ইরানে শান্তি প্রচেষ্টা কি ভেস্তে যাচ্ছে

ইরানে শান্তি প্রচেষ্টা কি ভেস্তে যাচ্ছে
কলামআন্তর্জাতিক

ইরানে শান্তি প্রচেষ্টা কি ভেস্তে যাচ্ছে

১৭ জুলাই, ২০২৬

[সূত্র : কালবেলা; ১৭ জুলাই ২০২৬]

শনিবার (১১ জুলাই) রাতে মার্কিন বাহিনী একই সপ্তাহে তৃতীয়বারের মতো ইরানের ওপর হামলা চালিয়েছে। হরমুজ প্রণালিতে সাইপ্রাসের পতাকাবাহী একটি কনটেইনার জাহাজে ইরানের হামলার প্রতিশোধ হিসেবে এ হামলা চালানো হয়। এর জবাবে ইরান যুক্তরাষ্ট্রের উপসাগরীয় দেশ বাহরাইন, কুয়েত ও কাতারে পাল্টা হামলা চালায়। তাই প্রশ্ন জেগেছে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং তার ইরানি প্রতিপক্ষের মধ্যে জুনের মাঝামাঝি সময়ে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের অধীনে সম্মত হওয়া যুদ্ধবিরতি কি ভেস্তে গেছে? এদিকে আপাত ভেস্তে গেছে মনে হলেও মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার জন্য শনিবার সকালে একটি ইরানি প্রতিনিধিদল ওমানে যায়।

 

 

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প শুক্রবার হুমকি দিয়েছেন যে, ইরান যদি তার জীবননাশের চেষ্টা করে, তবে তিনি ইরানকে ‘ধ্বংস ও নিশ্চিহ্ন’ করে দেবেন। তিনি আরও বলেন, যদি ইরান কোনো গুপ্তহত্যার চেষ্টা চালায়, তবে ‘ইসলামিক প্রজাতন্ত্র ইরানের দিকে তাক করে ১০০০ ক্ষেপণাস্ত্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে’। অন্যদিকে শনিবার এক বিবৃতিতে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা তার বাবার মৃত্যুর প্রতিশোধ নেওয়ার অঙ্গীকার করেন।

 

 

এর মধ্যে ইরান জানিয়েছে, তারা জর্ডানে মার্কিন কমান্ড সেন্টার ও ড্রোনে হামলা চালিয়েছে। দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, ইরানের বিপ্লবী রক্ষীবাহিনী (আইআরজিসি) জর্ডানে অবস্থিত একটি মার্কিন সামরিক ঘাঁটির কমান্ড ও কন্ট্রোল সেন্টার এবং ড্রোন হ্যাঙ্গারে হামলা চালিয়েছে। আইআরজিসির দাবি ‘জর্ডানের প্রিন্স হাসান বিমান ঘাঁটির গুরুত্বপূর্ণ সামরিক অবকাঠামো ও স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে এবং বেশ কয়েকটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে ঘাঁটিটির কমান্ড ও কন্ট্রোল সেন্টার এবং এমকিউ৯ ড্রোন হ্যাঙ্গারগুলো ধ্বংস করে দিয়েছে।’ রোববার (১২ জুলাই) হরমুজ প্রণালিতে দ্বিতীয় একটি জাহাজে ইরানিদের হামলা চালানোর খবরও প্রকাশিত হয়েছে।

 

 

এর আগে তারা গুরুত্বপূর্ণ এ জলপথটি বন্ধ করে দেওয়ার এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পাল্টাপাল্টি হামলা চালানোর দাবি করেছিল। ইরানি গণমাধ্যমে বলা হচ্ছে যে, ‘হরমুজ প্রণালিতে নিয়ম লঙ্ঘনের অভিযোগে অভিযুক্ত দ্বিতীয় একটি জাহাজে হামলা চালানো হয়েছে।’ তারা আরও জানায়, কাতারে অবস্থিত একটি মার্কিন ঘাঁটিতেও তারা হামলা চালিয়েছে।

 

 

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেনকম) দাবি করেছে যে, ইরানের ওপর নৌযান, যুদ্ধবিমান এবং ড্রোন ব্যবহার করে তৃতীয় দফার হামলায় প্রায় ১৪০টি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে তাদের সেনারা। তাদের লক্ষ্যবস্তু ছিল ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ঘাঁটি, নৌ সক্ষমতা, গোলাবারুদ মজুত কেন্দ্র, যোগাযোগ নেটওয়ার্ক এবং উপকূলীয় নজরদারি কেন্দ্র। এমনি এক প্রেক্ষাপটে এমন প্রশ্নও উঠেছে যে, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ বিরতি কি তবে সম্ভব? কীভাবে ? নাকি ভেস্তে যেতে বসেছে কাঙ্ক্ষিত এ যুদ্ধবিরতি? কেন? এমন প্রশ্নকে শক্তভাবে তুলে ধরেছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সাম্প্রতিক মন্তব্য। ট্রাম্প বলছেন ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি শেষ। এখন বড় প্রশ্ন এরপর কী হবে? ট্রাম্পের ভাষায় ইসলামিক প্রজাতন্ত্র ইরানের দিকে তাক করে এক হাজার ক্ষেপণাস্ত্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। তার মতে, ইরান তাকে হত্যা করার হুমকি দিয়েছে। তিনি আবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমনটাও লিখেছেন যে, আলোচনা চলবে।

 

 

হতাশাবাদীরা মনে করেন চুক্তিটির আপাত অবসান ঘটেছে, যা মোটেই অপ্রত্যাশিত ছিল না। তারা মনে করেন হরমুজ প্রণালিতে জাহাজে হামলার অভিযোগে তেহরানকে অভিযুক্ত করে যুক্তরাষ্ট্র ইরানজুড়ে হামলা শুরু করে সংঘাত নিরসনের প্রচেষ্টা আবার প্রথম ধাপে ফিরে গেল। যুদ্ধবিরতি ভেস্তে গেছে শুনে অনেকেই বিশেষ অবাক হননি। বেশ কিছুদিন ধরেই গোটা মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে উত্তেজনা দানা বাঁধছিল এবং সমঝোতা স্মারকটি স্বাক্ষরিত হওয়ার সময়েও সেই উত্তেজনা অব্যাহত ছিল। তাই শান্তি প্রচেষ্টা ভেস্তে যাওয়া গত ৪৭ বছর ধরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে খুবই স্বাভাবিক ছিল এবং সাম্প্রতিক সংঘাতের কারণে তা আরও তীব্র হয়েছে।

 

 

এ দুটি দেশের মধ্যে আদত অত্যন্ত বৈরী সম্পর্ক বিদ্যমান। উভয়পক্ষের মধ্যে প্রচুর অবিশ্বাস রয়েছে। ইরানের শাসকগোষ্ঠী আগে থেকেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে অনিচ্ছুক ছিল এবং দুই দেশের মধ্যে সরাসরি সংঘাত শুরু হওয়ার আগেও এমন বৈরিতা ছিল। ইরানের অনেক শীর্ষ নেতৃত্বকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র হত্যা করেছে। অন্যদিকে ইসরায়েলের শাসকগোষ্ঠী আজ অনেক বেশি সাহসী। যুক্তরাষ্ট্র ছাড় দিলেও ইসরায়েল ছাড় দিতে অনিচ্ছুক। অনেকের দৃষ্টিতে মার্কিন পক্ষে বড় বাধা ইসরায়েল নয় বরং একজন খামখেয়ালি রাষ্ট্রপতি, যিনি ইরানের দিক থেকে যা কিছুই ঘটুক না কেন, তার প্রতিক্রিয়া জানাতে খুব আগ্রহী।

 

 

সুতরাং এই সংমিশ্রণই আজকের এ পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। তবে আশার কথা, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুদ্ধবিরতি শেষ হয়েছে বলার পরও যুক্তরাষ্ট্র মর্মে ঘোষণা দিয়েছে যে, তারা ইরানিদের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাবে। যুক্তরাষ্ট্র একই সঙ্গে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ও অন্যান্য আক্রমণ চালানোর পাশাপাশি কূটনীতিতে যুক্ত দেশগুলোর সঙ্গেও যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছে। মার্কিনিদের এমন নীতি নতুন কিছু নয়। অতীতেও এমনটা বহুবার দেখা গেছে। তাই পাল্টাপাল্টি উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে এ দুই দেশের মধ্যে মাঝে মাঝে আলোচনা চলতে থাকবে। কারণ দিনশেষে যুক্তরাষ্ট্র বা ইরান—কেউই মার্চের সেই পরিস্থিতিতে ফিরে যেতে চায় না। তাই বলা চলে যে, ভবিষ্যতের জন্য স্থিতিশীল অবস্থা এবং সার্বিক প্রেক্ষাপটে একটি চূড়ান্ত চুক্তিই কেবল বিরাজমান এ সমস্যাটির সমাধান করবে।

 
 

এ কথাও স্মরণ রাখতে হবে যে, নিছক সামরিক দিক থেকে দেখলে, যুক্তরাষ্ট্রের সক্ষমতা আছে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। অন্যদিকে ইরানের সাফল্য হলো তারা কেবল যুক্তরাষ্ট্রের শক্তিকে প্রতিহত করেনি বরং এ সংঘাত থেকে সুবিধাজনক অবস্থায় থেকে বের হওয়ার পথে হাঁটছে। ট্রাম্পের রিজিম চেঞ্জ বা শাসন ব্যবস্থার পরিবর্তনের হুমকিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ইরান তার শাসনব্যবস্থাকে অক্ষত রেখেছে। এরই মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকটির মাধ্যমে ইরান ট্রাম্প প্রশাসনের কাছ থেকে কয়েকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছাড়ও আদায় করেছে। আর সেই সমঝোতা স্মারকটি কার্যকর থাকুক বা না থাকুক, রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষরের মাধ্যমে সেই ছাড়গুলো দেওয়া হয়েছে।

 

এর মধ্যে এমন কিছু বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে—যা ইরান বছরের পর বছর ধরে চেয়ে আসছিল এবং বিভিন্ন মার্কিন প্রশাসনের কাছে অনুরোধ করেছিল, কিন্তু তাদের কেউই ইরানকে তা দেয়নি। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, সব মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং এ অঞ্চল থেকে সেনা প্রত্যাহার ইরানের অন্যতম দাবি ছিল, যা মেনে নিতে হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রকে। ইসরায়েল ও মার্কিন পক্ষের রাজনৈতিক ক্যালেন্ডারও ইরানকে সুবিধা এনে দিয়েছে। এ মুহূর্তে ইরানের রাজনৈতিক ক্যালেন্ডার নিয়ে তেমন কোনো উদ্বেগ নেই। কিন্তু আর মাত্র চার মাস পরেই ট্রাম্পের সামনে মধ্যবর্তী নির্বাচন। ২৭ অক্টোবর হতে যাচ্ছে ইসরায়েলের নির্বাচন। বর্তমান সংঘাতকে আমেরিকা ও ইসরায়েলের ভুল বলে ভাবছেন দুই দেশেরই অধিকাংশ জনগণ। তাই এ দুটি নির্বাচনের দিকে তাকিয়ে ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু কী করবেন, তার ওপরই নির্ভর করবে ইরানে শান্তি প্রচেষ্টার সাফল্য।

 
 

লেখক: অবসরপ্রাপ্ত মেজর ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক

ট্যাগ:BCSকলামআন্তর্জাতিক