন অস্ত্র বিক্রি নিয়ে তার নরম মন্তব্য তাইওয়ানে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। অনেক আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক মনে করছেন, সফরটি ছিল প্রতীকী ও কূটনৈতিক প্রদর্শনী মাত্র, বাস্তবে নীতিগত পরিবর্তন কমই হয়েছে।

 

 

সফরের পরপরই (১৯ মে ২০২৬ থেকে) রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের চীন সফর দেখিয়ে চীনা প্রেসিডেন্ট সি জিনপিং বোঝাতে চেয়েছেন যে, বেইজিং এখনো রাশিয়ার সঙ্গেও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখছে। এতে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ তৈরির কৌশল স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

 

 

তবে এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে সফরটি ‘সম্পর্ক ভাঙন ঠেকানোর’ ক্ষেত্রে কিছুটা হলেও সফল হয়েছে। তবে যারা বড় ধরনের চুক্তি, তাইওয়ান ইস্যুতে কঠোর অবস্থান বা চীনের নীতিতে বড় পরিবর্তন আশা করেছিলেন—তাদের কাছে সফরটি অবশ্যই হতাশাজনক। চীনকে নীতিগতভাবে ছাড় দিতে বাধ্য করতে পারেনি আমেরিকা। অনেক বিশ্লেষক তাই এটিকে ‘স্ট্যাবিলিটি সামিট’ বা স্থিতিশীলতা ফেরানোর মোলাকাত বলছেন—যেখানে মূল লক্ষ্য ছিল সম্পর্ককে নিয়ন্ত্রণে রাখা, বড় সমাধান বের করা নয়।

 

 

অন্যদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের চীন সফরকে পূর্বনির্ধারিত ব্যর্থতার ফাঁদ বলেও ভাবছেন কেউ কেউ। রাশিয়া ও ইরানের সঙ্গে সম্পর্কের মাধ্যমে চীনের যথেষ্ট ভূরাজনৈতিক প্রভাব ছিল। তাই ওয়াশিংটনের কূটনৈতিক সাফল্য অর্জনের সম্ভাবনা শুরু থেকেই ক্ষীণ বলে মনে হচ্ছিল। ইরানকে নিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের অবসানের কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছিল না। যুক্তরাষ্ট্রের বিপুল সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব থাকা সত্ত্বেও ইরান তুলনামূলকভাবে স্বল্পমূল্যের রণসম্ভার প্রয়োগ ও ভৌগোলিক অবস্থান ধরে রেখে তথা হরমুজ প্রণালি দখলে রেখে যুক্তরাষ্ট্রকে ক্রমেই কোণঠাসা করে ফেলে।

 

 

 এ সফরের ফলে রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাতের অবসানেও তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখা যায়নি। ২০২৫ সালের আগস্টে আলাস্কায় ট্রাম্প ও পুতিনের আনুষ্ঠানিক বৈঠকও যুদ্ধের মৌলিক সমাধানে ব্যর্থ হয়। এবারও ব্যর্থ হলেন ট্রাম্প। ইরান এবং রাশিয়া উভয়কেই ব্যাপকভাবে চীনের সমর্থনপ্রাপ্ত বলে মনে করা হতো। যার প্রমাণ ইরান-রাশিয়া-চীন, এই তিন দেশের জ্বালানি, বাণিজ্য এবং অস্ত্র সহযোগিতার ওপর ভিত্তি করে কৌশলগত নতুন সমীকরণের জন্ম। ইরান এবং রাশিয়া বিশ্বের শীর্ষ জ্বালানি রপ্তানিকারকদের মধ্যে রয়েছে। অন্যদিকে চীন পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে রাশিয়া ও ইরানের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে সমর্থন করেছে এবং নীরবে সামরিক সহযোগিতা চলেছে। এদিকে, ২০২৭ সালের মধ্যে তাইওয়ানের বিরুদ্ধে চীনের সম্ভাব্য পদক্ষেপের ইঙ্গিত, অবকাঠামো সম্প্রসারণ এবং যুদ্ধকালীন সম্পদ মজুত করা অব্যাহত রেখে মার্কিনিদের উদ্বেগ বাড়িয়েছে বেইজিং প্রশাসন, যা এ সফরে একটুও কমেনি।

 

 

 

ওপরে উল্লিখিত সংকটগুলো থেকে বেইজিংয়ের প্রভাবকে বিচ্ছিন্ন করার প্রচেষ্টায় চীনের সঙ্গে আলোচনা ওয়াশিংটন প্রশাসনের জন্য একটি কঠিন চ্যালেঞ্জ ছিল। ক্ষমতায় ফেরার পর থেকে ট্রাম্প মার্কিন বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে শুল্ক আরোপের মাধ্যমে বারবার চীনের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছেন। এ কৌশলের আরেকটি উদ্দেশ্য ছিল বেইজিংকে অন্যান্য ভূরাজনৈতিক অঞ্চল থেকে মনোযোগ সরিয়ে ওয়াশিংটনকে গুরুত্ব দিতে বাধ্য করা, যা সফল হয়নি। বরং ইরান ও রাশিয়ার সঙ্গে চীনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আলোচনার টেবিলে বেইজিংয়ের দরকষাকষির ক্ষমতাকে আরও শক্তিশালী করেছিল। আন্তর্জাতিক সম্পর্কে, যখন কোনো একপক্ষের যথেষ্ট ভূরাজনৈতিক সুবিধা থাকে, তখন আলোচনা খুব কমই সফল হয়। ফলে ট্রাম্প-শি বৈঠকের ফল আগে থেকে অনেকটাই অনুমেয় বলে মনে হয়েছিল, হয়েছেও তাই।

 

 

 

পুরো সফরজুড়ে শি জিনপিংয়ের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক শিষ্টাচারে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে সতর্ক এবং কিছুটা সংযত দেখাচ্ছিল। তার শারীরিক ভাষা সমপর্যায়ের আলোচনায় আধিপত্যের পরিবর্তে দুর্বলতার লক্ষণ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। এর বিপরীতে, শি জিনপিংকে আরও বেশি মনোযোগী ও সক্রিয় মনে হয়েছে এবং তিনি আলোচনার সময় প্রায়ই সামনের দিকে ঝুঁকে পড়ছিলেন। পুরো সফরজুড়ে ট্রাম্পের বক্তব্য মূলত আনুষ্ঠানিক এবং প্রতীকীই ছিল। আলোচনার সময় শি তাইওয়ান সংকটকে একটি ‘রেডলাইন’ এবং যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কের ‘সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল বিষয়’ হিসেবে বর্ণনা করেন এবং সতর্ক করে দেন যে, এ বিষয়টি ভুলভাবে সামলানো হলে তা উভয় দেশকে সংঘাত বা সংঘর্ষের দিকে ঠেলে দিতে পারে।

 

 

পরোক্ষভাবে, শি যখন ইঙ্গিত দেন যে, ওয়াশিংটন যদি তাইওয়ানকে সমর্থন অব্যাহত রাখে, তবে বিশ্বের শীর্ষ পরাশক্তি হিসেবে আমেরিকার মর্যাদা পরিবর্তিত হতে পারে, তখন সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বাকপটু ট্রাম্প মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান। বিপরীতে শি জিনপিং মার্কিন-চীন সম্পর্ককে একটি ‘গঠনমূলক কৌশলগত স্থিতিশীলতা’র দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছেন। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মতে, উভয় নেতা ট্রাম্প প্রশাসনের অধীনে এবং তার পরও দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক উন্নত করতে সম্মত হয়েছেন। চীনের নেতৃত্ব পারস্পরিক বোঝাপড়া এবং গঠনমূলক আলোচনার মাধ্যমে অতীতের মতবিরোধ কাটিয়ে একটি পারস্পরিক লাভজনক সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা করছে বলে মনে হয়েছে।

 

 

 

তবে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একই ধরনের ভাষা ব্যবহার করেনি। পরিবর্তে, হোয়াইট হাউস ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন প্রতিরোধ, হরমুজ প্রণালিতে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা, রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাতের সমাধান এবং শুল্ক ও বাণিজ্য প্রতিশ্রুতি নিয়ে আলোচনার মতো বিষয়গুলোয় মনোযোগ দিয়েছে। এ পরস্পরবিরোধী সরকারি বিবৃতিগুলো প্রমাণ করে যে, উল্লেখযোগ্য মতবিরোধ অমীমাংসিত রয়ে গেছে। সামগ্রিকভাবে, ট্রাম্পের চীন সফর দুই দেশের মধ্যে কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গির গভীর পার্থক্যের বিষয় আবারও প্রকাশ্যে এনেছে। আলোচনার সময় কূটনৈতিক ভাষা এবং অমৌখিক যোগাযোগ উভয় ক্ষেত্রেই এ পার্থক্যগুলো স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছিল। এ সফরকালে কোনো চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়নি, যা এ ধারণাটিকে আরও শক্তিশালী করেছে যে, শীর্ষ সম্মেলনে ট্রাম্পের অংশগ্রহণ মূলত প্রতীকী ছিল এবং এর ফলাফল আগে থেকেই অনুমান করা হয়েছিল। তা সত্ত্বেও, ট্রাম্প অমীমাংসিত বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার জন্য শি জিনপিংকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে যুক্তরাষ্ট্র সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। আপাতত এটাই আশার কথা।

 

 

 

বাংলাদেশ এই দুটি দেশ তথা উভয় শক্তির সঙ্গেই সুসম্পর্ক বজায় রাখতে চায়। যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কের উন্নতি হলে বৈশ্বিক বাণিজ্য স্থিতিশীল হবে, পোশাক রপ্তানিতে প্রভাব পড়বে, জ্বালানি বাজারে স্বস্তি আসবে ও বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নত হবে বলে আশা করা হয়েছিল। অন্যদিকে দেশ দুটির পারস্পরিক সম্পর্ক খারাপ হলে ছোট ও উন্নয়নশীল দেশগুলোকে কূটনৈতিক চাপের মুখে পড়তে হয়।

 

 

লেখক : অবসরপ্রাপ্ত মেজর : গবেষক, বিশ্লেষক ও কলামিস্ট

ট্যাগ:BCSকলামআন্তর্জাতিক