জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যেভাবে সাহায্য করতে পারে

জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যেভাবে সাহায্য করতে পারে
কলামআন্তর্জাতিক

জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যেভাবে সাহায্য করতে পারে

২০ জুলাই, ২০২৬

ড. খন্দকার আবদুল্লাহ আল মামুন [সূত্র : বণিক বার্তা, ২০ জুলাই ২০২৬]

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মধ্যপ্রাচ্য, পূর্ব ইউরোপসহ বিভিন্ন অঞ্চলের ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা বারবার বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারকে নাড়া দিয়েছে; প্রতিবারই প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের জ্বালানি সরবরাহ, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও অর্থনীতিতে।

 

 

তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) ও অপরিশোধিত তেলের দাম বেড়েছে, স্পট মার্কেটে জ্বালানি সংগ্রহ কঠিন হয়েছে, গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলো উৎপাদন কমিয়েছে, আর লোডশেডিং আবারো দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে উঠেছে। এমন ঘটনা আমাদের একটি কঠিন সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করায়: দেশের প্রায় ৯৯ দশমিক ৫ শতাংশ মানুষ বিদ্যুতের আওতায় এলেও সেই বিদ্যুতের বড় অংশ এখনো এমন জ্বালানিনির্ভর যার সরবরাহ ও মূল্য বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণে নেই। এ অস্থির বাস্তবতায় বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন শুধু নতুন বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ নয়; বরং বিদ্যমান গ্যাস ও বিদ্যুতের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা। উত্তর খুঁজতে গিয়ে বিশ্বজুড়ে গুরুত্ব পাচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই।

 
 

তবে সংকটের আরেকটি বড় কারণ দেশের ভেতরেই। পুরনো সঞ্চালন ব্যবস্থা, ত্রুটিপূর্ণ মিটারিং, বিদ্যুৎ চুরি ও অদক্ষ ব্যবস্থাপনায় উৎপাদিত বিদ্যুতের উল্লেখযোগ্য অংশ অপচয় হয়; সামগ্রিক সিস্টেম লস প্রায় ১০ দশমিক ১৩ শতাংশ, যার মধ্যে বিতরণ পর্যায়েই প্রায় ৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ। গ্যাস খাতের চিত্রও উদ্বেগজনক, সরকারি হিসাবে বিতরণ পর্যায়ে ক্ষতি প্রায় সাড়ে ৭ শতাংশ হলেও স্বাধীন গবেষণায় এ হার ১২ শতাংশ পর্যন্ত বলেও উল্লেখ রয়েছে। অর্থাৎ প্রতিটি ইউনিট বিদ্যুৎ ও প্রতিটি ঘনফুট গ্যাসের একটি অংশ ভোক্তার কাছে পৌঁছানোর আগেই হারিয়ে যাচ্ছে। কোথাও চাহিদার চেয়ে বেশি উৎপাদন, কোথাও ঘাটতিতে লোডশেডিং; শিল্প-কারখানার বড় অংশ কম দক্ষ যন্ত্রপাতিতে চলায় বাড়ছে জ্বালানির অপ্রয়োজনীয় ব্যবহার।

 

 

 

গ্যাসের এ অপচয় শুধু জ্বালানির ক্ষতি নয়। পাইপলাইনের লিকেজ, অবৈধ সংযোগ কিংবা অদক্ষ বিতরণ শেষ পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয় বাড়ায়, শিল্পের প্রতিযোগিতা কমায় এবং সরকারের আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি করে। তাই গ্যাস ও বিদ্যুতের দক্ষ ব্যবস্থাপনাকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই; দুটি একই জ্বালানি ব্যবস্থার পরস্পরনির্ভর অংশ। প্রতিটি এলএনজি কার্গোয় যখন মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হচ্ছে, তখন অপচয় হওয়া প্রতিটি ইউনিট বিদ্যুৎ শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতিই নয়, জ্বালানি নিরাপত্তারও বড় ঝুঁকি।

 

 

জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় এআইয়ের নতুন সম্ভাবনা: বিশ্বজুড়ে জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় দ্রুত বাড়ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার। গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, ২০২৫ সালে এ খাতের বৈশ্বিক বাজার প্রায় ১৮ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার, যা বছরে প্রায় ৩০ শতাংশ হারে বেড়ে ২০৩৪ সালে পৌঁছবে ৭৫ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারে। বিদ্যুৎ উৎপাদন থেকে সঞ্চালন, বিতরণ, শিল্পের জ্বালানি ব্যবস্থাপনা ও নবায়নযোগ্য শক্তির সমন্বয়, সব ক্ষেত্রেই এআই এরই মধ্যে কার্যকর ফল দিচ্ছে।

 

 

বিদ্যুৎ কেন্দ্রের যন্ত্রপাতি কখন বিকল হতে পারে তা আগেভাগে শনাক্তে এখন এআই ব্যবহার হচ্ছে; এতে অপ্রত্যাশিত উৎপাদন বন্ধের ঘটনা ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় দুই-ই কমছে। উন্নত দেশে এ প্রযুক্তিতে বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ডাউনটাইম প্রায় ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে। একইভাবে আবহাওয়া, জনসংখ্যা, শিল্প উৎপাদন ও বিদ্যুৎ ব্যবহারের তথ্য বিশ্লেষণ করে এআই ঘণ্টাভিত্তিক চাহিদার পূর্বাভাস দিতে পারে; এতে কমে অতিরিক্ত উৎপাদন, হ্রাস পায় আকস্মিক ঘাটতি ও ব্ল্যাকআউটের ঝুঁকি।

 

 

স্মার্ট মিটার ও গ্রিড সেন্সরে বিদ্যুৎ কোথায় অপচয় বা চুরি হচ্ছে, তা দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব। শিল্প-কারখানায় প্রতিটি যন্ত্রের ব্যবহার পর্যবেক্ষণ করে এআই চিহ্নিত করতে পারে কোন যন্ত্র কত বিদ্যুৎ অপচয় করছে; বিভিন্ন দেশে এতে শিল্প খাতে ২০-৩০ শতাংশ পর্যন্ত জ্বালানি সাশ্রয়ের উদাহরণ রয়েছে। তৈরি পোশাক শিল্পসহ রফতানিমুখী শিল্পে এর উল্লেখযোগ্য প্রভাব পড়তে পারে।

 

 

গ্যাস খাতেও এআই সমান গুরুত্বপূর্ণ। পাইপলাইনের লিকেজ আগেই শনাক্ত, মজুদ পর্যবেক্ষণ এবং সীমিত গ্যাস কোন খাতে অগ্রাধিকারে যাবে—সে সিদ্ধান্তেও এআই কার্যকর সহায়তা দিতে পারে। পাশাপাশি সৌর ও বায়ুবিদ্যুতের উৎপাদন নির্ভুল পূর্বাভাসে নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে জাতীয় গ্রিডে আরো দক্ষভাবে যুক্ত করা সম্ভব।

 

 

সম্ভাবনা—এবং বাধা

বাংলাদেশের জন্য প্রথম ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ তথ্যভিত্তিক জ্বালানি ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা। শুধু স্মার্ট মিটার বসালেই সমাধান হবে না, তবে এটিই হবে পরিবর্তনের ভিত্তি; কারণ সঠিক তথ্য ছাড়া কোনো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাই কার্যকর সিদ্ধান্ত দিতে পারে না। এরপর প্রয়োজন এআই-ভিত্তিক বিশ্লেষণ ব্যবস্থা, যা সিস্টেম লস শনাক্ত করবে, চাহিদার পূর্বাভাস দেবে এবং স্বয়ংক্রিয়ভাবে গ্রিডের ভারসাম্য রক্ষা করবে। এতে নতুন বিদ্যুৎ কেন্দ্র বা অতিরিক্ত এলএনজি আমদানি ছাড়াই বিদ্যমান সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

 

 

প্রযুক্তির পাশাপাশি বদলাতে হবে মানুষের আচরণও। এআই শুধু কোথায় অপচয় হচ্ছে তা শনাক্ত করবে; তা কমানোর সিদ্ধান্ত নেবে মানুষই, তাই প্রযুক্তিনির্ভর জনসচেতনতা কর্মসূচি এখন সময়ের দাবি। এআই-ভিত্তিক মোবাইল অ্যাপে গ্রাহকের দৈনিক ও মাসিক ব্যবহারের তথ্য, সম্ভাব্য অপচয় ও সাশ্রয়ের পরামর্শ তাৎক্ষণিক জানানো যায়। সাপ্তাহিক জ্বালানি সাশ্রয় চ্যালেঞ্জ, পয়েন্টভিত্তিক পুরস্কার ও আবাসিক এলাকাগুলোর মধ্যে ইতিবাচক প্রতিযোগিতা মানুষকে আরো সচেতন করবে; বিভিন্ন দেশে এমন উদ্যোগ এরই মধ্যে ইতিবাচক ফল দিয়েছে। শহরের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, গণপরিবহন কেন্দ্র ও ডিজিটাল বিলবোর্ডে প্রতিদিনের বিদ্যুৎ ব্যবহার ও সিস্টেম লসের পরিসংখ্যান দেখানো গেলে মানুষ বুঝবে—জ্বালানি সংকট শুধু সরকারের নয়, প্রতিটি নাগরিকেরও দায়িত্ব। আরো কার্যকর হতে পারে প্রণোদনাভিত্তিক ব্যবস্থা, নির্ধারিত সীমার চেয়ে কম বিদ্যুৎ ব্যবহারকারী পরিবার বা প্রতিষ্ঠানের বিলে ছাড়, লয়্যালটি পয়েন্ট বা অন্য সুবিধা চালু হলে সাশ্রয়ী ব্যবহারে আগ্রহ বাড়বে। অর্থাৎ প্রযুক্তি, জনসচেতনতা ও প্রণোদনার সমন্বয়েই গড়ে উঠতে পারে দক্ষ ও দায়িত্বশীল জ্বালানি ব্যবস্থাপনা।

 

 

সরকারি ভবন, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিল্প-কারখানা ও অন্যান্য বৃহৎ স্থাপনায় সৌরবিদ্যুৎভিত্তিক নেট মিটারিং ব্যবস্থা এবং এআই-ভিত্তিক স্মার্ট এনার্জি ম্যানেজমেন্ট চালু করলে নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদন বাড়বে, পাশাপাশি জ্বালানি অপচয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। এতে বিদ্যুৎ ব্যয় হ্রাসের পাশাপাশি অতিরিক্ত উৎপাদিত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের সুযোগ তৈরি হবে, কার্বন নিঃসরণ কমবে এবং কার্বন ক্রেডিট অর্জনের সম্ভাবনাও সৃষ্টি হবে। এমন উদ্যোগ দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক সাশ্রয় এবং পরিবেশগত টেকসইতাকে আরো শক্তিশালী করতে পারে।

 

 

বিগ ডেটা বিশ্লেষণে কোথায় বৃহৎ সৌর বা বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপন সবচেয়ে লাভজনক হবে তা-ও নির্ধারণ সম্ভব; এতে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগের ঝুঁকি কমবে, যা আজকের ১ হাজার ৬৩২ মেগাওয়াট নবায়নযোগ্য উৎপাদনকে ২০৩০ সালের ২০ শতাংশ লক্ষ্য পূরণে প্রয়োজনীয় ৫ হাজার মেগাওয়াটে পৌঁছাতে সহায়তা করবে। পাশাপাশি এআই-ভিত্তিক সিদ্ধান্ত সহায়ক ব্যবস্থা নীতিনির্ধারকদের বিদ্যুৎ উৎপাদন, ট্যারিফ নির্ধারণ ও ভর্তুকি ব্যবস্থাপনা আরো তথ্যভিত্তিক ও কার্যকর করতে পারে।

 

 

সম্ভাবনা যত বড়, চ্যালেঞ্জও ততটাই বাস্তব। জ্বালানি খাতের তথ্য এখনো বিভিন্ন সংস্থায় বিচ্ছিন্নভাবে সংরক্ষিত; স্মার্ট গ্রিড পরিচালনা ও জ্বালানি বিশ্লেষণে দক্ষ জনবলের অভাব; বিদ্যমান নীতিমালা ডায়নামিক ট্যারিফ, স্মার্ট গ্রিড কিংবা বিকেন্দ্রীভূত বিদ্যুৎ ব্যবস্থাকে এখনো পুরোপুরি সমর্থন করে না। অন্যদিকে পরিচ্ছন্ন জ্বালানিতে রূপান্তরে প্রয়োজন বিপুল বিনিয়োগ। তাই শুধু বিদেশী সফটওয়্যার বা নতুন প্রযুক্তি কিনে এ সমস্যার সমাধান হবে না; প্রয়োজন দক্ষ জনবল গড়ে তোলা, গবেষণা ও উদ্ভাবনে বিনিয়োগ বাড়ানো এবং সরকার, বিশ্ববিদ্যালয়, শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও প্রযুক্তিভিত্তিক স্টার্টআপের সমন্বয়ে শক্তিশালী দেশীয় উদ্ভাবন পরিবেশ তৈরি করা।

 

 

বাংলাদেশ এক প্রজন্মেই প্রায় শতভাগ মানুষকে বিদ্যুতের আওতায় আনতে সক্ষম হয়েছে। এখন নতুন চ্যালেঞ্জ উৎপাদন বাড়ানো নয়, বরং উৎপাদিত প্রতিটি ইউনিটের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা; কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা হতে পারে সেই লক্ষ্য অর্জনের অন্যতম কার্যকর হাতিয়ার। ভবিষ্যতের জ্বালানি নিরাপত্তা নির্ভর করবে শুধু কত জ্বালানি উৎপাদন করা যায় তার ওপর নয়; বরং কতটা দক্ষতার সঙ্গে তা ব্যবহার করা যায়, তার ওপরও। যে দেশ প্রতিটি ঘনফুট গ্যাস ও প্রতিটি ইউনিট বিদ্যুতের সর্বোচ্চ মূল্য আদায় করতে পারবে, আগামী দিনের জ্বালানি প্রতিযোগিতায় তারাই এগিয়ে থাকবে।

 

 

ড. খন্দকার আবদুল্লাহ আল মামুন: ভাইস প্রেসিডেন্ট (এআই, ইনোভেশন অ্যান্ড এন্ট্রাপ্রেনিউরশিপ), ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি, যুক্তরাষ্ট্র; অধ্যাপক, কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (সিএসই) বিভাগ, ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি (ইউআইইউ)

ট্যাগ:BCSকলামআন্তর্জাতিক